somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জনৈকের কাছে জীবন-বিষয়ক প্রথম পাঠ

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ হঠাৎ নিজের আপাত-বেকার জীবনের ছ'মাস সময়টুকু বেশ মনে পড়ছে। আপাত-বেকার বললাম এজন্য যে আমার সহপাঠীরা সবাই সময়মত পাশ করে চাকুরে বা ফুলটাইম বেকার হয়েছিলো। আমিই শুধু বন্ধুমহলে একমাত্র ছাত্র রয়ে গেছিলাম! আরো একটা টার্ম, আরো ছয়টা মাস! আত্মীয়স্বজন জিজ্ঞেস করলে আবজাব কিছু একটা বলে দিতাম। দূরের বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যেতাম। চাকরি খুঁজতাম, ডাকলে ইন্টারভিউয়ে যখন বলতাম যে এখনও পাশ করিনি, চাকুরিদাতার মুখে অদৃশ্য সুক্ষ্ণ হাসি চিনতে ভুল হতো না। এই সময়ে স্বভাবতই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। বন্ধুবান্ধব যাদের সাথে আগে সময় কাটতো, তাদের কেউ কেউ যোগাযোগ রাখলেও বেশিরভাগই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সেখানে আমার খবর কেউ নিতো না, আমিও স্বস্তি পেতাম।

এই সময়টা আমার জীবনে দারুন একটা সময়। জ্ঞান হবার পর থেকে এরকম বেহিসেবী আলস্যভরা দিন, অজানা কারণে জেগে থাকা রাত আগে আসেনি। আমিও সেই সময়টাকে সাগ্রহে গ্রহণ করলাম। বাসায় বিশেষ থাকতাম না, হল-এ সারারাত প্রায় জেগেই থাকা হতো। ব্লগটা একটা ভালো টাইম কাটানোর মাধ্যম হয়ে গেলো। ফেইসবুকের গেমগুলাও খেলতে শুরু করলাম। আমি অতো মারকুটে গেমার না, শিশুতোষ-গুলোই খেলে মজা পাই। এসময় লেখালেখি শুরু করলাম আবার! আবার একারণে যে কলেজের পরে লেখাটা বন্ধই ছিলো একেবারে। এখানে পানি, রোদ আর আশকারা পেয়ে লতিয়ে উঠলো আবার! দেখতে দেখতে কতগুলো মাস পেরিয়ে গেলো।

শেষে একদিন পাশও করে ফেললাম। কীভাবে শেষ পরীক্ষা দিলাম, কীভাবে রেজাল্ট নিলাম, সেদিনের ঘটনা - কিন্তু এখন মনে করতে গেলে ঝাপসা লাগে। ঐ এক সপ্তাহ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম মনে হয়! পরীক্ষা দিতেই এই শিক্ষকের চাকরিটা হয়ে গেলো। শুরুতে একটু দোনোমনা ছিলাম, নেবো কি নেবো না- হাজার হোক, টেলিকম চাকরি অনেক লোভনীয়। অমুক কোম্পানিতে চাকরি করি বলতে গেলে নিশ্চয়ই বুক দু'ইঞ্চি ফুলে ওঠে! আমি সেখানে দরিদ্র-শিক্ষক। এতো টাকা এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েরা নিয়ে নেয় ছাত্রদের কাছ থেকে সব মনে হয় এ.সি. চালাতেই শেষ করে ফেলে। যাহোক এই বাজারে এরকম চাকরি পেয়েও আমি খুব খুশি হলাম এটা ভেবে যে আলসেমি যেটা রপ্ত করেছি ছয় মাসে সেটায় বাধা পড়বে না।

বাবা-মা-ও বেশ খুশি হলেন। তাদের মনে হয় আমার ব্যাপারে একটা সংশয় দেখা দিয়েছিলো মনে। সেটা দূর হলো। অফিসে গিয়ে কলিগদের বেশ ভালো লাগলো। সবাই বুয়েটের, দুই-এক বছরের সিনিয়র ভাইরা, সাথে আমার ব্যাচের দুইজন। হেড স্যার লোকটাও বুয়েটের, বেশ সাদাসিধা মানুষ। অফিসের সহকর্মীরাও বেশ মিশুক। সব মিলিয়ে অনুকূল পরিবেশ। কাজের চাপ তেমন নেই। অফিসে কোন হাজিরা বলে কিছু নাই। আসলে আসলাম, না আসলে নাই। খালি ক্লাশগুলো ঠিকঠাক নেয়া লাগে। আগস্ট মাসে পরীক্ষা চলে, আমার কোনও কাজ নাই, আসি, বসে থাকি কিছু ঘন্টা (হাজার হোক, নতুন এসেছি। এসেই ফাঁকিবাজি করলে যদি নট্‌ করে দেয়!), তারপর বিকেল পড়লে বেরিয়ে চলে আসি। গুলশান দুইয়ের মোড় থেকে হেঁটে আসি সেতুর পাশে ওয়ারিদ অফিসে, রিকশায় চড়ে বনানী ১১, ওখানে রাস্তা পার হয়ে ফের রিকশা নিয়ে বাসায়। রোদের ঝাঁজ কম হলে ভালোই উপভোগ্য জার্নি। তবে এয়ারপোর্ট রোডটা পার হতে খুব ভয় লাগে। জীবনের উপরে একটু মায়া পড়ে গেছে বেশিই।

সেদিন রেলগেটে রিকশা নিয়েছি। লাল শার্ট পরে একটা কালো, আমার বয়েসী রিকশাওয়ালা। আমি সাধারনত এত বিশেষভাবে খেয়াল করি না, তাড়াহুড়া থাকলে। এটা ছিল রোজার দ্বিতীয় দিন। একটু ক্লান্ত লাগছিলো তাই আস্তে ধীরে নড়াচড়া করছিলাম। রোদটাও প্রচণ্ড তীব্র, বিকেল পুরো পড়েনি, তাই গায়ে আঁচ লাগছিলো আর দরদরিয়ে ঘামছিলাম। রিকশায় ওঠার পরে একটু এগিয়ে বাঁকের মুখে একটা গাড়ি এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক করলো। আমি একটু আনমোনা ছিলাম, অতো জোরে ব্রেক না করলে সামনের চাকায় লেগে যেতো, হয়তো রিকশাসহ উল্টাতাম। ঝাঁকি খেয়ে নড়ে বসেই খেয়াল করলাম গাড়ির চালক মাথা বের করে কুৎসিত গালি দিলো। এরকম গালি রিকশাওয়ালা খেয়ে অভ্যস্ত, সেও সমান তেড়ে একইরকম কুৎসিত আরেকটা গালি দিলো।

আমি বরাবরি দুর্বলের দলে যাই। কিন্তু রাস্তার পাশে এরকম কাউকাউ করার শখ নাই। বললাম, "হয়েছে হয়েছে, চলো, টানো টানো"- সামনে থেকে সরে গেলে গাড়িওলাও শা করে বেরিয়ে গেলো। আমি মনে হয় একটু ধাতস্থ হয়ে বলেছিলাম, "কি মিয়া, দেখে শুনে চালাইবা না? রাস্তা পার হইতেছো কুনদিক দিয়া গাড়ি আসে দেখবা না?"

রিকশাওলা খানিক চুপ থেকে বলে উঠলো, "হ, সব দোষ আমাগো গরীব গো। যে ব্যাডা এরাম ইসপিডে গাড়ি টান দিলো হ্যার কোনো দোষ নাই।" আমি শুনে একটু অপরাধবোধে আক্রান্ত হই। আমারই বয়েসী একটা মানুষ, রোদে পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে শৈশবেই, এই গরমে রিকশা টানতে গিয়ে হয়তো খেয়াল করে নাই, বা হয়তো খেয়াল করেছে কিন্তু গতি কমিয়ে পরে বাড়তি খাটুনিটা করতে চায় নাই। মাঝখানে গালিটাও খেয়েছে বেমক্কা। অভ্যাস হয়ে গেলেই কি আর খারাপ লাগার পরিমাণ 'নেই' হয়ে যায়?

আমি বললাম, "না, সব দোষ তোমার হবে কেনো? কিন্তু লেগে গেলে তো তুমি আমি দুইজনেই মরতাম!" জবাব যেন তৈরি ছিলো, কথা শেষ করার আগেই শুনলাম, "হেইডা কন, আপনে মরার ভয় পাইছেন! ওঐটাইমে তাইলে আপনে আমি সমান!" পেছনে বসেও আমি নিঃসন্দেহ হই, কথাটা বলার পরে তার মুখে একচিলতে হাসি ঠিকই ফুটেছিলো!

তখন মনে পড়লো ঐ ছয় মাসের কথা। মরে গেলে ঐ ছয়মাস আমার জীবনের সেরা একটা সময় হতো নিশ্চিত। ঐসময়ে নিজের জীবন আর পরিপার্শ্ব নিয়ে এতো বেশি চিন্তায় সময় নষ্ট করেছি যে জীবনটাকেই একটা নতুন দৃষ্টিকোণে দেখা শুরু করেছি। এখন আসলেই মনে হয় মরতে ভয় পাই। মনে হয় কিছু একটা করতে হবে বাকি সময়টা দিয়ে। জগৎ-সংসারের হয়তো কিছু আসবে যাবে না তাতে, আমি অমন মহান ব্যক্তি নই, কিন্তু তারপর খুব শীতল হাতে মৃত্যু যখন ছুঁইবে, আমি তখন এই রিকশাওয়ালার মতো একচিলতে হাসি মুখে ঝুলাতে পারবো।


***



সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:০৮
৩০টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×