somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাপবোধ সংক্রান্ত টুকিটাকি বা হেনো তেনো

২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার পাপবোধের অনুভূতিটা বেশ টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আসলে চারপাশের মানুষগুলোর সাথে দিন দিন সম্পৃক্ততা কমে যাবার ফলেই মনে হয় এমন চিন্তার মোড় ঘুরে যাওয়ার সূত্রপাত।

পাপবোধ খুব সম্ভব একটা আপাত আরোপিত অনুভূতি। একটা শিশু কখনোই এই চেতনার অধিকারী হয়ে জন্মায় না। ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠার সময়টাতে, রঙ-রূপ-বর্ণ-শব্দগুলো চিনে চিনে চারপাশকে বোঝার সময়টাতে কোন এক অদৃশ্য প্রক্রিয়ায় এই অনুভূতি তার ত্বকে অভিস্রবণের মতো ঢুকে যেতে থাকে। মনে হয় সে নিজেও টের পায় না সে কখন পাপী হতে শুরু করে- কিংবা বলা যায় নিজেকে কখন পাপী ভাবতে শুরু করে।

একটি শিশু বড়ো হয়ে উঠতে উঠতে নিজেকে একটা সময় দোষী ভাবছে এই চিন্তাটা পীড়াদায়ক। তার স্বাধীনতার পরিপন্থীও বটে। কেননা মূলত শিশুদের দ্বারা আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হই না। নিতান্ত দুরন্ত শিশুও তুচ্ছ বা মূল্যবান তৈজস ভেঙে ফেলা ছাড়া তেমন কোনও গুরুতর অপরাধ করে না। অথচ সেই সময়টায় তাকে বেশ বিরূপতা পেতে হয়, বাবা-মা- বড়োদের কাছ থেকে। শিখে নিতে হয় উচিত-অনুচিতের লিস্টি। মা-বাবা শিখিয়ে দিতে থাকেন, চলা-বসা-কথা-হাঁটা-থামা। অপরাধী সত্ত্বাটির হয়তো তখনই জন্ম ঘটে।

উচ্চারণে যেসব শব্দেরা দূষিত, বা পঙ্কিল, সেগুলো আমরা বড়োরা খুব সযত্নে পরিহার করতে চেষ্টা করি একটা শিশুর সামনে। কেননা একটা সময়ে সে আমাদের সামনে কুৎসিত সেই শব্দ বা ভঙ্গিগুলো শিখে ফেলবে এটা জানার পরেও আমরা সেগুলো যতটা সম্ভব আড়াল করতে চাই। কিন্তু এতে করে যখন তারা শব্দগুলো শেষমেশ শিখেই যায়, তখন সেগুলোকে পরিচয়পত্রসহই শিখে নেয়। এমনকি অভিধানেও আমরা তাদের সেভাবেই চিহ্নিত করে রেখেছি।

এত গেল শব্দেরা, আশেপাশের দৃশ্যাবলিও যথেষ্ট কুৎসিত আমাদের এই জনপদে। বিরাট আকাশ-সংস্কৃতি না হয় ছেড়ে দিলাম, সচেতন অভিভাবকেরা হয়তো বেছে বেছে কাদা-ময়লা এড়িয়ে চলেন। কিন্তু রাস্তাঘাটে, বাজারে, দপ্তরে আমরা ক্রমশই অশ্লীল হয়ে উঠছি দিনে দিনে। ইদানীং কিছু পোশাকে নগ্নতা দারুন প্রকাশ পায়। গোপন রতিতে হয়তো তা তুমুল-কামনাজড়িত সুখের প্রভাবক হবে, হয়তো পুরুষ বা নারীটির সঙ্গীর দ্বারা প্রশংসিতও। কিন্তু প্রকাশ্যে আমরা চোখ দিয়ে চেটে-পুটে খেয়ে নিতে নিতে ভুলে যাই, পাশেই কোমর-উচ্চতার ছেলেটি বা মেয়েটিও দুচোখে গিলছে। তার দুচোখে নেমে নেমে পড়তে থাকা যুবকের প্যান্ট, আর উঠে উঠে যেতে থাকা যুবতীর টপস্‌ খুব সহজেই জানলা খুলে হাট করে তীব্র রোদ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সাথে করে ব্রীড়াজনিত সঙ্কোচটুকুও ঝরে পড়ছে।

আমরা এগোচ্ছি সামনে, ধীরে ধীরে আমাদের পদক্ষেপের দ্রুততা বাড়ছে। সেক্ষেত্রে বাইরের জগতের আলো প্রবেশ করার সময়ে অতিবেগুনিরশ্মির মতো কিছু রঙ আমাদের বালক-চোখদের খুব দ্রুতই বয়স্ক করে দিচ্ছে। আমি জানি এটা ঠেকানোর কোনও উপায় নেই। ফ্যাশন নামক বিদঘুটে অসংজ্ঞায়িত শব্দটির ফাঁদে পড়ে অশ্লীলতা ক্রমশই শ্লীল হয়ে যায়।

বালক থেকে বড়ো হয়ে উঠলেই অনেকটাই আগল খুলে যায়। অনেক আপাত রহস্যেরা সহজ-কঠিন সত্যরূপে প্রকাশ পায়। শরীর সশব্দ হয়। সেসময়ে ভাঙা-গড়ার খেলা খেলতে খেলতে একেকজনের নিজস্ব পাপবোধ গড়ে উঠে। এখানে ধর্ম হয়ত একটা বিরাট সর্বগ্রাসী ভূমিকা পালন করে। স্কুলের নতুন-বদলি-হয়ে-আসা হেডমাস্টারের মতন খুব সীমা-নির্ধারিত হয় সবকিছুর। ভালো-মন্দকে বার্লিন দেয়াল তুলে আলাদা করে দেয়া হয়। তবে আগের এই একচেটিয়া অধিকারটুকু ধর্ম দিন দিন হারাচ্ছে। সেটা কতটা হতাশার বা কতটা আশার তার তুলনা করা সম্ভব না। তবে তার মসনদে নতুন যে বসবে তাকে ভালভাবে চিনে নেয়াটা জরুরি। আমরা যখন এক স্বৈরশাসককে সরিয়ে আরেক স্বৈরশাসক টেনে আনি- তখন অনেকসময় বেশ দেরিতে টের পাই, আগেরজনই ভালো ছিলো!

ধর্ম খুব প্রয়োজনীয় রূপ ছেড়ে এই ঢাকা শহরের ইট-কাঠের চাপে পড়ে জুম্মাবার আর রোজার মাসে আটকে যাচ্ছে। অন্য ধর্মগুলোর পালনে অতোটা প্রাবল্য নাই। গুরুজনেরা বলেন, আগে সেগুলোর অনেক উচ্ছ্বাস এখন গলাবন্ধ কোটের মতন গরমে আটকে হাঁসফাঁস করছে। আর ইসলাম দারুন জোশে ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যক্তির পালনের মাঝে ধর্মই ঠিক করে দেয় পাপবোধ কেমন হবে। দিনের পর দিন নামাজ ক্বাযা করে আমাদের ত্বকে যে বোধ আঁচড় কাটে না, সেই বোধই সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় একদিন রোজা না রাখলেই (যদিও দুটোর মূল্যমান ধর্মমতে সমান)! এখন আমাদের ক্ষয়িষ্ণু প্রজন্ম সেটাও মানছি না। সমস্ত মাল্টিমিডিয়ার তোড়ে নিবিড় ধর্মপালন বইয়ে চাপা-দেয়া ফুলের পাঁপড়ি হয়ে গেছে। সেখানে ধর্মের সামাজিক উচ্চারণ প্রবল উচ্চকিত।

এখানে তখন মনে হয় কোন বোধে তাহলে আজ আমরা নিজকে যাচাই করি? কেউ কেউ হয়ত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরছে। বাবা-মায়েরা কুইনাইন-গোলানো গ্লাসে করে তা সন্তানকে গিলিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু তার মধ্যেও এর রূপ পরিবর্তিত হয়। মানুষ থেকে মানুষে যাবার সময়ে বোধেরা বদলে যায়। নজরুল-রবীন্দ্র-গানেদের রিমিক্সের মতোই! বিলাসিতার মাত্রা আর অপচয়ের পরিসীমা নতুন করে নির্ধারিত হয়। টাকার গন্ধ অনেকটা আফিমের মতো রক্তে প্রবেশ করলে আমরা তাতে বিমোহিত আচ্ছন্ন হতে থাকি আর ক্রমশ ভুলে যাইঃ আমাদের প্রপিতামহেরাও দুপুরে খররোদে ঝলসে যেতে যেতে লাঙলে কাঁধ জুড়ে ঠেলে ঠেলে নীরস মাটি খুঁড়ে সোনা ফলাতেন। তার ত্বকের কালোরঙা জিন আমার অসূর্যম্পশ্যা মাতামহী-মাতার শরীর ঘুরে আমার মাঝে আসতে আসতে চাপা পড়ে গেছে। দুধ-সাদা ত্বকে ঘামেরা জমতেও পারেনা। তাই টিনটেড গ্লাসের ওইপাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ হাত বাড়ালে তাকে আমরা চিনতেও পারি না।

এভাবে ভাবনাটা খুবই একপেশে মনে হয়। একটা এক্সট্রিম-কে প্রকাশ করতে মনে হয় আরেকটা এক্সট্রিম-কে টেনে আনতেই হয়। রুপোর টাকার ঝনঝনানিতে কানে তালা লেগে যেতে যেতে আমরা পাপবোধ কাটিয়ে উঠতে থাকি। এই জনপদের অনেক নিচে, অনেক গভীরে আমাদের প্রপিতামহেরা হাড়-গোড়ে শুয়ে থাকতে থাকতে কেবলই ক্ষয়ে যেতে থাকেন!



***
গতহপ্তা'জুড়ে লেখা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:১০
৪২টি মন্তব্য ৪২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×