আমার প্রিয় পোস্ট

চতুর্মাত্রিক.কম (choturmatrik.com)

স্নানক্লান্তি

২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:১৮

শেয়ারঃ
0 0 0


পানির ফোয়ারা মুখ থেকে অনর্গল সাপের মতো ফোটায় ফোটায় পানি ছুটে আসছে। প্রথমে তারা উচ্ছ্বাসে ঝাপটা দিল আমার কপালে, ঈষৎ নিচু করে রাখা মুখে দ্রুত গড়িয়ে নামল তারা, সদলবলে, সোল্লাসে। চোখের পাতা কেঁপে উঠলো কিছুটা, পানিবিন্দুর ভারে আবেশে বুঁজে এলো। পানির রথের সেদিকে খেয়াল নেই, দুর্দান্ত দাপটে সে গাল, চিবুক, ঠোঁট, থুতনি পেরিয়ে গেল অনায়াসেই। তারপরে কেউ কেউ ঝরে গেল সুদূর টাইল্‌সে। মহাপতন! কেউ কেউ সেই ঊর্ধ্বমুখী চলনে গড়িয়ে গেল গলায়, গোপনে-

গোপন সুখের মত আমি চোখ বুঁজেই থাকি। পানির অবিশ্রাম ধারা ঝরছে, অঝোরে, নিভৃতে। গলারভাঁজ থেকে গ্রীবার সমতলে তারা ছুটে চলে। নীরব, কিন্তু নিরলস। আমি খেয়াল করি পিঠের ওপরেও আছড়ে পড়ছে ক্ষুদেকণা, বিম্বিসার পথের মত, সেখানে পথ তৈরি হয় অচিরে। গহনপথের ঠিকানায় ঘোলা ঘামের দাগ বিস্মৃত হয়, যেভাবে আমি আমার শৈশব ভুলে গ্যাছি, যেভাবে গতকালের জীবন হারিয়ে ফেলেছি। সেভাবে জরুরি প্রত্যাদেশের মত নোটিশ ঝুলে উঠল পিঠে, জলের দাগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্লাবনেরও অধিক শোক মুছে দিতে পারে।

পানির ঢেউ আরো নিচে নেমে যেতেই থাকে আমাকে শিউরে দিয়ে। চোখ খুলে আমি পানির রঙ দেখি, উন্মনা দেহের সৌরভের মত রঙ পাঁপড়ির সামনে খেলা করে। চারপাশে পানির দোলায়মান দেয়াল, দুলছে, নাচছে, সরে যাচ্ছে, কাছে আসছে। আমিও অজান্তেই মাথা দুলাই। ঘুরতে থাকে পৃথিবী আমার চারপাশে, মানুষেরা বিম্বের মত বশংবদ হয়ে সঙ্গী হতে থাকে, কাতার কাতার মানুষ, অজস্র অসংখ্য অচেনা অবয়ব ঘিরে ধরে আমাকে। আমি টের পাই জলের পর্দার বাইরে সকলে হা হা করে আমার দিকে হাত বাড়িয়েছে। ডাকছে, আয়! আয়!

কিন্তু আমি নড়তেও পারি না। অচল পাথরের মত নিস্তব্ধ হয়ে আমি আমার শরীরে ক্রমাগত ঝাঁপিয়ে পড়া পানি, আর ঝরে পড়া বিন্দু গুনি। তার বাইরের পৃথিবী ঝাপসা, ক্রমশ দূরাগত, অভিমানী! সামনে ও পেছনে পানিপথে প্রবল স্রোত, আমি ভেসে যাই খড়কুটোর মত। নিঃশ্বাসেও জলজ অক্সিজেন আমার ফুসফুসে নৃত্য শুরু করে দেয়। আমি আরাম পাই, ধীরে ধীরে আমার পেশি শিথিল হয়ে আসে, চোখ বুঁজে ফেলি আবার, এবং এবারে আমি আর সেটা খুলতে চাই না। শুধুই অবিরাম বর্ষণ। শুধুই ঝরোসুর। শুধুই নীরবতায় পানির গান। আঁধারের পর্দা নেমে এলে আমার কোষ জেগে ওঠে পলিদ্বীপের মত, বাইশখালি চরের মত। চরের ধবল বালুর মত আমার শরীরে ভিন্‌রূপী ত্বক হেসে ওঠে। আমি চোখ না খুলেই অবাক হয়ে তার খিল খিল হাসি শুনি।

একটা সময়ে নেমে আসা পানির স্রোত থেমে যায়, স্রোতের ভেতরে বিন্দুর রথ স্থবির হয়ে আসে, উড়তে থাকা বাষ্প কণাও ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে আমার খুলির ভেতরে সেঁধিয়ে যেতে থাকে। আমি চোখ খুলি না তখনও, শিথিল শরীরে পড়ে থাকে শাদাটে হাড়ের মত সিক্ত মেঝেতে। শরীরে লেগে থাকা পানির বিন্দুগুলো সহোদর-মায়ায় মাটিতে নেমে আসতে থাকে, আমার আতিথেয়তা বুঝি তাদের আর ভালই লাগে না! দূরের পর্দার ওপাশে মূর্তির মত স্থির মানুষের মুখ, শতসহস্র মানুষের নির্বাক চোখ আমার বন্ধ চোখের ভিতর দিয়েও আমাকে বিঁধতে থাকে।



***
- অনীক আন্দালিব
২৪.৬.৯


 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): মুক্তগদ্যস্নানক্লান্তি ;
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:৩৭ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৩৫
শফিউল আলম ইমন বলেছেন: এক কথায় চমৎকার লেখা। আপনার লেখা পড়ে খুব ঈর্ষা হয়।
কেমন আছেন? অনেকদিন কথা হয় না, ব্লগে আসা হয়নি।:(
২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৪৩

লেখক বলেছেন: এখন তো এলেন, এটাই তো ভালো হলো। :)

আমি ভালই আছি, আপনার খবর কী? ঈর্ষা পরিত্যাগ করেন। ;)

২. ২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৪৪
জয় সরকার বলেছেন: অসম্ভব সুন্দর লেখা..................
২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৪৮

লেখক বলেছেন: বিনীত ধন্যবাদ জানাই। ভালো লাগলো।

৩. ২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৫৮
ফারহান দাউদ বলেছেন: লেখাটা পড়ার পরে মনে হইলো বৃষ্টির শব্দ শুনলাম, শান্তি।
২৮ শে জুন, ২০০৯ ভোর ৪:০২

লেখক বলেছেন: তাহলে তো আমি শব্দের শরীর তৈরি করে ফেললাম মনে হয়! :)

তোমার অনুভূতির সংবেদনশীলতা বেশি, এখানে মিলে গেছে সম্ভবত।

৪. ২৮ শে জুন, ২০০৯ ভোর ৫:০৪
শান্তির দেবদূত বলেছেন: অদ্ভুত ! অদ্ভুত !

শুধু স্নানের উপর এমন লেখা হতে পারে এটা না পড়লে কখনোই বুঝতাম না.....এমন ছোট ছোট তুচ্ছ ব্যপারগুলোকে এমন শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে প্রথমেই যে জিনিষটা দরকার তা হলো প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা......আপনি তা আজ দেখালেন চরমভাবে ......

আবারও, অদ্ভুত ! অদ্ভুত !
২৮ শে জুন, ২০০৯ সকাল ১১:৩৮

লেখক বলেছেন: কী লিখলাম!

এভাবে বললে বিরাট শরমিন্দা লাগে! :)

আমি আসলে একটু বিদঘুটেই ভাবছিলাম, এভাবে ভাবনাটাকে। ঠিক ফুটে উঠল কিনা, সেটা নিয়েই সংশয় কাজ করছিল। তবে এখন আপনার মন্তব্যে মনে হচ্ছে সে চিন্তাটা অমূলক।

৫. ২৮ শে জুন, ২০০৯ ভোর ৫:১৫
ফেরারী পাখি বলেছেন: ওয়াও! স্নান আমার খুব প্রিয় বিষয়। তার সাথে এমন সুন্দর বর্ণনা।

আমি মুগ্ধ।
২৮ শে জুন, ২০০৯ সকাল ১১:৫১

লেখক বলেছেন: স্নান আমারও খুব প্রিয় বিষয়। একান্ত, গোপন। নিজের সাথে কেবলই নিজের সময় কাটানোর সময়।

থ্যাঙ্কু আপা। ভালো থেকো।

৬. ২৮ শে জুন, ২০০৯ ভোর ৬:৩৯
চিটি (হামিদা রহমান) বলেছেন: অসম্ভব সুন্দর শব্দ চয়নে। ভালো লাগলো।
২৮ শে জুন, ২০০৯ সকাল ১১:৫২

লেখক বলেছেন: আবারও অনেকদিন পরে দেখা হলো। কেমন আছেন আপনি?

৭. ২৮ শে জুন, ২০০৯ সকাল ৯:১৫
আকাশচুরি বলেছেন: স্নানও কতো শৈল্পিক হতে পারে!!

ছন্নের পেন্সিল দিয়ে অবিরাম সোনা ঝরুক:)
২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:০৪

লেখক বলেছেন: আপনার মুখে (পড়ুনঃ আঙুলে) ফুলচন্দন পড়ুক। :)

৮. ২৮ শে জুন, ২০০৯ সকাল ৯:৩২
বৃত্তবন্দী বলেছেন: স্নানক্লান্ত ভালো লাগা...
২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:০৮

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ শুভ ভাই। :)

৯. ২৮ শে জুন, ২০০৯ সকাল ১০:০২
আহমেদ রাকিব বলেছেন: শফিউল আলম ইমন বলেছেন: এক কথায় চমৎকার লেখা। আপনার লেখা পড়ে খুব ঈর্ষা হয়।
--------------------------------------------------------------------------
পুরাই সহমত। ;)
২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:১০

লেখক বলেছেন: আমিও সহমত! ;)

১০. ২৮ শে জুন, ২০০৯ সকাল ১০:৩৮
পারভেজ বলেছেন: শৈল্পিক লেখনী!
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তরল ভালোলাগায় সিক্ত করে রাখলো।
২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:১১

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ পারভেজ ভাই। লেখাটা আপনার ভাল লেগেছে জেনে খুশি হলাম।

২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:১৫

লেখক বলেছেন: এক শব্দে এমন করে প্রশংসা করলে অভাবিত ভাল লাগে!

১২. ২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৩
শেরজা তপন বলেছেন: আসলেই দুর্দান্ত- ভীষন ভাল লেগেছে
২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৫

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ শেরজা তপন। আপনার পাঠে আমার ভালো লাগছে।

১৩. ২৮ শে জুন, ২০০৯ বিকাল ৪:২২
ভাঙ্গা পেন্সিল বলেছেন: এই গরমে এইরকম লেখাই চাই!!
২৮ শে জুন, ২০০৯ বিকাল ৫:০১

লেখক বলেছেন: তার মানে খুব "সময়োপযোগী পুস্ট" হইছে! নাকি? ;)

১৪. ২৮ শে জুন, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:০৫
আন্দালীব বলেছেন: আমার আনন্দ লাগতেছে যে আপনি "জল" কে 'পানি' বলতে পারছেন দেখে...

কতো লোক ইহকাল পাড়ি দিলো..."জল" লেখার লোভ ছাড়তে পারলো না!
২৮ শে জুন, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩২

লেখক বলেছেন: আরে! এই জন্যেই বলে জহুরির চোখ!
আমি খুব সচেতনভাবেই 'জল' এড়িয়ে 'পানি'কে নিয়ে লেখার চেষ্টা করলাম। কারণ আমি সবসময়েই 'পানি' বলি, 'পানি' খাই। সুকুমারের 'জল'পাইয়ের দিন তো কবেই গেছে!
এটা নিয়ে আপনার সাথে তো কত আলাপও হইছে। :)

লোভ ছাড়তে ছাড়তে আমি না শেষে সন্ন্যাস নিয়ে ফেলি! ;)

১৫. ২৮ শে জুন, ২০০৯ রাত ১১:৩৫
প্রণব আচার্য্য বলেছেন: কী হে ছন্ন?






(মগজে কারফিউ, সব কিছু ধীরে ধীরে ঢুকতেছে, আরো পড়ি কয়েক বার)
২৯ শে জুন, ২০০৯ রাত ১২:২২

লেখক বলেছেন: সময় প্রচুর, হরতালেও স্থবির নয় এ-অঞ্চল। আপনি পড়েন সময় নিয়েই, কোন সমস্যা নাই! :)

৩০ শে জুন, ২০০৯ রাত ১২:৪৩

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ শুভ্র।

১৭. ০১ লা জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৩:১২
েজবীন বলেছেন: দুর্দান্ত ! ..... :)

স্নান ব্যাপারটা নিয়ে কি দারুন করে লিখলেন........

আকাশচুরি মতো করে বলি ...... স্নানও কতো শৈল্পিক হতে পারে!!
০১ লা জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৩:২৮

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ জেবীন।

এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা নিয়ে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন। সেটাকে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস ছিল। তা আপনার ভাল লেগেছে জেনে খুব খুশি হলাম।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৩৪৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
লেখালেখির সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত©লেখক

যোগাযোগঃ shunno.oronno@gmail.com
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই