কোন এক ছুটির দিনে এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াত। খাওয়া দাওয়া এবং আড্ডার পরপর যেটা হয়, ডিভিডি কালেকশন নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। বন্ধুটির বড়ভাই বেশ উদার এবং কালেক্টিভ মানুষ। আমরা একটা ঢাউস ব্যাগ খুলে থরে থরে সাজিয়ে রাখা ডিভিডি দেখছি। কোনটা দেখা হয়ে গেছে আর কোনটা দেখা লাগবে সেটাও হিসাব করছি। এমন সময় পরপর অনেকগুলো ডিভিডি দেখলাম একই। একজন কে জানি বললো, এটা একটা সিরিজ। আমি আগ্রহের বশে বললাম, এত দিন মুভি দেখেছি। এখন সিরিজ দেখতে হয়, কী জিনিস।
সেই হলো শুরু। যে ডিভিডিগুলো হাতে নিয়েছিলাম সেগুলো ছিল ফ্রেণ্ডস -এর। একসাথে দশ সীজন-এর দশটা ডিভিডি। একটানা দিনরাত জেগে দেখলাম। হাসতে হাসতে শ্যাষ কথাটা যে আসলেই সত্যি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।
এর পরে কত সিরিজ যে এল গেল। কোনটা ভাল লেগেছে, কোনটা পুরাই ফালতু, কোনটা দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। আর কোনটার একটা এপিসোড মিস হলে হন্যে হয়ে নেট ঘেঁটে ডাউনলোড করে দেখার পরেই শান্তি হয়েছে!
সেইসব সিরিজের ভেতর থেকে আমার পছন্দের তিনটা সিরিজ নিয়ে এই লেখাটা।
House M.D.

সিরিজটার নামটাই অদ্ভুত। শুনলে মনে হয় বাড়িঘর। আবার এম.ডি. বুঝাচ্ছে এটা কোন ডাক্তারের নাম। কিন্তু মানুষের নাম হাউস- এটা কেবল আমেরিকানদের মত জাতের পক্ষেই সম্ভব। ডাক্তারের পুরো নাম ড. গ্রেগরি হাউস। নামের চেয়েও বিদঘুটে তার কাজকর্ম। হাঁটেন একটু খুড়িয়ে খুড়িয়ে, পায়ের শিরায় স্ট্রোক করে পেশীর অনেকখানি অংশ কেটে ফেলে দিতে হয়েছিল। সেইসময় থেকেই তার পায়ে সারাক্ষণ ব্যথা। ব্যথা কাটানোর জন্য হরদম গিলছেন পেইনকিলার “ভাইকাডিন”, একেবারে মুড়ি মুড়কির মতই। ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও, হাসপাতালের ভিতরে সাদা কোট পরেন না। তার কাছে যেসব রোগী আসে, সেগুলো এমনই বিদঘুটে কেস, অন্য সব ডাক্তার যেখানে হাল ছেড়ে দেয়, সেখান থেকেই তার কাজ শুরু! হাসপাতালের ডীন আবার বেশ সুন্দরী, কিন্তু কঠোর মহিলা। তার সাথে হাউসের আগে একটা “কিছু” ছিল বলে আন্দাজ পাওয়া যায়।
হাউসের ডিপার্টমেন্টের নাম “ডিফারেনশিয়াল ডায়াগনস্টিক”। একটা কম প্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে কাজ কারবার। ডাক্তারের চিন্তাভাবনা যেমন দেখি, তারা রোগীর লক্ষণ, উপসর্গ শুনে একটা ফরম্যাটে ফেলে দেন। কয়েকটা আন্দাজ রোগ বাছাই করে কিছু টেস্ট করান, তারপরে যে রোগটা মিলে যায়, সেটার জন্য ওষুধ দেন। হাউসের কাজ এর থেকে পুরোপুরি আলাদা। এমন এমন রোগী আসে, যাদের কোন উপসর্গ নাই, অথচ হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! বা, হঠাৎ করেই একজন চোখে দেখতে পারছেন না, অথচ অন্ধত্বের কোন লক্ষণই নাই! এইরকম কুলকিনারাহীন এক একটা সমস্যা এক এক এপিসোডে সমাধান হয়। খুবই উত্তেজনার পর্বগুলো, মাঝে মাঝে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়েই রোগীর জীবন বাঁচাতে হয়। সিরিজটির বর্তমানে ষষ্ঠ সীজন চলছে। এখন পর্যন্ত কাহিনী “ঝুলে নাই”, অবাস্তব মেলোড্রামা নাই, পারষ্পরিক টানাপোড়েন, “টু বি কন্টিনিউড” (এইটা আরেক সিরিজের মূল আকর্ষণ(!) “Heores”) নাই। এক পর্বেই গল্প শেষ, মাঝে একটা দুইটা পর্ব মিস করলেও সমস্যা নাই।
The Big Bang Theory

আমি হাসির সিরিয়ালকে এতটা বৈষয়িক হতে খুব কম দেখেছি। বেশির ভাগ কমেডি বা সিট-কমগুলো ধীরে ধীরে মূল লক্ষ্য থেকে সরে যায় বলেই মনে হয়েছে। নির্ভেজাল হাস্যরস, এবং সেইসাথে দুর্দান্ত সংলাপ (অবশ্যই প্রাসঙ্গিক) এই সিরিজটার মূল শক্তি। চারজন পদার্থবিজ্ঞানী বন্ধু এবং তাদের প্রতিবেশী সুন্দরীকে নিয়ে এর গল্প। লেনার্ড, শেলডন একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে। তাদের আরো দুই বন্ধু ক্ষীণাঙ্গ হাওয়ার্ড এবং ভারতীয় রাজ কুত্রাপলি। মাঝে মাঝেই সংলাপে নানারকম রেসিস্ট মন্তব্যকে পরিহাস করা হয়। হাওয়ার্ডের ইহুদি হওয়া, মায়ের সাথে ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত বসবাস করাটা যেমন পঁচানি খায়, তেমনি অতিরিক্ত শুচিবাইয়ের জন্য শেলডনও কম ধরা খায় না! এরই মাঝে লেনার্ড এবং শেলডনের পাশের ফ্ল্যাটে এসে ওঠে পেনি। এক চীজকেকের দোকানের ওয়েইট্রেস, এবং নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখা মেয়ে। স্বভাবতই যথেষ্ট সুন্দরী এবং বোকা প্রকৃতির। আমরা ডাম্ব-ব্লণ্ড মেয়েদের নিয়ে যে জোকগুলো শুনি, সেগুলোর নিখুঁত উদাহরণ। এখন এই সিরিজটির দ্বিতীয় সীজন শেষ হয়ে এখন তৃতীয় চলছে। একমাত্র সমালোচনা এই যে মাঝে মাঝে উদাহরণগুলো খুব বেশি “তত্ত্বীয়” হয়ে যায়। তবুও, দেখা শুরু করলে মনে হয় রসাস্বাদনে তেমন সমস্যা হবে না!
Smallville

তিনটি সিরিজের মধ্যে এটাই সবচেয়ে পুরনো। এখন মোট আট সীজন শেষ হয়েছে। স্মলভীলের কাহিনী হল সুপারম্যানের ছোটবেলা। তার হাইস্কুলের সময় থেকে বড় হয়ে ওঠা। আমি যখন প্রথম দেখতে শুরু করি, তখন এতটা মজা লাগেনি। যদিও ক্লার্ক কেন্ট, লেক্স লুথার, লানা ল্যাঙ এই তিন চরিত্র আগে থেকেই পরিচিত। যারা সুপারম্যানের কমিক্সের ফ্যান তারা নিশ্চয়ই লাফ দিয়ে উঠেছেন। মুভিগুলো দেখা থাকলেও এদের চেনা যায়। সাথে ছিল ক্লার্ক কেন্টের পালক বাবা-মা মার্থা কেন্ট এবং জোনাথন কেন্ট। শুরু থেকেই ক্লার্কের বড় হয়ে ওঠা, নিজের এক একটা শক্তির সাথে পরিচিত হয়ে ওঠার ব্যাপারগুলো ঘটতে থাকে। সেইসাথে শুরু হয় লেক্স লুথারের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার নানা তরিকা। সেই সাথে প্রতি পর্বে নতুন নতুন কাহিনী, ক্রিপটোনাইটের প্রভাবে, রেডিয়েশনে মানুষের মাঝেও কেউ কেউ কোন অ্যাবিলিটি পেয়ে গেলে তাকেও শায়েস্তা করা দেখতে ভালই লাগে। এই সিরিজে মূল কমিক্সের বাইরে কিছু চরিত্র এসেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্লোয়ি সুলিভান। মেয়েটি ক্লার্কের খুবই ভাল বন্ধু, নানা বিপদেআপদে তাকে সাহায্য করে, চরম কম্পিউটার নার্ড এবং ক্লার্কের বাবা-মা ছাড়া একমাত্র সে-ই জানে যে ক্লার্ক একজন ক্রিপ্টোনিয়ান। চতুর্থ সীজনে জানা গেল, এই ক্লোয়ির কাজিন হল আমাদের লইস লেইন। তারপরে সিরিজটির মজা আরো বেড়ে গেছে। লেক্সের বাবার রোলটাও জন গ্লোভার দারুণ করেছেন। লায়নেল লুথার তিন-চার সীজন পর্যন্ত মেইন “ভিলেন”। লেক্স তখনও বদমায়েশিতে হাত পাকায় নাই।
====
সবগুলো সিরিজেরই ডিভিডি এখন ঢাকায় পাওয়া যায়। এছাড়া নেটেও এপিসোড ধরে ধরে পাওয়া যায়। সুতরাং দেখার কোনই সমস্যা নাই। আশা করি এই সিরিজগুলো সবাইকে ততটাই আনন্দ দিবে যতটা আমাকে দিয়েছে।
সিরিজগুলোর অফিশিয়াল সাইটঃ
House M.D.
The Big Bang Theory
Smallville
***
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



