somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ব্লগানুবাদঃ দ্য সেলফিশ জিন - রিচার্ড ডকিন্স (২য় অধ্যায়) The Selfish Gene বইটির অনুবাদ করছি। বিবর্তন সম্পর্কিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মাঝে এটি উল্লেখযোগ্য। বিবর্তন নিয়ে কম জানা, অজানা, এবং ভুল জানা বিষয়গুলোকে এই বইয়ে খুব 'সহজ' ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

প্রথম অধ্যায়...

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ অনুলিপিকারক

আদিতে ছিল সরলতা। একটা সাধারণ মহাবিশ্ব কেমন করে তৈরি হলো, তা ব্যাখ্যা করা এমনিতেই কঠিন। আমি মেনে নিচ্ছি যে প্রাণের এই চকিত উৎকলন, সুসজ্জিত ও দুর্বোধ্য এই সংস্থান যা নতুন প্রাণের উৎস হিসেবে কাজ করে, তাকে ব্যাখ্যা করা আরো জটিল। ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাহায্যে বর্ণিত বিবর্তন তত্ত্ব একটি সন্তোষজনক সূত্র, কারণ তা এই জটিল বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে। কীভাবে সরলতা থেকে জটিলতা এলো, কীভাবে বিশৃঙ্খল অণুসমূহ শৃঙ্খলায় সজ্জিত হয়ে যৌগিক কণা তৈরি করলো, কীভাবে সেখান থেকে মানুষের উৎপত্তি হলো এসবের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছে এই তত্ত্ব। ডারউইন এখন পর্যন্ত আমাদের অস্তিমানতার একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধানটা দিয়েছেন। এই অসামান্য তত্ত্বটিকে সাধারণত যতোটা দুর্বোধ্যভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, আমি তার চেয়ে অধিকতর সহজভাবে ব্যাখ্যা দিবো। বিবর্তন শুরু হবার আগের সময় থেকে আমাদের শুরু করতে হবে।

ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উত্তরজীবীতা’ একটি বিশেষ অবস্থা বুঝায়, যা মূলত আরেকটি সাধারণ বাক্যবন্ধ থেকে এসেছে, সেটা হলো ‘সুস্থিতের উত্তরজীবীতা’। মহাবিশ্ব অসংখ্য সুস্থিত বস্তুতে ভরে আছে। একটি সুস্থিত বস্তু হলো কিছু অণুর স্থায়ী বা সাধারণ সমষ্টি যাকে একটা নাম দেয়া যায়। তা হতে পারে ম্যাটারহর্নের মতো কিছু অনন্য অণুর সমষ্টি, যা নামকরণের মতো স্থায়িত্ব ধারণ করে। হতে পারে একই ধরণের কিছু বস্তুর গুচ্ছ, যেমন বৃষ্টিবিন্দু, যেগুলো গুচ্ছাকারে একটা বেশ লম্বা সময়ের জন্যে অস্তিত্ব নিয়ে থাকে, যদিও এককভাবে তারা ক্ষণস্থায়ী। আমাদের চারপাশে আমরা যা দেখি, যাদেরকে বর্ণনা করা যায়, তেমন সবকিছু – পর্বত, নক্ষত্রপুঞ্জ, সাগরের ঢেউ – এগুলো সবই কম বেশি সুস্থিত অণুর বিন্যাস দিয়ে তৈরি। সাবানের বুদবুদ গোলাকার হয় কারণ সেটাই গ্যাসভর্তি সরু ফিল্মের স্থিতাবস্থা। মহাকাশযানে পানির অণুর স্থিতিশীল আকার গোলাকৃতি হয়, কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে পানির অণুর স্থিতিশীল আকার হলো আনুভূমিক। যেমন, লবণ স্ফটিকের কণা ঘনক আকৃতির হয় কারণ সোডিয়াম ও ক্লোরিনের আয়নের প্যাকিংয়ের সবচেয়ে সুস্থিত গঠন হচ্ছে ঘনক। সূর্যের ভেতরে সরলতম পরমাণু হাইড্রোজেন থেকে ফিউশন বিক্রিয়ায় হিলিয়াম পরমাণু তৈরি হচ্ছে কারণ সূর্যের ঐ পরিবেশে হিলিয়ামের পারমাণবিক গঠন সবচেয়ে স্থায়ী। পুরো মহাবিশ্বের অসংখ্য নক্ষত্রের ভেতর বহু জটিল পরমাণু তৈরি হচ্ছে আরো অনেক ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু থেকে। বর্তমানে প্রমাণিত তত্ত্বমতে মহাবিস্ফোরণের পর থেকে এই প্রক্রিয়া চলমান। আমাদের বিশ্বজগতের সকল উপাদান এই মহাবিস্ফোরণ থেকেই এসেছে।

যখন একাধিক পরমাণুর মাঝে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, তখন সেগুলো মিলে কমবেশি সুস্থিত অণু সৃষ্টি হয়। এরকম অণুগুলো আকারে অতি বৃহৎ হতে পারে। যেমন, হীরকের একটি স্ফটিক যা কিনা নিজেই একটি বৃহৎ অণু, একই সাথে এর স্থায়িত্বও অনবদ্য। অন্তঃআণবিক গঠনের দিক থেকে হীরক খুবই সরল কারণ এটি অসংখ্যবার পুনরাবৃত্তি হয়ে গঠিত হয়। এখনকার জীবিত প্রাণীসত্তার মধ্যে এমন অনেক অণু পাওয়া যায় যেগুলোর গঠন খুবই জটিল এবং বেশ কয়েকটি পর্যায়ে তাদের গঠনের এই জটিলতা দেখা যায়। যেমন আমাদের রক্তের হিমোগ্লোবিন একটি সাধারণ প্রোটিন অণু। ছোট ছোট অ্যামাইনো এসিডের শেকল দিয়ে এটি গঠিত। এই শেকলের প্রতিটিতে কয়েক ডজন পরমাণু একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে সজ্জিত আছে। একটি হিমোগ্লোবিন অণুতে ৫৭৪ টি অ্যামাইনো এসিডের অণু আছে। সেগুলো চার ধরণের শেকলে সাজানো থাকে, শেকলগুলো একে অপরকে পেঁচিয়ে একটি গ্লোবিউলার বা বর্তুলাকার গঠন তৈরি করে। এই অণুর গঠন বিস্ময়কর রকমের জটিল। একটা হিমোগ্লোবিনের মডেল দেখতে অনেকটা ঘন কাঁটাঝোপের মতোন। পার্থক্য হলো হিমোগ্লোবিন অণু সত্যিকারের কাঁটাঝোপের মতো হিজিবিজিভাবে তৈরি হয় না। একজন সাধারণ মানুষের শরীরে ৬ কোটি কোটি কোটি হিমোগ্লোবিনের অণু একটা সুনির্দিষ্ট গঠন মেনে চলে, অন্তহীনভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটে এই অণুর শেকগুলোর, যেগুলোর মাঝে একটা ডাল বা একটা প্যাঁচও এদিক ওদিক হবে না। এই নির্দিষ্ট কাঁটাঝোপের মতোন হিমোগ্লোবিনের অণুকে আমরা সুস্থিত বলতে পারি কারণ একই বিন্যাস মেনে গঠিত যে কোন দুইটি অ্যামাইনো এসিডের শেকল স্প্রিংয়ের মতো প্যাঁচিয়ে একটি নির্ধারিত গঠনের ত্রিমাত্রিক কয়েলই তৈরি করবে। আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের এই ‘নির্ধারিত’ কাঁটাঝোপ অণু প্রতি সেকেন্ডে তৈরি হচ্ছে মোট চার কোটি কোটি, এবং একই সংখ্যক অণু প্রতি সেকেন্ডে ধ্বংসও হয়ে যাচ্ছে।

অণুসমূহের সুস্থিত আচরণের উদাহরণ হিসেবে হিমোগ্লোবিন একটি বেশ আধুনিক অণু। এখানে যে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক তা হলো পৃথিবীতে প্রাণের উন্মেষের আগে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যার এরকম কিছু সাধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অণুসমূহের এক ধরনের প্রাথমিক বিবর্তন ঘটে থাকতে পারে। এখানে কোন নকশা, কোন উদ্দেশ্য বা কোন তত্ত্বাবধানের কথা ভাবার প্রয়োজন নেই। যে কোন শক্তি উপস্থিতিতে কিছু পরমাণু যদি একত্রিত হয়ে কোন স্থায়ী অণু তৈরি করে, তাহলে সেটি অপরিবর্তিত থাকবে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের আদিতম ঘটনাগুলো মূলত এই স্থায়ী ঘটনাগুলোর নির্বাচন আর অস্থায়ীগুলোকে বর্জনের মাধ্যমেই ঘটেছে। এর মাঝে কোন রহস্য নেই। সংজ্ঞানুযায়ী, এটা ঘটতোই।

অবশ্যই এর মানে এই না যে মানুষের মতো যৌগিক ও জটিল জীবের অস্তিত্ব আমরা সরাসরি এই নিয়মের কথা বলে ব্যাখ্যা করতে পারবো। সমান সংখ্যক অণু পরমাণু নিয়ে নির্দিষ্ট শক্তি দিয়ে ঝাঁকালে কোন লাভ নেই। সেখান থেকে আদম টপ করে নাজিল হবে না! কয়েক ডজন পরমাণু নিয়ে এভাবে হয়তো একটা অণু তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু একজন মানুষের শরীরে দশ লাখ কোটি কোটি কোটির চেয়েও বেশি অণু থাকে। এভাবে কোন জৈবরাসায়নিক ককটেল-মিক্সারে মানুষ তৈরি করতে গেলে আপনার যে সময় লাগবে তাতে মহাবিশ্বের পুরো সময়কাল এক পলকেই শেষ হয়ে যাবে। এমনকি তার পরেও আপনি সফল হবেন এই ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা নেই। আর এখানেই ডারউইনের তত্ত্বের সবচেয়ে সাধারণ রূপটি কাজে আসে। এই ধীর প্রক্রিয়ায় অণু সৃষ্টির গল্পের চালকের আসন এর পরে ডারউইনের তত্ত্বই নিয়ে নিয়েছে।

স্বভাবতই, আমি যে তথ্য দিয়ে প্রাণের উদ্ভব বর্ণনা করবো, তা অনুমানভিত্তিক। সংজ্ঞামতেই, সে সময়ে পৃথিবীতে প্রক্রিয়াটি দেখার জন্যে কেউই বেঁচে ছিলো না। আরো বেশ কিছু একইরকমের তত্ত্ব রয়েছে, যা বিবর্তন তত্ত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এই সব তত্ত্বের মাঝেই নির্দিষ্ট কিছু বিষয় একেবারে মিলে যায়। আমি যে সাধারণ বর্ণনা দিবো, মূল সত্য থেকে তা খুব বেশি দূরের নয়। [১]

পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির সময়ে ঠিক কোন রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যেতো তা আমরা জানি না। তবে সম্ভাব্য পদার্থগুলো হলো পানি, কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, এবং এমোনিয়া: সবগুলো খুব সাধারণ প্রাকৃতিক যৌগ, যেগুলো সৌরজগতের অন্য কয়েকটি গ্রহেও পাওয়া যায়। রসায়নবিদেরা আদি পৃথিবীর রাসায়নিক পরিবেশ পুনরায় তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। পরীক্ষাগারে এই সাধারণ যৌগগুলোকে একটা ফ্লাস্কে ভরে তার ভেতরে নির্দিষ্ট শক্তি উৎস দেয়া হলো অতিবেগুনি রশ্মি বা বৈদ্যুতিক ক্ষরণের (আদি পৃথিবীর বিদ্যুৎচমকের কৃত্রিম সিমুলেশানের) মাধ্যমে। বেশ কয়েক সপ্তাহ পরে ফ্লাস্কের ভেতরে মূল অণুগুলোর চাইতেও অনেক জটিল গঠনের কিছু যৌগের অণুর এক ধরণের হাল্কা খয়েরি স্যুপ পাওয়া গেলো। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, ফ্লাস্কে এমাইনো এসিড পাওয়া গেলো – যা প্রোটিনের গাঠনিক একক, জৈবিক অণুর দুই মহান শ্রেণীর একটি। এই পরীক্ষার আগে মনে করা হতো এমাইনো এসিডই কেবল প্রাণের সনাক্তকারী চিহ্ন। এই অণুটি যদি মঙ্গল গ্রহে পাওয়া যায়, তাহলে ধরে নেয়া যাবে যে অচিরেই সেই গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ঘটবে। যাক, এই পরীক্ষা থেকে বলা যায় যে আদি পৃথিবীতে এমাইনো এসিডের উপস্থিতি প্রমাণের জন্যে সেই সময়ের পরিবেশে কিছু সরল গ্যাস, আগ্নেয়গিরি, সূর্যালোক বা ঝড়ো অবহাওয়া থাকলেই চলবে। অতি সম্প্রতি, পরীক্ষাগারে রসায়নবিদেরা আদি পৃথিবীর পরিবেশ সিম্যুলেট করে একইভাবে পিউরিন এবং পাইরিমিডিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যা কিনা ডিএনএ’র গাঠনিক একক।

একই ধরণের প্রক্রিয়ায় নিশ্চয়ই সেই ‘আদি স্যুপ’ তৈরি হয়েছিলো, জীববিজ্ঞানী ও রসায়নবিদেরা মনে করছেন, ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার লক্ষ বছর আগের সমুদ্রে এই স্যুপ পাওয়া যেতো। এই জৈবিক পদার্থ ধীরে ধীরে সম্পৃক্ত এবং ঘন হয়ে, মূলত সমুদ্রের তীরে শুষ্কভূমিতে ছোট ছোট বিন্দুকণায় জমা পড়তো। অতিবেগুনি রশ্মির মতো শক্তির উপস্থিতিতে এই বিন্দুগুলো জড়ো হয়ে আরো বৃহৎ অণু তৈরি করতো। এখনকার সময়ে এমন বৃহৎ অণু খুব বেশিক্ষণ টিকবে না বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কারণে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য জীবাণু সেই সময়ে প্রকৃতিতে ছিলো না, এবং এই বৃহৎ অণুগুলো ধীরে ধীরে জমা হবার সুযোগ পেতো।

ঘটনাক্রমে, এক পর্যায়ে একটি বিশেষ অণু সৃষ্টি হয়েছিলো। আমরা এই অণুটিকে বলবো অনুলিপিকারক। এই অণুই যে সবচেয়ে জটিল গঠনের বা সবচেয়ে বৃহদাকারের ছিলো তেমন না, তবে এটার বিশেষত্ব ছিলো যে তা নিজেই নিজের কপি তৈরি করতে পারতো। মনে হতে পারে যে এই ধরণের ‘ঘটনা’ ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। এবং আদতেই তা সত্যি। এই ঘটনাটি খুবই ‘অসম্ভাব্য’ ঘটনা। একজন মানুষের জীবনকালে যদি এর সম-সম্ভাবনার কোন ঘটনাকে তুলনা করা হয় তাহলে তাকে বাস্তবিকভাবেই অসম্ভব বলে রায় দেয়া যায়। এজন্যেই আপনি কোন ফুটবল পুলের লটারিতে কোন বড়ো পুরষ্কার কখনো জিতবেন না। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত সম্ভাবনার হিসাবে অভ্যস্ত মস্তিষ্ক সাধারণত লাখ লাখ বছর সময়ে ঘটা সম্ভাবনা নিয়ে কল্পনা করতে পারে না। যদি আপনি কয়েক হাজার লক্ষ বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে ফুটবল কুপন পূরণ করতে থাকেন, তাহলে বেশ কয়েকবার পুরষ্কার জেতা খুবই স্বাভাবিক।

একটা অণু যা কিনা নিজে নিজেই কপি হতে থাকে, সেটাকে প্রথমে বেশ কষ্টকল্পনা মনে হলেও আসলে তা নয়, আর এই ঘটনাটা কেবল একবারই ঘটতে হবে। মনে করুন এই অনুলিপিকারক একটা ছাঁচ বা টেমপ্লেট। মনে করুন এটা একটা বিরাট অণু যার ভেতরে নানারকম একক অণুর জটিল শেকল রয়েছে। ছোট ছোট শেকলগুলো সেই আদি স্যুপে অনুলিপিকারকের চারপাশে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান ছিলো। এখন ধরে নিন যে প্রতিটা একক অণুতে নিজের সমপ্রকৃতির অণুর প্রতি একটা আকর্ষণ আছে। তাহলে যখনই অণুটি অনুলিপিকারকের কোন অংশে নিজের গঠনের সাথে মিল পাবে, তখনই সেটা সেখানে যুক্ত হয়ে যাবে। যুক্ত হবার সাথে সাথেই অণুটি অনুলিপিকারকের মূল গঠনের সাথে খাপে খাপে মিলে যাবে। তারা তখন যুক্ত হয়ে মূল অনুলিপিকারকের সদৃশ একটা সুস্থিত শেকল তৈরি করবে, এটাও সহজে ভাবা যায়। এই প্রক্রিয়া স্তরে স্তরে বেড়ে উঠতে পারে। এভাবেই বিভিন্ন স্ফটিক তৈরি হয়। অপরদিকে ঐ দুটো শেকল বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা দুটো অনুলিপিকারক পাবো যা কিনা একইভাবে অনুলিপি তৈরি করতে থাকবে।

এর চাইতে একটু জটিল সম্ভাবনার দিকে যাওয়া যাক। ধরে নেয়া যায় যে প্রতি একক অণুর নিজের সদৃশ এককের সাথে নয় বরং নিজের পরিপূরক আরেকটি এককের প্রতি আসক্তি আছে। তখন এককটি নিজের সদৃশ কপির ছাঁচ হিসেবে কাজ করবে না, বরং নিজের ‘নেগেটিভ’ ছাঁচ হিসেবে কাজ করবে, যা অনুলিপি তৈরির সময়ে মূল পজেটিভ এককের মতো ঠিক আরেকটি একক তৈরি করবে (পজেটিভ-নেগেটিভ প্রক্রিয়া)। আমাদের হিসাবের জন্যে অনুলিপিকরণ প্রক্রিয়া পজেটিভ-পজেটিভ নাকি পজেটিভ-নেগেটিভ ছিলো সেটা জরুরি না। যদিও এখানে উল্লেখ করা ভালো যে প্রকৃত অনুলিপিকারকের আধুনিক সংস্করণ, বা ডিএনএ অণু, উল্লেখিত পজেটিভ-নেগেটিভ প্রক্রিয়ায় অনুলিপি তৈরি করে। যে বিষয়টি জরুরি তা হলো তখন হঠাৎ করেই আদি প্রকৃতিতে এক নতুন ধরনের ‘স্থায়িত্ব’ চলে এসেছিলো। এর আগে স্যুপের ভেতরে কোন বিশেষ ধরনের জটিল অণুর সংখ্যা ছিল অপ্রতুল, কারণ প্রতিটি অণু তার গাঠনিক একক ভাগ্যক্রমে সৃষ্টির সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল ছিলো। কিন্তু যখনই অনুলিপিকারকের সৃষ্টি হলো, তখনই অবধারিতভাবে সেটি অতি দ্রুত নিজের অসংখ্য কপি তৈরি করেছে, যতক্ষণ না গাঠনিক ক্ষুদ্র অণুগুলো একেবারে কমে যায়। অনুলিপিকারক ছাড়া অন্যান্য বৃহৎ অণু এর পরে খুব কমই তৈরি হচ্ছিলো।

তো এখন আমরা বেশ বড়োসংখ্যক সদৃশ অনুলিপির একটা সমষ্টি পেলাম। কিন্তু এখানে অনুলিপিকরণের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলে রাখা ভালোঃ এটা নিখুঁত নয়। কপি তৈরির সময়ে ভুল হবেই। যেমন আমি আশা করছি এই বইটায় কোন বানান-বিভ্রাট নেই, তবে আপনি যদি খুব খেয়াল করে পড়েন, তাহলে হয়তো একটা বা দুটো ভুল পেতেও পারেন। সেগুলো হয়তো বাক্যের অর্থ খুব বেশি বদলে দিবে না, কারণ সেগুলো হচ্ছে ‘প্রথম প্রজন্মে’র ভুল। কিন্তু মুদ্রণব্যবস্থার আগের কথা চিন্তা করুন, যখন হাতে লিখে গসপেলের মতো বই কপি করা হতো। যতোই সচেতন থাকুক না কেন সব লিপিকারই কোন না কোন ভুল করেছেন, আবার কেউ কেউ হয়তো স্বেচ্ছায় ছোটখাট ‘সংশোধন’ও করেছেন। যদি তারা সবাই একটা আদি সংস্করণ থেকে কপি করে থাকেন, তাহলে হয়তো বাক্যের অর্থের খুব একটা বিকৃতি ঘটবে না। কিন্তু যদি মূল সংস্করণ থেকে না হয়ে কপি থেকে কপি করা হতে থাকে, আবার সেই কপি থেকে আরো কপি করা হতে থাকে, তাহলে ভুলের সংখ্যা যোগানুপাতে বাড়তেই থাকবে, এবং ভুলগুলো হবে গুরুতর। এমন অসাবধানী কপি করাকে আমরা খারাপ বলেই বিবেচনা করি, আর মানুষের বেলায় এমন অনুলিপিকরণে ভুলগুলোকে উন্নয়ন মনে করা কষ্টকল্পনা। আমি মনে করি সেপ্টুয়াজিন্ট-এর পণ্ডিতেরা যখন তোরাহের অনুবাদ করতে গিয়ে হিব্রু ভাষার ‘তরুণী’ শব্দের গ্রীক ভাষান্তর করলেন ‘কুমারী’, তখন বড়োসড়ো গড়বড় ঘটে গেছে। তাদের অনুবাদের ফলে ঐশীবাণীটির চেহারা দাঁড়ালোঃ “ শোনো, এক কুমারীর গর্ভে ভ্রূণসঞ্চার হবে আর জন্ম নিবে এক ছেলে…” (Isaiah 7:14)। [২] যাই হোক, আমরা দেখাবো যে জৈবিক অনুলিপিকারকগুলোর মধ্যে এমন অসাবধানী নকলের প্রবণতা থেকে সত্যিকার অর্থেই উন্নতি ঘটে, আর প্রাণের ক্রমবিবর্তনের ধারায় এই ভুলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো। ঠিক কতোটা নিখুঁতভাবে প্রাথমিক অনুলিপিকারকগুলো নকল তৈরি করতো তা আমরা জানি না। তাদের বর্তমান বংশধর, অর্থাৎ ডিএনএ অণু এই কাজে অবিশ্বাস্য মাত্রায় নিখুঁত, সবচাইতে বিশ্বস্ত মানুষের চাইতেও তারা শ্রেয়। কিন্তু সেখানেও মাঝে মাঝে ভুলচুক হয়ে যায়। এই হুট করে ঘটা ভুলগুলোতেই মূলত বিবর্তন ঘটে। সম্ভবত প্রাথমিক অনুলিপিকারকগুলো অতিমাত্রায় বেখেয়ালী ছিলো, যেটাই হোক না কেন, সেই সময়ে ভুল হয়েছিলো এই ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত, আর সেই ভুলগুলো যথারীতি ক্রমাগত ঘটেছিলো ভাবাটাই যৌক্তিক।

যখন এই ক্রমান্বয়ে ঘটে চলা ভুল যতো বেড়েছে, তখন সেই আদিম স্যুপে নানারকমের অনুলিপিকারকের সংখ্যা বেড়েছে। এই বিচিত্রতা সহজেই অনুমেয়, আর একই প্রকৃতির অনুলিপিকারক না থাকাটাও স্বাভাবিক। এই সকল ‘উত্তরবংশ’ আসলে এক আদিম পূর্বপুরুষ থেকেই উৎপন্ন। কোনো কোনো ধরণের অনুলিপিকারক কি অন্যগুলোর চাইতে বেশি তৈরি হয়েছিলো? অবশ্যই হ্যাঁ। কিছু কিছু অনুলিপিকারক অন্যগুলোর চাইতে বেশি সুস্থিত ছিলো, কিছু কিছু অণুর সৃষ্টির পরে ভেঙে যাবার সম্ভাবনা অন্যান্য অণুর চাইতে কম ছিলো। এই ধরণের অণুর সংখ্যা খুব কম সময়েই স্যুপে বেড়ে যাওয়ার কথা। চিন্তা করলে, সেগুলোর দীর্ঘায়ু যেমন সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ, তেমনি দীর্ঘ আয়ুকালে তারা বেশি বেশি অনুলিপি তৈরি করতে পারতো এটাই বড়ো কারণ। সুতরাং দীর্ঘায়ুর অনুলিপিকারকের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেলো, তেমনি বাকি সবকিছু ঠিক থাকলে সেই অণুর জনসংখ্যায় এই দীর্ঘ আয়ুর একটি ‘বিবর্তনিক প্রবণতা’ও তৈরি হলো।

অথচ সেখানে বাকি সব কিছু সম্ভবত ঠিক ছিলো না। আর অনুলিপিকারক বৈচিত্র্যের বিশ্লেষণে তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্যও গোনায় ধরতে হবে। অনুলিপিকারক বৈচিত্র্যের মাঝে দ্রুত বিস্তার ও বৃদ্ধির একটি জরুরি বৈশিষ্ট্য হলো উর্বরতা (fecundity)। যদি অনুলিপিকারক নিজের অনুলিপি তৈরি করতে কয়েক সপ্তাহ লাগায়, আর অনুলিপিকারক নিজের অনুলিপি কয়েক ঘন্টায় তৈরি করে ফেলে, তাহলে সহজেই বুঝা যায় যে খুব তাড়াতাড়িই ক-এর অণুর সংখ্যা খ-এর অণুর তুলনায় নগণ্য হয়ে যাবে (এমনকি সেগুলো ‘দীর্ঘায়ু’ হলেও)। তাহলে এটা বলা যায় যে সেখানে ‘উর্বরতা’র গুণের দিকেও একটা ‘বিবর্তনিক প্রবণতা’ সেই স্যুপে তৈরি হয়েছিলো। তৃতীয় আরেকটি বৈশিষ্ট্য অনুলিপিকারকের মাঝে দরকারী ছিলো, সেটি হচ্ছে অনুলিপি তৈরির শুদ্ধতা। যদি অনুলিপিকারক এবং একই হারে অনুলিপি তৈরি করে, আর তাদের আয়ুও সমান হয়, সেক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। গ-এর অনুলিপির প্রতি দশম ধাপে যদি একটা করে ‘ভুল’ হতে থাকে আর ঘ-এর অনুলিপির প্রতি একশতম ধাপে একটা করে ভুল হয়, তাহলে অবশ্যই ঘ-অণুর সংখ্যা বেশি হবে। গ-অণুগুলো কেবল যে নিজের ভুলভাল ‘সন্তান’গুলোকেই হারাবে না তা নয়, তাদের ভবিষ্যত প্রকৃত ও সম্ভাব্য বংশধরও হারিয়ে যাবে।

আপনি যদি বিবর্তন সম্পর্কে একটু ধারণা রাখেন তাহলে শেষ পয়েন্টটা হয়তো স্ববিরোধী মনে হবে। “উচ্চ অনুলিপি-শুদ্ধতার দিকে প্রাকৃতিক নির্বাচন পক্ষপাতী” এই বক্তব্যের সাথে “ভুল অনুলিপি বানানো বিবর্তন ঘটার একটি জরুরি পূর্বশর্ত” – এই দাবির কোনো সামঞ্জস্য কি আমরা আনতে পারি? এর উত্তর হলো, যদিও ভাসাভাসাভাবে দেখলে বিবর্তন প্রক্রিয়াটিকে ‘ভালো ঘটনা’ বলে মনে হয়, যেহেতু আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার উপজাত, আসলে কেউই বিবর্তিত হতে ‘চায়’ না। চান বা না চান, বিবর্তন এমন এক প্রক্রিয়া যা ঘটবেই, সব অনুলিপিকারকের (এখনকার ডিএনএ’র) সব ধরণের বিরোধিতা সত্ত্বেও। এই বিষয়টি Jacques Monod তার হার্বার্ট স্পেন্সার বক্তৃতায় খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন। তার ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যটা ছিলোঃ ‘বিবর্তনের ব্যাপারে আরেক মজার কথা হলো সবাই মনে করে যে সে বিবর্তন খুব ভালো বুঝে!’

তো, চলুন আবার সেই আদিম স্যুপের কাছে ফিরে যাই। এতোক্ষণে নিশ্চয়ই নানান বৈচিত্র্যে ভরা সুস্থিত অণুতে গিজগিজ করছে। সুস্থিত এ অর্থে বললাম, যে হয় সেগুলো দীর্ঘসময় টিকে আছে, অথবা সেগুলো দ্রুত অনুলিপি তৈরি করছে, অথবা সেগুলো নিখুঁতভাবে অনুলিপিত হচ্ছে। বিবর্তনগত প্রবণতা এই তিন ধরনের স্থায়িত্বের উপর নির্ভর করে নিম্নরূপেঃ যদি দুটা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই স্যুপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়, তাহলে পরের নমুনাটিতে বেশি দীর্ঘ/বেশি উর্বর/বেশি নকল-বিশ্বস্ত বৈশিষ্ট্যের অণু অধিক পরিমাণে পাওয়া যাবে। এই একই কথা একজন জীববিজ্ঞানীও বিবর্তন নিয়ে বলে থাকেন যখন তিনি জীবিত প্রাণিজগত নিয়ে আলোচনা করেন, আর দুইক্ষেত্রেই মূল পদ্ধতি একই – প্রাকৃতিক নির্বাচন।

আমরা কি তবে আদি অনুলিপিকারক অণুগুলোকে ‘জীবিত’ বলতে পারি? হু কেয়ারস? আমি হয়তো আপনাকে বললাম ‘ডারউইন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ’, আর আপনি হয়তো বললেন, ‘না, নিউটন’। আশা করি আমরা সেই তর্ক বেশিক্ষণ চালাবো না। কথা হলো আমাদের তর্ক মীমাংসায় কোন উপসংহার বা সিদ্ধান্তই প্রভাব রাখে না। আমরা তাঁদেরকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মানি বা না মানি, নিউটন এবং ডারউইনের জীবন ও অর্জনের প্রকৃত তথ্য তাতে বদলায় না। ঠিক তেমনি, আমি যেভাবে বললাম সেভাবেই অনুলিপিকারক অণুর গল্পটা ঘটেছিলো বলে প্রমাণিত, আমরা সেগুলোকে ‘জীবিত’ বলি বা না বলি, তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের এতো জ্বালা-যন্ত্রণার কারণ আমরা মেনে নিতেই পারি না যে শব্দ আসলে আমাদের ব্যবহৃত প্রকাশ মাধ্যম ছাড়া কিছুই না, আমরা বুঝতে চাই না যে অভিধানে ‘জীবিত’ শব্দ থাকা মানে এই না যে সেটা এই পৃথিবীতে কোন রক্তমাংসের অর্থ বুঝায়। প্রাথমিক অনুলিপিকারকদের আমরা জীবিত বলি আর না বলি, এতে কোনো সন্দেহ নাই যে তারাই প্রাণের পূর্বপুরুষ; তারাই আমাদের আদি-পিতা।

এই প্রসঙ্গে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো প্রতিযোগিতা, যা নিয়ে খোদ ডারউইন প্রচুর আলোচনা করেছেন (যদিও তিনি প্রাণী ও উদ্ভিদ নিয়ে কথা বলেছেন, অণু নিয়ে না)। আদিম স্যুপে অসীম সংখ্যক অণুর জায়গা হতে পারে না। প্রথমত, পৃথিবীর মোট আয়তন সীমিত, তবে এর চাইতেও বড়ো প্রভাবক উপাদান ছিলো। আমরা যেভাবে এই অনুলিপিকারকের ধারণা তৈরি করছি, যা একপ্রকারের ছাঁচ বা টেমপ্লেট হিসেবে কাজ কছে, সেগুলো প্রথমে নিশ্চয়ই প্রচুর ছোট ছোট গাঠনিক একক অণুর সাগরে ভাসছিলো। কিন্তু যখন দ্রুত অনুলিপিকরণ চালু হলো, তখন ধীরে ধীরে সেই ক্ষুদ্র গাঠনিক এককের সংখ্যা কমে যাবেই। বিভিন্ন ধরণের অনুলিপিকারক তখন সেগুলোর জন্যে প্রতিযোগিতা করেছে। অধিক সুস্থিত প্রকারের শ্রেণীগুলো যে যে ভাবে পক্ষপাত পায় সেগুলো আমরা এতোক্ষণ দেখেছি। আর এখন দেখা যাচ্ছে যে কম-সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীগুলো প্রতিযোগিতার কারণে অপেক্ষাকৃত কম পক্ষপাত পাবে, এবং শেষ পর্যন্ত অনেকেরই ধারা বিলুপ্ত হবে। অনুলিপিকারকের বৈচিত্র্যের শ্রেণীগুলোর মাঝে টিকে থাকার লড়াই ছিলো। তারা জানতো না যে তারা লড়াই করছে, কিংবা এ নিয়ে দুশ্চিন্তাও করতো না; একেবারে বিদ্বেষ ছাড়াই এই লড়াই চলেছিলো, এমনকি আদৌ কোন ধরণের অনুভূতিই সেখানে ছিলো না। কিন্তু তারা লড়ছিলো নিশ্চয়ই, এতোটাই যে কোনো ভুল-নকলীকরণের ফলে যদি নতুন অধিক-স্থায়ী গঠন পাওয়া যায়, বা কোনোভাবে তা প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্থায়িত্ব হ্রাস করে, তাহলে সেই ভুলটাই সংরক্ষিত হবে এবং গুণাকারে বেড়ে যাবে। এই প্রক্রিয়ার উন্নতি ছিলো ক্রমবর্ধিষ্ণু। নিজের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি বা প্রতিদ্বন্দ্বীর স্থায়িত্ব হ্রাসের নানান পথ ধীরে ধীরে বাড়লো। কেউ কেউ হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী অণুকে ভেঙে ফেলার কায়দা-কানুনও ‘আবিষ্কার’ করে ফেললো, আর ভেঙে ফেলার পরে সেগুলোর গাঠনিক একক কাজে লাগিয়ে নিজের কপি তৈরি করলো। এই আদি-মাংশাসীরা একইসাথে নিজেদের খাবার জোগাড় করলো আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিলুপ্তি ঘটালো। অন্যান্য অনুলিপিকারকেরা হয়তো নিজেদের রক্ষা করার উপায় বের করে ফেলেছিলো, হয় রাসায়নিকভাবে, নয়তো নিজেদের চারিদিকে প্রোটিনের দেয়াল তৈরি করে। হয়তো এভাবেই প্রথম জীবিত কোষের জন্ম হয়। অনুলিপিকারকেরা শুধু টিকে থাকাই শুরু করলো না, ধীরে ধীরে নিজেদের জন্যে ধারক তৈরি করলো, যে ধারক বা বাহকে তাদের অস্তিত্ব বহাল থাকবে। সেই অনুলিপিকারকগুলোই টিকে গেলো যারা নিজেদের বসবাসের জন্যে উত্তরজীবীতার যন্ত্র বানাতে পেরেছিলো। এরকম যন্ত্রের প্রথমটার হয়তো একটা সুরক্ষা-আবরণ ছাড়া কিছুই ছিলো না। কিন্তু যতোই নতুন ও কার্যকর উত্তরজীবীতার যন্ত্র নিয়ে নতুন নতুন প্রতিস্বন্দ্বী তৈরি হতে থাকলো, ততোই টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠলো। এই যন্ত্রগুলোও হয়ে উঠলো আরো বড়ো ও আরো সুনির্মিত, এই প্রক্রিয়াটিও ছিলো ক্রমবর্ধমান এবং প্রগতিশীল।

পৃথিবীতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে অনুলিপিকারকদের এই কৌশল আর চাতুর্যের সাথে ক্রমশ উন্নত হয়ে ওঠার কি কোন শেষ ছিলো? এরকম উন্নতির জন্যে তো অনেকটা সময় পড়ে আছে। স্বরক্ষার কোন উদ্ভট উপায়, কৌশল সামনের হাজার হাজার বছর নিয়ে এসেছিলো? প্রায় চল্লিশ হাজার লক্ষ বছর পরে সেই আদি অনুলিপিকারকের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো? তারা তো নিশ্চয়ই বিলুপ্ত হয়ে যায় নি, কারণ তারাই টিকে থাকার লড়াইয়ের আদি-যোদ্ধা। কিন্তু তাদেরকে সাগরে খুঁজতে যাবেন না; তারা সেই শৌখিন স্বাধীনতা বহু আগেই বিসর্জন দিয়েছে। তারা এখন বৃহৎ উপনিবেশে দলবেঁধে সাঁতরে বেড়ায়, বিশাল জগদ্দল রোবোটের ভেতরে, [৩] বাইরের পৃথিবীর সাথে এখন তাদের সংশ্রব নেই, তেমন যোগাযোগের জন্যে আঁকাবাঁকা বক্র কুটিল পথের প্রয়োজন পড়ে, রিমোট কন্ট্রোল কাজে লাগাতে হয়। তারা আমার ভেতরে আছে, তারা রয়েছে আপনার ভেতরেও; তারাই আমাদের সৃষ্টি করেছে, আমাদের দেহ আর আমাদের মন; আর তাদের সংরক্ষণশীলতাই আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত মৌলিক যুক্তি। ওই অনুলিপিকারকেরা এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। এখন তাদেরকে জিন বলে ডাকা হয়, আর আমরা হলাম তাদের উত্তরজীবীতার যন্ত্র।



***

মুক্তমনা'য় প্রকাশিত পোস্টের লিঙ্ক

[অনুবাদ, ভাষাভঙ্গি এবং তথ্য সব দিক নিয়ে সকলের মতামত জানতে 'হা' করে বসে রইলাম!

এই অধ্যায়ের তিনটা ফুটনোট দিয়েছেন লেখক। সেগুলো মন্তব্য সেকশনে হুবহু তুলে দিচ্ছি বোঝার সুবিধার্থে। আগ্রহী যে কেউ নোটগুলোকে অনুবাদ করতে পারেন, অশেষ কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবো! ]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29234324 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29234324 2010-09-03 00:19:05
যৌনকর্মীঃ একজন পেশাজীবীর স্বীকৃতি ও তদসংলগ্ন ছেঁড়া চিন্তা শিরোনামে এসেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা বলবৎ করার ব্যাপারে মূল আলোচনা বা বিতর্কের জায়গায় ছিলো সুপ্রীম কোর্ট। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভের একটাকে পুনর্বহাল করেছিলো তারা। আর এখন নির্বাচন কমিশন ভোটার আইডি'তে যোগ করেছেন বেশ কিছু পেশা। তাদের বক্তব্য, নতুন যোগ করা পেশাগুলোকে আগে চিহ্নিত করা হতো না। সেই পেশাজীবী মানুষদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতেই এই উদ্যোগ।

লিস্টিটা দেখলাম- যৌনকর্মী, ইমাম/পুরোহিত/যাজক(clerics), সেবিকা, হেয়ার-ড্রেসার, ধোপী, কাজের লোক (মেইড), মালী, ক্লিনার, বাবুর্চি, দর্জি, ড্রাইভার। তবে এই পেশাগুলোকে নিয়ে তেমন আলোচনা তৈরি হয় নি। বাঙালি মধ্যবিত্তের মননে 'তোলপাড়' তুলে ফেলেছে কেবল যৌনকর্মী পেশাটি। এই নিয়ে এরই মাঝে কিছু ব্লগে কয়েকটা লেখা দেখলাম, মূলত খবরটার প্রতিক্রিয়া নিয়ে। আশা করেছিলাম যেমন, ঠিক তেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সকলেই আমার ধারণাটিকে বদ্ধমূল করেছেন যে বাংলাদেশের সামাজিক চালচিত্র মোটেই এই পদক্ষেপের জন্যে অনুকূল নয়।


যৌনকর্মী সংক্রান্ত প্রাথমিক 'বুকিশ' আলোচনার দিকে যাবো না, সেদিকে আমি আপনার চাইতে বেশি কিছু জানি না। তাই চলুন একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাই। ঐ যে বলছিলাম, নির্বাচন কমিশন এবং সুপ্রীম কোর্ট নিয়মিতই কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের মাঝে ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। এই উঠে আসার কারণ হয়তো তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের সাথে আমাদের মনন, সামাজিক প্রথাবদ্ধতার অমিল মূলাংশে দায়ী। ধর্মপ্রবণ এবং মোটামুটি অশিক্ষিত এই জনপদে গিজ গিজ করছে মাথা, সেই মাথায় চুল গজায় আবার ঝরে পড়ে টাক বিস্তৃত হয় কিন্তু খুলির ভেতরে ধূসর-বস্তুতে খুব বেশি আলোড়ন ওঠে না। যে খুলিগুলোতে কিছুটা রসদ থাকে, সেগুলো ড্রেন দিয়ে বা প্লেনে চড়ে পাচার হয়ে যায় ফর্সা-চামড়ার দেশে। তার এখানকার কালো, কুৎসিত, কুশিক্ষিত মানুষের মনন একটা আধা-ধর্মান্ধ-আধা-সুশীল অবস্থানে আটকে থাকে (আছে)। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা পরপর দুটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। "যুগের অন্ত" আক্ষরিকার্থেই! কারণ, জন্মাবধি কাগজে কলমেও বাংলাদেশ সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধর্মনিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারে নি।


পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সময়ে যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছিলো যে এই ইসলামিক রাষ্ট্রটি ১০০ বছর বাঁচবে, যুগে যুগে এইখান থেকে তৈরি হবে নব্য-মুসলিম স্কলার, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে ও সভ্যতার উৎকর্ষে তারা অবদান রাখবেন; সেই সুখ কল্পনা ছেঁড়া কাথার ফুট দিয়ে পালিয়েছে। পেছনে ছিলো সামরিক লাঠির বাড়ি। আধামূর্খ-আধামুসলিম বাঙালিত্বের লুঙ্গি খুলে খুলে যখন পাক-পবিত্র পাকিস্তানিরা চেক করেছে, তখনই বোঝা গেছে পলিমাটিতে মরু-রুক্ষ ইসলাম জমবে না। এখানে পীর-আউলিয়াদের হাত ধরে আগত ইসলাম কেবল আচারে, প্রথায় রাখা যেতে পারে, তার বেশি মানুষ তা মানবে না।


বাঙালি তখন লুঙ্গি ছেড়ে সবে রাস্তাঘাট বানাচ্ছে আর শার্ট-প্যান্টের সাথে জুলপি রাখতে শিখেছে। তাদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার গ্রহণযোগ্যতা একটা সামাজিক-রাজনৈতিক উল্লম্ফন ছিলো। কিন্তু পুরো শরীর এক সাথে না লাফালে যেমন গোত্তা খেয়ে পড়তে হয়, তেমনি সাড়ে চার বছরেই ধর্মনিরপেক্ষতার ঝুমঝুমি হাত ফস্কে গেছে, একেবারে নিচতলায়, বেইসমেন্টে ধুলো মেখে। আমরা শনৈ শনৈ সামরিক উন্নয়নে ডুবে গেছি, বন্যায় ডুবেও রাস্তাঘাট আর খাল কেটে স্বস্তি পেয়েছি। ব্রিটিশ জুতো, পাকিস্তানি জুতোর পরে বাংলাদেশী জুতোর পাড়া খেতে আমাদের কালো দেহে মন্দ লাগে নি। পরিবারতন্ত্রের রাশান রুলেৎ খেলা "রহমান ডাইনেস্টি" দুটোর ভগিজগিও গত বিশ বছরে সামরিক শাসনের 'সমসাময়িক' হয়ে উঠছে। তো, এবারে নতুন শতকের এক দশক পেরিয়ে গেলে কোন দৈববলে আবার সেই মানিকরতন ফিরে এলো, তাকে নিয়ে আমরা কী করবো; কোলে রাখবো নাকি ছুঁড়ে ফেলবো, এটাই এখনো ঠিকঠাক ঠাহর হচ্ছে না।


তার ওপরে নির্বাচন কমিশন চাপিয়ে দিলেন পেশা-স্বীকৃতির এই 'অভাবনীয়' বিজ্ঞপ্তি! এবারে আমাদের পুরুষালী রোম খাড়া হয়ে গেছে। এই উত্তেজনায় বাকি সবগুলো পেশাজীবীকে বাদ দিয়ে আমরা যৌনকর্মীদের নিয়ে পড়েছি। এমনিতেই তাদের ব্যাপারে ট্যাবু, চাপা-আগ্রহের কোনই কমতি নাই, তার ওপর নিঃকঃ এসে পেশা হিসেবে উন্মুক্ত করে দিলো যেন। এখন হিসেব উঠে আসছে, ঢাকায় ঠিক কতোজন যৌনকর্মী আছেন, ঠিক কোন কোন জায়গায় তাদের ডেরা, বাংলাদেশেই বা কতোগুলো 'নিষিদ্ধপল্লী' আছে ইত্যাদি।


খেয়াল করলাম, যে পেশাগুলোকে নতুনভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই নারীর পেশা। ইমাম/পুরোহিত/যাজক, মালী এবং ড্রাইভারের পেশাতে এখনও পুরুষের একচ্ছত্রতা। সেবিকা, যৌনকর্মী, কাজের লোক এগুলো পেশায় নারীর একচ্ছত্রতাও উল্লেখ করি। বাদ বাকি পেশাগুলোতে ধীরে ধীরে নারীকে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। এই সবগুলো পেশার মধ্যে মিল হলো সচরাচর এগুলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র 'চিনতে' চায় না। কাজের লোককে নামমাত্র বেতনে রাখা হয়। ইংরেজি খবরে "ক্লিনার" বলে সম্ভবত মেথর ও জমাদার বুঝিয়েছে, তাদেরকেই বা কতোটা দ্রষ্টব্য ভাবা হয়? সেবিকাদের নামের আশে পাশে 'মহামতি ফ্লোরেন্সে'র নাম নিয়ে তাদেরকেও শ্রমের ন্যায্যমূল্য দেয়া হয় না। হয়তো শুভ্র পোশাকের সেবিকাদেরকে ততোটা 'খেটে খাওয়া' বলে মনে করতে আমাদের 'সুশীল' চোখ অভ্যস্ত নয়। আর সেই সুশীল চোখের কাছে যৌনকর্মীর নাম দূরে থাক, উল্লেখমাত্রই একেবারে অচ্ছুৎ।


তবু নিষিদ্ধের কৌতূহল আর বিকৃত আগ্রহ আমরা নিশ্চিত লালন করি। তাদের জীবন ও জীবিকার খবর জানতে, পরিসংখ্যানের ভেতরে আরো খতিয়ে জানতে অনেকেই উৎসুক। এই ঔৎসুক্য জন্মেছে পারিবারিকভাবে শেখানো ঠুঁটো নিষিদ্ধতার কারণে। যৌনতা এ অঞ্চলে ট্যাবু হলেও অন্তরীণ নয়। সকলেই চর্চা করেন, এখন তথ্যপ্রবাহের ঢেউয়ে তার অনেকটাই জানা যায়। নারী বা পুরুষ কেউই এই চর্চার বাইরে নেই। হয়তো অংশগ্রহণের স্বাভাবিকতায় নারী যুগযুগ জিইয়ে রাখা জড়তা এখনও কাটাতে পারে নাই, তবু প্রায় সমানে সমানেই (আড়ালে বা প্রকাশ্যে) যৌনতার লালন ঘটছে।


সুতরাং এখানে কোন উন্নাসিকতার উপায় নেই, সুযোগ নেই উপেক্ষার। স্বীকার করেই নিতে হয় যে এই আদিমতম পেশাটি বঙ্গ-জনপদে প্রাচীনকাল থেকেই আছে, আছে এর "ভোক্তা" (পুরুষ) ও "কর্মী" (নারী)। সমাজে পুরুষ নিজের সামাজিক প্রতিপত্তি আর পরিচয়ের জন্যে রেখেছে স্ত্রী, আর ভোগ ও লালসার জন্যে রেখেছে যৌনকর্মী। এবং নিজেদের 'সম্মান' ধরে রাখতে এই কর্মীদের নাম দিয়েছে 'পতিতা', 'বেশ্যা' ইত্যাদি। নামগুলো দেখুন, নিছক শব্দ হিসেবেই প্রথম শুনেছিলেনঃ কিশোর বয়সের কথা মনে করুন। তারপরে শিখে গেছেন, এগুলো কতোটা নিকৃষ্ট শব্দ, অশ্লীল, অসভ্য, কুৎসিত। তারপরে পরিচিত হয়েছেন এই শব্দগুলো যাদের সাথে ব্যবহার করা হয়, তাদের সাথে - সেই নারীদের সাথে যারা পতিত, অস্পৃশ্য, নিষিদ্ধ ইত্যাদি। অথচ তারা কোথায় থাকে, কি করে, কারা তাদের কাছে যায় এটা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চিত বড়ো একটা ধমক খেতেন। 'চুপ' বলে চেঁচিয়ে উঠতো আপনাকে আদর্শলিপির পাঠ দেয়া 'পুরুষ' চরিত্রটি।


এই চর্চা, আবহমান সংস্কৃতির মতো চলে আসছে। পুরুষ কখনই যৌনকর্মীর কাছে যাওয়া থামায় নি, এবং নিয়মিত খদ্দেরকেই দেখা গেছে তাদের বিপরীতে উচ্চকণ্ঠে। এই দ্বিমুখী আচরণ আসে কুশিক্ষা থেকে, প্রথাবদ্ধতা থেকে, অন্ধের মতো ক্ষমতা দখলের লিপ্সা থেকে। এখানে কেন ক্ষমতার কথা আনলাম? একটু ভেবে দেখলে আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন।


সমাজের ক্ষমতার পিরামিডে এই নারীদের অবস্থান কতোটা নিচে! হয়তো সবার নিচে। এমনিতেই অনগ্রসর ও দরিদ্র জনপদে গড়পড়তা নারীরা ২য় শ্রেণীর নাগরিক, তার ওপরে তাদের মধ্যে যারা দেহব্যবসার সাথে জড়িত, তারা না পান পরিচয়, না পান মূল্য - সামাজিক অবস্থান তো দূরাস্ত। এ অবস্থায় তাদেরকে আলাদাভাবে কেন 'পতিত' বলে চিহ্নিত করা হলো? কারণটা কি খুব স্পষ্ট না? কারণ সমাজের পুরুষের দুশ্চরিত্রের অনেকটা চেহারাই তাদের কাছে উন্মুক্ত। ভ্রষ্ট প্রথা মেনে সমাজে প্রতিপত্তি গড়ে তোলা উপরতলার বেশির ভাগ পুরুষ এই সকল নারীর ভোক্তা। কাঁচা বাজারে গেলে তারা যেমন প্যান্ট উঁচু করে চলেন, কাদা মাড়ালে যেমন তাদের নাক কুঁচকে যায়, সেই সকল উন্নাসিকের গতায়াত এই অঞ্চলে অহরহ। আর সেজন্যেই, যৌনকর্মীদেরকে সমাজের নিচু থেকে নিচুতলায় ঠেলে দিলে এই সব পুরুষদের স্বস্তি হবে। এতোটা নিচুতলা থেকে তারা আর কিইবা বলবে, আর সেটা কে-ইবা শুনবে?


বিষয়টা প্রবলভাবে রাজনৈতিক - ক্ষমতার বন্টনের মতো। কিন্তু সে দিকে না তাকাই। আমরা বরং 'আম' জনতা সেজে থাকি। অন্ধকারে আমাদের মাঝে কে কে এই পল্লীতে এগুবেন সেটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। আমরা সেখানে কোন জাজমেন্টাল অবস্থান নিতে চাই না।


কিন্তু নির্বাচন কমিশন যৌনকর্মীদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। যুগের পর যুগ ধরে তাদের প্রতি জমে ওঠা অবহেলা, নাক সিঁটকানোর স্বভাবটাকে বদলাতে তারা সমাজের আরো পাঁচজন পেশাজীবীর কাতারে উঠিয়ে নিয়ে আসছেন। এই পদক্ষেপটি যাদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তারা স্বভাবতই উপরে উল্লিখিত মানুষদের মতো মন-মানসিকতা ধারণ করেন। যতোক্ষণ তাদের সেই কূপমণ্ডুক, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তারা নিজেদের ভেতর রাখছেন, ততোক্ষণ সেটা নিয়ে মনে হয় না কারো মাথাব্যথা আছে। কিন্তু যখনই তারা গলাবাজি করে সমাজের নৈতিকতা, এবং অনুশাসনের বুলি আওড়াতে যাবেন, তখন মনে করিয়ে দেয়া জরুরি যে এই নারীদের পেশাবৃত্তির ভোক্তাশ্রেণীটি কারা।


যৌনকর্মীদের পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াটা মূলত পুরুষ ভোক্তাদেরকে ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সমতূল্য। এই বিষয়টিই হয়তো কাঁটার মতো গলায় বিঁধছে অনেকেরই। তাদের জন্যে প্রেসক্রিপশন, দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার পুরুষতান্ত্রিকতার গলায়, মানবতার ফোরসেপ দিয়ে কাঁটাটি না তুললে অচিরেই সেপটিক হয়ে যাবে। তখন না গোটা গলাটাকেই কেটে ফেলতে হয়!


***


[*নির্বাচন কমিশনে এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিদের মাঝে কোটি কোটি দোষত্রুটি আছে। এই সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন খাতে ব্যর্থতার পরিচয় 'সগৌরবে' রেখেছে। তারপরেও এরকম কিছু দুরন্ত উদ্যোগের জন্যে তারা সাধুবাদ দাবি করেন। বাংলাদেশে সামরিক ও ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়াশীলতার পিঠে এরকম প্রগতিশীল পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই!]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29226078 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29226078 2010-08-19 23:41:11
'অমানবিক'!

আমার ঘরে কিছু অনুভূতিপ্রবণ মানুষ বাস করে। তারা সাংস্কৃতিক জীবঃ প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতি ধরে রেখেছে। তারা সংস্কৃতি খায়। মাখে। ঘুমায়। চোষে। আমের আঁটির মতো সংস্কৃতির গায়ে কমলা কমলা মাংস কামড়ায়।


আমার ঘরে কিছু বাঙালি-চেতনায় গাঢ় মানুষ বাস করে। তারা হাজার বছরের বাঙালিত্ব লালন করে। বাঙালিত্বের ভারে তারা শ্বেত-শুভ্র হয়ে যাচ্ছে, বাংলায় হাসছে, বাংলায় নিন্দা করছে, বাংলা দিয়ে বাংলাদেশকে করছে।


আমার ঘরে এমন চমৎকার মানুষের ভীড়ে আমি ক্রমশ বর্ণবাদী হয়ে উঠছি। বর্ণবাদী সুশীলীয় শব্দ, এটাকে গালি মনে হয় না। বরং বলতে পারি, আমি রেসিস্ট হয়ে উঠছি। এটা বলামাত্রই মানুষগুলো শিউরে উঠলো, তাদের চোখে আমি নিজের ছায়াকে ধীরে ধীরে এনার্কিস্ট হয়ে উঠতে দেখলাম।


স্পর্শকাতরেরা সামাজিকভাবে আমাকে বয়কট করলো, এই হলো তাদের একুশ শতকের আন্দোলন।
অসহযোগের মতো দাবানল ছড়িয়ে গেলো তাদের মাঝে।


অনুভূতিপ্রবণেরা কমলা সংস্কৃতি খেয়ে রেগে লাল হয়ে উঠলো, তারা পথনাটক আর জনগানে
আমার বিরুদ্ধে মোর্চামিছিল নামিয়ে দিলো গতকাল সাঁঝে।


বাঙালিত্বে উজ্জ্বল মানুষেরা আমাকে বাংলায় তিরস্কার করলো, বাংলায় লিখলো পাতা-পাতা
স্মারকলিপি, প্রতিবাদ-বিবৃতি, রেগে উঠলো বাঙালি ঝাঁজে।


আমি তাদের সবাইকে আমার ঘরে রেখে বেরিয়ে এলাম
বাইরে তখন হলুদ হলুদ রোদ মেখে আকাশ খুব হাসাহাসি করছিলো নীল মেঘের ওড়না ধরে!


***
- অনীক আন্দালিব
৮.৮.১০


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29219753 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29219753 2010-08-11 00:48:19
ব্লগল্পঃ সেতুবন্ধন!
য়াফসানা পড়লো মহা ফ্যাসাদে! এমনিতে সে মেয়ে ভালো, বিয়ের চিন্তাও করছিলো। কিন্তু কেউ তার হয়ে উদ্যোগ নিতেছিলো না। এখন কি তাহলে নিজেই এগিয়ে যাবে? এই ভাবতে ভাবতে সে ফুটপাত থেকে একটা রিকশা নিলো।


য়াফসানার রিকশাটা খুব ঝাঁকি খাচ্ছে। রিকশাওয়ালা চ্যাংড়া একটা ছেলে। রাস্তাটাও খানাখন্দে ভরা। প্রতিবার ঝাঁকুনির পরে চ্যাংড়া ছেলেটা শক্ত করে হ্যান্ডেল চেপে ধরতে পারে না। আরো একটু নড়বড়ে হয়ে যায় য়াফসানার বসা। এক হাতে ব্যাগ আর আরেক হাতে রিকশার হুড আঁকড়ে ধরে সে বসে আছে। আর দোয়া দরুদ পড়ছে, কতো তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে পারবে। রাস্তাঘাটে এমনিতেও বেরুতে ভয় লাগে আজকাল। একদিন দেখেছে একটা মেয়ে খুব আঁটোসাঁটো জামা পরে ওড়নাটা কাঁধে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মোটর সাইকেলে হেলান দিয়ে।

ইয়া আল্লাহ মাবুদ! কী দৃশ্য! দেখার পর থেকে য়াফসানার শরীর কেমন কেমন করছিলো। সেদিন বাড়িতে ফিরে দুইবার গোসল করেছে। তারপরেও কেমন জ্বর জ্বর লাগছিলো! রাতে অনেকক্ষণ ঘুম হয় নি।


======

এপিলগঃ
গুরু বলেছেন, পরনামে নিন্দা কদাচ করিও না। গল্প বাড়িতে দিলে সেটাই ঘটিবে, গুরু কুপিত হইতে পারেন। আমি শিষ্য হইয়াই থাকতে চাই। য়াফসানার কারণে আমি গুরুর চরণচ্যুত হইতে চাহি না।
সেতুটা তাই বাঁধা থাকিলো। পরে একদিন... সময় সুযোগ মতো... ইহাকে ছাড়িয়ে দিবো। না ছাড়িলেই বিশদ ক্ষতি কী? <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29212223 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29212223 2010-07-31 23:22:50
আসুন সবাই একটা গান পড়ি!

কল্পনা করো তো, যেন কোথাও কোন স্বর্গ নেই, নরক নেই, আমাদের মাথার ওপরে কেবল নিঃসীম আকাশ, কল্পনা করা তেমন কঠিন নয়, যেন আমরা সবাই এক আকাশের নিচেই আজকের জন্যে বেঁচে আছি....

Imagine there's no Heaven
It's easy if you try
No hell below us
Above us only sky
Imagine all the people
Living for today

কল্পনা করো তো, কোন রাষ্ট্রসীমা নেই, এক দেশের হয়ে আরেক দেশকে আঘাত করা নেই, গণহারে মানুষহত্যা নেই, কল্পনা করো তো, যেন কোন ধর্ম নেই, যেন সকলে আমরা এক আকাশের নিচে শান্তিতে বেঁচে আছি...

Imagine there's no countries
It isn't hard to do
Nothing to kill or die for
And no religion too
Imagine all the people
Living life in peace

তুমি হয়তো বলবে, আমি স্বপ্নবাজ, কিন্তু আমি একা নই, আমি খুব করে চাইছি, একদিন তুমিও আমার সাথে আসবে, আর আমরা সবাই মিলে এই পৃথিবীতে বাস করবো...

You may say that I'm a dreamer
But I'm not the only one
I hope someday you'll join us
And the world will be as one

কল্পনা করো তো, কোন দখলদারি নেই, তুমি এমন ভাবতেও পারবে কি না জানি না, কোন লোভ নেই, কোন ক্ষুধা নেই, অমল-ভ্রাতৃত্বের ছায়ায় এই পৃথিবীর সকলে মিলেমিশে আছে...

Imagine no possessions
I wonder if you can
No need for greed or hunger
A brotherhood of man
Imagine all the people
Sharing all the world

তুমি হয়তো বলবে, আমি স্বপ্নবাজ, কিন্তু আমি একা নই, আমি খুব করে চাইছি, একদিন তুমিও আমার সাথে আসবে, আর আমরা সবাই মিলে এই পৃথিবীতে বাস করবো...

You may say that I'm a dreamer
But I'm not the only one
I hope someday you'll join us
And the world will live as one

=====

জন লেননের এই বাণী অনেকেই শুনে নি, তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে, ক্ষেপে গিয়েছে। তারপরে এক লুনাটিক, উন্মাদ তাঁকে গুলো করে মেরে ফেলেছে আজ থেকে ৩০ বছর আগে

কিন্তু জন লেনন এখনও মরেন নি, তাঁর গান এখনও টিকে আছে, যতোদিন মানব থাকবে, যতোদিন তার ওপরে অন্যায় হবে, নির্যাতন হবে, জুলুম হবে, ততোদিন এই গান বারবার গাওয়া হবে

বারবার!
বারবার!!
বারবার!!!
======

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29211420 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29211420 2010-07-30 23:39:28
এখন ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করা বা তার সদস্য হওয়ার বা অন্য কোনো প্রকারে তার...
আমি জানি যে আমি তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে দূর্নীতিপ্রবণ এলাকায় জন্মেছি

আমি জানি যে আমার পরিবেশের বেশিরভাগ মানুষ খুব সরল মধ্যবিত্ত

আমি জানি যে তারা সকলেই দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের নিশ্চয়তার বেশি চায় না

পৃথিবীর তাবৎ বুদ্ধিবৃত্তির মাঝে যে উৎকর্ষতা, সেটার চর্চা এখানে নেই

তাই আমার পরিচিত বেশিরভাগ বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান বিদেশে চলে গেছে

এই কারণে, আমাদের চারপাশে গড়বুদ্ধি ও গড়মননের লোকজন

গড়ের জন্যে সর্বোচ্চ নীতি নয়, গড়ের জন্যে মধ্যম নীতি

গড় মানুষকে সকলের সাথে মিলে, সকলের মতো হয়ে চলতে হয়

তাই আমি জানি, আমার জনপদে প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা হয়

আমি জানি এখন জোটবদ্ধ শাসন চলে, জোটবদ্ধ ধর্মের - জোটবদ্ধ সামরিকতার

আমার দেশের ভেতরে গত চল্লিশ বছরে সবচেয়ে বেশি সময় এই চর্চা চলেছে

সেজন্যে আমি খুব অবাক হই যখন তার বিপরীত চর্চা চলতে শুরু করে

আমার মনে হতে থাকে যে এটা আমার দেশ নয়

আমার দেশের গড়পড়তা মানুষগুলো এসব কেয়ার করে না, তারা মগ্ন জীবিকায়

আমার তখন মনে পড়ে এ'রকম গড় মানুষেরাই একটা সময়ে জান্তাদের গুলিতে মরেছে, তারা মরতে মরতে একটা সময়ে অসাধারণ হয়ে উঠেছে, তাদের অসাধারণত্বের দ্যূতিতে ভাস্বর কথামালা আমি তো কতোই পড়েছি। সেখানে দেখি আলো, সেখানে দেখি আকুতি, সেখানে দেখি ভালোবাসা একটি ফুলের জন্যেই, এক টুকরো মাটির জন্যেই...

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29210101 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29210101 2010-07-29 10:52:47
আলো অন্ধকারে যাই...

…We all carry these things inside that no one else can see. They hold us down like anchors, they drown us out at sea...

না হয় আমি তুচ্ছ আর তুমি গুরুত্বপূর্ণ, তা বলে কি আমার হৃদয় নেই? হৃদয় কোথায় থাকে তা তো তুমিও জানো না। যদি বলো আমার হৃদয় নেই, তাহলে তোমারও হৃদয় নেই। তোমার কেবল একটা হৃৎপিণ্ড আছে যা খালি ধুকপুক ধুকপুক করে রক্ত পাম্প করছে; বিরতিহীন। সে জানেও না তোমার হাতের একটু ছোঁয়ার জন্যে আমি কতোটা কাতর।

সেই স্পর্শ হঠাৎ অঘটনে পেয়ে গেলে আমার ভেতরে কী তোলপাড় হয়! মনে হয় টেবিল চেয়ার বাবদ এই বাস্তব চরাচর দুমড়ে মুচড়ে উঠছে কাগজের মতো। কেউ নির্বিকার আমার জগতটা কুড়ানো কাগজের মতো ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। তুমি যখন না বুঝেই হেসে ফেলো আমাকে দেখে, যখন আমি তোমার হুটহাট তীব্র কথার জবাব দিতে পারি না, থতমত খাবি খেতে থাকি- তখন তোমার ঐ শাদা দাঁতের হাসি দেখা যায়।

তুমি অবিরাম হাসো আর দাঁতের কামড়ে খুঁড়ে ফেলো আমার শরীর। উড়িয়ে দিতে পারো, কিন্তু আমি সত্যিই টের পাই এই বেদনাবোধ। আমি টের পাই তুমি কীভাবে আমার ভেতরে ভাঙচুর করছো আর আমি হাসিমুখে তোমার দিকে চেয়ে আছি। একটা পলকের জন্যেও বুঝতে দিচ্ছি না আমি কতোটা ফুরিয়ে গেছি। তুমি একটু পরে বিরক্ত হয়ে গেলে, আমার চাহনি আর তোমার ভালো লাগছে না। তোমার দমবন্ধ লাগছে তাই তুমি জানালা খুলে দিলে। তিনতলার জানলা হাট করে খুলতেই দমকা বাতাস উড়ে এলো।

নিচের রাস্তায় দুয়েকটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো- যাদের দেখে তুমি স্মিত হাসলে।

তুমি কি জানো তোমার ঐ এক চিলতে স্মিত হাসির কতোটা কাঙাল আমি? আমি একটু পেছন থেকে দেখলাম তোমার চোখের রঙ বদলে যাচ্ছে। মেয়েদের ওড়নার রঙে ঘোলা হয়ে উঠছে মণি। তুমি বারকয়েক পলক ফেলতেই দেখলাম তুমি নেই! উদামখোল জানালা গলে চলে গেছে ওড়নার ভাঁজে। তোমার ঐ খিলখিলে মেয়েগুলোকে ভালো লাগে। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখি দুটো মেয়ে হাঁটছে আর তুমি তাদের দিকে মুগ্ধনয়নে তাকিয়ে চলে যাচ্ছো।

আমার সামনে জানালা খোলা। আমার সামনে তুমি নেই।

আমার সামনে ঘোলাটে চোখ নেই। হাসির ছুরি নেই। ঝকঝকে শাদা দাঁতগুলো আমাকে আর কাটছে না। তোমার মাথায় যে এলোমেলো মেঘ ভেসে বেড়াতো, সেটাও এখন অনেক দূরে ঐ আকাশে উড়ে যাচ্ছে। আমার হঠাৎ খুব সাধ হলো, জানো? আমি তো ঐ মেয়েগুলোর ওড়নাকে ভালোবাসি না, কখনো বাসি নাই। আমি খালি তোমার কাঙাল হয়ে গেছি বহুদিন ধরে। আমি খালি তোমাকেই দেখি, তুমি মাঝে মাঝে আমাকে ছুঁয়ে দিলে আমি বারবার মারা যাই। আজ হঠাৎ কী যে হলো? আমার খুব মরতে ইচ্ছা হলো। আমি বারবার তোমার হাতে মরতে চাই না আর। আমার ক্লান্ত লাগে।

আমার তো আর কেউ নাই। আমার মতো আর কেউ নাই। তুমিও আমার নও, আমার মতো নও।

আমি কেবলই আমার মতো, আর আমি জানি এই কথাটা তুমি জানো না। তাই আমি আজকে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেলাম। জানালাটা হাট করে খোলা, আমি সেটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জানালা বললো, “তুমি কেমন আছো ছেলে?” আমি বললাম, “আমি ভালো আছি, জানালামনি।” তোমার মাথার চুলের মতো মেঘগুলো ভাসতে ভাসতে লাফাতে লাফাতে হঠাৎ থমকে গেলো আমার এই মিথ্যা শুনে। তারা ভীষণ অবাক! বললো, “তুমি তো ভালো নেই ছেলে। তুমি বার বার মরে যাচ্ছো। তোমার শরীরে ঐ ছেলেটার দাঁতের দাগ দেখতে পাচ্ছি আমরা।” আমি হঠাৎ হেসে ফেলি, এতো দুখেও ফিক করে বলি, “বোকা মেঘ, তোমরা জানো না শরীরে কেন দাগ পড়ে। তোমাদের শরীরে কেউ দাগ ফেলে না। এই দাগগুলো আমি ভালোবাসি। বুঝলে?” মেঘগুলো মাথা নেড়ে চলে গেলো। আর জানালাটাও চুপ করে কী কী যেন ভাবছিলো। আমি হেসে বললাম, “আমাকে নিয়ে এতো ভেবো না জানালামনি।” ফিসফিস করে বললাম, “আমি ভালো আছি। আমি ভালো আছি।”

আমি খুব তুচ্ছ আর আমার একটা হৃদয় আছে। সেটা কিচ্ছু শেখে নি, সেটা কেবল তোমাকে চায়। তুমি তা জানো না। তুমি জানলেও আমাকে চাইতে না। আমি খুব তুচ্ছ।



===***___***===
১৯.৭.১০


*||চতুর্মাত্রিক এবং ক্যাডেট কলেজ ব্লগে পূর্বপ্রকাশিত||

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29208785 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29208785 2010-07-27 16:48:03
রিমান্ডের তিন রত্নকে নিয়া হিটলার বাবাজি একটা ভাষণ দিছেন! " style="border:0;" />

ভিডিঊঃ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29207506 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29207506 2010-07-26 00:30:05
জ- এ জামাত, জ- এ জেএমবিঃ কে কার অলঙ্কার? শূন্য আরণ্যকের ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেখেছিলাম গ্রেফতারকৃত যুদ্ধাপরাধী বিষয়ক, ধরা পড়া সাঈদী, নিজামী ও মুজাহিদের সামনে জেএমবি'র সাইদুর রহমানকে রিমান্ডে হাজির করা হলে সাইদুর হড়বড় করে নানান কুকীর্তির পেছনে এই ত্রিরত্নের ভূমিকা প্রকাশ করেছেন। জামাতের পালের গোদাদের নামে আরো নানান সত্য প্রকাশিত হবে বলে আরণ্যকও ধারণা করেছিলেন। সেই 'থলের বেড়ালে'র লেজের দেখা পেলাম আজ। দৈনিক যুগান্তরের শেষ পাতায় আর দৈনিক ইত্তেফাকের শেষ পাতায় রিপোর্ট এসেছেঃ যার থেকে সার সংক্ষেপ তুলে আনলাম। আমার নিজের তাৎক্ষণিক মতামতটাও দিয়ে দিচ্ছি সাথে। বাকিদের মতামত জানাতে পারেন। <img src=" style="border:0;" />

১। নিজেদের রাজনৈতিক চেহারা ঠিক রাখতে বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক আচরণ জামাত নিজে না করে জেএমবি ও হিজবুত তাহরিরের ব্যানারে করেছে। এজন্যে প্রয়োজনীয় অর্থ ও অন্যান্য সুবিধাদি তারাই সরবরাহ করেছে।

(এটা অবশ্য পূর্বানুমিতই ছিলো, এতো দিনে সেই অনুমান সত্যরূপ পেলো। জামাতের রাজনীতিতে ধর্মের ছিটেফোঁটা নাই, খালি তাদের দলের নামটি ছাড়া। এর বিপরীত যারা দাবি করেন তাদের জন্যে এটা একটা শক্ত উদাহরণ। জামাত এবং শিবিরের নাশকতা একাত্তর থেকেই জারি আছে। মাঝখানে শুধু তা ভোল পাল্টিয়েছে।)

২। সাঈদী বলেছে এবার তাকে ছেড়ে দিলে সে জামাত ছেড়ে ধর্মকর্মে মন দিবে। জামাতের কোন ষড়যন্ত্রের সাথে সে জড়িত ছিলো না বলে দাবি করেছে। একইসাথে জেএমবির জঙ্গি ভাগ্নে শহীদ স্বীকার করেছেন যে সাঈদীর নির্দেশে ড. হুমায়ুন আজাদের উপরে প্রাণনাশের হামলা করেছিল তারা ৪ জন। বাকি তিনজন হলো সানি (শায়খ রহমানের ভাই), বোমারু মিজান আর শিপন।

(সাঈদীর বক্তব্য শুনে মনে হলো শুয়োরের লেজে আগুন লাগলে সে কতোটা কুৎসিতভাবেই না ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে থাকে! এই বদমাশ এখন বমাল ধরা পড়ে রেহাই পেতে আবার ধর্মের পাজামা ধরে টানাটানি করছে। যেন আবার ধর্মের নাম নিলেই তার অপরাধ মওকুফ করা হবে। অবশ্য এটা নতুন কোন আচরণ না। এই ধর্মের নাম নিয়ে একাত্তরে ফাকিস্তানি বাহিনী তিরিশ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলেছিলো। সেই সময়ে টিক্কা খাঁন বলেছিলো আমি মানুষ চাই না মাটি চাই। আমাদের দেশের মানুষ তাদের চোখে 'প্রকৃত মুসলমান' ছিলো না। লুঙ্গি খুলে ফাক-হানাদারের চেক করছে সেই বীভৎস দৃশ্যটা সবাই-ই দেখেছেন। জামাত সেইসময়েরই নষ্টবীজ। তখন ফাকিস্তানিদের সাথে মিলে ধর্ষণ আর জবাইয়ের উন্মত্ততায় মেতেছিলো জামাত। আর এই সবের ঢাল বানিয়েছিলো ধর্মকে। এখনও বানাচ্ছে! একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর যেভাবে বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে খুন করেছিলো, সেই একই নৃশংসতা তারা ২০০৪-এও দেখিয়েছে। এই ধরনের খুনের পীঠস্থান বাংলাদেশ হতে পারে না, ফাকিস্তান ও সে'রকম দেশগুলো হতে পারে।
একাত্তরের মতোন নৃশংসতার ইতিহাস জামাতের সুদীর্ঘ। সবচেয়ে নিকটের ঘটনাগুলো ২০০১ সালে তারা নির্বাচনে জেতার পরে হিন্দুদের উপরে ঘটানো অত্যাচার, ধর্ষণ, হত্যা।)

থলের বেড়ালের পুরো শরীর বেরিয়ে আসুক। জেএমবি আর হিজবুত তাহরিরের আড়ালে থাকা জামাতকেও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হউক।


১৯/৭/১০

====
খবরের খবর দিলেন সালমা রহমান । তাকে ধন্যবাদ। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29203393 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29203393 2010-07-19 18:29:59
পুনঃপাঠঃ প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘতর ছায়ার নিচে
আমার প্রথম ব্লগে একটা কথা লিখেছিলাম। প্রতিটা কাজের উৎসাহ একটা নির্দিষ্ট থ্রেশহোল্ড না পার হলে আমরা কাজটা করতে পারি না। ইচ্ছা অভিলাষের একটা পারদ মাত্রা থাকে। তার চেয়েও ঝাপসা শব্দ অভিলাষ। আমার অভিলাষ একবার মহাশূন্যে ভ্রমণে যাব (সেটা কার্যকর হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, শারীরিক ও আর্থিক দিক থেকে আমি অনুপযুক্ত)। তেমনি আমার সাধ একদিন বাংলাদেশ খুব আনন্দময় একটা দেশ হবে।

এই সকল বালখিল্য আশার বয়স এবং বাস্তবতা দুইটাই পার হয়ে এসেছি। এবং পথের মধ্যেই জানতে পেরেছি এগুলো আমাদের জন্য মরীচিকার মত পেতে রাখা আছে। আমরা এসব সাধ বা অভিলাষ পোষণ করে আপাতকঠোর বাস্তবতা থেকে দুই দণ্ডের রেহাই পাই। বড়ো হতে হতে জেনেছি যে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ একটা মিথ। এখনও সেটা রোমান বা গ্রীক মিথের মত হয়ে ওঠেনি, তবে হবে। আমার নাতি বা তার নাতির সিলেবাসে হয়তো কার্ল মার্ক্স একজন রূপকথার গল্পকার বা মিথের কথক হিসেবে পঠিত হবেন। আমার মধ্যেও এই বিলাসজাত স্বপ্ন নাই যে পৃথিবী থেকে সকল শ্রেণীভাগ উঠে যাবে।

এটার পাশাপাশি অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে কোনকিছু তত্ত্বে দারুণ হলেই সেটার প্রয়োগ দারুণ হবে বা উপযুক্ত হবে এমন কোন কথা নাই। এরকম উদাহরণ আশেপাশে প্রচুর দেখতে পাই। বাংলাদেশের মত দেশে জিপিএ সিস্টেম নিয়ে অনেকেই আশাবাদী ছিলেন ২০০৩ সালে। আধুনিক বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের মত আমরাও ৫.০ পয়েন্ট পাবো, এবং আমাদের এই "বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দেখতে" জিপিএ দেখে তারা আমাদের গুরুত্ব দিবে। এমনও শুনেছিলাম এতে করে আমাদের বহির্বিশ্বে পড়াশোনার উপকার হবে (কী উপকার হবে সেটা সম্বন্ধে বক্তা বেশ সন্দিহান ছিলেন)। তবে আজকে প্রায় ৬ বছর পরে যেটা বুঝি, প্রচুর পরিমাণ ১ম/২য় বিভাগ শ্রেণীর মেধা ও মস্তিষ্ক নিয়েই অনেকে জিপিএ ৫.০ পাচ্ছে। তাতে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কারোরই দীর্ঘকালীন কোন লাভ হচ্ছে না।

এই প্লাটফর্মে আস্তিক্য-নাস্তিক্য নিয়ে অযথাই তালগাছ-মূলক তর্ক/ঝগড়া/ত্যানা প্যাঁচানো/গালাগালির কথা মাথায় রেখেও একটা উদাহরণ একইভাবে দেয়া যায়। সেটা হলো তত্ত্বীয় ধর্ম এবং তার প্রয়োগের পার্থক্য। তত্ত্বীয় নাস্তিক্য বিষয়ে এখনও প্রমাণ গ্রন্থ বা বিশেষ গ্রন্থ না থাকলেও মোটামুটি সেখানেও ব্যবহারিকে গিয়ে আকাশ পাতাল পার্থক্য দেখি।

আরো একটা উদাহরণ দেখি এই সমাজ-বিষয়ে সকল মতবাদে। সেই গোত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র থেকে শুরু করে পুঁজিবাদ পর্যন্ত যত নীতি এসেছে, সবাই নিজস্ব ভুল, ত্রুটি নিয়েই এসেছে। মানুষের 'চিরভ্রষ্ট' চরিত্রের কারণেই একটা দলের সবার সাথে খাপ খায় এমন কোন পথ বা মত কেউ দেখাতে পারেন নাই। কোন মতবাদেই এই সুবিধাগুলো প্রদান করতে পারেন নাই বিধায় মানুষ শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদ আর মুক্তবাজার নিয়ে কাজ চালাচ্ছে। ইউটোপিয়ান সমাজ কেবল বই-পুস্তকে সম্ভব বলেই আমরা চোখ খুলে দেখি সবাই কাড়াকাড়ি করেই নিচ্ছি সবকিছু! এবং এটাকে সমর্থনের জন্যেই কি না জানি না, বাকি সমস্ত মতবাদ আজকের পৃথিবীতে ভীষণ কোণঠাসা। কাগজে কলমে যতই "সুন্দর ভবিষ্যত" বা "সুন্দর পৃথিবী"র আশ্বাস থাকুক না কেন, এই নিস্পৃহ ব্যবস্থার কাছে বাকি সব থুবড়ে পড়ছে।

এটাও একটা উদাহরণ যে তত্ত্বমতে যে কথা উপযোগী মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা অনেক সময়েই ধোপে টিঁকে না

সামাজিকভাবে আমাদের বাস্তবতা ক্রমশই চরমপন্থী হয়ে উঠছে। একটু ব্যাখ্যা করি। আমি নিজে নব্বুইয়ের দশকে বড়ো হয়েছি। তার আগের দশকব্যাপী স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনের মিশ্রণে থেকে আমাদের সমাজ অনেকাংশই ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। মতপ্রকাশ বা আনন্দ-উৎসবের মাঝেও আমি একটা ম্রিয়মাণতা টের পেতাম। হয়তো সমাজের উপরতলায় এগুলো ঠিকঠাকই ছিল, ওখানে অবশ্য কখনই বা উদযাপনের জাঁকজমক কমেছে? সেসময়ের তুঙ্গস্পর্শী বিষয় ছিল ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম (এখন তাঁকে শুধুমাত্র তাঁর মৃত্যদিনে স্মরণ করা হয়!) এবং গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলা। ছোট ছিলাম, এবং রাজনৈতিক বিষয়ে গড়ে ওঠা সুশীলীয় আরোপিত অনাগ্রহের কারণেই মামলার খুঁটিনাটি সম্বন্ধে জানতাম না। বিস্ময় হলো হেরে যাবার পরেঃ একজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, জামাতে ইসলামীর মত ধর্মব্যবসায়ী দলের নেতা হয়ে এই লোকটি কীভাবে নাগরিকত্ব পেয়ে গেল! নাগরিকত্বের আড়ালে তাকে স্বীকার করে নেয়া হলো (ক্ষমা ও পুনর্বাসন তো আগেই করা হয়ে গেছে!)।

এই দশকের শুরুতে জামাত যখন বিএনপি এবং আরো দুইদলের সাথে জোট করলো, এবং সরকারের অংশ হয়ে গেলো তখন আমি বুঝলাম যে হয়তো আমিই ভিন্নভাবে চিন্তা করছি। দেশের বেশিরভাগ মানুষ এদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করছে এই জিনিসটা আমার মেনে নিতে কষ্টও হলো।

তত্ত্বাবধায়কের সময়ে দেখলাম বিএনপি ও আওয়ামীলীগের অনেক বড়ো বড়ো নেতা দূর্নীতিসহ নানান মামলায় ধরা পড়ছেন, কেবল জামাতের কেউ ধরা পড়ছে না। এইবারেও আমি অবাক হলাম, এরা ধোয়া তুলসীপাতা নয় সেটা নিশ্চিত, এবং চুরি করার সময়ে চোর এটা খেয়াল করে না যে বাক্সপত্র ওলটপালট হচ্ছে। সুতরাং নিশ্চয়ই চুরির আলামত আছে, দূর্নীতির চিহ্ন আছে। সেগুলো কেন কেউ খুঁজে পাচ্ছে না, কিংবা বলা যায়, সেগুলো কেউ কেন খুঁজে বের করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না। জামাত এবং জামাত-সমব্যথীরা কি তবে হর্তাকর্তাদের মধ্যেও, তত্ত্বাবধায়কদের মধ্যেও?


২.
২০০৮ এর শুরুতে আমি ব্লগজগতে প্রথম এসেছি। প্রথম দিকে লেখার চাইতে পড়তাম অনেক বেশি। সময় এবং সুযোগ কমে যাওয়াতে এখন সেটা হয়ে ওঠে না। পড়তে পড়তে খেয়াল করলাম প্রচুর ব্লগ লেখা হচ্ছে জামাতপন্থী এবং রাজাকার-তোষণমূলক কথাবার্তা দিয়ে। যেহেতু এটা খোলা মাধ্যম, কেউ চাইলেই সেটা বন্ধও করতে পারবে না। সরাসরি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললে হয়তো সেটা অভিযুক্ত করা যায়। কিন্তু একটু আড়াল করে, আবডাল দিয়ে লিখলে অনেক সময়ে সেটা বোঝাও যায় না।

এরকম লেখাগুলো পড়তে পড়তে এবং তাদের অন্যদের সাথে মন্তব্যে কথাবার্তা পড়তে পড়তে দেখলাম এটা বেশ শক্তিশালী পদক্ষেপ। পুরো ঘটনাগুলো বেশ গুছিয়ে, আঁটঘাঁট বেঁধেই করা হচ্ছে। মন্তব্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেলে হয় তা মডারেট হচ্ছে, নতুবা তা মুছে ফেলা হচ্ছে। ব্লগের কর্তৃপক্ষের হস্ত্ষপের বিলম্বের পেছনে যে কারণই থাক না কেন, সেটা অন্যান্যদের উষ্মা এবং গালিগালাজ থামাতে পারছে না। একটা পর্যায়ে নিক বা ব্লগার ব্যান করে দিলেও সে বা অন্য কেউ অন্য নামে ঘুরে ফিরেই আসছে (একজন ব্লগার সম্ভবত এই লিস্টও বানিয়েছিলেন!)।

আমি সবসময়েই এরকম পোস্টগুলো এড়িয়ে চলি, সারাদিনের অনেক রকম জটিলতা ও হাউকাউয়ের পরে ব্লগে এসে একই কাজ করতে ভালো লাগে না। তারপরেও মাঝে মাঝে এই নিস্পৃহতার সীমাটা ছাড়িয়ে যায়। তখন হয়তো কোন পিচ্ছিল, এবং বিরক্তিকর ধরনের কোনো জামাতির সাথে তর্ক শুরু করতে হয়। এসব তর্কের কোন ফলাফল নাই, কারণ একজন শিবির বা জামাত মনোভাবের কারো পক্ষে নিজস্ব মতামতের বাইরে গিয়ে চিন্তা করা সম্ভব না। সম্পূর্ণ জেনে বুঝে একটা ধর্মব্যবসায়ী ও খুনি-ধর্ষণকারী দলের সমর্থক হতে গেলে নিজস্ব নৈতিকতা বা মানবতাবোধকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। মাথা মুড়ে চুনকাম করে ফেলা হয় বলেই তাদের আচরণ এবং ব্যবহার হয় পরিশীলিত, মার্জিত। এবং রাজনীতি ও ধর্ম ব্যাপারে যেহেতু আমরা কম বেশি উদাসীন, পড়াশোনা কম, বিশ্বাসটাও মরচে ধরা নড়বড়ে, আমাদের মাঝে তারা বেশ দীপ্তি নিয়েই বিরাজ করে। তাদের চারিত্রিক সুষমা দেখে মুগ্ধ হয়ে শিবিরপন্থী বা জামাতের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে দেখেছি অনেককেই।



৩.
নিরপেক্ষ বলে কোন পক্ষ নাই বলে আমি বিশ্বাস করি। মানুষ কোন না কোনভাবে একটা সাইড নিবেই। একজন জামাতপন্থী খুব ভালো করেই জানে বাংলাদেশের মানুষের মনে কুশিক্ষা এবং ধর্মবিষয়ক অজ্ঞানতা কতটা বেশি। সেই জায়গাটা নরম এবং নাজুক বলে সেখানে একটু গুতো দিলেই ঝুরঝুর করে তার প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে। তারপরে কোন ফাঁকে তাকে মগজ ঘুলিয়ে, গল্প ও কবিতার ছলে "সাথী" বানিয়ে ফেলা হবে সেটা সে নিজেও জানবে না।

আমি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বুয়েটের মত প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও উজ্জ্বল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই প্রচুর জামাতি ও শিবিরপন্থী চরিত্র। এদের কেউই পোশাক আশাক, চলন বলনে গোঁড়া নয়। পাঞ্জাবি-পায়জামা-টুপি পরা ছেলে অথবা বোরকাবৃত মেয়ে'র বেশ ছেড়ে অনেকেই আমাদের মতই শার্টপ্যান্ট আর সালোয়ার কামিজ-ফতুয়া পরছে এবং মনে মনে শিবিরঘেঁষা মনোভাব ধারণ করছে। চলনে বলনে আধুনিক এবং বিজ্ঞ রূপধারী এই সব মানুষই তীব্রভাবেই একগুঁয়ে (অন্তত প্রগতির প্রশ্নে); ধর্মের মূল জ্ঞানের চাইতে কর্ম অর্থাৎ সামাজিক পালনের ব্যাপারে বেশি উৎসাহী; এবং বর্তমান রাজনীতি ও প্রেক্ষাপট নিয়ে সচেতন, উচ্চাভিলাষী।

এই "সচেতন", "শিক্ষিত" জনগোষ্ঠীর নিরানব্বুইভাগ তুখোড় ছাত্র, কিন্তু এমন সচেতনতার সাথে জামাতি বা শিবিরীয় মনোভাবের পাশাপাশি জীবনযাপনেও তারা প্রবলভাবে ধর্মান্ধ। অবস্থা বিশেষে ধর্মের "সুবিধা" সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেই তারা আদায় করে। অথচ ধর্মজাত স্বার্থত্যাগ বা নিঃস্বার্থ আচরণ তাদের মাঝে দেখি না। পরোপকারের যে মুখোশ তারা সামাজিকভাবে ধারণ করেন সেটারও গূঢ় উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপত্তি বা স্ট্যাটাস অর্জন।

আশংকা বা ভয়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের ইতিহাস বা স্বাধীনতার প্রতি হুমকি বহন করে এরকম অনেকগুলো মতবাদকেই এরা চিত্তে ও ধ্যান-ধারণায় লালন করে। এবং সেইদিন দূরে না যেদিন আমাদের উদারতা এবং প্রগতিবাদীত্বের উদারতার বুলশিটের মধ্যে দিয়ে তারা শাসন, ক্ষমতা ও অর্থবিত্তের দাপট দেখানো শুরু করবেন। আমরা ছা-পোষা মধ্যবিত্ত কেবল রাজনৈতিক অনীহা থেকেই চেয়ে চেয়ে দেখবো প্রতিক্রিয়াশীলতার ছায়া দীর্ঘ হতে হতে আমাদের জনপদ ঢেকে ফেলছে।


***

পুরানো কপি


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29202140 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29202140 2010-07-18 00:03:30
অকল্পগল্পঃ পাইদুর যাহা ভনে একটি নতুন ধরনের নীরিক্ষা থেকে একটা গল্প লিখলাম। কাজী আনোয়ার হোসেন "মাসুদ রানা"য় যেমন বিদেশী গল্পের ছায়ানুসারে গল্প লিখেন, তেমনি আমার গল্পটাও মৌলিক নয়। একটি খাঁটি দেশীয় গল্পের ছায়া ও কায়া ধরে বেড়ে উঠেছে এটি। এ যেন রসালের দেহ বেড়ে স্বর্ণলতিকা (আহেম)। এই সূচনাটুকু দিলাম গল্পের শরীরকে ঢেকে রাখার জন্যে। ওহ, বলতেই ভুলে গেছি, এমেচারিশ ভুল। এই গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক। জীবিত বা মৃত কোন চরিত্রের সাথে কোন মিল পাওয়া গেলে তা একান্তই ব্লা ব্লা ব্লা... ]


পাইদুর যাহা ভনে

'আপনারা তো পর্নোগ্রাফির ছবিতে অভিনয় করেন। আপনাদের মধ্যে কোনো রুচি নাই। পরিচালকদের ভেতরে-ভেতরে আর্টফ্লিম করার কথা বলেন আর নিজেরা সস্তা ছবিতে অভিনয় করে ইয়ে করার ধান্ধা করেন। আমি আজ ঠুঁটো পরিচালক আর আপনারা সাধু সেজেছেন, না? এমন কোন শট কি আছে, যা আপনাদের ছাড়া টেক করেছি?'

নিষিদ্ধ ঘোষিত পিএমবি'র (পর্নো মুভি বিলায়াতীন) কুখ্যাত পরিচালক পাইদুর জাঝামান আর্টফ্লিম-এ-গুলতামীর সেক্রেটারি জেনারেল নায়ক চালী শাহকান ঢ়োগাম্মত গুজামিলকে উদ্দেশ করে এভাবেই এক চোট নিলেন মঙ্গলবার রাতে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের সময়। ওই রাতে ছিল তাঁদের দ্বিতীয় দফা মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ। পিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে আর্টফ্লিম-এ-গুলতামীর তিন শীর্ষ মেগাস্টার ঝাঁকিউর জাঝামান মিজানী, গুজামিল, সালোয়ার পিন্দাইন বাঈজী ছাড়াও পিএমবির পাইদুরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

গোয়েন্দা পুলিশের সাব ডিটেকটিভ (নর্থ) ঘনাদা পত্রিকাকে জানান, এদের বিরুদ্ধে মামলায় তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। অন্য এক ঘাগু অফিসার জানান, এর আগে পিএমবির পরিচালক পাইদুর ও গুলতামীর মেগাস্টারদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন স্ক্রিপ্ট যাচাই-বাছাইয়ের জন্যই তাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে।

পর্নো মুভিতে অভিনয় ছাড়াও সম্প্রতি আউটডোর শ্যুটিং স্পটে অশালীন পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ (যেমন হুটহাট গেলমান নিয়ে মগবাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া, সালোয়ারের ফিতে খুলে যাওয়া ইত্যাদি) আছে গোয়েন্দাদের হাতেঃ এসবও যাচাই-বাছাই চলছে।

জিজ্ঞাসাবাদকারীদের একটি সূত্র জানায়, এ দফায় রিমান্ডে পাইদুরকে বেশ জলি দেখায়। তিনি জোর গলায় বলছেন, একটি চিত্রনাট্যও মিথ্যা বানাই না। গ্রীনরুম থেকে আসার আগে সাজানো স্ক্রিপ্ট ছিঁড়ে নকল পরচুলা-দাড়িতে সেট-ওয়েট জেলও মেখে এসেছেন তিনি। গোয়েন্দা তাই দেখে মাথা নাড়েন, রিপোর্টার খস খস করে লেখেন, "বেরি বেরি সেক্সি!"

মঙ্গলবার বিকেলে কারাগার থেকে তাকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে এনে সন্ধ্যার পর কিছুক্ষণের জন্য মিজানী ও গুজামিলের মুখোমুখি করা হয়। দ্বিতীয় দফা শ্যুটিংয়ে ওই রাতের শিফটেই ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত তাকে তিন গুলতামী নায়কের পেছনে দণ্ডায়মান করে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ চলে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এ সময় বেশি প্রম্পট করার কোনো প্রয়োজনই হয়নি। খালি ক্যামেরা অন রেখে ঘনাদা একশন বলেছেন আর তারা নিজেরাই গড়গড় করে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নাটকের স্টাইলে বিনাস্ক্রিপ্টে ডায়ালগ মেরেছেন। সেখান থেকে তারা অজানা অনেক তথ্য দিয়েছেন। তবে পাইদুরের ক্ষোভ বেশি গুজামিলের প্রতি। তাদের প্রথম সিনের সময় পাইদুর নিজ থেকেই আগ বাড়িয়ে গুলতামীর তিন মেগাস্টারের সঙ্গে করমর্দন করেন। মীজানী ও বাঈজী করমর্দন করলেও গুজামিল অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন।

সূত্র মতে, পাইদুর গুলতামীর তিন মেগাস্টারকে দেখা মাত্রই সাজানো স্ক্রিপ্টের বাইরে ডায়ালগ বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে গুজামিল বলেন, 'পাইদুর সাহেব, এসব কী বলতে শুরু করেছেন?' উত্তরে পাইদুর ছিনেমাটিক ঢঙে বলেন, 'কেন! ভুলে গেছেন্‌ন্‌? (ইকো হবেঃ গেছেন্‌ন্‌? গেছেন্‌ন্‌? গেছেন্‌ন্‌?) ১৯৯১ সালে আর্টফ্লিমে গুলতামীর অফিসের দোতলায় কী বলেছিলেন্‌ আপনি?' গুজামিল বলেন, 'আপনার সঙ্গে আমি শেষ কবে ছবি বানিয়েছি তাই তো খেয়াল নাই।' পাইদুর বলেন, 'ওই যে সময় আপনি বলেছিলেন, সাদাকালো পর্নে গুলতামীর শ্যুটিংয়ের মধ্যে সমন্বয় ছিল না। সমন্বয় থাকলে আজ গুলতামীর ওপর পিএমবি মাথাচাড়া দিতে পারত না।' এ সময় গুজামিল ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, 'এসব কোনো আলাপ হয়নি আপনার সঙ্গে।' পাইদুর বলেন, 'খেয়াল করার চেষ্টা করেন, সব মনে করতে পারবেন। দরকার পড়লে আপনার স্পটবয় গেলমানকে জিজ্ঞেস করেন। ওই দিন আপনি আমাকে উটপাখির ডিম দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন।' এ সময় গুজামিল মাথা নিচু করে থাকেন।

গুজামিল পাইদুরকে উদ্দেশ্য করে আরো বলেন, 'আপনাকে তো আর্টফ্লিম-এ-গুলতামী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আপনার সঙ্গে আলাপ করব কেন?' পাইদুর তখন ক্ষিপ্ত হয়ে পাঁই করে ঘুরে বললেন, 'আবার ভুল ডায়ালগ বলছেন! আমাকে বহিষ্কার করেছেন এরকম কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারবেন আপনারা? আমার ছেলে পা.মো.শু পিএমবি'র একটা ছবির ইনডোর সিনের শ্যুটিংয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পরও তো আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা করেছি। তখন আপনারা সবাই মিলে আমাকে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে বলেছিলেন।' পাইদুর পই পই করে এক দিকে ঘাড় কাত করে আরো বলেন, 'আপনারা আমাকে পর্নো মুভিখোর বলেন আবার যোগাযোগ করে সাহায্য চান। আপনাদের মতো আমি না। আমার অন্তর্বাস-বর্ম আছে। আমি এক বর্মে বিশ্বাস করি। আমি পিএমবির দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি "ইয়ে" ঘটনাও ঘটতে দিইনি। আপনারা তো শ্যুটিংয়ের জন্য সব কিছু্ই করেন। নারী চরিত্র হারামের কথা বলেন, আবার সুযোগ পেতে নারী নায়িকাদের গান ছবিতে বসিয়ে দিয়ে বসে থাকেন। এসবের জন্য আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে।'

এ সময় জিজ্ঞাসাবাদকারীরা পাইদুরকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, 'আপনার সব রাগ তো দেখি গুজামিল সাহেবের ওপর। এর কারণ কী?' পাইদুর বলেন, 'সব নষ্টের মূলে তো উনি।' জিজ্ঞাসাবাদকারীরা বলেন, 'মিজানী সাহেব তো তাহলে ভালো।' পাইদুর দাবি করেন, 'ওনাদের সবাই এক রকম। কেউ একটু শ্যুটিংয়ে একশন বেশি বলেন, কেউ কম।' পাইদুর বলতে থাকেন, 'দুই দিন আগে এফডিসির কোর্ট-এ মিজানী সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। এ সময় তো মিজানী সাহেব আমার কাছে দোয়া চেয়ে বলেছিলেন, আপনি কি আসলেই পুলিশকে এসব বলছেন?'

দীর্ঘক্ষণ নীরবে পাশে বসে থাকা মিজানী ডায়ালগ মনে করতে না পারায় নীরব থাকলেও সালোয়ার পিন্দাইন বাঈজী পাইদুরের এসব কথা শুনে মুখ খোলেন। পাইদুরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'এসব কী ডায়ালগ বলছেন আপনি?' তখন পাইদুর আরেক দফা বাঈজীর ওপর ক্ষেপে যান। বলেন, 'আপনি বড় মুজরা নাচনেওয়ালী হয়েছেন। আপনার মধ্যে আর কোনো এলেম আছে নাকি! আপনার চাইতে আমার গেলমান ঢের ভালো। আপনার পেশাই হচ্ছে ঠুমকো নেচে ব্যবসা করা। মগবাজারের গেলমানদের মতো মনের আর দেহের ধৈর্য আপনার নাই। আপনি খুলনার ফকির সাহেবের ব্যাগ টেনে টেনে এখন বড় মুজরা নাচনেওয়ালী হয়েছেন, টাকা কামিয়েছেন। এটা কি কেউ ভুলে গেছে মনে করেন?' এসব শুনে বাঈজী আর কথা বাড়াননি। ফারুকীর মত স্ক্রিপ্টের সাথে ফিক্সড স্ক্রিপ্টে কুলিয়ে পারা যায় না।

এ সময় জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মধ্যে একজন বাঈজীর মুজরা নাচনেওয়ালী হওয়ার কাহিনী জানতে চান পাইদুরের কাছে। পাইদুর বলেন, 'বাঈজী বেগমের কাজ ছিল খুলনার ফকির সাহেবের লুঙ্গি গামছা টানা। ফকির সাহেব কোথাও গেলে বাঈজী তার গামছা নিয়ে আগেই সেখানে পৌঁছে যেত। কিংবা কোনো সময় ফকির সাহেবের বিনা কাপড়ে মঞ্চে উঠে গেলে বাঈজী তাড়াতাড়ি উঠে যেতেন। আর লুঙ্গিবিহীন ফকিরকে দেখে উত্তেজিত শ্রোতাদের কিছুক্ষণের জন্য শান্ত রাখতে মুজরা নাচতেন কিংবা ফকির সাহেব চা বা খাবার খেতে গেলে সেই ফাঁকে বাঈজী মুজরা নাচতেন। এভাবেই বাঈজী বেগম বড় মুজরা নাচনেওয়ালা হয়ে গেছেন। পরে ফকির সাহেবের সঙ্গেও বাঈজী বেইমানি করেছেন। তাকে ভুলে আর্টফ্লিম-এ-গুলতামীর ধামা ধরেছেন। আসলে গলার জোরে এ পর্যন্ত আসা আর কী। পাইদুর দাবি করেন, বাঈজী অনেক সময় নাচের মধ্যেও ভুলভাল তাল ঠোকেন। চোখ নাচাতে গিয়ে ভুল তালে কেবল কোমর নাচাতেই পারেন!

****


- ১৫.৭.১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29200868 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29200868 2010-07-16 09:44:20
নটে গাছ না মুড়োলে...
খাতার পৃষ্ঠা খুলে আমি অনেককিছু লিখতে চাইতাম, কিন্তু পারতাম না। মাঝে মাঝে শব্দহীনতায় কামড় দিতো। আমি প্রায় ছয় বছর কিছুই লিখি নি, কারণ আমার ভেতরে কোন শব্দ জেগে উঠতো না। আমি শব্দহীন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কথা বলতাম, ভাবনাচিন্তাও করতাম, কিন্তু সেগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারতাম না। ওই ছয় বছরের সকল স্মৃতি মগজের ভেতরে আটকে আছে। হয়তো সেগুলো সেখানেই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। আমি সেই ঘরগুলোতে আর ঢুকতে চাই না। এড়িয়ে যাই। কষে তালা দিয়ে আটকে রেখেছি। ওগুলো নিভৃত- অযতনে থাকুক!

আমার কখনো দলের ভেতরে থাকা হলো না। প্রথাগত হওয়া হলো না। আমি কখনো কারো সাথে আত্মীয়-যোগ করতে পারি নি। আমার চারপাশে হয়তো একটা অদৃশ্য দেয়াল ছিলো সবসময়েই। আমি হয়তো সেই দেয়ালের কারণেই সবার সাথে স্বচ্ছন্দ হতাম। "বি ইয়োরসেল্ফ" বলেছিলেন বড়ো বোন, তারপর থেকে আমি কেবল নিজের মতোই হতে চেয়েছি। এই চাওয়া পূরণ হয়েছে নানা পথে, নানা ভাবে, আমি বদলে বদলে গেছি সময়ের সাথে। এবং আমি কখনই কারো মতো হতে পারি নি। একটি দলের সকলের থেকে আলাদা হয়ে গেছি অচিরেই। দেখেছি তাদের সাথে আমার মিলের পরিমাণ কেবল পোশাকে, বা স্থানিকতায়। আমরা এক জায়গায় আছি, থাকছি বা বসবাস করছি বলেই কেবল যোগাযোগ হচ্ছে, যোজন বিয়োজন হচ্ছে, আদান-প্রদান হচ্ছে। কিন্তু সেটা না হলে আমি ক্রমশ আলাদা, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। তাদের সকলের সাথে আমার যোগাযোগ রক্ষা করা হয় না। তারা বা আমি কেউই কারো অভাব অনুভব করি না।

যদিও মনে হতে পারে এহেন অ-যোগাযোগ আমাকে দুঃখী করে, আসলে তা সত্যি না। আমি দুঃখ পাই না। সম্পর্কের সুতোগুলো ধীরে গুটিয়ে নিতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এই স্বাচ্ছন্দ্যের কোন ভালো বা খারাপ তকমা নেই, নৈর্ব্যক্তিক পুরোটাই। তাই আমি এভাবেই জুড়ে যাই, এবং বিযুক্ত হয়ে যাই। এবং এই প্রক্রিয়া কোনমতেই আরোপিত নয়। খুব প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে থাকে। যেমন পৃথিবীর ঘূর্ণন বা পানির চক্রের কোন ব্যত্যয় নেই, ঠিক তেমনি- নিয়মানুগ!




প্রবলভাবে জাগতিক বলেই, আমি চারপাশের ঘটনাবলিতে উদ্দীপ্ত হই অনেকটা নিপীড়নের কাছাকাছি। প্রতিক্রিয়ায় বিচারে তাই আমার মননে সেগুলোর ছাপ পড়ে থাকে অনেক বছর। আমার চারপাশে পিরিচ-ঘূর্ণনের মতো মানুষরা জুড়ে যায় একে অপরের সাথে। আমি দেখে তৃপ্তি পাই- এই তৃপ্তিটুকুও, স্বাচ্ছন্দ্যের মতোই- অনেতিবাচক ও অনস্তিবাচক অনুভব। তা, যা বলছিলাম, পিরিচের ঘূর্ণিতে মানুষ জুড়ে যেতে থাকে। এ বড়ো অদ্ভুত সুন্দর প্রক্রিয়া! কেউ যদি দেখে থাকেন, কেউ যদি সেইসময়ে অনুভব করতে পারেন, কী অবলীলায় দু'জনে জুড়ে যাচ্ছে, তাহলে বুঝবেন আমি কিসের কথা বলছি। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হতে থাকে। আমার দূর্ভাগ্যবানও মনে হয়, যখন দেখি পিরিচের ঘূর্ণিতেই, সেই মানুষরা আলাদা হয়ে যাচ্ছে দেখে। আমি কষ্ট পাই, আর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি।

যখন আমি মানুষদের দু'জনকেই চিনি, তখন এই যোগাযোগ ও অ-যোগাযোগের অশরীরী প্রক্রিয়াটা আরো মোহনীয় হয়ে ওঠে। আমি এর রসায়ন বুঝে যাই অনেকটাই। পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব। তাদের দু'জনের জন্যেই নির্মল ভবিষ্যত কামনা করতে থাকি। এই সময়েরই আগে পরে, টের পাই কেউ কেউ নিঃশব্দে আর কারো কাছে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে তোর?" অচিরেই জবাব এলো, "আমি ধরা পড়ে গেছি নিজের কাছেই। গোপনীয়তার সূত্র ভেঙে অকপটেই দেয়ালটাকে ভাঙলাম। এখন আমার আবরণ নেই।"

ছেলেটার চোখে আমি কেবলই অদৃশ্য অশ্রু খুঁজি। নেই। সেখানে কেবল আবেগী-শূন্যতা। আমি সেই শূন্যতাকে অনেক যুক্তিতে হারাতে চাই, কিন্তু পারি না। আমার মনে হয় এখানে যুক্তি চলে না। আমার খুব ইচ্ছা করে এতোদিন ধরে পরিচিত ছেলেটির এই সময়ে পাশে দাঁড়াতে। তাকে এভাবে বদলে যেতে দেখে আমার আর ততোটা ভালো লাগে না। তাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখেও ভালো লাগে না। মেয়েটি হয়তো জানতেও পারছে না ও কীভাবে কষ্ট পাচ্ছে! আমাদের যোগাযোগের এতো এতো মাধ্যম, তারপরেও আমরা একে অপরের সাথে সামান্য এই কথাটুকুও বলতে পারি না যে আমাদের ঠিক কেমন লাগছে। হায়!

আমার মনে হয় পুরনো যুগে মানুষ অনেক আরামে ছিলো। অবশ্যই, তাদের অনেক রকমের অসুবিধা ছিলো। তাদের দৈনন্দিন সুবিধাগুলো ছিলো না, তাদের মোবাইল আর এসএমএস ছিলো না, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে প্রচুর শ্রম ও সময় দিতে হতো। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবেই না আমরা এই সমস্যাগুলো দূরে করে ফেলেছি! এখন হুট করেই সব করা যায়, চট করেই কাজ সেরে ফেলা যায়, উড়ে চলে যাওয়া যায় দেশ-দেশান্তর। তারপরেও আমরা অনেক বেশি কষ্টে আছি। এখন আমি যখন সেই ছেলেটির চোখের দিকে তাকাই, সেখানের সবগুলো অব্যক্ত কথা পড়তে পারি না। হয়তো সে-ও পারে না। যেমন করে সে মেয়েটিকে বলতে পারছে না অকপটে। মেয়েটিও সেটা বুঝতে পারছে না!

ভাবছিলাম আমরা কী এখনও কৈশোরক? আটকে গেছি বয়ঃসন্ধির দোলাচলে? নাহলে কেন এই বয়সে এসেও এভাবে কারো হৃদয় টুকরো টুকরো হতে দেখবো! সেই অস্থির অন্তর্লীন সময় তো আমরা কবেই পেরিয়ে এসেছি, এখন সময় বুঝে চলার বুঝে নেয়ার। সব কিছু দেখে শুনে সিদ্ধান্ত নেয়ার। ছেলেমানুষীর, খামখেয়ালিপনার দিন ঢলে চলে গেছে কবেই! তারপরেও টের পেলাম যে আমরা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আমাদের বিচারে ভুল হয়ে গেছে। ছেলেটি যেদিন টের পেলো, সেই ভুলের দিন, সেই খামখেয়ালির দিনে মনে হয় আকাশ গাঢ় কালো হয়ে এসেছিলো। ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরেছিলো মধ্যগ্রীষ্মে। তারপরে সে বুঝে গেছে হৃদয় হারালে কতোটা ক্ষরণ!

ভেবেছিলাম তার জন্যে এলিজি লিখবো। আশাবাদ লিখবো। সাথে তার জন্যে স্মৃতিগুলো লিখবো। কিছুই হলো না। কেবল (অ)যথা-বাক্যক্ষয়! পারা না-পারার দোলাচল।



দেখি ঘরে কে এলো, ওমা! তুমি? যাই এ'বেলা। কথা ফুরোবে না, নটে গাছও মুড়বে না!


******** ********** ***********



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29192769 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29192769 2010-07-05 08:57:32
ট্র্যাপিজ-লাফ

এমন অসম্ভবেও ঢেউপ্রবণ নগরে জটাজট মানুষ জমে ওঠে

জাদুবিদের কারসাজি দেখা যায় সুউচ্চতল আকাশে, যে প্রান্ত অবধি দালানটি পৌঁছে গেছে অনেকদিন আগে- হয়তো গত শতাব্দীতে, হয়তো গতকালই, সেই দালান-চূড়ার কাছাকাছি চলিষ্ণু মেঘের ট্র্যাফিক সিগন্যাল, নানান রুটের বাস ও ট্রাকদের হুইসেল, ভেঁপু বাজান-থামুন-১০০ হাত দূরে থাকুন

ছুটে আসা কৃষ্ণবরণা মেঘ।
আর আমরা দেখতে পাই সেই দালানের কার্নিশে প্রকাণ্ড মেঘগুলো জমে আছে
সেখানে জাদুবিদ টলোমলো পায়ে হাঁটছেন ঝুঁকে পড়ে মাপছেন জলের তাপমাত্রা, অনেক নিচে আমাদের সারি সারি মাথাগুলো ধীরে স্লোমোশনে হেঁট হয়ে যায় চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্যে, অনুগামী শটের এডিটে কাটা পড়ে একটি জাদুকরি দেহ...



***
- অনীক আন্দালিব
৩.৫.১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29182830 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29182830 2010-06-22 18:33:10
রাতচারণ


দুপুর নিয়ে আমার প্রবল উন্মাদনা আছে। উন্মাদনা, অর্থাৎ সাধারণ্যের সমাজ ও প্রথানিয়ন্ত্রিত আচরণের বাইরে আচরণ। আমি এমন করি, জেনেশুনেই বুক-পকেটে উন্মাদনাসমূহ লালন করি বিবিধ বিষয়ে। জাগতিক তাড়না দিয়ে যেগুলো ইস্যু আমার হিস্যা নিয়ে নেয়- অর্থ, চাকরি, খাওন-দাওন এগুলো আমাকে উন্মাদ করে না। আমি হিসেবি ও খেয়াল করে দেখি এটিএম বুথের ভেতরে ছক ছক নম্বরের জোরে আমার প্রাপ্য খটাখট আমার করতলে চলে আসে। পাতলা হয়ে থাকা ওয়ালেটের ভেতরে শৌখিন রোলার স্কেটিং করে নোটগুলো জমা পড়ে।


অথচ আমি দুপুরের আলোতে উন্মাদ হই। জ্ঞান হবার পর থেকে আমি এই উন্মাদনাকে সহজাতভাবেই পেলেপুষে বড়ো করেছি। কখনো বেখাপ্পা লাগেনি নিজের কাছে, মনে হয়নি ভদ্রসমাজে এমন আচরণের কথা ভাবাও অভব্যতা। দুপুর অর্থাৎ দ্বিপ্রহর; সেই সময়টুকু পাহাড়ের চূড়ায় পত্‌পত্‌ করে উড়তে থাকা নিশানের মতোই কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে। তারপরে হঠাতই গড়িয়ে পড়ে হারিয়ে যায়। হারানোর আগে আগে, স্পষ্ট দেখি দুপুরের ঝিম ধরা আলোর ভেতর থেকে একটা মুচকি হাসি আমার দিকে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকাচ্ছে। তাকে পুরোপুরি পড়ে নেয়ার আগেই বিকেল চলে আসে। বিকেলের প্রতি আমার কোন মমত্ব নেই। বিকেলে মরা বিড়াল আবিষ্কার হয়।


আরেক দ্বিপ্রহরও আমাকে উন্মত্ত করে, সে নিকষ, সে তিমির, সে শুনশান। আর আমি সেই অনুভবের স্বরূপ চিনতে পারি নীরবতার মাঝেও, নিঃসন্দেহে বুঝি যে এটা অস্বাভাবিক। এমন স্তব্ধসময়ের প্রতি আমার উন্মাদনা মানায় না। এখন দরকার ধ্যানজ স্থিরতার, পানির উপরিতলের নিস্তরঙ্গতার। মনকে শান্ত করো, ইন্দ্রিয়গুলোর মুখ বুঁজে দাও। মোমের প্রলেপ দিয়ে দাও চোখে, তুলো দিয়ে মুছে দাও ত্বকের প্রদাহ। তারপরে নিঝুম ঘুম! কিন্তু আমি বড়ো বেখেয়ালি হয়ে পড়ি এ'সময়ে। বুঝতে পারি আমার ভেতরের ভাঙন রাত দ্বিপ্রহরকে ছুরির ধারে কাটছে। দেয়ালের ছবি আর মুখগুলো ধীরে ধীরে ধুয়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তাদের বিবর্ণতায় আমারও কেমন মরাটে লাগে। বিভ্রম হয়, মনে হতে থাকে এখন বেলা দুপুর। তীব্র ঝমঝমে রোদে পুড়ে যাচ্ছে রঙ। মরা পাতা খটখটে পাঁপড়ের মতো হয়ে উঠছে।


দেয়ালও একটা সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে। যেভাবে দুপুর আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলো, যেভাবে বিকেল এসে আমাকে তীব্র ঠাট্টাভরা অবহেলা করে চলে গিয়েছিলো, যেভাবে সন্ধ্যা খুব সন্দেহজনক হয়ে উঠেছিলো আর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার সবকিছু ছিনতাই করে চলে গিয়েছিলো, পুলিশবেশী রাত অনেক দেরি করে এসেছিলো- ঠিক সেভাবেই রাত দ্বিপ্রহর আমাকে ফেলে চলে যায়। রাত বাড়তে থাকে তন্বী-কিশোরীর বেণীর মতোন। তার ভঙ্গিমা আমার কাছে অপরিচিত লাগে, দূর্বোধ্য লাগে। আমি আবারও চেষ্টা করি চোখ-কান বুঁজে সমাধির ভেতরে ডুবে যেতে। কিন্তু পারি না। সাঁড়াশির মতো দুটো কঙ্কাল হাত আমার হা-কোটরের ভেতরে আঙুলের হাড় ঢুকিয়ে সেটা খুলে রাখে। চোখবিহীন চোখে আমি চরাচরে রাতের লীলা দেখি। নিশিক্লান্ত অনেক অনেক মরদেহ মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে, খেলা করে। তাদের ক্লান্তি কমে না। তারা শ্রান্তিতে টুকরো টুকরো হয়ে একসময় আবার নিজেদের শয়ানে শিশির হয়ে যায়।


হে আমার দেয়ালের মুখ, হে বিবিধ উন্মাদনা, আমাকে ঘুমুতে দাও!



***
- অনীক আন্দালিব
১৬.৪.১০


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29180148 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29180148 2010-06-19 04:46:08
একটি অগল্প-জনিত প্রয়াস বা বিভ্রম

ঝিম ঝিম দুপুর গড়িয়ে গেলে আমার ঘুম ভাঙতো। একজন তার অনেক আগেই ঘুম ভেঙে উঠে চলে গেছে। কামলাগিরি করে বহুজাতিকে, সেখানে দশটা পাঁচটা বলে আদতে আটটা-আটটা খাটিয়ে নেয়। খাটতে খাটতে তার খাটিয়ায় ওঠার দশা। ভোরে বের হয়ে যায়, বাস ঠেলে অফিসে ঢোকে। বের হতে হতে নিশুতি। আবার ফিরে আসতে আসতে তার খাওয়ার ইচ্ছাটুকুও থাকে না। আমরা বাকি দু'জন যখন কোন মুভি'টা দেখা দরকার, বা আজকে আসলে ইন্টারনেটে নতুন সাইটটার ভেতরে ঘোরাঘুরি করার ফন্দি কষি, সে তখন ভোসভোসিয়ে ঘুমাচ্ছে। আমরা তাকে বিরক্ত করি না, শান্তিতে ঘুমাতে দেই। তারপরে একটু নেট ঘেঁটে বলি, "নাহ, এই ফেসবুক নামের সাইটটা বেশ মজাদার। এতে ঘোরাঘুরি করতেও মজা লাগছে।"


একটু পরে আমরা নাটক দেখতে বসি। ইংরেজি নাটক, যা কিনা মার্কিন মুলুকে সপ্তাহে সপ্তাহে একদিন করে দেখায়, আর আমরা গরীব দেশে সেটা একবছর পরে একবারে সারাবছরের সব পর্ব দেখি। তাতে ক্ষতি নেই, আমাদের মনে হতে থাকে এটা একটা অন্তহীন মুভি। পর্বে পর্বে চমক। আমরা তর্ক করি কেন সুপারম্যান একটা 'গুড-ফর-নাথিং' লানা ল্যাঙের পিছনে ঘুরছে? কেন সে তার পাশেই ক্লোয়ির দিকে একবারও তাকায় না!


তারপর রাত বাড়লে আমাদের ক্ষুধা পায়। আমরা পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে বের হই আর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছাউনির নিচে তাওয়ার কাছে গিয়ে বসি। এখানে তেল তেল পরোটা আর আধাকাচা ডিমভাজি পাওয়া যায়। আমরা সেই আগুনেগরম তেল-পরোটা-ডিম-ভাজি দ্রুত মুখে চালান করে দেই। দেরি করলেই আঙুল নয়তো জিব পুড়ে যেতে পারে। একটু খেয়ে আমার সাথে যে ছেলেটা আছে, সে সিগারেট ধরায়। আমি সিগারেট খাই না। খালি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমার চারপাশের প্রিয় মানুষেরা সিগারেট কেন খায়, এটা নিয়ে ভাবতে বসি। আমরা দেখি ফাঁকা রাস্তা দিয়ে পরাবাস্তব দৃশ্যের মতোন মহিষের পাল যাচ্ছে। কালো রাস্তার পিঠে কালো কালো মহিষগুলোকে আমাদের অন্যজগতের মনে হয়, কেমন নিঃশব্দ চলাচল তাদের। যেন চোখ বেঁধে নিশ্চিন্তে চলে যাচ্ছে তারা! একবারও ভাবছে না যে কালকেই হোটেলে হোটেলে তাদের মাংস কালাভুনা হয়ে আমাদেরই পেটে চলে যাবে। মহিষের পালের রাখালটাকে আমার ভালো লাগে না, তার চেহারা অস্পষ্ট।


ছেলেটার সিগারেট খাওয়া শেষ হয়। এখন চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠিয়ে আমরা ট্রাফিক সিগন্যালে বসে আছি। জনহীন রাস্তায় সবুজ-লাল বাতি একা একাই জ্বলে! আমরা ভাবি, আবোল তাবোল।



তারপর অনেক দিন পার হয়, এভাবেই। তারপরে আমি ভুলে যাই আমি এরকম দিন কাটিয়েছি। সেই ছেলেটাও ভুলে যায় হয়তো। হয়তো আমি ভুলি নাই পুরাপুরি। ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটা চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদেশ চলে যায়। সিগারেট খাওয়া ছেলেটা বিয়ে করে। বউসমেত বিদেশ যাওয়ার সব ঠিকঠাক হয়। তারপরে আমাদের মাঝে পনের মিনিটের রাস্তা রেখে আমরা চাকরি করতে থাকি। ঘানি টানতে থাকি মহিষগুলোর মতোন। তারপরে আমিও হয়তো অনিশ্চিত কোথাও চলে যাই! কোথায় যাই?...



... তারপর আর কোন গল্প থাকে না। সেই ফেসবুক নামক চমৎকার সাইটে কয়েকশ' বছর আগে তুলে রাখা আদিম অ্যালবামটা ঐ সিগারেটখোর ছেলেটা কোনো এক একলা রাতে খুলে বসে। তারপর সেখানে ছবিতে বসে থাকা মুখগুলো দেখে নিজেকে চেনার চেষ্টা করে। একটু পরে অন্য দু'জন একটা করে নোটিফিকেশন পায়। সবকিছুর মাঝে থেকেও বাকি দুইজনে চুপচাপ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।



*****
২৫শে এপ্রিল, দুই হাজার দশ


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29178149 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29178149 2010-06-16 15:01:22
অব্যয়িক


এবং প্রকারান্তরে আমি কাশফুল ভালোবাসি
কিংবা উন্মোচনের শরৎ

ঋতুসমূহ আলোচনার উপসংহারে
সেই মত বিবেচিত হয়নি

তাই আদিগন্ত ধূসর গ্রীষ্ম, গাঢ় কাজল হয়

এই ভাবালু অভিমান বেহুদাই
শহরবাসীর ঋতু বিষণ্ণ ওয়ালপেপারের বেশি নয়

এর চেয়ে অ্যাকোয়ারিয়াম ভালো-
মৎস্য-সন্তরণ আমাদের, ক্লোরিনের শরীরে

ঘটনাবাহুল্যে আজ ও ইদানিং ভুলে যাই কোথায় রেখেছি সুর ও শূন্যতার শব্দ




****
- অনীক আন্দালিব
১৬.৪.১০


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29177488 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29177488 2010-06-15 16:37:32
ব্লগানুবাদঃ দ্য সেলফিশ জিন - রিচার্ড ডকিন্স (১ম অধ্যায়) http://mukto-mona.com/banga_blog/?p=7313) বইটির অনুবাদ শুরু করেছিলাম। 'মুক্ত-মনা'র অনেকের অনুপ্রেরণায় সেই কাজটি করতে পারবো আশা করি। তবে অনুবাদের সবচেয়ে কঠিন ব্যাপারটি হলো ভাষাবদলের ঝুঁকি, অর্থবিকৃতির আশংকা। এজন্যেই ব্লগে সবার সাথে শেয়ার করা, যাতে অনুবাদ ক্রমশ সরল, প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিলে অনেক খুশি হবো।]
==========
প্রথম অধ্যায়ঃ মানুষ কেন?

একটি গ্রহে বুদ্ধিমান জীব পূর্ণতা পায় যখন তারা নিজেদের অস্তিত্বের কারণ খুঁজে বের করতে পারে। যদি বাইরের জগত থেকে কোন অতি বুদ্ধিমান প্রাণী পৃথিবীতে আসতো, তাহলে তারা প্রথম যে প্রশ্নটি করতো সেটা হলো, ‘এই প্রাণীরা কি এখনো বিবর্তন আবিষ্কার করেছে?’ পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন বছর পর্যন্ত একজন ছাড়া এই সত্য আর কারো কাছে উন্মোচিত হয় নি। সেই একজনের নাম চার্লস ডারউইন। সত্যি বলতে কি, অনেকেই এই সত্যের খুব কাছাকাছি ধারণা করেছেন, কিন্তু ডারউইনই প্রথম আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং অকাট্য ধারণা দিতে পেরেছেন। এই অধ্যায়ের শিরোনামে শিশুর মতো যে-অবুঝ প্রশ্নটা করা হয়েছে তার খুব যুক্তিপূর্ণ উত্তর দেওয়ার সুযোগ ডারউইন আমাদের করে দিয়েছেন। জীবনের নানা গভীর অনুসন্ধান, যেমনঃ এই জীবনের কোন অর্থ আছে কি না? আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি? মানুষ কী? এগুলোর উত্তর জানতে আমাদের আর অলৌকিকতার কাছে আত্মসমর্পণের দরকার নেই। শেষবার এই ধরনের প্রশ্নগুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে খ্যাতনামা প্রাণিবিজ্ঞানী G. G. Simpson বলেছেন, “আমি যা বলতে চাই তা হলো ১৮৫৯ সালের আগে এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সকল প্রচেষ্টা এখন মূল্যহীন, এবং আমরা সেগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করলেই ভালো থাকবো।

আজ বিবর্তনতত্ত্ব ততোটাই নিঃসংশয়, যতোটা পৃথিবীর সূর্যকেন্দ্রিক ঘূর্ণন তত্ত্ব; যদিও ডারউইনের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের পুরো প্রভাব বিচার করা এখনো সম্ভব হয় নি। প্রাণিবিজ্ঞান এখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটা গৌণ বিষয়, এমনকি যারা এটি নিয়ে পড়াশোনা করছেন তাদের অনেকেই এর প্রগাঢ় দার্শনিক গুরুত্ব না বুঝেই বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন। দর্শন এবং ‘মানবিক‘ বিভাগের বেশিরভাগ বিষয়ই এমনভাবে পড়ানো হয় যেন ডারউইন নামে কেউ ছিলেনই না! আমার কোন সন্দেহ নেই যে এই অবস্থা বদলে যাবে। যা হোক, এই বইটি ডারউইনবাদের ওকালতি করতে লেখা হয় নি। বরঞ্চ এটি বিবর্তনতত্ত্বের একটি বিশেষ দিকের প্রভাব ও ফলাফল আলোচনা করবে। আমার উদ্দেশ্য স্বার্থপরতা এবং পরার্থপরতার জীববিজ্ঞান খতিয়ে দেখা।

গবেষণাগত গুরুত্বের পাশাপাশি এই বিষয়ের মানবিক গুরুত্বও অনুমেয়। এই বিষয়টি আমাদের সামাজিক জীবনের সবগুলো দিককে স্পর্শ করে, আমাদের ভালোবাসা আর ঘৃণা, কলহ আর সহযোগিতা, দানশীলতা আর চৌর্যপ্রবৃত্তি, আমাদের লোভ এবং উদারতা। এই আলোচনার দাবি আরো কয়েকটি বই করতে পারে, Lorenz এর On Aggression, Ardrey এর The Social Contract, এবং Eibl-Eibesfeldt এর Love and Hate সেগুলোর মাঝে উল্লেখ্য। তবে বইগুলোর সমস্যা হলো এগুলোর লেখকেরা বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে ভুল বুঝেছেন। তাদের ভুল করার কারণ তাঁরা বিবর্তনের মূল প্রক্রিয়াটি বুঝতে পারেন নি। তারা সকলেই বিবর্তনের ব্যাপারে একটা ভ্রান্ত অনুমান করেছেন যে প্রজাতির (বা দলের) ভালো দিকগুলো, একক প্রাণীর (বা তার জিনের) ভাল দিকের চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পরিহাসের বিষয় হলো Ashley Montagu লরেঞ্জের সমালোচনা করতে গিয়ে তাকে ‘উনবিংশ শতকের “Nature red in tooth and claw” চিন্তাবিদদের সরাসরি বংশধর’ হিসেবে তুলনা করেছেন। অথচ লরেঞ্জের বিবর্তন বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি আমি যতোটা বুঝতে পারি, তিনি Tennyson-এর এই বিখ্যাত পঙক্তিটির বিরোধিতায় মন্টেগুর সাথেই একমত হবেন। তাদের দুজনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি বলতে চাই “Nature red in tooth and claw” পঙক্তিটি দিয়েই প্রাকৃতিক নির্বাচনের আধুনিক ধারণাটি সহজে বোঝা যায়।

আমার যুক্তিগুলো দেয়ার আগে আমি সংক্ষেপে এই যুক্তি কী ধরনের এবং কী ধরনের নয় সেটা বলতে চাই। আমাদের যদি কেউ বলে যে একজন মানুষ শিকাগোর গ্যাংস্টারদের মাঝে সারাজীবন কাটিয়েছে, তাহলে সে কেমন মানুষ ছিলো সেই ব্যাপারে আমরা কিছু কিছু অনুমান করতেই পারি। আমরা আশা করতে পারি যে তার মধ্যে শক্তিমত্তা, ক্ষিপ্র ট্রিগার আঙ্গুল আর অনুগত বন্ধুদের প্রতি বাৎসল্যের মতো গুণাবলি থাকবে। এগুলো একেবারে বাঁধাধরা নিখুঁত পর্যবেক্ষণ না, তবে যদি কোন মানুষের টিকে থাকা ও সাফল্যের পরিবেশ সম্বন্ধে আমাদের জানা থাকে, তাহলে তার চরিত্রের ব্যাপারে আমরা একটি মতামতে উপনীত হতে পারি। এই বইয়ের বক্তব্য হলো আমরা এবং সকল প্রাণীরা কেবলমাত্র আমাদের জিনের তৈরি এক ধরনের যন্ত্র। সফল শিকাগোর গ্যাংস্টারদের মতোই আমাদের জিনগুলো এই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভরা পৃথিবীতে টিকে আছে, কখনো কখনো প্রায় মিলিয়ন বছর ধরে। এই তথ্য আমাদের জিনগুলোর ব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ দেয়। আমি দাবি করি যে একটি সফল জিনের মধ্যে এই একরোখা স্বার্থপরতাই মূল চালিকাশক্তি। জিনের এই স্বার্থপর আচরণই ব্যক্তির আচরণে স্বার্থপরতার জন্ম দেয়। তবে, কিছু বিশেষক্ষেত্রে দেখা যায় যে কোন জিন তার নিজের স্বার্থপর উদ্দেশ্য ভালোভাবে আদায় করতে পারে যদি সেটা একক ব্যক্তিপর্যায়ে কিছুটা সীমিত উদারতা দেখায়। ‘বিশেষ’ এবং ‘সীমিত’ শব্দ দুইটা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যতোই অস্বীকার করতে চাই না কেন, পুরো প্রজাতির সার্বজনীন ভালোবাসা আর পরোপকার বিষয়গুলো কোন বিবর্তনীয় অর্থ তৈরি করে না।

এর সাথে সাথেই চলে আসে যে এই বইটিতে আমি কী বলতে চাই না তার প্রথম কথাটি। আমি বিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে কোন নৈতিকতা প্রচার করছি না। আমি বলতে চাইছি সবকিছু কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে। আমি বলছি না মানুষ হিসেবে নৈতিকভাবে কেমন আচরণ করা উচিত। আমি এটা জোর দিয়ে বলছি কারণ আমি জানি যাঁরা একটা বিষয়ের ব্যাপারে বক্তব্য এবং বিষয়টি কেমন হওয়া উচিত তাঁর প্রচারণা, এই দুইয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারেন না, এমন অনেকেই আমায় ভুল বুঝবেন। আমার নিজের বিশ্বাস, কোন সমাজ যদি কেবলমাত্র জিনের একরোখা স্বার্থপরতার সূত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে তবে সেই সমাজ বসবাসের জন্যে খুবই অনুপযুক্ত, নোংরা। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে আমরা যতোই সেটাতে বিশ্বাস করি না কেন, জিনের এই বৈশিষ্ট্য অস্বীকারের উপায় নেই। এই বইয়ের বক্তব্য আকর্ষণীয় হওয়ার কথা, তবে আপনি যদি এখান থেকে কোন নৈতিকতা বের করতে চান তবে সতর্ক হোন। আগেই সতর্ক করে দিচ্ছি, আপনি যদি এমন একটা সমাজ গড়ে তুলতে চান যেখানে প্রত্যেকে নিঃস্বার্থভাবে এবং উদারতার সাথে সকলের ভালোর জন্যে কাজ করে, ধরে নিতে পারেন আমাদের পশুবৃত্তি আপনাকে তেমন সাহায্য করবে না। আসুন, আমরা পরার্থপরতা ও স্বার্থহীনতা শেখানোর চেষ্টা করি, যেহেতু আমরা জাত-স্বার্থপর। আগেই বুঝে নেয়া দরকার যে আমাদের স্বার্থপর জিন কী করতে যাচ্ছে, যাতে করে সেই নকশা ভেস্তে দেয়ার একটা সুযোগ আমরা পাবো, যা কোন প্রজাতির প্রাণী করার সাহস করেনি।

শিক্ষার এই বক্তব্যের পাশাপাশি এটা বলে রাখি, যে জিনগতভাবেই আমরা সব বংশগত বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকি এবং তা অপরিবর্তনীয়- এমন যুক্তি একটা খুব সাধারণ ফ্যালাসি। আমাদের জিন আমাদের স্বার্থপরতা শেখায়, তবে সেই শিক্ষা সারাজীবন মানতে আমরা কেউ বাধ্য নই। এমন হতে পারে যে এখন উদারতা শেখা যতোটা কঠিন, সেটা একটু সহজ হতো যদি জিনগতভাবেই তা শেখানো হতো। প্রাণীদের মাঝে একমাত্র মানুষই তার সংস্কৃতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, কিছু কিছু শিখে, কিছু কিছু দেখে। অনেকে হয়তো বলবেন, সংস্কৃতি এতোটাই জরুরি যে জিন স্বার্থপর হোক আর না হোক, তাতে কিছু যায় আসে না, মনুষ্যপ্রকৃতি বুঝতে জিনের গুরুত্ব মোটামুটি অপ্রাসঙ্গিক। আবার অন্যেরা এর সাথে দ্বিমত করবেন। আসলে মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ নির্ভর করে “প্রকৃতি বনাম শিক্ষা” বিতর্কে আপনি কোন পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন সেটার ওপরে। এই বইটি কী ধরনের নয় সেটার দ্বিতীয় পয়েন্টটা এরই সাথে চলে আসেঃ এই বইটি প্রকৃতি/শিক্ষা বিতর্কের যে কোন একটা পক্ষের সাফাই গাইবে না। স্বাভাবিকভাবেই এই বিষয়টায় আমার একটা মতামত আছে, তবে সেটা আমি এখানে প্রকাশ করতে চাই না, তবে শেষ অধ্যায়ে সংস্কৃতির ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যাবে। যদি জিনগত বৈশিষ্ট্য আমাদের আচরণে কোনই প্রভাব না ফেলে, যদি আমরা বাকি সব প্রজাতির প্রাণীদের থেকে এতোটাই আলাদা হয়ে থাকি, তবে সেই ব্যতিক্রম আমরা কেন হয়ে উঠলাম সেই গবেষণাও খুব আকর্ষণীয় হবে। আর যদি আমরা প্রাণিজগত থেকে যতোটা আলাদা ভাবি ততোটা আলাদা না হয়ে থাকি, তাহলে এই নিয়মের অধ্যয়ন খুবই জরুরি।

এই বইটি কী ধরনের নয় তার তৃতীয়টি হলো এটি মানুষ বা অন্য কোন প্রজাতির আচরণের বিস্তারিত বিবরণ নয়। কেবল প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবেই আমি কিছু কিছু তথ্য নিবেদন করবো। আমি কখনই বলবো নাঃ “আপনি যদি বেবুনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে দেখবেন যে তারা স্বার্থপর; সুতরাং মানুষের আচরণও স্বার্থপর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে”। আমার ‘শিকাগোর গ্যাংস্টার’ নিয়ে উদাহরণের পেছনে যুক্তিটা এর থেকে আলাদা। সেটা এরকম- মানুষ এবং বেবুন প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা বিবর্তিত হয়েছে। যদি আপনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের পদ্ধতির দিকে তাকান, তাহলে মনে হবে যে এর দ্বারা বিবর্তিত যেকোন প্রজাতিরই স্বার্থপর হবার কথা। সুতরাং যে কোন প্রজাতির, তা সে মানুষ বা বেবুন বা অন্য কোন প্রজাতির বৈশিষ্ট্য খুঁজতে গেলে আমরা ধরে নিতে পারি যে তা স্বার্থপর হবে। যদি আমরা সত্যিই খুঁজে পাই যে অনুমানটা ভুল, যদি সত্যিই মানুষের আচরণ পুরোপুরি উদার, তাহলে আমরা বিভ্রান্তিকর কিছু একটা পাবো, এমন কিছু যার ব্যাখ্যা আমাদের বের করতে হবে।

আরো বিশদে যাওয়ার আগে আমাদের ধারণাগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা দরকার। এমন একটি সত্ত্বা (যেমন বেবুন) যাকে আমরা পরার্থপর ধরতে পারি। এমনভাবে পরার্থপর যে নিজের অস্তিত্বের উপরে হুমকি আসা সত্ত্বেও সে অপর আরেকটি সত্ত্বার উপকার করবে। স্বার্থপর আচরণ এটার ঠিক উল্টা। এখানে ‘উপকার’ বলতে ‘টিকে থাকার সম্ভাবনা’ বুঝাচ্ছে, যদিও জীবন ও মৃত্যুর তুলনায় তা ক্ষুদ্র, অনেকটা উপেক্ষা করার মতোই। ডারউইনীয় তত্ত্বের আধুনিক ধারণার একটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো টিকে থাকার সম্ভাবনায় আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র প্রভাবও বিবর্তনে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। এর কারণ এরকম ছোট কিছুর হাতে হাজার হাজার বছর সময় থাকে নিজের প্রভাব বুঝানোর জন্যে।

এটা বলে রাখা জরুরি যে উপরে দেয়া ‘পরার্থপরতা’ এবং ‘স্বার্থপরতা’র সংজ্ঞা দুইটি আচরণগত সংজ্ঞা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। মোটিভ বা উদ্দেশ্যের মনোবিশ্লেষণ নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমি এটা নিয়ে তর্ক করবো না যে মানুষের ‘উদারতা’র পেছনে কোন গোপন বা অবচেতন স্বার্থের উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে কী না। এটা হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে, এমনকি এটা আমরা কখনই জানতে পারবো না, কিন্তু সেগুলো নিয়ে এই বইটি আলোচনা করবে না। আমার দেয়া সংজ্ঞার ব্যাপ্তি কেবল উদারতা বা স্বার্থপরতা ক্রিয়াটির প্রভাব নিয়ে, উদারতা দেখানো সত্ত্বা এবং যার উপরে উদারতা দেখানো হলো তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা কতোটুকু বাড়লো বা কমলো সেটা নিয়ে।

কোন আচরণের দীর্ঘকালীন প্রভাব ফুটিয়ে তোলা খুব জটিল একটা প্রক্রিয়া। প্রকৃত আচরণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আমাদের অবশ্যই একটা শব্দ ব্যবহার করতে হবে, সেটা হলো ‘আপাতদৃষ্টিতে’। একটা আপাতদৃষ্টিতে উদারতার আচরণ এমন যা দেখে মনে হবে যে এটি উদারতা, যেন আচরণ করা সত্ত্বাটির (খুব ক্ষুদ্র হলে) মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং উদারতাপ্রাপ্ত সত্ত্বাটির বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অনেক সময় খুব গভীরভাবে দেখলে দেখা যায় যে আপাতদৃষ্টিতে উদারতার আচরণটি আসলে ছদ্মবেশী-স্বার্থপরতা। আবারও বলি, আমি এটা বলতে চাই না যে তলে তলে সব আচরণেরই মূল উদ্দেশ্য স্বার্থপরতা, কিন্তু টিকে থাকার উদ্দেশ্যে এই আচরণগুলোর প্রভাব আমরা যেমন ভাবছি তার বিপরীত হয়।

এখানে কিছু আপাত-স্বার্থপর এবং আপাত-পরহিতকর আচরণের উদাহরণ দিবো। যখন আমরা নিজেদের প্রজাতি নিয়ে কাজ করি, তখন ব্যক্তিগত মতামত আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, এজন্যে আমি অন্য প্রজাতি থেকে উদাহরণ নিবো। প্রথমেই একক প্রাণীদের কয়েকটি স্বার্থপর আচরণ।

ব্ল্যাকহেডেড গাল (Chroicocephalus ridibundus) বড় কলোনিতে বাস করে, তাদের বাসাগুলো কয়েক ফুট দূরে দূরে হয়। প্রথমে যখন বাচ্চাগুলো ডিম ফুটে বের হয় তখন সেগুলো ছোট এবং প্রতিরক্ষাহীন হয় আর গিলে ফেলতেও সুবিধা। এটা অন্য গালদের জন্যে বেশ সুবিধাজনক। প্রতিবেশী একটু দূরে গেলে, যেমন মাছ শিকার করতে গেলেই তার বাসায় ঢুকে বাচ্চা খেয়ে ফেলা যায়। এটা খুবই পুষ্টিকর খাবার তাদের জন্যে, বিশেষ করে মাছ ধরতে যাওয়ার কষ্ট করা লাগলো না, এমনকি নিজের ঘর বেশিসময় অরক্ষিত রাখারও দরকার পড়লো না।

এর চেয়েও আলোচিত উদাহরণ উদাহরণ হলো স্ত্রী-ম্যান্টিসের ম্যাকাব্র স্বজাতিভক্ষণ। ম্যান্টিস এক ধরনের বড় আকারের মাংসভূক পতঙ্গ। তারা সাধারণত মাছি বা এই ধরনের ছোট পতঙ্গ খেয়ে থাকে, তবে চলনশীল যে কোন কিছুকেই তারা আক্রমণ করে। সঙ্গমকালে পুরুষ-ম্যান্টিস খুব সতর্কভাবে স্ত্রী-ম্যান্টিসের পেছনে চড়ে বসে, সঙ্গমের যে কোন পর্যায়ে সুযোগ পেলে স্ত্রী-ম্যান্টিস তাকে খেয়ে ফেলে। যখন পুরুষ ম্যান্টিস তার দিকে এগুতে থাকে, বা যে মুহূর্তে তার ওপরে উঠতে চেষ্টা করে তখন, অথবা সঙ্গমশেষে বিচ্ছিন্ন হবার পরপরই প্রথমেই সে পুরুষটির মাথা কামড়ে খেয়ে ফেলে। এটা মনে হতে পারে যে স্ত্রী-ম্যান্টিস খাওয়ার কাজটা সঙ্গমের পরেই করবে। কিন্তু দেখা যায় মাথা খেয়ে ফেললেও পুংদেহটির যৌনকার্যে বাধা পড়ে না, বরঞ্চ, পতঙ্গের মাথায় বেশ কিছু স্নায়ুর কেন্দ্র থাকায়, স্ত্রী-ম্যান্টিস মাথা খেয়ে ফেলায় পুংদেহটির যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং এটা আসলেই একটা অতিরিক্ত লাভ। প্রাথমিক লাভ হলো স্ত্রী-ম্যান্টিস একটা ভালো খাবার পেলো।

‘স্বার্থপর’ শব্দটা সম্ভবত এমন ভয়ানক স্বজাতিভক্ষণের ক্ষেত্রে লঘু হয়ে যায়, যদিও এই উদাহরণ আমাদের সংজ্ঞার সাথে ভালোভাবেই খাপ খায়। মনে হয় এন্টার্কটিকার সম্রাট-পেঙ্গুইনের কাপুরুষোচিত আচরণ আমরা আরো সহজে বুঝতে পারবো। তাদেরকে অনেক সময় দলবেঁধে পানির কিনারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তারা পানিতে ঝাঁপ দিতে দ্বিধায় ভুগতে থাকে কারণ সীল মাছের খাদ্য হওয়ার ভয় আছে। যদি খালি একটা পেঙ্গুইন লাফ দেয়, তাহলেই সীল মাছের উপস্থিতির ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় এবং বাকিরা লাফ দিবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। স্বভাবতই কেউই এখানে গিনিপিগ হতে চায় না বলে অপেক্ষা করতে থাকে, এবং অনেক সময় একে অপরকে ঠেলা দিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে।

সাধারণভাবে বললে, কোন সম্পদ, যেমন খাদ্য, এলাকা বা যৌনসাথী ভাগ করে নিতে অস্বীকৃতিও স্বার্থপর আচরণের কাতারে পড়ে। এখন আসুন কিছু আপাত-উদার আচরণের উদাহরণ দেখি।

কর্মী-মৌমাছির হুল ফোটানোর কাজটি মধুচোরদের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকর প্রতিরক্ষা। কিন্তু যে মৌমাছি এই হুল ফোটায় সে একজন কামিকাজি যোদ্ধা, হুল ফোটানোর সাথে সাথেই তার শরীরের বেশ কিছু জরুরি অঙ্গ শরীর ছিঁড়ে বের হয়ে যায়, একটু পরেই মৌমাছিটি মারা যায়। তার এই আত্মহত্যা-মিশনের কারণে হয়তো কলোনির মহামূল্যবান মজুদ রক্ষা পেলো, কিন্তু তাতে তার কোন উপকার হয় না। সংজ্ঞামতে এটা এক ধরনের পরার্থপরতা- উৎসর্গের আচরণ। মনে রাখবেন আমরা সচেতন উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করছি না। এই উদারতা এবং স্বার্থপরতার উদাহরণগুলোতে হয়তো সেই উদ্দেশ্য আছে বা নেই, তা আমাদের সংজ্ঞার কাছে অপ্রাসঙ্গিক।

একজন বন্ধুর জন্যে কারো নিজের জীবন দিয়ে দেয়া অবশ্যই এক ধরনের উদার-আচরণ, যেমনিভাবে বন্ধুর জন্যে কোন ঝুঁকি নেয়া। ছোট আকারের অনেক পাখির মাঝে দেখা যায় কোন শিকারি পাখি দেখতে পেলে একধরনের বিশেষ ‘সতর্কীডাক’ দেয়, যাতে ঝাঁকের বাকিরা দ্রুত সতর্ক হতে পারে। পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে যে এর ফলে পাখিটা নিজেকে বিরাট বিপদে ফেলে দিলো, কারণ ডাক দেয়ার সাথে সাথে শিকারি পাখির মনোযোগ কেবল তার দিকেই চলে আসতে পারে। এটা হয়তো একটু অতিরিক্ত ঝুঁকি, কিন্তু তারপরেও প্রাথমিক বিচারে এটাকে আমরা উদার-আচরণ হিসেবে গণ্য করতে পারি।

প্রাণিজগতে সবচেয়ে বিচিত্র এবং বহুল প্রচলিত নিঃস্বার্থ-আচরণ দেখা যায় সন্তানের জন্যে অভিভাবক, বিশেষ করে মায়ের মধ্যে। তারা বাচ্চাকে শরীরে বা বাসায় ধারণ করতে পারে, যে কোন মূল্যে তাদেরকে খাদ্য দিবে, এবং শিকারির হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে মহাঝুঁকি নেবে। এখানে খালি একটা উদাহরণই আমি নিবো, মাটিতে বাসা বাঁধা অনেক পাখির ক্ষেত্রে- কোন শিকারি প্রাণী আশেপাশে আসলে, যেমন কোন শিয়াল যদি আশেপাশে দেখা যায়, তখন মা-বাবা পাখিটি এক ধরনের ‘মনোযোগ-বিঘ্নকর-নৃত্য’ করে। অভিভাবক পাখিটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাসা থেকে দূরে চলে যায়, একটা ডানা একটু বাঁকা করে রাখে, যেন মনে হয় সেটা ভেঙে গেছে। শিকারি সহজ শিকার পাওয়া গেছে মনে করে বাসা থেকে সরে অভিভাবক পাখিটার পিছন পিছন চলে যায়। এবং শেষপর্যন্ত বাসা থেকে নিরাপদ দূরত্বে চলে এলে শিকারি ধরে ফেলার আগেই পাখিটা এই ভান ছেড়ে উড়ে চলে যায়। নিজের জীবনের ঊপর ঝুঁকি নিয়ে এই ভানটুকু সম্ভবত তার বাচ্চাদের জীবন বাঁচায়।

আমি গল্পগুলো বলে কোন যুক্তি প্রমাণ করতে চাইছি না। কোন বোধগম্য সরলীকরণে যাওয়ার জন্যে এমন বাছাইকৃত উদাহরণ কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নয়। আমি পরার্থপরতা আর স্বার্থপরতা বলতে কী বুঝাচ্ছি, সেটা ছবির মতো পরিষ্কার করে বুঝানোর জন্যেই এই উদাহরণের গল্পগুলো বলছি। এই বইটি আপনাদেরকে প্রমাণ করে দেখাবে যে কীভাবে ব্যক্তিক পরার্থপরতা বা ব্যক্তিক স্বার্থপরতাকে একটা মৌলিক সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়- যাকে আমি বলি জিনগত স্বার্থপরতা। কিন্তু প্রথমেই আমি একটা সর্বাংশে ভুল উদাহরণকে ব্যাখ্যা করতে চাই, যা পরার্থপরতার উদাহরণ হিসেবে বহুল প্রচলিত, এমনকি অনেক স্কুলেও পাঠ্য।

এই ব্যাখ্যাটি একটি ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে যা আমি এরই মধ্যে উল্লেখ করেছি। ধারণাটি হলো, সব জীবিত প্রাণী মূলত ‘প্রজাতির ভালো’ বা ‘গোষ্ঠির ভালো’র জন্যেই পরার্থপর আচরণ করে। জীববিজ্ঞানে এই ধারণা কীভাবে শুরু হলো সেটাও খুব সহজে আন্দাজ করা যায়। একটি প্রাণীর জীবনের বেশিরভাগ সময় চলে যায় সন্তান বা বংশধর উৎপাদনে, আর প্রকৃতিতে বেশিরভাগ পরার্থপর আচরণের উদাহরণ পাওয়া যায় সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের আচরণে। সভ্যসমাজে বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার একটা ভালো প্রতিশব্দ হলো “প্রজাতি টিকিয়ে রাখা”, আর এটা বংশবৃদ্ধির একটা অনস্বীকার্য ফলাফলও বটে। এখন খালি একটু যুক্তিপন্থার হাতটা লম্বা করলেই দেখবেন, বংশবিদ্যার ‘ফাংশন’ হচ্ছে প্রজাতির অস্তিত্বকে ‘দীর্ঘ করা’। এর থেকে আর কিছু ভুলভাল ছোট পদক্ষেপ নিলেই দেখবেন মনে হবে, প্রাণীরা সাধারণত যেভাবে আচরণ করে তার মূল উদ্দেশ্যই প্রজাতির দীর্ঘায়ন। নিজ প্রজাতির অন্যান্যদের প্রতি উদারতার কারণও ঐ একই।

এই চিন্তার সিঁড়িগুলো অস্পষ্টভাবে ডারউইনীয় টার্মে ফেলা যায়। বিবর্তন কাজ করে প্রাকৃতিক নির্বাচন পদ্ধতিতে, এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন বলতে বুঝায় ‘যোগ্যতমের’ টিকে থাকা। কিন্তু আমরা কি একজন যোগ্যতম ব্যক্তি, একটা যোগ্যতম জাতি, একটা যোগ্যতম প্রজাতি নিয়ে কথা বলছি, নাকি অন্যকিছু? বেশ কিছু ব্যাপারে এটাতে তেমন কিছু এসে যায় না, তবে যখন আমরা পরার্থবাদ নিয়ে কথা বলতে যাবো, তখন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা প্রজাতির অস্তিত্বের ক্ষেত্রে চিন্তা করি, যেটাকে ডারউইন ‘অস্তিত্বের সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন, তাহলে একটি প্রাণী পুরো যুদ্ধে কেবলই একটি ঘুঁটি, যা কিনা প্রয়োজন পড়লে যে কোন সময়েই উৎসর্গ করে দেয়া যায়। যদি আরেকটু সম্মানজনকভাবে বলি, যখন একটা গোষ্ঠি, অর্থাৎ কোন প্রজাতি বা প্রজাতির একটা অংশ যখন নিজেদের জীবন পুরো প্রজাতির রক্ষার্থে উৎসর্গ করে দেয়, তখন তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটা গোষ্ঠি বা প্রজাতি, যার সদস্যরা নিজেদের স্বার্থপরতাকে প্রাধান্য দেয়, তাদের চাইতে প্রথম গোষ্ঠির বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। এভাবে পৃথিবীতে মূলত তেমন গোষ্ঠির প্রাণীরাই টিকে থাকে যেটার সদস্যরা আত্ম-উৎসর্গী। এই তত্ত্বের নাম ‘গ্রুপ নির্বাচন’। বহুদিন পর্যন্ত এই তত্ত্বকে জীববিজ্ঞানীরা সত্য ভেবেছেন, যতোদিন পর্যন্ত বিবর্তন তত্ত্বের খুঁটিনাটি আমাদের অজানা ছিলো। এই তত্ত্বটি প্রকাশিত হয়েছে V.C. Wynne-Edwards এর একটি বইতে, এবং জনপ্রিয়তা পেয়েছে Robert Ardrey এর The Social Contract বইয়ের মাধ্যমে। এর প্রথাগত বিকল্পটিকে ‘ব্যক্তিক নির্বাচন’ বলে, যদিও আমি জিন নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি।

এইমাত্র দেয়া যুক্তিটার বিপক্ষে ‘ব্যক্তিক নির্বাচনবাদী’দের ত্বরিত জবাবটা অনেকটা এরকমঃ একেবারে পুরোপুরি পরার্থপর গ্রুপের মধ্যেও নিশ্চিতভাবেই একটা বিরুদ্ধবাদী সংখ্যালঘু অংশ থাকে যারা কোনরকম স্বার্থত্যাগে অস্বীকৃতি জানায়। যদি একজনও স্বার্থপর বিদ্রোহী থেকে থাকে যে বাকিদের পরার্থতার সুযোগ নিতে পারে, তাহলে সংজ্ঞামতেই বাকিদের চাইতে তার টিকে থাকার এবং সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনা বেশি। এই সন্তানদের প্রত্যেকেই তার এই স্বার্থপরতার বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে। বেশ কয়েক প্রজন্মের প্রাকৃতিক নির্বাচনের পরে, ঐ “আত্ম-উৎসর্গী” গ্রুপটি একক স্বার্থপর মানুষদের ভীড়ে হারিয়ে যাবে, মিলিয়ে যাবে। তাদের আর আলাদা করে চেনা যাবে না। গ্রুপে স্বার্থপর কোন অংশ থাকার সম্ভাবনাকে যদি আমরা জোর করে উড়িয়েও দেই, তার পরেও এটা মেনে নেয়া কঠিন যে আশেপাশের ‘স্বার্থপর’ গ্রুপ থেকে কেউ এসে এই গ্রুপে মিশে যাবে না। এবং আন্তঃবিবাহের মাধ্যমে এই পরার্থপর গোষ্ঠির বিশুদ্ধতা তারা নষ্ট করবে।

একজন ব্যক্তিক-নির্বাচনবাদীও স্বীকার করবেন যে এই রকম গ্রুপগুলো শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায়, এবং একটা গ্রুপ বিলুপ্ত হবে কি হবে না সেটা নির্ভর করে সেই গ্রুপের ব্যক্তিদের আচরণের উপরে। তিনি হয়তো এটাও স্বীকার করবেন যে যদি গ্রুপের একক ব্যক্তিগুলো নিজেদের ভবিষ্যত সম্পর্কে সচেতন থাকে, তাহলে তারা বুঝতে পারে যে নিজেদের লোভ এবং স্বার্থকে বাঁধ দিলেই পুরো গোষ্ঠির ধ্বংস ঠেকানো যাবে। ব্রিটেনের খেটে খাওয়া মানুষদেরকে এই কথাটি কি অনেকভাবেই বলা হয় নি? কিন্তু গোষ্ঠির বিলুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়া আসলে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতার দ্রুততা ও তীব্রতার চেয়ে অনেক ধীর প্রক্রিয়া। এমনকি যখন পুরো গোষ্ঠি ধীরে ধীরে পতন আর বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, তখনও দেখা যায় পরার্থবাদীদের মাড়িয়ে কিছু কিছু স্বার্থপর ব্যক্তি ঠিকই উন্নতি করে যাচ্ছে। ব্রিটেনের নাগরিকেরা হয়তো ভবিষ্যতের ব্যাপারে সচেতন নয়, কিন্তু বিবর্তন ভবিষ্যতের ব্যাপারে অন্ধ।

পেশাদার জীববিজ্ঞানিদের মাঝে যাঁরা বিবর্তন সঠিকভাবে বুঝতে পারেন, তাঁদের কাছে যদিও ‘গ্রুপ নির্বাচন’ এখন তেমন একটা পাত্তা পায় না, তবুও এর বেশ সজ্ঞামূলক আবেদন আছে। স্কুল পাশ করার পরে প্রাণিবিদ্যা পড়তে এসে শিক্ষার্থীদের উপর্যুপরি অনেকগুলো প্রজন্ম যখন দেখে যে এটাই প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নয় তখন তারা বিস্মিত হয়। এর জন্যে অবশ্য তাদেরকে তেমন দায়ী করা যায় না, কারণ Nuffield Biology Teachers’ Guide বইটিতে, যা কিনা ব্রিটেনের উচ্চতর জীববিজ্ঞান শিক্ষকদের জন্যে লিখিত, আমরা দেখতে পাইঃ “উন্নত জীবদের মধ্যে প্রজাতির অস্তিত্বরক্ষার্থে ব্যক্তির আত্মহত্যার আচরণ দেখা যায়” (‘In higher animals, behaviour may take the form of individual suicide to ensure the survival of the species.’)। তিনি যে কতোটা বিতর্কিত একটা কথা বলেছেন সেই ব্যাপারে এই বইয়ের অজ্ঞাতনামা লেখক দারুণভাবে অজ্ঞ। এই ব্যাপারে তিনি প্রায় নোবেল প্রাইজ পাওয়ার দাবিদার। Konrad Lorenz, তার On Aggression বইয়ে আক্রমণাত্মক আচরণের ‘প্রজাতি রক্ষাকারী’ ক্রিয়াসমূহের কথা বলেছেন, যার মাঝে একটি হলো কেবল যোগ্যতম ব্যক্তিই যেন বংশবিস্তারে অংশ নিতে পারে সেই সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করা। এটা একটা চক্রাকার তর্কের সূচনা করবে, যা কখনই শেষ হবে না। কিন্তু আমি যে যুক্তি দিতে চাই তা হলো গ্রুপ নির্বাচন ধারণাটি এতোটাই গভীরে গেঁথে আছে যে Nuffield Guide লেখকের মতো লরেঞ্জও এমন বক্তব্য দেয়ার সময়ে খেয়াল করেননি যে তা ডারউইনীয় তত্ত্বকে পুরোপুরি লঙ্ঘন করছে।

আমি সম্প্রতি একটা বিবিসি অনুষ্ঠানে এরকম বিনোদন-উদ্রেককারী একটা উদাহরণ শুনলাম, অস্ট্রেলিয়ান মাকড়সা সম্পর্কে। অনুষ্ঠানটি আর সব দিকে দিয়ে চমৎকার, কিন্তু তাতে উপস্থিত ‘বিশেষজ্ঞ’ দেখলেন যে অধিকাংশ বাচ্চা মাকড়সাই অন্যান্য প্রজাতির খাদ্যে পরিণত হয়, এবং দেখার পরে বলেনঃ “ হয়তো এই বাচ্চা মাকড়সাদের জন্মানোর এটাই আসল উদ্দেশ্য, যেহেতু অল্প কিছু মাকড়সা হলেই বংশবৃদ্ধি করা যাবে, সেহেতু সকলের বেঁচে থাকার দরকার নেই’!

Robert Audrey তার The Social Contract বইতে সব ধরনের সামাজিক ব্যবস্থার জন্যে এই গ্রুপ-নির্বাচন তত্ত্বকে কারণ হিসেবে চিন্তা করেছেন। তিনি নিশ্চিতভাবেই ধরে নিয়েছেন মানুষ প্রজাতি হিসেবে পশুর আত্মতুষ্টি থেকে দূরে সরে এসেছে। অর্ড্রে তবু নিজে নিজে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেছেন। প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করাটা তার নিজের সচেতন সিদ্ধান্ত ছিলো, এজন্যে তিনি অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার।

মনে হয় এই গ্রুপ-নির্বাচন তত্ত্বের এতো বেশি গ্রহণযোগ্যতার মূল কারণ তা আমাদেরকে শেখানো নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শের সাথে মিলে যায়। দেখা যায় আমরা প্রায়ই এককভাবে অনেক স্বার্থপর আচরণ করি, আবার যখন দেখি কোন বৃহত্তর ব্যাপারে কেউ নিজের স্বার্থের ছেড়ে বাকিদের ভালো চায়, তখন তার আদর্শিক অবস্থানকে আমরা সম্মান করি, পছন্দ করি। আবার, এই ‘বাকিদের’ পরিচয় নিয়েও অনেক বাকবিতণ্ডা হয়ে গেছে। প্রায়ই একটি গোষ্ঠীর ভেতরে পরার্থপর আচরণ অন্যান্য গোষ্ঠীর জন্যে স্বার্থপর আচরণ হয়ে দাঁড়ায়। এটাই ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভিত্তি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের এই পরার্থপর আত্মত্যাগ থেকে রাষ্ট্র বহুলভাবে উপকৃত হয়, যেমন দেশের গৌরবকে সমুন্নত রাখতে মানুষদের বলিদান একটা সাধারণ ব্যাপার। এমনকি তাদেরকে সম্পূর্ণ অপরিচিত আরো অনেক মানুষকে শুধুমাত্র অন্য দেশের মানুষ বলে মেরে ফেলতে উদ্বুদ্ধ করা যায় । (মজার ব্যাপার হলো, শান্তিকালীন নিজেদের সুবিধার জন্যে ছোট একটা আত্মত্যাগ যতো না আকর্ষণীয়, তার চাইতে যুদ্ধকালীন সময়ে অপরকে মেরে ফেলার উদ্দীপনা অনেক বেশি কার্যকর।)

সম্প্রতি বর্ণবাদ এবং দেশপ্রেম নিয়ে বেশ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, অনেকের মাঝে আমাদের ভার্তৃত্ববোধ দিয়ে পুরো মানবজাতিকে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখছি। আমাদের পরার্থপরতার এমন মানবতাবাদী সম্প্রসারণের দরুণ একটা দারুণ ফলাফল হয়েছে, যা কিনা আবার বিবর্তনের ‘প্রজাতির জন্যে শুভকর’ ধারণাটিকে আরো মজবুত করছে। যারা রাজনৈতিকভাবে উদার মূলত তারাই প্রজাতি-নৈতিকতার ধ্বজাধারী। দেখা যায় যারা অন্যান্য প্রজাতিগুলোকে পরার্থপর আচরণের উদ্দেশ্য বলে চিন্তা করতে চান, তাদের ব্যাপারে প্রায়ই এরা আবার খুবই বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেন। আমি যদি বলি লোকজনের বাসস্থানের উন্নয়নের চাইতে আমি তিমি মাছ হত্যার প্রতিবাদ করতে চাই, তাহলে আমার বেশিরভাগ বন্ধুই স্তম্ভিত হয়ে যাবে।

অন্য প্রজাতির সদস্যদের চাইতে নিজের প্রজাতির সদস্যরা যে বিশেষ খাতির পায় এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনেক প্রাচীন আর গভীর। যুদ্ধবিগ্রহ বাদে মানুষ খুন করলে তা সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধগুলোর কাতারে পড়বে। মানুষের সংস্কারের মধ্যে এর চাইতে বড়ো অপরাধ হতে পারে নিজের প্রজাতি ভক্ষণ (সেই মানুষটি মৃত হলেও)। যদিও আমরা অন্য প্রজাতির প্রাণী নিয়মিত মজা করেই খাচ্ছি। নিকৃষ্টতম অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্যও অনেকেই সহ্য করতে পারেন না, অথচ বিনাবিচারে কীটপতঙ্গ মারতে তারা পিছ পা হবেন না। আমরা তো নিজেদের বিনোদনের জন্যে একেবারে নিরীহ প্রজাতির পশু-পাখিও শিকার করি। সাদা চোখে দেখলে একটা মানবভ্রূণের মধ্যে একটা অ্যামিবার চাইতে বেশি অনুভূতি নেই, অথচ একটা পূর্ণবয়স্ক শিম্পাঞ্জির চাইতেও ভ্রূণটা অনেক বেশি গুরুত্ব এবং আইনগত সুরক্ষা পায়। যেখানে একটা শিম্পাঞ্জির অনুভূতি আছে, সে চিন্তা করতে পারে, কিছুদিন আগে আবিষ্কৃত হয়েছে যে সে মানুষের ভাষাও একটা পর্যায় পর্যন্ত শিখতে পারে। ভ্রূণটি আমাদের প্রজাতিতে পড়ে, আর কেবল এই কারণেই তা বিশেষ পক্ষপাত আর অধিকার পায়। Richard Ryder -এর তৈরি শব্দটা ব্যবহার করে যদি বলি, ‘স্পেশিসিজম’-এর মাঝে যৌক্তিকতার জোর আদৌ ‘বর্ণবাদে’র চাইতে বেশি কি না, তা আমি জানি না। আমি যা জানি তা হলো বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে এর মৌলিক ভিত্তি নেই।

মানুষের নৈতিকতার শিক্ষায় পরার্থপরতা কোন গণ্ডি পর্যন্ত কাম্যঃ- পরিবার, নাকি জাতি, নাকি বর্ণ, নাকি প্রজাতি, অথবা সকল জীবিত প্রাণ – এই বিভ্রান্তিকর তর্ক যেমন চলছে, পাশাপাশি জীববিজ্ঞানে আরেকটি তর্কও গড়ে উঠেছে, সেটা হলো বিবর্তন তত্ত্ব মোতাবেক প্রজাতিগুলোর মধ্যে এই পরার্থবাদের গণ্ডি আদতে কোন পর্যায় পর্যন্ত আমরা আশা করতে পারি। গ্রুপ নির্বাচনবাদীদের অনেকেই হয়তো অন্য গ্রুপের সদস্যদের একে অপরের প্রতি হিংস্র আচরণ দেখে অবাকও হবেন নাঃ যেমন করে ট্রেড ইউনিয়নের লোকেরা বা সৈন্যরা যুদ্ধের সময় সীমিত সম্পদ নিয়ে নিজের নিজের গ্রুপে পক্ষপাতিত্ব দেখায়। কিন্তু তখন আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি গ্রুপ নির্বাচনবাদীরা এই নির্বাচনের পর্যায়গুলো কীভাবে নির্ধারণ করেন? যদি একটি প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে অথবা প্রজাতিগুলোর মাঝে এই নির্বাচন ক্রিয়াশীল থাকে, তাহলে কেন সেই প্রক্রিয়া তারও বাইরে কাজ করে না? প্রজাতিসমূহ মিলে জেনেরা গঠন করে, জেনেরাগুলো মিলে অর্ডার, অর্ডারগুলো মিলে শ্রেণী। সিংহ এবং অ্যান্টিলোপ উভয়েই মানুষের মতো স্তন্যপায়ী শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তাহলে কি আমরা ভাবতে পারি না যে ‘স্তন্যপায়ী শ্রেণীর স্বার্থে” সিংহ আর কোন অ্যান্টিলোপ শিকার করবে না? স্তন্যপায়ীর বিলুপ্তি ঠেকাতে নিশ্চয়ই তারা পাখি বা সরীসৃপ শিকার করবে। আবার তখন পুরো মেরুদণ্ডী পর্বকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা কি সবাই ভুলে যাবে?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29176004 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29176004 2010-06-13 13:40:28
##সে##লা##ই## (অসময়ের তিন ফোঁড়)

ফোঁড়ঃ ৩

বিকেলের আলোমাখা টেবিলে আমরা দুজনে বসে
তোমার খয়েরি চোখের গাঢ় কাজল দেখলাম
চোখের পাঁপড়িগুলো নেই
(কেউ এসে তুলে নিয়ে গেছে)
ডান চোখের কিনার থেকে লাল ঠোঁটের প্রান্ত অবধি ছুরি দিয়ে চিরে দিয়েছে কেউ
ঠোঁট থেকে হাসির কিছু টুকরো কণা চোখের দিকে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যাচ্ছে

তোমার কষ্ট লাগছে। তোমার ব্যথা লাগছে। তুমি হাসছো না। তুমি কাঁদছো না।

আসো আমরা এদিক-ওদিক তাকাই। দু’জনের মাঝে কিছু লতাগুল্ম আদরে বেড়ে উঠেছে। তোমার আঙুলে আশ্রয় নিয়েছে তারা। টেবিলের পেট ফুঁড়ে নদী জেগে উঠছে। নদীতে আমি ডুব দিলাম, সাঁতরে ভুস করে ভেসে উঠলাম। তোমার স্ফীত উদরের কাছাকাছি। এই তীরে প্রবল জলের ক্রন্দন।

মৃত-আলোয় নদী থেকে বিন্দু বিন্দু পানি উঠে আসছে তোমার কোলে, আমি সেখানে মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম, মাটির ভেতরে শামুক, শামুকের খোলে সে, তার হাতখানা ছোট, হাতের মুঠিতে তোমার চোখের পাপড়িগুলো ঝুরঝুর করে ঝরে পড়লো সেই নদীতে
***
-১২.৪.১০
***

ফোঁড়ঃ ২

ফোরসেপ হাতে তুমি আমাকে কাটছিলে চারবার এদিক ওদিক কৌণিক পোচে ভূখণ্ড কেটে ফেলে জোড়াতালি কাঁটাতার মেখে সেখানে চড়ুইয়ের ঘর বসানো বাড়ি থেকে সূর্যরশ্মি তীর্যক উড়ে এসেছিল। তোমার নখের ভেতর চুলের ভেতর মরাত্বকের ভেতর জন্মজ ডাক ছেড়ে কাঁদা ত্রিরাত্রবয়সী বালিকা আমার কানে চিৎকার পৌঁছে দিল বলে ধাতব টিনের বিছানায় উপুড়মুখী শুয়ে থাকা তোমাকে দেখে আমিও পাশে নগ্ন-উন্মুল ঊর্ধ্বাকাশ মাপি আর ফাটল ফাটল বেছে ফেলি উকুন বাছার মতোন। অ্যামোনিয়াগন্ধ সে'সময়ে আমাদের মাঝে অভিলম্ব ধরে ঝুলে থাকা শিরদাঁড়ায় জমে যাচ্ছিল।


***
-২৬.১১.৮
***

ফোঁড়ঃ ১

এখন চোখের ওপরে খড় দিয়ে তৈরি সুতো আর শাবল দিয়ে তৈরি সুঁই দিয়ে কেউ একজন আমার চোখ সেলাই করে দিচ্ছে। চোখের দুই পাতা চিরে গিয়েছিলো জন্ম-মুহূর্তে। তারপরে চেরাফুটোয় গলগলিয়ে রঙ ঢুকেছে; আলো, বাতাস, পিতা, মাতা, সহোদরা ঢুকে গেছে এবং মেডুলায় তাদের কাদালেপা ঠাণ্ডাঘর বানিয়েছে। সেই চোখচেরা গুহামুখে প্রবল প্রতাপী তরুণীর শাদা শাদা ফুল আর অগ্নি ঢুকে গেছে (সাথে নিয়েছে কুষ্ঠভিখারিনীর গলিত হাত ও জটামাখা চুল।
সেই চোখ আজ শাবলসুঁইয়ে কেউ কড়কড় করে সেলাই করে দিচ্ছে, এক কোণে এক টুকরো ফাঁকা ছিলো তখনও! সেই উপবৃত্তাকার ফাঁক দিয়ে সূর্যগ্রহণের আলো প্রবেশ করেঃ শেষ আলো। তারপরে শেষ একপোচে সাঁ করে আলো বন্ধের কান্নার তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে আসে। আমি থরথরানো দু'হাত তুলে সেলাইকর্তার লোমশ ধাতব হাত চেপে ধরিঃ ওরে মাগো! এবারে ক্ষান্ত দে! আমার দু'চোখ বুজে গেছে চিরতরে! আমি আর কোন রঙ-রূপ-রস-গন্ধ-শোভা দেখবো না!


***
-২৬.১১.৮



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29175132 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29175132 2010-06-12 01:48:20
ফুটবল লিজেন্ডঃ দ্যা ডিভাইন পনিটেইল

...dedicated to him that, despite the enemies and the bad luck, was, is and will be always the talent person that the italian football has ever expressed.
-Antonio Cavallaro

ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডিনায় রোজ বো’ওল স্টেডিয়ামের কথা। সময়টা চুরানব্বুইয়ের সতেরই জুলাই, দুপুর গড়িয়ে বিকেলের রোদ তেরছা হয়ে পড়ছে মাঠের ভেতর। সাড়ে বারোটায় খেলা শুরু হয়েছে, নব্বুই মিনিটের পরে অতিরিক্ত তিরিশ মিনিটের খেলাও শেষ। বন্ধ্যা ম্যাচ, এখনতক কোন গোলের দেখা নেই, পুরো টুর্নামেন্টেই অবশ্য গোলখরা। ফাইনাল ম্যাচ হচ্ছে বিশ্বকাপের, এতোক্ষণ ধরে এই গোলহীন লড়াইয়ের শেষে দুইদলের সব খেলোয়াড়ই ক্লান্ত, বিমর্ষ কোচদের দু’জনের চেহারায় ফুটে উঠছে অনিশ্চয়তার রেখা। টাইব্রেকারের জন্যে অপেক্ষা করছে ৯৪ হাজার দর্শক, তাদের সামনে দিয়ে একে একে দুই দলের চারজন করে খেলোয়াড় প্যানাল্টি কিক করলো। স্কোর ৩-২। পাঁচ নম্বরে পিছিয়ে থাকা দলের যিনি কিক নিতে গেলেন, তার জন্যে হিসাব ছিলো গোল না করতে পারলে হার, আর গোল দিতে পারলেও অপর দল মিস না করলে বিশ্বকাপের আশা শেষ। দর্শকদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখা মুহূর্ত পেরিয়ে গেলো, দেখা গেলো সেই পঞ্চম খেলোয়াড়ের সাবলীল মাপা দৌড়, কিক নেয়ার সাথে সাথে বলটা উড়ে গেলো গোলবারের ওপর দিয়ে গ্যালারির দিকে। বিপক্ষদলের সমর্থকদের উল্লাসে রোজ বো’ওল স্টেডিয়াম ফেটে পড়লো। আর সেই আকাশ ফাটা চিৎকারের নিচে দেখা গেলো নির্বাক হয়ে উড়ে যাওয়া বলটার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি- রবার্তো ব্যাজ্জিও।

আদর করে তাকে ডাকা হতো Il divin codino (দ্যা ডিভাইন পনিটেইল)। কোঁকড়ানো ছোট ছোট চুলের পেছনে একটা ঝলমলে পনিটেইল। বাইশ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রায় বেশিরভাগ সময়েই এটা ছিলো তার আইকন।

প্যানাল্টি কিকের সাথে এ’রকম অম্ল-মধুর স্মৃতি ব্যাজ্জিওর পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারে অনেকগুলো। যেমন ফাইনালের ঘটনার চার বছর আগে, ফ্লোরেন্সের মাঠে টাইব্রেকারের সময় জুভেন্টাসের জার্সি পরা ব্যাজ্জিও কিক নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। বিপক্ষ দলটা ছিলো ফিওরেন্তিনা, যে দলের হয়ে ’৮৫ থেকে ’৯০ পর্যন্ত খেলেছেন। মাত্রই সেই মৌসুমের শুরুতে রেকর্ড পরিমাণ ট্রান্সফার ফি দিয়ে জুভেন্টাস তাকে কিনে নিয়েছে, কিন্তু এখনও তিনি ফিওরেন্তিনাকে ভুলতে পারেন না। এই ক্লাবই তাকে এতোটা পরিচিতি দিয়েছে, এতোদিনের সেই সম্পর্ক ভুলে তিনি প্যানাল্টি কিক নিতে যান নি। বরং সাইড লাইনের পাশে পড়ে থাকা ফিওরেন্তিনার একটা বেগুনি স্কার্ফ তুলে নিয়ে চুমু খেলেন। পরে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “Deep in my heart I am always purple.” ফ্লোরেন্সের রঙ বেগুনি।

সারাজীবন ক্লাব থেকে ক্লাবে ব্যাজ্জিওকে খেলতে হয়েছে। ভিঞ্চেঞ্জা (’৮২ – ’৮৫), ফিওরেন্তিনা (’৮৫ – ’৯০), জুভেন্টাস (’৯০ –’৯৫), মিলান (’৯৫ – ’৯৭), বোলোনা (’৯৭ – ’৯৮), ইন্টার (’৯৮ – ’০০), ব্রেসিয়া (’০০ – ’০৪)। প্রায় বাইশ বছরে এতোগুলো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন, মাঝে দুইবার তার দলবদলের ট্রান্সফার ফি সেই সময়ের সর্বোচ্চ ছিলো। এগুলো হঠাৎ শুনলেই মনে হবে হয়তো তিনি খুবই হিসেবি আর পেশাদার খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু আসলে ভেতরে ভেতরে ব্যাজ্জিও বরাবরই আবেগি, বলা চলে emotional fool। এজন্যেই হয়তো আটানব্বুইয়ের বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন সেই বিখ্যাত পনি টেইল ছাড়া।

ছোট ছোট চুল, পুরো ম্যাচেও কোচ তাকে খেলাতেন না, দেল পিয়েরোর বদলি হিসেবে নামেন শেষ দিকে। ‘বুড়ো’ হয়ে আসছেন ভেবে সবাই হয়তো একটু করুণা কি সহানুভূতি দেখায়- এমন অবস্থা। চিলির সাথে ম্যাচে যখন ইটালি ১-২ গোলে পিছিয়ে তখন বদলি হিসেবে নামলেন। আক্রমণে উঠে ডি-বক্সের কাছাকাছি জায়গায় বল কাটাতে গিয়ে তা চিলির ডিফেন্ডারের হাতে লেগে গেলো। প্যানাল্টি! আবার! চুরানব্বুইয়ের পরে এই প্রথম ব্যাজ্জিও’র সামনে আরেকটা প্যানাল্টি কিক নেয়ার সুযোগ। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে ঠিক সেই মুহূর্তে কী ভেবেছিলেন তিনি! টিভিতে দেখালোঃ হ্যান্ডবল হওয়ামাত্রই রেফারির বাঁশি শুনে একটু ঝুঁকে গেলেন ব্যাজ্জিও। নিজেকে আড়াল করলেন সবার থেকে, তার স্মৃতিতে চার বছর আগের কথাই ভেসে আসছিলো নিশ্চয়ই। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে প্যানাল্টি কিক নিতে এগিয়ে গেলেন। এবারে ভুল হলো না, তার গোলেই তখন চিলির সাথে ম্যাচে সমতা পেলো ইটালি।

ফুটবলের মাঠে হাজার হাজার সমর্থকদের চিৎকার, কোচের কথা, সতীর্থদের কথা, গেম প্ল্যান, স্ট্র্যাটেজি এই সবকিছু ছাপিয়ে আমার কাছে ব্যাজ্জিওর এই মানবিক রূপটা অদ্ভুত ভালো লাগে। মনে হয় এই লোকটা ফুটবলার হয়ে বিপদে পড়ে গেছেন নিজের বেহিসেবী আবেগ নিয়ে।

এমন না যে ব্যাজ্জিওর ক্যারিয়ারে খালি হা-হুতাশ। পাশাপাশি রাখলে এক বিশ্বকাপ ছাড়া তার পুরো ক্যারিয়ারে তেমন একটা হার নেই। নব্বুইয়ের দশকে জুভেন্টাসের স্কুদেতো জয়ের পেছনে তিনিই ছিলেন মূল শক্তি। লীগের অনেকগুলো ট্রফি জিতেছিলো সেই সময়ে জুভেন্টাস। পঁচানব্বুইয়ে ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন তিনি, একইসাথে ইউরোপিয়ান বর্ষসেরাও! বিশ্বকাপে ব্যাজ্জিও ইটালির একমাত্র খেলোয়াড় যিনি পরপর তিনটা বিশ্বকাপেই গোল করেছেন। আর চুরানব্বুইয়ের বিশ্বকাপের পুরোটাই তার অনবদ্য খেলার দৃষ্টান্ত।

অনবদ্য এই অর্থে যে তেমন একটা স্কিল দেখিয়ে খেলতেন না। এমনকি পুরো মাঠ দাপিয়েও বেড়াতেন না। যেটা করতেন সেটা হলো সুযোগের সদ্ব্যবহার। তক্কে তক্কে থাকতেন, আর যাকে বলে, ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকতেন, দুর্দান্ত ফিনিশিং ছিলো। খুব বেশি যে কৌশলটা খাটাতেন তা হলো ডজিং। এমন অনেকগুলো গোল দেখেছি, যা কেবল গোলকিপারকে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ করেই দিয়েছেন।

পরিসংখ্যান যদিও তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না, ওটা দিয়ে তেমন কিছু বুঝাও যায় না, তবু একটা মজার ফ্যাক্ট পেলাম। যে তিনটা বিশ্বকাপে ব্যাজ্জিও ইটালির হয়ে ১৬ টা ম্যাচ খেলেছেন (’৯০, ’৯৪, ’৯৮), তার প্রতিটাতেই ইটালির বিদায় হয়েছে টাইব্রেকারে। ’৯০-এ আর্জেন্টিনা, ’৯৪-এ ব্রাজিল আর ’৯৮-এ ফ্রান্স। তার মানে কোনবারেই ইটালি সরাসরি কোন ম্যাচ হেরে বাদ পড়ে নি {গ্রুপ ম্যাচগুলোর মাঝে কেবল একটা ম্যাচেই তারা হেরেছিলো (’৯৪) আয়ারল্যান্ডের সাথে}।

আসলেই ফুটবল একটা নিষ্ঠুর খেলা!



***
- ৯.৬.১০


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29174342 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29174342 2010-06-10 19:07:03
নিরর্থকাব্য
এ'সময়ে এই ঘরে এক দামাল হাওয়া কিশোরের শরীরে সশব্দে ঢুকে পড়ে, দরোজার মুখ খুলে যায়। দরোজার বাইরে যে, দরোজার ভেতরেও সে, সেখানে সকল সম্ভাবনা। অচেতন-চেতন ঘুমে আমার শরীরকে তুলে ধরে, টেনে ধরে কিশোর দুটো হাত, "ওঠো!" "ওঠো তো!" তার হাতের 'পরে আমি মহাকর্ষে আটকে থাকা পৃথিবী ছেড়ে দেই। কিশোর দামাল হাওয়া সাঁ করে পৃথিবীটাকে ছুঁড়ে দিলো গোবেচারা নীল গ্রহটা পাঁই পাঁই করে ঘুরতেই থাকলো খ্যাক খ্যাক করতে থাকা সূর্যের চারপাশে। আমি আরেকটু দূর থেকে ঘুম-অঘুমের মাঝে সূর্যের খ্যাক খ্যাক শুনি।


এই যে দেখছি একটা সাইকেল চলে গেলো
অনুষঙ্গে কিছু নেই, আরোহী নেই, নেই রোদ
চাকার ভেতরে সেলুলয়েড এবং এক বিভ্রান্তি
বিড়ালটি কেবল ঐ কাঁটার সাথেই যুদ্ধ করে
তার কৃষ্ণতর চোখে স্বৈরাচারী ট্রাক ও রাজা
আমাদের দর্শকমনের ভিতরে অনাদায়ী ঘুম!


চোখের পাতায় মাঝে মাঝে সকল ক্লান্তি এসে জড়ো হয়, আমি তখন মনে মনে চোখ বুঁজে দেখতে পাই অনেককিছু। দেখতে চাইলে তুমিও পারবে, চেষ্টা করেই দেখো না! দেখবে অমল ধবল পৃথিবী নীল নীল চেহারা নিয়ে নির্বিকার ঘুরছে, বন বন করে। তার চারপাশে কালো কালো অন্ধকার আর নৈঃশব্দ্য অথচ সে নিজের শরীরে গেঁথে রেখেছে কিছু দামাল বাতাস আর সশব্দ জল- সশব্দ পাহাড়- সশব্দ গিরিখাত- সশব্দ সবুজ- সশব্দ মানুষ! শব্দের যে কোন অর্থ নেই সেটা সবাই জানে, শুধু নিরর্থক মানুষ জানে না।

দামাল হাওয়া অনেকক্ষণ আমার চোখের ঘুম-অঘুম কাটানোর চেষ্টা করে হতাশ হয়ে নীল পর্দার পেছনে সবুজ পাতাগুলোর সাথে ফ্লার্ট করতে উঠে গেলো!


****
- অনীক আন্দালিব
১৭.৩.১০


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29118728 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29118728 2010-03-18 10:45:57
বাইনারি আবেগ আর ঝিঁঝিঁপোকারা ২

"you know,
if you stay up late,
you're just going to make it
harder for yourself"


"maybe,
but i like it this way,
i like the numbness that comes with being
exhausted, the oblivion, and the quiet chaos
that exists only in my own head
everybody elses problems are suddenly
the furthest from my own, because i have things
to deal with too
if i'm tired, i have a qualified excuse
to keep to myself at home, to evade
the constant problems that don't concern me anyway
sometimes i don't even need to try
to block things out,
the exhaustion does it for me;

and i like that"


...মাঝে মাঝে ভাবি এই অন্তর্জালে কত কথায় নিজের ছায়া দেখি, কতো ছায়ায় নিজের কথা দেখি!...


স্মৃতিচারণমূলক সুতো


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29118288 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29118288 2010-03-17 16:35:06
আগোরা - আলেকজান্দ্রিয়া - হাইপেশিয়াঃ ধর্মের বলি, বলির ধর্ম! বনানী মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আমার একটা পছন্দের ডিভিডি'র দোকান আছে। মাসে, দু'মাসে আমি সেখানে ঢুঁ দেই, নতুন মুভি কিনতে। দোকানটির বৈশিষ্ট্য এই যে ডিভিডি'র মান, ছবির প্রিন্ট ও সাউন্ড খুব ভালো থাকে। মাঝে মাঝে বিদেশি, একটু কম আলোচিত ছবিও ওখানে পাই। গতমাসের মাঝামাঝি সময়ে একদিন আবার গেলাম। বেশ কয়েকটা নতুন মুভি আনলাম যাদের মাঝে একটাকে নিয়ে আজকে না লিখে পারলাম না!

ছবিটার নাম আগোরা



আমাদের দেশে আগোরা বললেই একটা সুপার মার্কেটের কথা মনে পড়ে যেখানে টুথপিক থেকে শুরু করে খেলনা সাইকেল পর্যন্ত সবই পাওয়া যায়। ডিভিডি দেখে ভাবলাম, হয়তো সেই সুপার মার্কেট নিয়েই বিতং ছবি বানিয়েছেন আলেহান্দ্রো আমেনাবার। এই পরিচালকের বানানো মাত্র সাতটি ছবির মাঝে তিনটি ছবি দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। চিলি'র সৌভাগ্য, এমন একজন পরিচালক তাদের আছে যিনি প্রথাগত সিনেমার মধ্যেও সুররিয়্যাল ছবির মেজাজ নিয়ে আসতে পারেন। তাঁর প্রথম যে ছবিটা দেখেছিলাম, সেটি "আব্রে লোস ওহোস" (ওপেন ইয়োর আইজ)। (এই ছবিটির একটা হলিউডি-ভার্সন আছে, ক্যামেরন ক্রোয়ের বানানো, নাম- ভ্যানিলা স্কাই)। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে আলেহান্দ্রো এই ছবিটি বানিয়েছিলেন, যেটা ছবি দেখার সময়ে একবারও মনে হয়নি। ছবির এডিটিং, দৃশ্যবিন্যাস, পরপর বাস্তব-পরাবাস্তবের মধ্যে সংলাপগুলো, চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব এতোটাই জটিল-সরল রূপ নিয়েছে যে মন্ত্রমুগ্ধ হতেই হয়। যে বছর "আব্রে লোস ওহোসে"র রিমেক "ভ্যানিলা স্কাই" মুক্তি পেলো, সেই বছরেই আলেহান্দ্রো আরেকটি ছবি বানালেন, এবারে ভৌতিক গল্প নিয়ে। এটার নাম "দ্য আদার্স"। এখানেও প্রথাগত হরর ছবির হাস্যকর রক্তারক্তি নেই, খুব চিৎকার চ্যাঁচামেচি নেই, কিন্তু অজান্তব একটা শিরশিরে ভয় দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর ছবির শেষে একটা মারাত্মক মোচড় আমাকে এতোটাই ঘাবড়ে দিয়েছিলো যে ক্রেডিট শেষ হয়ে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরেও চুপচাপ বসেছিলাম!

"আগোরা" কেনার সময়ে তাই আলেহান্দ্রোর নাম দেখে বেশ উৎসাহিত হয়েই কিনলাম।
ছবির পটভূমি ৩৯১ খ্রিস্টাব্দের আলেকজান্দ্রিয়া নগরী। গ্রিক সভ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল নারী, একাধারে দার্শনিক, গণিতবিদ এবং শিক্ষানুরাগী হাইপেশিয়াকে নিয়ে ছবিটা তৈরি। যদিও বিভিন্ন প্রচারণাতে তাঁর চাইতে বেশি বলা হয়েছে ক্রিশ্চিয়ানিটির অনুসারী এক যুবক এই ছবির মূল উপজীব্য (যে কিনা হাইপেশিয়ার দাস ছিলেন), ছবি দেখার সময়ে আমার সেটা মনে হয়নি। মূলত হাইপেশিয়ার নাম দেখে আমি তুমুল আগ্রহী হয়ে উঠি ছবিটা দেখার জন্যে। গ্রিক সভ্যতার যে জ্ঞানার্জন, তার শেষ প্রদীপ ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই আলেকজান্দ্রিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা অন্ধকারে পতিত হয়। খ্রিস্টান ধর্মের প্রবল ধর্মগুরুদের প্রতাপে রোমান প্রিফেক্টরা দলে দলে প্যাগান থেকে খ্রিস্টান হয়ে ওঠেন। ধর্মাচরণ, ধর্মপালন ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং এক দীর্ঘ কুৎসিত অন্ধকার যুগের বন্ধ্যা সময়ের শুরু হয়।



এতোক্ষণ মুভিটির সামনে ও পিছনে থাকা দুজন সবচেয়ে জরুরি মানুষ নিয়ে কথা বললাম। আলেহান্দ্রো আর হাইপেশিয়াকে ছাড়া মুভির বাকি অংশগুলো বুঝে উঠতে দ্বিতীয়বার দেখলাম ছবিটা।

"আগোরা" মানে বাজার। গ্রীক-রোমান সভ্যতায় কোন কমনপ্লেসকে ঘিরে যে বাজার গড়ে ওঠে সেটাকে আগোরা বলে। রোমের কলিসিয়ামের ধার ঘেঁষে যেমন আগোরা ছিলো, তেমনি আলেকজান্দ্রিয়ার প্যাগান ভাস্কর্যের (অর্থাৎ দেবদেবীদের মূর্তি যেখানে স্থাপিত ছিলো) চারিদিকেও একই ধরনের আগোরা গড়ে উঠেছিলো। খ্রিস্টধর্মের বয়স যখন প্রায় চারশ বছর, তখন আলেকজান্দ্রিয়া একটি কসমোপলিটান নগরী হয়ে উঠছিলো। একই সাথে সেখানে গ্রীক সভ্যতা, রোমান সভ্যতার মিশেল আর ইহুদী, প্যাগান এবং নব্যআহূত খ্রিস্টান নাগরিকের একটা মিলনমেলা হয়ে উঠলো নগরটি। শাসন করতো রোমান প্রিফেক্ট, ধর্মানুসারে যারা প্যাগান ছিলেন। কিন্তু সিনেটের একটা বড়ো অংশ তখন ইহুদী এবং খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। যীশুর মৃত্যুর প্রায় চারশ বছর পরেও সামাজিক সৌহার্দ্যের মুখোশ খুলে তাদের মাঝে বিরোধ মাঝে মাঝেই দেখা দিচ্ছে। আবার নিরাকার ঈশ্বর বনাম মূর্তিমান দেবতার যে সংঘাত, সেখানে একদিকে ইহুদী-খ্রিস্টানদের অবস্থান, বিপরীতে প্যাগান শাসক।

আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত বাতিঘর আর পাঠাগার তখন সভ্যবিশ্বের প্রতীক, পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি ছিলো এই বাতিঘর! পাঠাগার যেমন ছিলো গ্রিক-রোমান সভ্যতার সকল জ্ঞানের সংগ্রহশালা, তেমনি প্যাগানদের উপাসনালয়ের স্থান। পাঠাগারের বইগুলো ছিলো হাতে লিখিত। মূল লেখকের লেখা একটি কপি থেকে পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা আরো অনেকগুলো কপি করতেন। এভাবে বইগুলো সংরক্ষিত হতো। শিক্ষকদের বেশিরভাগই ছিলেন প্যাগান, পাঠাগারের ঠিক মাঝখানে প্যাগান দেবতা সেরাপিস, হোরাস, আনুবিস আর আইসিসের মূর্তি রাখা ছিলো। সারা শহর জুড়েই অসংখ্য স্থাপত্য নিদর্শন ছিলো যেগুলো এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই!

হাইপেশিয়ার গবেষণার মূল প্রেরণা ছিলো জ্যোতির্বিদ্যা আর গণিত। পৃথিবীকে তখনও মনে করা হতো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র। তার চারপাশে সূর্য, মঙ্গল, শনি, বুধ এবং শুক্র হলো "পরিব্রাজক"(ওয়ান্ডারার)। টলেমির দেয়া মডেল অনুযায়ী, সকল ঘূর্ণনপথকে বৃত্তাকার কল্পনা করা হতো। সেক্ষেত্রে যেটা মূল সমস্যা ছিলো, তা হলো সূর্য এবং অন্যান্য পরিব্রাজকের আকারের ছোটবড় হওয়া। বৃত্তাকার পথে ঘুরলে সেটা হওয়ার কথা নয়। টলেমি এই সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন এই বলে যে, সবগুলো পরিব্রাজক পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার সাথে সাথে নিজেদের একটা ছোট বৃত্তাকার পথেও ঘুরছে। এই কারণেই তার আকারের পার্থক্য আমাদের চোখে ধরা পড়ে। মনে রাখতে হবে, সেই সময়ে বৃত্ত ছিলো বিশুদ্ধতম জ্যামিতিক ক্ষেত্র। উপবৃত্ত, পরাবৃত্তকে মনে করা হতো অবিশুদ্ধ বা পার্থিব, বৃত্তাকার ছিলো স্বর্গীয়। এখনকার যুগে জ্যামিতিক ক্ষেত্রকে পবিত্র মনে করার ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হলেও সে সময়ে এগুলো নিয়ে প্রশ্ন করা, বিরোধিতা করার জন্যে কাউকে মুক্তমনা হওয়া ছিলো খুবই জরুরি। বিজ্ঞানের প্রসারের প্রথম পদক্ষেপটাই ছিলো প্রতিষ্ঠিত সত্যের ব্যাখ্যায় প্রচলিত পদ্ধতিকে প্রশ্ন করা। জ্যামিতিক ক্ষেত্রের এই স্বর্গীয়/পার্থিব ভেদাভেদ করে অনেকদিন পর্যন্ত ভ্রান্তপথে চালিত হয়েছে গবেষণা। এখনও আমরা অনেকেই পড়াশোনা করার পরেও যেমন জ্যোতিষবিদ্যায় বিশ্বাস করি, পানিপড়া, তুকতাক, ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাসীও খুঁজলে পাওয়া যাবে! একমাত্র মানুষের পক্ষেই সকল যুক্তি ও বোধ বিসর্জন দিয়ে এমন অবিশ্বাস্য "শক্তি"র ওপর বিনাশর্তে বিশ্বাস করা সম্ভব।

ছবিটির প্রথমাংশের একটি দৃশ্যে হাইপেশিয়ার ক্লাসরুম দেখানো হলো। এখনকার মতো নয়, আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লাসরুম অনেক বেশি 'ক্যাজুয়াল' ছিলো। সেখানে পাশাপাশি প্যাগান-ইহুদি-খ্রিস্টান সকলেই তাঁর কাছে পড়তো। তিনি পৃথিবী ও সৌরজগতের এই জটিল ঘূর্ণন ব্যাখ্যা করছিলেন। ওরেস্টিস (পরবর্তীতে রোমান প্রিফেক্ট হন তিনি, ধর্মে প্যাগান) নামের একজন বলে উঠলো, "এমন ঘূর্ণনের নিয়ম বানানোর আগে দেবতাদের উচিত ছিলো আমার সাথে পরামর্শ করে নেয়া"। সকলে হেসে উঠলো, ওরেস্টিস একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো, "কারণ এতো জটিল করে বানানোর কী দরকার ছিলো? সবগুলো পরিব্রাজক কি একটা সরল বৃত্তপথেই ভ্রমণ করতে পারতো না? তাহলে তো অনেক সহজ হতো সবকিছু"। তার প্রশ্ন নিয়ে হাইপেশিয়া তখনও ভাবছেন, পাশ থেকে সাইনেসিস (পরবর্তীতে খ্রিস্টান বিশপ হন তিনি) আপত্তি করে উঠলেন, "ওরেস্টিস, তোমার কোন অধিকার নেই ঈশ্বরের সৃষ্টি নিয়ে এরকম হাসিতামাশা করার। তিনি মহান, তাঁর সৃষ্টির নিয়মকে তুমি প্রশ্ন করতে পারো না!"

ওরেস্টিস: "তোমার কি সমস্যা? একজন মানুষ কি তার মতামত জানাতে মুখও খুলতে পারবে না?"

সাইনেসিস: "তুমি আমাদের ঈশ্বরের সমালোচনা করছো, তার সৃষ্টির সমালোচনা করছো। এগুলো করে তুমি আমাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছো।"

ওরেস্টিস: "তোমরা এক কাজ করো, মরুভূমিতে চলে যাও। ওখানে তোমাদের অনুভূতিকে আহত করার কেউ থাকবে না।"

এই উত্তপ্ত কলহের মাঝে দাঁড়িয়ে হাইপেশিয়ার আচরণ আমাকে মুগ্ধ করে। সাইনেসিসের দিকে তাকিয়ে তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "সাইনেসিস, ইউক্লিডের প্রথম সূত্রটা কি?"

সাইনেসিস জবাব দিলো, "if two things are equal to a third thing, then they are all equal to each other."

হাইপেশিয়া: "এখন বলো, তোমরা দু'জন কি আমার কাছে সমান নও?"

ওরেস্টিস আর সাইনেসিস চুপ করে মাথা নাড়লো, অনেকটা অমোঘ সিদ্ধান্তের স্বরে হাইপেশিয়া বললেন, "যদি তোমরা দুজনেই আমার কাছে সমান হয়ে থাকো, তাহলে তোমরা একে অপরের কাছেও সমান। আমি বাকিদেরকেও বলি, যতোকিছু আমাদের বিভক্ত করে, তার চেয়েও অনেক বেশি জিনিশ আমাদের একত্র করে। বাইরে বাজারে যে সংঘাত, মারামারি, হিংসা, হানাহানি, সেগুলো আমাদের এখানে নেই। এখানে আমরা সবাই এক। উই আর ব্রাদার্স!"

ছবির বাকি অংশ দেখার আগেই আমি বুঝে ফেলি, এটি সম্ভবত আমার দেখা সবচেয়ে অসামান্য দৃশ্যের একটি। একই দৃশ্যে মৌলবাদ, ধর্মীয় কুযুক্তি, বিশুদ্ধ বিজ্ঞান-দর্শনের ক্ষমতা, আর সাম্যের বাণী মিলে মিশে এক হয়ে গেছে! তখন বুঝতে পারি কেন রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। কারণ এই ধর্মের সাহায্যে মানুষে মানুষে সবচেয়ে বেশি বিভেদ তৈরি করা যায়। কোন মানুষের অর্জিত জ্ঞান, প্রজ্ঞাকে খুব সহজেই নাকচ করে দেয়া যায়, ভিন্ন ধর্মের অপবাদ দিয়ে। অন্য যে কোন বিষয়ে মানুষের মাঝে যতোগুলো ভাগ করা সম্ভব, তার চেয়ে অনেক সহজে মানুষকে বড়ো বড়ো গ্রুপে ভাগ করে ফেলা যায় খালি ধর্মের পার্থক্য করলেই। একটু মিলিয়ে দেখলাম, এই ভারত উপমহাদেশে, আলেকজান্দ্রিয়ার সময়ের প্রায় ১৫০০ বছর পরে ঠিক এভাবেই ভাগ করা হয়েছিলো হিন্দু আর মুসলিম ধর্মের নামে। কতো সহস্র মানুষ সেসময়ে মারা গিয়েছিলো, তার কোনো হিসেব ইতিহাসে নাই!

এখনকার বাস্তবতায় হয়তো আমরা ধর্মীয় পরিচয়ের চাইতে মানুষের কথা, কাজের মূল্য কিছুটা বেশি দেই। কিন্তু আমাদের সভ্যতার গত তিন-চার হাজার সময়ে বারবার জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানের প্রসারে বাধা দিয়েছে ধর্ম। ধর্মানুভূতির কোমল ইন্দ্রিয়ে আঘাত পেয়েছে বলে যাজকদের, পাদ্রিদের, মোল্লাদের তলোয়ার আর বোমাতে মারা গেছে কাফের-নাস্তিক-বিধর্মী-ডাইনি (খেয়াল করলাম, এরা কোন মানুষ নয়, এরা কেবলই কতোগুলো নোংরা বিশেষণ!)। জেরুজালেম থেকে খ্রিস্টের মৃত্যুর পরে তাঁর বারো শিষ্যের হাত ধরে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার ঘটেছে। প্রায় সাত-আটশ বছরের অর্জিত গ্রিক-রোমান সভ্যতার বারোটা বাজাতে তাদের বেশিদিন লাগেনি। আলেকজান্দ্রিয়ায় ৩৯১ সালে পাঠাগার ধ্বংস হলো, পুড়িয়ে ফেলা হলো প্যাগান মূর্তিপূজারীদের অর্জিত বিজ্ঞানের বই, গবেষণার সরঞ্জাম! পাঠাগারের ভেতরে মূর্তিগুলো ভেঙে স্থাপনা হলো খ্রিস্টধর্মের নিরাকার ঈশ্বরের। প্রাচীন বাইবেল অনুযায়ী লিখিত হতে লাগলো শাসনের নিয়ম। নগরে চরে বেড়াতে লাগলো প্যারাবেলামি নামক মাস্তানেরা। এদের ঝোলায় থাকতো পাথর, কোমরে তলোয়ার। খ্রিস্টান ধর্মের প্রতাপে উচ্ছেদ হলো ইহুদিদের। তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রাচীন অভিযোগ, তারা খ্রিস্টকে ক্রশবিদ্ধ করেছে। তাই তারা অভিশপ্ত, নির্বাসিত! মেরে ভাগিয়ে আগোরা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হলো তাদের। এবং রোমান সরকার চেয়ে চেয়ে দেখলো কীভাবে ধর্মীয় বিশপ পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে!

হাইপেশিয়া এই সকল উত্তেজনার মাঝেও জ্যোতির্বিদ্যার কাজ চালিয়ে গেছেন। অল্প কিছু বাঁচাতে পারা বই, কিছু গণিতের সরঞ্জাম দিয়ে তখনও চেষ্টা করছেন বিশ্বের সূত্র আবিষ্কারের। পৃথিবী এবং নক্ষত্রের ভ্রমণ নিয়ে তাঁর গবেষণায় বাধা হয়ে দাঁড়ালো খ্রিস্টান চার্চ। বাইবেলে বর্ণিত আছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড একটা চেস্ট, যার সর্বোচ্চে আছে স্বর্গ, সর্বনিম্নে পৃথিবী, এবং পৃথিবী সমতল চাকতির(!) মতো। সেই মতবাদের প্রতাপে টলেমির গোলাকার পৃথিবীর মডেলও বাতিল। এখন হাইপেশিয়া যদি বলে বসেন, পৃথিবী আসলে কেন্দ্র নয়, সূর্যকে ঘিরে ঘূর্ণায়মান একটি গ্রহমাত্র, তাহলে তা বাইবেলের সরাসরি বিরোধিতা করে বসে! হাইপেশিয়া ব্যক্তিগত বিশ্বাসে নাস্তিক ছিলেন, প্যাগান ধর্মের মূর্তিতেও তিনি বিশ্বাস করতেন না। প্রখর প্রজ্ঞার এই দার্শনিকের কাছে দর্শনই ছিলো একমাত্র "ঈশ্বর", একমাত্র পূজনীয় স্বত্ত্বা। তাই অচিরেই তিনি চার্চের চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন। আর্চবিশপ সিরিল বাইবেল থেকে পাঠ করলেন স্রষ্টার অমোঘ বাণী, "নারীকে সৃষ্টি হয়েছে অবগুণ্ঠিত থাকার উদ্দেশ্যে, পুরুষের সহধর্মিনী হিসেবে, অনুচর হিসেবে। কোনো নারীর ক্ষমতার নিচে, নেতৃত্বের নিচে পুরুষ থাকতে পারে না। সেই নারী, যে আব্রু করে না, জ্ঞানের চর্চা করে এবং পুরুষকে নিয়ন্ত্রণ করে সে ডাইনি।" উদাহরণ হিসেবে সিরিল বললেন, যীশুখ্রিস্ট তাঁর বারোজন শিষ্যের মাঝে এজন্যেই কোন নারীকে রাখেন নাই। এই আলেকজান্দ্রিয়ায় একজন এমনই ডাইনি আছে যে কোন ঈশ্বরেই বিশ্বাস করে না, সৃষ্টিতত্ত্বের বিরোধিতা করে, পুরুষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। হাইপেশিয়া নামক সেই ডাইনির বিরুদ্ধে চার্চের সমন জারি হয়ে গেলো!

পরের গল্পটুকু বেদনাদায়ক। ক্রীড়নক রোমান প্রিফেক্টের (ওরেস্টিস) শত আপত্তি সত্ত্বেও হাইপেশিয়াকে চার্চ আটক করে ফেলে। প্রকৃত ইতিহাস থেকে মুভিটি এখানেই একটু সরে আসে। মুভিতে দেখানো হয় হাইপেশিয়ার পুরনো দাস তাঁর শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে, তাঁকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। তারপর সেই মৃতদেহের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারে প্যারাবেলামির মাস্তানেরা, খ্রিস্টের অনুসারীরা(!)। মূল ইতিহাসে, তাঁকে জীবন্ত অবস্থায় পাথর ছুঁড়েই মারা হয়, তারপরে তাঁর দেহ আলেকজান্দ্রিয়ার রাস্তায় ঘোড়া দিয়ে হিঁচড়ানো হয়। শিউরে ওঠার মতো নৃশংসতা? ইতিহাস বলে এটি কিছুই না। এর পরের প্রায় এক হাজার বছরের অন্ধকার মধ্যযুগে অনামী এমন অসংখ্য নারীকে ডাইনি অপবাদে মারা হয়েছে, পুড়িয়ে, পাথর ছুঁড়ে, চাবুক মেরে। কেবল নারীই নয়, জ্ঞান আহরণে আগ্রহী, বিজ্ঞান গবেষণার নিবেদিত যে কোন মানুষ যখনই ধর্মীয় সত্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন- তারা এরকম নির্মমভাবেই স্তব্ধ হয়ে গেছেন।

মুভি হিসেবে "আগোরা" এই চিরন্তন প্রশ্নগুলো উস্কে দেয়। ধর্মের শ্বাশত রূপ, মহান বাণী, সাম্যের প্রতিশ্রুতি কখনই প্রমাণিত হয়নি। যুগে যুগে ধর্মের পতন হয়েছে প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মকে হঠিয়ে। এই হঠানোর কাজটি সহজে হয়নি, মিষ্টি কথায় হয়নি। হয়েছে প্রবল প্রতাপে, নির্মম খুন-হত্যা-রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে। এই নির্মমতার ব্যাপারে একটা মজার পর্যবেক্ষণ হলো, বহুদেবতাবাদী ধর্মের চাইতে একেশ্বরবাদী ধর্ম অধিক নিষ্ঠুর। প্যাগান বা হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতার চেয়ে খ্রিস্টান বা ইসলাম অনেক বেশি দাপুটে। আর এই সকল ধর্মের বিপরীতে একা দাঁড়িয়ে আছেন গুটিকতক মানুষ- যাঁরা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন, যাঁরা বাকি সবার মতো একবাক্যে অমোঘ বাণী মেনে নেন না, যাঁরা প্রকৃত দর্শন, প্রকৃত বিজ্ঞানের পথে চলেন। মহাপ্রতাপশালী শাসক বা রাজার ধর্মকে অনায়াসে প্রশ্ন করতে পারেন। সকল ধর্ম-মত নির্বিশেষে, তাঁরা মানবসভ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল অথচ সবচেয়ে অত্যাচারিত চরিত্র!

আলেকজান্দ্রিয়ার সিনেটে ইহুদী-প্যাগান-খ্রিস্টান সকল ধর্মের সভাসদ ছিলেন। এক উত্তপ্ত বিতর্কের সময়ে খ্রিস্টান এক সিনেটর বলেন, "এটা কেবল সময়ের ব্যাপার যে আপনারা একদিন খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করবেন। প্রিফেক্ট বুদ্ধিমান তাই তিনি এরইমধ্যে করেছেন। আপনারাও করবেন।"

হাইপেশিয়া উত্তর দিলেন, "আপনার স্রষ্টা আগের যে কোন দেবতার চেয়ে বেশি ন্যায়পরায়ণ, ক্ষমাশীল এরকম প্রমাণ করতে পারেন নাই। চার্চ এখন যে স্রষ্টার নামে হত্যা-লুঠ চালাচ্ছে সেটা আগের সকল দেবতার নামে ঘটে যাওয়া হত্যা-লুঠের চাইতে কম না। আমি কেন সময়ের সাথে আপনার ধর্মে বিশ্বাস করবো, যেখানে আপনি আমাকে সন্তুষ্ট করার মতো কোন প্রমাণ দেখাতে পারছেন না?"

উত্তর দিতে না পেরে সেই সিনেটর পালটা প্রশ্ন করলেন, "আপনি কেন স্রষ্টা ও ধর্ম নিয়ে কথা বলছেন। আপনি তো কোনোকিছুতেই বিশ্বাস করেন না!"

হাইপেশিয়া থেমে থেমে উত্তর দিলেন, "I believe in Philosophy."


****

স্টেজভ্যু থেকে ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://stagevu.com/video/xzfwayteuqie


****
ছবির কিছু দৃশ্যঃ

পাঠাগারের ক্লাসরুমে পড়াচ্ছেন হাইপেশিয়া


সেরাপিসের মূর্তি, আলেকজান্দ্রিয়ার পাঠাগারের মূল কক্ষ থেকে বের হয়ে আসছে দলে দলে প্যাগান, খ্রিস্টানদের মূর্তি অবমাননার 'সমুচিত' জবাব দিতে, তলোয়ার হাতে!


আলেকজান্দ্রিয়া শহর, বাতিঘর এবং হাইপেশিয়া


ধর্মে ধর্মে কোন্দল আর রক্তপাত!



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29115578 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29115578 2010-03-13 17:24:45
সামহোয়্যারের (সংকলিত) প্রথম পাতা এবং কপি-পেস্ট পোস্টের অত্যাচার!
ঠিক এই মুহূর্তে সামুর প্রথম পাতার পোস্ট থেকে দেখছি:

১। ক্রিকেট ছেড়ে দিলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের তারকা ব্যাটসম্যান রকিবুল
লিখেছেন অন্তু, ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:৪৮

২। বাল্য বিয়ে নয়, মৃত্যুর কাছেই হার মানল বাউফলের ১২ বছরের সাথী
লিখেছেন মঈনউদ্দিন, ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:৪৬

৩। হট নিউজ। ইউনুস খান & মোহাম্মদ ইউসুফ সবরকমের ক্রিকেট থেকে অনিদ্রিষ্ট কালের জন্য বাদ। রানা নাভিদুল হাসান & শোয়েব মালিক...
লিখেছেন মাহমুদুল হাসান কায়রো, ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:৩২


৪। ১২ হাজার কি.মি. দূর থেকে আফগানিস্তানে কেন এসেছেন? যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ডঃ আহমাদিনেজাদ
লিখেছেন বিপদ-আপদ, ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:২৬

৫। শিক্ষাঙ্গনে হয়রানি
লিখেছেন তানবিরটি্‌এলপি, ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:২১

৬। মুজিব স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়নি এটা ঠিক তবে যারা বলে জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক তাদেরকে বলছি।
লিখেছেন প্রিন্‌সেস ঢাকা, ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:২০

============
এই ছয়টি পোস্ট সরাসরি কোন না কোন পত্রিকা বা খবরের সাইট থেকে কপি করা খবর নিয়ে। কোন কোন পোস্টের ভিতরে হিজিবিজি সংকেত দেখে বুঝলাম যে সেগুলো ইউনিকোডেও ঠিক মতো কনভার্ট করেন নি লেখক ব্লগার। যেমনে তেমনে কপি করে সাঁটায় দিয়েই পোস্ট করে দিছেন।

সময়ের ব্যবধান দেখুন, মাত্র আটাশ মিনিটের মধ্যে প্রথম পাতার পনেরটি পোস্টের মধ্যে ছয়টাই এই আবর্জনা। পরের পাতায় গেলে আরো ভুরি ভুরি পাওয়া যাবে!

সামহোয়্যার কোন খবরের সাইট না। এটা একটা কমিউনিটি ব্লগ। গাদা গাদা খবর যদি জানতেই হয়, যদি হট নিউজ-ব্রেকিং নিউজ-গরমাগরম খবর জানতেই হয় তাহলে বেশ কিছু দূর্দান্ত বাংলা ও ইংরেজি সাইট আছে। একটু গুগলে সার্চ দিলেই পাওয়া যায়! তারপরেও সেই জরুরি খবরের এমন বারংবার উল্লেখ শুধু বিরক্তিকরই নয়, মেজাজ খারাপ করিয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট!

তাই, হে মহামান্য কপি-সাঁটানো ভাইসবেরা, আপনারা যে খবর পড়ছেন, আমরাও সেই খবর পড়ছি। শুধু শুধু খবরের কপিপেস্ট গোলানো মণ্ড আমাদের আর খাওয়াইয়েন না। যদি নিতান্তই পোস্টানোর কিছু না পান, তাইলে এই সব নিউজ নিজেদের ব্লগে দেন- প্রথম পাতা খালি রাখেন। আপনার সরবরাহকৃত খবরে আগ্রহী লোকজন সানন্দে আপনার ব্লগে গিয়ে পড়ে নিবে।

যারা এই নিদারুণ কপিসাঁটানোর অত্যাচারে সামু ছেড়ে চলে যাওয়ার দশা, তাদের জন্যে আপনাদের কি একটুও দয়া হয় না???


এর হাত থেকে নিষ্কৃতির উপায় কী!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29113914 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29113914 2010-03-10 23:06:24
মৃ

যে হেসে দিলে দুয়েক মুহূর্তের জন্যে কমলালেবুর মতো গোল পৃথিবী শ্লথ হয়ে সেই হাসি উপভোগ করে যায় সে জানেও না তার স্মিত মুখের বিকীর্ণ আলো কতোটা সুন্দর করছে চারিপাশ, পৃথিবী জানে, পৃথিবী বোঝে, তাই বোঝা কাঁধে চলতে চলতে সে কিছুটা স্থবির হয়ে দম নেয় আর সেই হাস্যাঞ্চলের উল্টোপাশে রাতের আঁধার কিছুটা ফিকে হয়ে আসে


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29113652 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29113652 2010-03-10 13:20:48
একটি খুব সাধারণ ঘটনা

মৃত্যু খুব সাধারণ ঘটনাঃ
একটা বইয়ের পাতা ওল্টানোর মতোই নিত্যদিনের ঘড়ির কাঁটায় ঘাপটি মেরে বসে আছে।

যেভাবে তুমি চুল আঁচড়াও বা ঘুম ভেঙে দু'হাত আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে এলোমেলো ছড়িয়ে দাও সূর্যরশ্মির মতোন, সেভাবেই মৃত্যু হেঁটে এসে কলিংবেল বাজিয়ে দেয়। সেও আমাদের মতো আধুনিক হয়ে গেছে। যেমন সময় খুব আধুনিক আজকাল, নিয়মিত কোয়ার্টজের অণুতে মিশে থাকে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সময় তেমন ভুল করে না, তবে মৃত্যু মাঝে মাঝে ভুল হিসেবে কাছাকাছি চলে আসে খুব- যেমন চড়ুইটা সেদিন হুট করে জানালা গলে আমাদের ঘরে এসেছিলো। তুমি আঙুলের নখ কাটছিলে দাঁতে আর আমি তোমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিচ্ছিলাম কপট রাগে, আর তখন চড়ুইটা আমাদের মাঝে অনেক না-বলা কথা হয়ে অযুত মুহূর্ত ঝুলে রইলো।

তারপর?
-তারপর ফুরুৎ

তারপর?
-তারপর ফুরুৎ

কে ফুরুৎ, মৃত্যু না চড়ুই?
-ওমা তুমি বুঝো নাই কে ফুরুৎ? খেয়াল কোথায় থাকে তোমার আজকাল? চোখের নিচে গাঢ় হ্রদের কালো পানির দাগ আর কপালে মরূদ্যানের ভাঁজ কেন! কেন শিথিল হয়ে আসে তোমার হাতের মুঠো? কেন দাঁত কাটার মতো তুচ্ছ মুহূর্তে চড়ুইটা বা মৃত্যুটা এলো আর চলে গেলো? তারপর সব ফুরুৎ।

একটু আগে আমি ভুল বলেছি। সময় ঠিক আধুনিক হতে পারেনি। সময় এখনও চিরপুরাতন মৃত্যুর কাছে হেরে যায় রোজ। প্রতি পদক্ষেপে সে আমাদের থেকে আরো একটু করে ছিনতাই হয়ে যায় মৃত্যুর কাছে।



***
- অনীক আন্দালিব
৫.৩.১০


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29110625 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29110625 2010-03-05 17:51:54
Voyeur উঁকি দিয়ে দেখা গেলো
দুরন্ত ভোইয়ারিজ্‌ম।

ভেতরে জমাট গুমোট
খড়িমাটি-প্রবাহ- গতকাল থেকে জমে আছে, বিগত।

"চাহিবামাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে" জীবাণুকুল,
অনুকূল তাপমাত্রায় মেপে নিয়ে
রেটিনাজগতের রোগশোক, গ্রহ-উপগ্রহ।

গলগ্রহ হবেন হঠাৎ ভিট্রিয়াস ফুল,
লালনীল কোমল কমল!

তারপর সকল ভোইয়ারিজমে ফুলের ভেতর ফুটবে চোখ, রেটিনাক্লান্ত পুলক।

পালক-বিন্যাসে কাজল ছুঁয়ে দিলে,
নজর পড়ে অজান্তেই চুরমার হয়ে যাচ্ছে দেখো সেখানে জমে থাকা রোদ।

রৌদ্‌রো! রৌদ্‌রো!
-বলে কতোদিন চিৎকারগুলো ছুটে গেছে ইন্দ্রিয়ের ভেতরে অশুদ্ধ বিশুদ্ধ ভুল




***
- অনীক আন্দালিব
৩.৩.১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29108913 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29108913 2010-03-03 02:25:30
ছাগচিহ্ন টিউটোরিয়াল ২: ছাগপালনের সুবিধা অসুবিধা! আগের পোস্টে আপনাদের সাথে একজন ছাগুকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি যিনি একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশিষ্ট রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরির চরিত্রকে ধুয়ে মুছে সাফ করার চেষ্টা করেছিলেন। অতীতে তার মাঝে আরো ছোটখাট ছাগবৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছে। অধুনা তিনি একাত্তরে যুদ্ধশিশু নিয়ে অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ মতামত রাখেন। সেখানে তিনি দাবি করেন বীরাঙ্গনাদের সন্তান, যাঁরা পাকি-হানাদার, রাজাকারদের নির্যাতন, ধর্ষণের কারণে জন্মেছেন, তাঁরা নষ্টবীজ, খারাপ, হারামি ইত্যাদি।

পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট এমন ছাগু (খেয়াল করুন, ছাগুর বিশিষ্টার্থে প্রয়োগ। ছাগল ও ছাগু আলাদা প্রাণী বুঝায়)-এর কাজকর্ম অতিশয় নিন্দনীয়। বিরক্তি উদ্রেককারী। হীন। নোংরামিতে পূর্ণ।

যাক। আজকে তিনি সেই নোংরা পোস্টটি ড্রাফট করার কারণ বেশ দম্ভভরে বর্ণনা করছেন। শিরোনামে "কৈফিয়ৎ" লেখা থাকলেও পোস্টের ভেতরে যুদ্ধশিশুদের অবমাননাকারী একবারও ক্ষমা চাননি। বরং ইসলামের দোহাই তুলেছেন কোন তথ্যসূত্র ছাড়াই। আমরা জানি যুগে যুগে, একাত্তরের পর থেকেই হীন ছাগুর দল নিজেকে বাঁচাতে ইসলামের আশ্রয় নেয়। আমরা ছাগুর প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ধর্মভীরু জাতি বলেই বারবার সেই ফাঁদে পা দেই। যুদ্ধশিশুদের প্রতি অবমাননাকারী, বীরাঙ্গনাদের অসম্মানকারী কোন ধর্মের আড়াল নিয়েও রক্ষা পাওয়া উচিত নয়।


এবারে আসি টিউটোরিয়াল নিয়ে। আজকে ভাবছিলাম কী লেখা যায়। মনে হলো ছাগপালনের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে লিখি। জনহিতকর প্রকল্প হাতে নিই। <img src=" style="border:0;" />



প্রথমেই অসুবিধাঃ
(যাতে আপনারা ছাগপালনে উৎসাহী না হয়ে উঠেন)
১। ছাগু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গোঁয়ার। গোয়ার্তুমি (Stubborn, গোআ+তুমি নহে) করার কারণে আপনার দেয়া কোনো লজিক, রেফারেন্স সে মানে না। উইকি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের দলিলও তার কাছে নস্যি!

২। ছাগু সর্বভূক। অন্যান্য বিষয়ে কিমাশ্চর্যম নির্বুদ্ধিতার ভান করলেও খাওনের বেলায় কোন বাছবিচার নাই। তখন সে আপনার ঘর-বাড়ি-দেশপ্রেম-স্বকীয়তা-কথা বলার স্বাধীনতা সবকিছু খেয়ে ফেলবে। এই সকল খাওয়া দাওয়া করার হাতিয়ার করবে ইসলাম ধর্মকে। ধর্মকে পূঁজি করে, ধর্মের সত্যকে টুইস্ট করে নানাবিধ ফতোয়া বানিয়ে আপনাকে ঠকাবে। কর্পোরেট যেমন আমাদের আবেগ নিয়ে খেলে, ছাগু তেমনি আমাদের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে খেলে।

৩। ছাগু বর্ণচোরা। তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন, কী মায়াময় নিরীহ দৃষ্টি! মূলত এই কারণেই আমরা সহানুভূতিশীল হয়ে উঠি। আফটার-অল, পশুপ্রেম মহৎ! তবে এই চাহনি বেশিদিন মায়াময় থাকে না। ভুল করে হলেও আপনি একটা পর্যায়ে ছাগুর সাথে মিশে মিশে নিজের গায়েও তার বোঁটকা গন্ধটি ধারণ করবেন। আপনার কাছে মনে হবে, একাত্তরে অনেক রাজাকার অনেক ভালো কাজ করেছে। মনে হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে এখন কী লাভ? মনে হবে শিবিরের সকলেই ভালো মানুষ। মনে হবে গোআ একজন ভাষাসৈনিক, মইত্যা মহান!

এই যে আপনার বদল ঘটে যাবে, আপনি একজন মানুষ থেকে ছাগুবান্ধবে পরিণত হবেন এটা প্রকৃতির ভারসাম্যের প্রতি ঝুঁকি। আপনারা জানেন, বিশ্ব এখন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নিয়ে কতোটা উদ্বিগ্ন! আসুন, আমরা ছাগুমিশামিশি থামাই।


এবারে আসি ছাগপালনের সুবিধাঃ

১। এইটাও জীববৈচিত্র্যের ক্যারিসমা! আসলে সমাজে ভালোর পাশে খারাপ, মানুষের পাশে ছাগু থাকবেই। নিজেরা মানুষ থেকে অপর ছাগুদের দেখে শেখা যায় যে অমনটি হতে নেই! অন্ধকার না থাকলে যেমন আলোর গুরুত্ব বোঝা কঠিন, তেমনি ছাগু আমাদের সামনে "স্যাম্পল-নট-টু-বিকাম" হয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

২। যতোই মুখে অস্বীকার করি, ছাগু না থাকিলে ব্লগিংয়ের মজা কম। সরস কাব্য-গদ্য-প্রবন্ধ আর কাঁহাতক ভালো লাগে। যতোদিন যুদ্ধাপরাধের বিচার না হচ্ছে, ছাগুশিবির-জামাত এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ না হচ্ছে ততোদিন ছাগুরা ম্যাৎকার দিবেই। আশা করি, ততোদিন আমরা এভাবে বিনোদিত হইবো।

৩। ছাগু আমাদের একাত্তরের জামাতের মন-মানসিকতা বুঝতে সাহায্য করে। বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে জন্মেছে। তারা যেন ঠিকমত জানতে পারে, একাত্তরে জামাত কেমন ছিলো, জামাত কীভাবে মুক্তিবাহিনীর দামাল ছেলেগুলোকে পাকিদের হাতে তুলে দিতো হাসিমুখে, ধর্ষণ করতো নিরীহ নারীদের, লুঠ আর অগ্নিসংযোগ করতো গ্রামের পর গ্রাম সেগুলোর জ্বলন্ত নিদর্শন ছাগু। ছাগুরা মাঝে মাঝে এইসব কুৎসিত কাজকে ধুয়ে পরিষ্কার করতে যায়, সাফাই গাইতে যায়। তখনই সেটার মাঝে নারকীয়, অমানবিকতাটি ফুটে ওঠে।

এর বেশি ভালো দিক খুঁজে পেলাম না। (ছাগুদের মতো হইলে অবশ্য আরো কয়েকটা পাইতাম নির্ঘাত!!<img src=" style="border:0;" />)

====

সকলকে ধন্যবাদ!


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29107639 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29107639 2010-03-01 01:44:34
ছাগচিহ্ন টিউটোরিয়াল
তবে বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারে এই নামটি একটি বিশেষ অর্থ ধারণ করে। যেমন- রেজাকার বা রাজাকার অর্থ বন্ধু, সাহায্যকারী। কিন্তু আমরা এই নাম দেই সেই সকল কুলাঙ্গারকে যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিবাহিনীকে সাহায্য করেছে। নিজের দেশমাতার সাথে বেঈমানি করেছে, দেশের মানুষকে হত্যা, রাহাজানি, লুঠ, অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে। নারীর সম্মান ভুলুন্ঠন করেছে। সেই রাজাকারগুলো আমাদের দূর্ভাগ্য যে আমাদের মাঝে এখনও বিদ্যমান। পাকিহুজুরের গোয়ামারার সুখ তারা ভুলতেই পারে না!

বাংলা ব্লগে ছাগুপ্রজাতির বিভিন্ন নিকে বিচরণ সকলেরই জানা। এখন যুদ্ধাপরাধী বিচার যতো এগিয়ে আসছে, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি যতোই সংগঠিত হচ্ছে ততোই এই ছাগুদলের হাউমাউ বাড়তেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে ফাকিস্তানিদের সাপোর্ট দেয়া রাজনৈতিক দল জামাত আর তার লেজুড় শিবির তৎপর। এই সকল বাংপাকি-গেলমানদের চিহ্নিত করুন, নিজের স্বার্থেই!

এখানে একটা ছাগু যুদ্ধশিশু নিয়ে জ্ঞান বিতরণে নেমেছে । একাত্তর বাহাত্তর হিসাব করে কী গালাগাল করলো!

একে অবশ্য অনেক আগেই চিহ্নিত করা গেছে । দেখলাম ছুপা থাকে বলে অনেকেই হয়তো জানেন না।

আসুন আমরা নিজ উদ্যোগে ছাগুচিহ্নিত করি। আমীন!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29106907 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29106907 2010-02-27 23:16:18
ডু নট ডিসটার্ব মাই সার্কেলস
এক বৃদ্ধ কিছু গাণিতিক সরঞ্জাম নিয়ে গভীর মনোযোগে কাজ করছিলেন কোন অজ্ঞাত গাণিতিক সমস্যা নিয়ে। তাঁর চারপাশে ছড়ানো ছিলো বেশ কিছু বৃত্তের আকৃতি। রোমান সৈন্যদল সেগুলো তছনছ করে তার দিকে এগিয়ে এলে তিনি অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, "Noli turbare circulos meos" ("Do not disturb my circles")। সৈন্যদের নেতা তাঁকে এই দম্ভোক্তি ও অসম্মানের অপরাধে সেনাপতির কাছে ধরে নিয়ে যেতে চাইলেন। বৃদ্ধ তখনও গাণিতিক সমস্যায় মগ্ন, তিনি যেতে রাজি হলেন না। ক্রোধে মত্ত সৈন্যদলের নেতা তার তীক্ষ্ণ তলোয়ারে মুহূর্তেই মেরে ফেললেন পয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধকে!

বৃদ্ধের নাম ছিলো আর্কিমিডিস। প্রবল প্রতাপশালী রোমান সৈন্যদের চাইতেও যাঁর কাছে নীরিহ বৃত্তগুলো জরুরি ছিলো!


খ্রিষ্টের জন্মের দুই হাজার চার বছর পরে ঢাকা নগরীতেও উন্মত্ত চাপাতির কোপে আক্রান্ত হলেন আরেকজন গবেষক, বিদ্যানুরাগী, কবি। সেই বছরেই, মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস পর তিনি মারা গেছেন। তাঁর কাছেও ধর্মান্ধ, গোঁড়া, প্রতিক্রিয়াশীল হায়েনাদের চেয়ে জরুরি ছিলো রাড়িখাল, ফুল, কবিতা, বাঙলা ভাষা, বাঙলাদেশ*!

আজ বুদ্ধিবৃত্তির বিরুদ্ধে ধর্মান্ধের এই আক্রমণের দিনেআপনাকে স্মরণ করছি, প্রিয় হুমায়ুন আজাদ। আপনি যে বাংলাদেশ দেখে শিউরে উঠেছিলেন, আমরা সেই বাংলাদেশেই স্মৃতিহীন ও বিকারহীন হয়ে বাস করছি।



***



[*হুমায়ুন আজাদের লেখায় বাঙলাদেশ বানানটি অক্ষত রাখা হয়েছে]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29106503 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29106503 2010-02-27 12:18:39
নির্বাণ


মানুষকে বোবা করে তোলার সব প্রক্রিয়া যখন সমাপ্ত, তখন তাদের মাঝে এক ধরনের মিশ্র ক্লান্তি দেখা যাবে। অবয়ব পরিষ্কার নয় বলে তারা ঠিক কতোটা ক্লান্ত, সেটা আমি বুঝে উঠতে পারি না। স্যরি, আমি খালি নিজের কথা বলি। বাকিরাও বুঝে উঠতে পারে না। আমি এবং বাকিরা, আমরা সবাই তাদের মুখের রেখা পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কোনো লাভ নাই, শালাদের মুখই নাই, তার আবার মুখের রেখা? ধুস! রেগেমেগে সব ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা করে আমাদের। এরকম ধ্বংসযজ্ঞ অনেকবার করেছি আমরা, চারপাশের সবকিছু ভেঙে ফেলেছি। তারপরে অনেক ভাঙচুরের পরে আমরা শান্ত হয়েছি। মাথা ও রক্ত ঠাণ্ডা হলে খেয়াল করেছি যে এইসব ভাঙচুর করে কোনো লাভ হয়নি। তাদের টিকিও স্পর্শ করা যায়নি, তারা বহাল তবিয়তেই আছে- আমাদের দিকে মুচকি মুচকি হাসছে। হাসিটাও স্পষ্ট নয়। ঐ যে বললাম, তাদের অবয়ব দেখা যাচ্ছে না ঠিকঠাক।

এই কারণে আমরা বারবার হেরে যাই- আমাদের পরাজয়ের পেছনে কোনো রণক্ষেত্রের বিশ্বাসঘাতকতা দায়ী নয়- যেটা ঘটেছিলো প্রাগৈতিহাসিক পুরাণের পলাশী-পরিচ্ছেদে। অথবা সম্প্রতি ইতিহাসে সংকলিত রক্তবিষ-শুয়োরদের ছদ্মবেশী আক্রমণপন্থাও আমরা এখন ধরতে পারি। এই পন্থায় আমাদের অনেক ভয়ানক একটি পরাজয় ঘটেছিলো- প্রাগৈতিহাসিক পুরাণের বঙ্গ-পরিচ্ছেদে। আমাদের শৈশবেই এইসব প্রাগেতিহাস পড়ানো হয়। এগুলো থেকে আমরা ভ্রান্তিমোচনের উপায় এবং কৌশল শিখি। তথ্যগুলো একটা রঙিন সিরিঞ্জে ভরে আমাদের ঘাড়ের একটু উপরে, নরম গর্ত দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। বেশি ব্যথা লাগে না চেতনানাশকের প্রভাবে, তবে একটু ঝিমঝিম করে। সিরিঞ্জগুলো রঙিন করা হয় যাতে শিশুরা ভয় না পায় সেজন্যে। সিরিঞ্জ পুশ করার পর একদিন সেই গাঢ় রঙ আমাদের চোখের রং বদলে দেয়। দূর থেকে দেখলেই বুঝা যায় কারা কারা এখন বঙ্গ-পরিচ্ছেদ, বা পলাশী-পরিচ্ছেদ, বা পাকি-পরিচ্ছেদ, বা কোম্পানি-পরিচ্ছেদ নিয়েছে। এগুলো নিয়ে এখন আমরা আর তর্কও করি না- সবাই সঠিক অভ্রান্ত প্রাগেতিহাস জানলে সেটা নিয়ে কথা বলা বাতুলতা। আমরা বাতুলতায় সময় নষ্ট করি না।

রণক্ষেত্রে যারা এবারে খুব চৌকস রণ করেছেন তারা মিশমিশে কালো হয়ে গেছেন, কারণ তারা কালো রঙের সিরিঞ্জে করে স্মৃতিনাশক ঢুকিয়ে দিয়েছে। এদের চোখ তো চোখ, হাত-পা-মুখ-চুল-ত্বক-আঙুল-বুক-পেট-লিঙ্গ সবকিছু কালো কুচকুচে হয়ে গেছে। খুব খেয়াল না করলে এদেরকে মূর্তি বলে মনে হয়, যারা খুব দুর্দান্ত রণকৌশল দেখিয়েছেন। এরা কথা বলতে পারে না এখন। সেটাই বলছিলাম শুরুতে- যখন আমরা মানুষরা বোবা হয়ে যেতে শুরু করি তখন তাদের সম্ভবত ক্লান্ত লাগে। বোবা ও অথর্ব আমাদের চোখের ভেতরে সাদা অংশটি কালো হয়ে গেলে তারা হেসেও ওঠে জোরে। সেই হাসি বোবা মানুষেরা, আমরা শুনতে পাই, তবে ঠাহর করতে পারি না। কী করে করবো? আমাদের তো চোখের ভেতরে কালো রঙ!

হেসে উঠে তারা একটি তালিকা ধরিয়ে দেয় মূল-বোবার হাতে। শুধু মূল-বোবা'ই তখনও চোখে দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি তালিকাটিতে চোখ রাখেন। পড়ার সাথে সাথে তার মাথার পেছনের নরম গর্তে লাগানো ধ্বনিযন্ত্রে শব্দগুলো জোরে জোরে উচ্চারিত হতে থাকে। তালিকায় লেখা আছেঃ


=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+==+=+=+=+=
______সকল কৃতজ্ঞতা তাঁর! সকল দায়িত্ব তাঁর!______

___আজ আধুনিক পুরাণের দশম বছরের দ্বাবিংশতিতম দিন।___

মানুষকে আমরা পরাজিত করেছি অত্যাধুনিক রণক্ষেত্রে তিনদিনব্যাপী রণ সম্পন্ন করে। এখন তাদের আটককৃত দক্ষ যোদ্ধাদের সকলকে কৃষ্ণমধু দিয়ে নিরপেক্ষ সত্ত্বায় পরিণত করা হয়েছে। কৃষ্ণমধু দেয়া হয়েছে চোখ-হাত-পা-মুখ-চুল-ত্বক-আঙুল-বুক-পেট-লিঙ্গ ইত্যাদি অঙ্গে। সেইসাথে বর্ণিত হলো কেন তাদের অধিকার নেই, কেন তারা কালো হয়ে গেলেন, কেন তারা বোবা এবং কেন সকল ক্ষমতা হারালেন-

১. চোখে মধু দেয়া হয়েছে যাতে তারা আর কখনোই সত্য দেখতে না পান। এখন থেকে তারা কেবল সেই ছবিই দেখবেন যেটি আমরা দেখাবো।

২. হাতে মধু দেয়া হয়েছে যাতে তারা স্বেচ্ছায় কোন ক্রিয়া করতে না পারেন। এই সাথে হাতের সকল অনিচ্ছাকৃত কার্যও নিষিদ্ধ হলো।

৩. পায়ে মধু দেয়া হয়েছে যাতে তারা কোথাও হেঁটে যেতে না পারেন। এখন থেকে তাদেরকে নিতম্বের ওপর ভর দিয়ে গোড়ালির সাহায্যে চলাচল করতে হবে।

৪. মুখে মধু দেয়া হয়েছে যাতে তারা কোন নিজস্ব বক্তব্য রাখতে না পারেন। কথা ও শব্দের সকল অধিকার রদ করা হলো।

৫. চুল, আঙুল ও ত্বকে মধু দেয়া হয়েছে যাতে তারা পরষ্পরকে স্পর্শ করে কোন তথ্য পাচার করতে ও যূথবদ্ধ হতে না পারেন। মধুর প্রলেপের কারণে তারা এখন সম্পূর্ণ শরীরে ও মনে বিচ্ছিন্ন থাকবেন।

৬. বুকে মধু দেয়া হয়েছে যাতে আত্মা ও হৃদয় বলে বহুল প্রচারিত প্রপঞ্চটি দমন করা যায়। যেহেতু সঠিক নিয়মে আত্মা ও হৃদয়ের অবস্থান নির্ণয় করা যায়নি, সেহেতু আমরা নিকটবর্তী হাইপোথিসিসটি মেনে নিয়েছি।

৭. পেটে মধু দেয়া হয়েছে যাতে তারা সর্বসময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা দূরীভূত থাকেন। নিবৃত্তির বশবর্তী হয়ে প্রাগৈতিহাসিক রণসমূহের কোনো পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না।

৮. লিঙ্গে মধু দেয়া হয়েছে যাতে সেগুলো বাইরের কোনো উদ্দীপনা বা ভেতরের লিবিডোর থেকে মুক্ত থাকে। অতীতে অতিপ্রজননশীল মানুষ নিয়ন্ত্রণ ও পরিদর্শনের সংখ্যা ছাড়িয়ে বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিলো। সেটি বন্ধ করতে এই নতুন উদ্যোগ।

একটি সুসভ্য, সুষ্ঠু, নিয়ন্ত্রিত জনগোষ্ঠি আমাদের সকলেরই কাম্য। সেই বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে মানুষের ভবিষ্যত সংরক্ষণে আমরা সদা তৎপর। সকল বিভ্রান্তি ও দ্বিধা এড়িয়ে যারা আমাদের সাথে রণে সাহায্য করেছেন- তারা বন্ধু, সহযোগী ও সাথী। তারা অবশ্যই তাঁর (সকল কৃতজ্ঞতা তাঁর! সকল দায়িত্ব তাঁর!) কৃপা পাবে।

=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+=+==+=+=+=+=

পুরো তালিকাটি পড়া হলে মূল-বোবার হাত থেকে তারা সেটি কেড়ে নিলো। মূল-বোবার কথা বলাও বন্ধ হয়ে গেলো। তারপর মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে তার চোখের সাদা অংশটি কালো হয়ে উঠলো কৃষ্ণমধুর প্রভাবে। আমরা বাকিরা একটা ধপ করে শব্দ শুনলাম। তারপরে হিস হিস করে শব্দ হতে থাকলো। আমরা সবাই যদি দেখতে পেতাম তবে দেখতাম যে মূল-বোবার নিথর ধড় ইলেকট্রিক শক দেয়া ব্যাঙের শরীরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। ধপ করে খসে পড়েছে তার কালো চুলসহ মাথাটা।

যেন পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে সেটা একজনের পায়ের কাছে এসে থামলো।
যেন কোন ব্যারাকের কালো নর্দমায় সেটা ভেসে উঠলো তিন দিন পরে।
যেন কোন বধ্যভূমিতে গণকবর খুঁড়তেই লাফিয়ে বেরিয়ে এলো সেটা।
যেন কালো শীতল নদীতে সেটা আলতো করে ভেসেই যাচ্ছিলো।
যেন পিচের ঢালু রাস্তায় তপ্ত দুপুরে সেটা গড়িয়ে যাচ্ছে।
যেন লাঠির আঘাতে কারাগারের অন্ধকুঠুরিতে সেটি গুমরে মরছে।
যেন কোন জমিদারবাড়ির পেছনের বনে কতগুলো তলোয়ার তাকে টুকরো করেছে।

তার খোলা ভোকাল কর্ড আর ঘাড়ের ভেতর থেকে হিস হিস করে রক্ত বেরিয়ে আসছে। মেঝের পুরো মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো। আমরা যেখানে বসেছিলাম, আমাদের পায়ে, পাছায়, হাতে লাল রঙ লেগে গেলো। আমরা যদি ত্বকে কোন অনুভূতি পেতাম, তবে আমরা গরম রক্তের অনুভব পেতাম। আমরা যদি কথা বলতে পারতাম তাহলে আমরা চিৎকার করে উঠতাম। আমাদের চোখের সামনে এভাবে মূল-বোবা'র মাথা কেটে ফেলার আগে বাধা দেয়ার চেষ্টাও করতাম। মূল-বোবা হয়ে ওঠার আগে তার একটা সুন্দর নাম ছিলো- সেই নাম ধরে আমরা শ্লোগান দিতাম, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতাম। আমাদের হাত-পা কালো না হয়ে উঠলে আমরা দৌড়ে যেতাম তাদের দিকে, বাধা দিতাম নিশ্চিত!

কিন্তু আমাদের চোখের ভেতর, মাথার ভেতর, মুখের ভেতর, হাতের ভেতর, পায়ের ভেতর ঘোর ঘোর কালো। তারা না চাইলে আমরা আমাদের লিঙ্গও উত্থিত করতে পারবো না। তাদের কী মনে হলো, তারা চাইলেন আমরা যেন একটু হাসি। অমনি আমাদের মুখে মুচকি মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। দেখা গেলো মূল-বোবার ধড় ছটফটানি কমিয়ে দিয়েছে, মাথাটা তখনও আমাদের একজনের পায়ে লেগে এদিক ওদিক দুলছে। রক্তের বেগ কমে গেছে। থিকথিকে ঘন কালচে রক্তের মাঝে বসে আমরা অল্প অল্প দুলছি এবং হাসছি।



তারা নিশ্চয়ই মহান। তারা নিশ্চয়ই প্রতিভাবান। তারা নিশ্চয়ই সুসভ্য। তারা নিশ্চয়ই আমাদের ভালো চান। মূল-বোবার মাথাবিহীন ধড়ের পাশে রক্তে ভিজতে ভিজতে আমরা এই ধরনেরই একটা প্রবল বোধিলাভ করি!


***
- অনীক আন্দালিব
২৪.২.১০



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29104952 http://www.somewhereinblog.net/blog/4thinthelineblog/29104952 2010-02-24 23:53:52