শাহীনের লেখার জবাব দিতে বাধ্য হচ্ছি দুটি কারনে। ১. তিনি আমার লেখার উত্তর সরাসরি যাযাদিতে দেননি, কারন তিনি নৈতিকভাবে দুর্বল। ২. তিনি তার ব্লগে লিখেছেন যে, তাকে জড়িয়ে নাকি কথা বলা হয়েছে। তার লেখার জবাব তাকে না জড়িয়ে কিভাবে দেয়া সম্ভব?
আপনি বারবার বলছেন যে, বিতর্ক হয় এমন ইস্যু অ্যাভয়েড করা ভালো। বারবার ঐক্যের দোহাই দিচ্ছেন? আপনি যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হন তবে বিতর্ক যে গণতন্ত্রের প্রান সেটাও নিশ্চয় বোঝেন। আপনি গণতন্ত্র চান, অথচ বিতর্ক চান না। আর যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সাথে ঐক্যের কি সম্পর্ক? আপনি কোন ঐক্যের কথা বলছেন, ফতোয়াবাজদের সাথে হাসিনার ঐক্য, নাকি জামাতের সাথে খালেদার? যুদ্ধাপরাধের বিচার করলে এধরনের ঐক্যের হয়তো ক্ষতি হতে পারে। আর সেটার জন্যই কি আপনার সকল মাথাব্যাথা?
আপনার বিশ্ববিদ্যালয় আর আমার কলেজের মধ্যে রাতের মিষ্টি বাক্যবিনিময় যদি আপনার আনন্দের উত্স হয়, তবে যে শব্দগুলি নিয়ে আপনি আপত্তি করেছেন সেগুলোও আপনার আনন্দের উত্স হবারই কথা। কারন আপনার লেখাতে যে মিষ্টি” বাক্যগুলোর কথা আপনি মনে করেছেন সেগুলো কিন্তু ছাপার অযোগ্য। তারমানে কি আপনি ছাপার অযোগ্য বাক্যবিনিময় দিয়ে আনন্দ পান?
এবার বাংলা অভিধানটা খুলবেন। কৈফিয়ত অর্থ হল ব্যাখ্যা বা এক্সপ্লানেশন। আমি কোন কৈফিয়ত দেইনি। আমি আপনার লেখার জবাব দিয়েছি। কৈফিয়ত দিচ্ছন এখন আপনি। আর ঢেকুর গেলে না, ঢেকুর তোলে। সহজ বাগধারা। কানাডায় ৭ বছর, বাংলা ভুলে যাচ্ছেন বোধহয়।
আপনি হারিয়েছেন নানাকে? নানার আদর মেয়ের ঘরের নাতী কতটুকু পায় জানি না, তবে বাবার আদর যে সব সন্তানের চাওয়া, সেটা বোধকরি আপনার অজানা নয়? বাবা হারানোর যন্ত্রনা কি লিখে বোঝানো যায়? কি করে আপনি বলেন যে, গ্রামের মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে গন্ডগোল বলে? এটা বলে আপনি কি প্রমান করতে চেয়েছেন? মুক্তিযুদ্ধের মূল্য নেই গ্রামের জনগণের কাছে?
যুদ্ধাপরাধের রেফারেন্স দিলেন উইকিপিডিয়া থেকে। বললেন সেখানে বাংলাদেশের কোন যুদ্ধাপরাধীর কোন নাম নেই। প্রশ্ন করলেন যে কারা তালিকা বানাবে? আর এখন বলছেন যে আপনি উইকিপিডিয়াকে বাইবেল বানান নাই? আমি তো কেবল বলেছি যে, তালিকা বানাতে হবে না। অনেক তালিকা আছে। আছে সে সময়ের দলিল। আছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল। চাইলেই সেসব থেকে সাহায্য নেয়া যেতে পারে।
কোন বইয়ের এডিটর রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় জামিনে আছেন এটা আপনি জানেন। এই মামলার কারনে কি যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ হালাল হয়ে যায়। আপনি কত সহজে সেই বইয়ের এডিটরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী মামলার উদাহরণ দিলেন, অথচ যারা এই রাষ্ট্রের জন্মের বিরোধীতা করল, বুদ্ধিজীবিদের নিধন করল, ধর্ষন করল, তাদের বিচার চাইলেন না। ঐ এডিটর সাহেব তার নেত্রীর কাছে বিচার চান নাই, তাতে কি আসে যায়? আমার বিচারের দাবীর সাথে তো কোন এডিটরের স্বার্থপরতার কোন সম্পর্ক নাই। আপনি লিখেছেন কই নির্বাচনের পর তো কাউকে দেখি না, বিচারের দাবী তুলতে? সেজন্যই তো বিচার এখন চাই। কারন নির্বাচনের পর আপনার মতো সুবিধাবাদীরা আবার তাদের সাথে গাঁটছড়া বাধবেন। আপনি কোথাও বলেন নি, এ সরকারের উপর বোঝা না বাড়াতে। বরং আপনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তথাকথিত এলিটশ্রেনী নিয়ে এবং বলেছেন আমাদের ভবিষ্যত গণতন্ত্র নাকি সিভিল মিলিটারী টেস্ট টিউব গণতন্ত্র। এর মানে আপনি এ সরকারের প্রতিশ্রুত গণতন্ত্রের স্বরুপ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এখন বলছেন অন্য কথা।
চীফ এডভাইজার দুর্নীতির বিচারের জন্য সংক্ষুব্ধদের আদালতে যেতে বলেন কেন? কেন দুদক নিজে থেকে তালিকা বানায়? সন্ত্রাসীদের তালিকা কে বানায়? আদালত কখনো নিজে থেকে তালিকা তৈরী করে না। তালিকা তৈরী করে প্রসিকিউশন। যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা বানাবে আদালত আর ছিচকে চোর, সন্ত্রাসীদের তালিকা বানাবে রাষ্ট্র? রাষ্ট্র ব্যস্ত থাকবে ইয়াবা নিয়ে, কালা আর ধলা জাহাংগীরকে নিয়ে আর কাদের মোল্লা বলবে নারী আর টাকার লোভে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে। আপনি নিজে কি কাদের মোল্লার এই কথাটার সাথে একমত? সরাসরি উত্তর দিতে পারবেন?
আমি বিগত ৩৬ বছর ধরেই রাজাকারদের উত্থান দেখেছি। যার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে গত সরকারের সময় তাদের মন্ত্রীত্ত্ব আর ক্ষমতার ভাগাভাগিতে। যে আত্মীয়তার কথা আপনি বলেছেন, শেখ হাসিনার সেই আত্মীয়র যদি অপরাধ থাকে, তবে তারও বিচার চাই। যদি অপরাধ থাকে শাস্তি হবে, না থাকলে সসম্মানে মুক্তি পাবে অভিযুক্ত। আপনি তো আগেই দেখে ফেললেন, লাখলাখ মাওলানাকে বংগোপসাগরে ফেলে দেয়া হবে। লটাকানো হবে।
আপনি অবশ্যই কাউকে হাসানোর জন্য আর্টিকলটি লেখেন নি। আপনি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে এটি লিখেছেন। আপনি শুধু চতুর নন। আপনি মিথ্যাবাদীও। আপনি এখন লিখছেন কেয়ারটেকার সরকারের সম্মানজনক এক্সিটের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ফিরে পেতে চান আর তখন লিখেছিলেন বাংলাদেশের ভবিষ্যত নাকি সিভিল মিলিটারী টেস্টটিউব গণতন্ত্র। এখন লিখছেন কেবলই প্রান পেয়েছে ডেমোক্রেসি আর তখন লিখেছিলেন বাংলাদেশ পাক তুর্কীর মিশ্রনে কোন টেস্ট কেস হচ্ছে কিনা সবাইকে সেটা ভেবে দেখতে। ভবিষ্যতের গণতন্ত্রে আপনি তখন জনগনের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া আইন প্রণয়ন, ডায়লগ আর ডিবেটের ডেমোক্রেসীর পায়তারা লক্ষ্য করছেন আর এখন বলছেন সদ্য প্রান পেয়েছে ডেমোক্রেসি। একে আপনি বাধাগ্রস্ত করতে চান না।
দূর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান কি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ? হাসিনা খালেদার বিচার কি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ? সরকার এসব কিছুই পারে, শুধু পারে না যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে? তখনই শুধু সংসদ লাগে, অন্য সময় আদেশ জারি করলেই হয়। আমি বিচার চেয়েছি এবং লিখেছি আপনার মতো মানুষদের স্ববিরোধীতা ধরিয়ে দিতে। আপনারা তথাকথিত ঐক্যের কথা বলে এদের জিয়ল মাছের মতো পালতে চান, যাতে ভবিষ্যতে আপনাদের সংসদে ক্ষমতায় যেতে এদের সাথে আবার দেনদরবার করা যায়, আবার গাঁটছড়া বাঁধা যায়।
আমি কাউকে দাবানোর কথা বলিনি। বরং আপনি ভেবেছেন ভবিষ্যতে মাওলানাদের ঝাটানো আর লটকানোর মতো বিকৃত
স্যাডিস্টিক ভাবনা । কারন আপনার ধারনা যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইছেন তারা বলশেভিক গণতান্ত্রিক। এখন বলছেন সকলকে সব ধরনের রাজনীতি করতে দিতে। আর তখন ভয় দেখিয়ে বলেছেন কি হবে যদি মাওলানারা দেশের ধর্মহীন রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবী তোলেন? আমি এই জুজুর ভয় দেখানোটাকেই হাস্যকর বলেছিলাম।
শেষমেষ বলেছেন বিচার আপনিও চান। তবে এখন না। দেরী করে চান। আমি কারো ফাঁসী চাইনি। আপনি কল্পনা করেছেন সব নেতাদের ধরে ফাঁসীতে ঝোলানোর কথা। আমি বলেছি বিচার করতে হবে। বিচারে রায় যা হবে সেটাই ন্যায়। আপনি ৩৬ বছর দেরী করেছেন, আরো দেরী করতে চান। এই দেরীর ফলে সব অপরাধী স্বাভাবিকভাবেই পার পেয়ে যাবে, আপনি সেটাই চান। ইহকালে আর বিচার না চেয়ে আপনার মত অনুযায়ী এখন পরকালে বিচার চাইতে হবে।
আপনি আপনার আর্টিকেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সাথে মাওলানা সাহেবদের ঢালাওভাবে মিশিয়ে তাদের বানিয়ে দিলেন প্রতিপক্ষ আর এখন বলছেন অন্য কথা। আপনি ২১ আগস্ট আর ২৮ অক্টোবরকে ভয় পান কিন্তু ১৪ ডিসেম্বরকে পান না। তাই বুদ্ধিজীবি হত্যার বিচার চান না ।
বিজেপি, সিডিইউ কিংবা আর যেসব দলের উদাহরন আপনি দিয়েছেন, সে প্রসংগে বলি। বিজেপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন কি তারা ভারতের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়েছিল? সি ডি ইউ, ডেমোক্রাট কিংবা কনজার্ভেটিভ দলের গঠনতন্স্রে কি বাইবেলের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে?
ঠিক বলেছেন কেনেডীর কথা। আমি কিন্তু আমার লেখায় কানাডাকে নিয়ে স্পেসিফিক প্রশ্ন রেখেছিলাম। আপনি উত্তর দিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এর হত্যাকান্ড দিয়ে। কানাডার কয়জন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছিল যার বিচার হয় নাই? আপনি কেনেডী দিয়ে কানাডা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দিলে আর কি বলার আছে?
আমি কোন তথ্যটি মিথ্যা দিয়েছি? স্পেসিফিক বলবেন। আমি কোন তথ্যই দেইনি। আমি শুধু সহজ যুক্তি দিয়ে আপনার বিরোধীতা করেছি মাত্র। কাউকে মর্ষকামী (স্যাডিস্ট) বললে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি করে অপমানিত হয়? লটকানো, ঝাটানো, মাওলানাদের ধরে সাগরে ফেলে দেয়াটা অশ্লীল কথা নয়কি ভাইজান?
আপনি পুরো জনগণকে বোকা বললে দোষ হয় না, আমি শুধু একজনকে বললে দোষ হয়? আপনি গোটা মুক্তিযুদ্ধকে গ্রামের জনগনের দোহাই দিয়ে গন্ডগোল বলে চালিয়ে দিতে চাইলে দোষ হয় না, আমি শুধু একজনকে মূর্খ বললে দোষ হয়। মূর্খ বা ডাম্ব শবদটি অশ্লীল? আর লটকানো শব্দটা শ্লীল? আমি ইচ্ছা করেই বলেছিলাম এ শব্দগুলি যাতে আপনি রিঅ্যাক্ট করেন। আপনি সামান্য কটি শব্দে কতো রিঅ্যাক্ট করলেন । অথচ বাংলাদেশের ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত, হাজার হাজার নারীর ধর্ষন আপনাকে রিঅ্যাক্ট করাতে পারে না। কি দারুন শিক্ষা আপনার। ডা. ফজলে রাব্বীর হৃদপিন্ড বের করে নেয়া লাশ, ডা. আলীম চৌধুরীর মৃত্যু আপনার মনে সামান্য দাগ কাটে না। আপনি চিন্তিত যুদ্ধাপরাধীদের অভিযোগের আগেই ফাঁসীতে ঝোলানো নিয়ে।
অ্যাপ্রেসিয়েশন মেইল পেয়েছেন আপনি। কয়টা মেইল পেয়ে বুঝে গেলেন যে আপনি সঠিক? নিজের বিবেকের কাছে অ্যাপ্রেসিয়েশন মেইল পেয়েছেন? আপনার নানার চেহারা মনে আছে আপনার? তিনি কি আপনাকে অ্যাপ্রেসিয়েট করতেন বলে আপনার মনে হয়? আমিও পেয়েছি অনেক মেইল। এতে কিছু আসে যায় না। আমি মেইল না পেলেও যা, পেলেও তাই।
বিদেশে থাকা নিয়ে কটাক্ষ করি নাই। এলিট শ্রেনীকে গালাগাল দেয়াতে শুধু মনে করিয়ে দিয়েছি যে আপনিও সেই শ্রেনীরই একজন। বলশেভিকদের কটাক্ষ করবেন আবার বলশেভিকদের মতো এলিট শ্রেনীর আইনকে কটাক্ষ করবেন। এটাতো স্রেফ দ্বিচারণ। পরদেশে পরজীবি, সুবিধাবাদী বলার কারন আপনি মুক্তিযুদ্ধকে গন্ডগোল বলার চেষ্টা করেছেন।
আর সুবিধাবাদের প্রমান আপনার লেখাতেই আছে। মুহিনের নাম নিয়ে লেখাটিতে কোথাও বলেননি আপনি যুদ্ধাপরাধের বিচার চান। বরং বলেছেন ঐক্যের স্বার্থে এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো। আমার জবাবেও আপনি আবার বলেছেন আপনি চান এসব ইস্যু নিয়ে কথা না হওয়াই ভালো। আবার শেষে এসে বলেছেন যে, বিচার চান, তবে এখন না। পরে। যেসব পলিটিশিয়ানদের সম্পর্কে খারাপ খারাপ কথা বলেছেন, যারা ৩৬ বছর তাদের বিচার করেনি তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে চান যুদ্ধাপরাধীদের ভবিষ্যত।
তার মানে আপনি চান এভাবেই কাটুক দিন। আমরা কিন্তু এই দিন বদলাতে চাই। যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে বলার কারনে আমার টিভি প্রোগ্রাম কিংবা আমার বিতর্ক নিয়ে যারা কথা বলছেন, তাদের বলি। এসব বলি বলেই গত সরকার শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানটি জোর করে বন্ধ করে দিয়েছিল। তাতে কার ক্ষতি হয়েছে? আমার? নাকি টিভি দর্শকদের? সবার কাছে প্রিয় থাকার জন্য সত্য বলা বন্ধ করতে পারবো না।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ২:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



