১৯৭০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, এস্কিমোরা ইউরোপিয়ানদের থেকে কম হৃদরোগে ভোগে।
জাপানিদের গড় আয়ু বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও এদের খাদ্য তালিকা ভিন্ন কিন্তু একটা জিনিস খুব
কমন, এদের সবারই খাদ্য তালিকায় রয়েছে সমৃদ্ধ মাত্রার ওমেগা-৩(Omega3) ফ্যাটি এসিড।
বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ওমেগা-৩।
কী এই Omega?
ওমেগা হচ্ছে একধরনের পলিআনস্যাটুরেটেড(Polyunsaturated) ফ্যাটি এসিড। একে বলা হয়
অত্যাবশ্যকিয় ফ্যাটি এসিড যা শরীরের জন্য প্রয়োজন কিন্তু মানব শরীর তা উৎপন্ন করতে পারে না। সুতরাং, খাবারের মাধ্যমে
এটি আমাদের গ্রহন করতে হয়। তিন ধরনের ওমেগা আছে-omega-3, omega-6, omega-9.
এর মধ্যে ওমেগা-৩ সবচেয়ে উপকারি।
ওমেগা-৩ একগুচ্ছ ফ্যাটি এসিডের সমন্বয়। এর ভিতর ৩টা আমাদের স্বাস্থের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ন।
EPA(eicosapentaenoic acid), DHA(docosahexaenoic acid) যা আমরা মাছের তেল থেকে
পেতে পারি। অন্যটি ALA(alphalinolenic acid) ,এটি পাওয়া যায় উদ্ভিদ থেকে।
এই ফ্যাটি এসিড আমাদের শরীরের সেল মেমব্রেন এ থাকে। কোষের ভিতর দিয়ে যেসব সাবস্টেন্স চলাচল করে তা নিয়ন্ত্রণ করা
এবং একটি সেলের থেকে অন্য সেলের মধ্যকার যোগাযোগ রক্ষা করে। যেসব সেলে বেশি ওমেগা-৩ থাকে সেসব সেলে ফ্লুইড এর
পরিমান বেশি থাকে এবং কার্যকর ভাবে কাজ করে। ওমেগা ফ্যাটি এসিড হরমোন উৎপাদনও নিয়ন্ত্রন করে।
ওমেগা-৩ এর উপকারিতা কি?
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ওমেগা-৩ ফ্যাট হার্ট ডিজিস রোধ করে। এটা রক্ত জমাট বাধা(Blood clotting) কমায় এবং হার্ট এটাক এর ঝুঁকি কমায়; যদি হার্ট এটাক হয় তবে তা মারাত্নক হবার সম্ভাবনা কমায়। স্ট্রোক এবং অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন কমাতে সাহায্য করে।
ব্লাড প্রেসার থিক রাখে। শিশুর মস্তিস্ক গঠনেও সাহায্য করে ওমেগা-৩। মাছ ব্যাতিত বুকের দুধ হচ্ছে DHA এর একমাত্র বিকল্প উৎস।
বিভিন্ন ইনফ্ল্যামেন্টরি ডিজিস (যেমনঃ রিউমাটাইড আথ্রাইটিস) এর বিরুদ্ধে লড়াই করে ওমেগা-৩।
আরো কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা-৩ ডিপ্রেশন এবং মনোসংযোগ ব্যাঘাত জনিত সমস্যার ক্ষেত্রেও কাজ করে।
প্রাথমিক কিছু গবেষণায় বলা হচ্ছে-ওমেগা-৩ ব্রেস্ট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার ও প্রোস্টেট ক্যান্সার বৃদ্ধির ঝুঁকি হ্রাস করে।
এজমা, এক্সিমা, নেফ্রটিক সিনড্রম, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি রোগের উপর এর উপকারি ভূমিকা নিয়ে কাজ করে চলছেন গবেষকরা।
ওমেগা-৩ কিভাবে পাবেন?
তেলযুক্ত মাছ হচ্ছে ওমেগা-৩ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উৎস।সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য সী ফুডে EPA এবং DHA থাকে।
অন্য ফ্যাটি আসিড ALA পাওয়া যায় উদ্ভিদ থেকে- বাদাম, ভেজিটেবল ওয়েল (সয়াবিন, অলিভ অয়েল, ফ্লেক্সসিড) এবং ওলিভ ওয়েল। এই সকল ALA হচ্ছে সর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড।আমাদের শরীর এই সর্ট চেইন ফ্যাটি এসিডকে লং চেইন ফ্যাটি এসিডে রুপান্তর করে।
কি পরিমান ওমেগা-৩ দরকার?
বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতিদিন ৬১০মিলিগ্রাম EPA ও DHA দরকার। মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪৩০মিলিগ্রাম। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন সামুদ্রিক তেলযুক্ত মাছ
খেলে এই পরিমান ওমেগা-৩ পাওয়া সম্ভব। হৃদ্ররোগের রুগীর জন্য আরো বেশি ওমেগা-৩ দরকার। একটা পরীক্ষায় দেখা গেছে, যাদের হার্ট এটাক হয়েছে তারা প্রিতিদিন ১গ্রাম ওমেগা-৩ ক্যাপ্সুল আকারে খেলে মৃত্যুর ঝুঁকি ২৫% পর্যন্ত হ্রাস পায়।
(গর্ভবতি মহিলাদের ওমেগা-৩ ক্যাপ্সুল গ্রহন কর উচিত নয় )
অতিরিক্ত মাছ খাওয়া কি ক্ষতিকর?
বর্তমানে জানা গেছে কিছু মাছে পারদ(markary) এবং PCB থাকে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে মাছের উপকারিতা স্বাস্থের জন্য এতই ভালো যে
এর ক্ষতিকর দিক্টা খুবি নগন্য, যদি আপনি সপ্তাহে ২দিন মাত্র মাছ খেয়ে থাকেন। মাছের তেলে পারদ থাকে না বললেই চলে, কারণ তেল পরিশোধন
পক্রিয়ায় ধাতব বস্তু দূর হয়ে যায়।
আপনি ভেজিটেরিয়ান হলে কি করবেন?
তবুও আপনি উদ্ভিদ উৎস থেকে ওমেগা-৩ পেতে পারেন কিন্তু সেটা ALA টাইপের। পুস্টিবিদ স্যারন ন্যাটলি বলেন-"আপনি ভেজিটেরিয়ান হলে আপনাকে পর্যাপ্ত পরিমান ALA সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। বর্তমানে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ ডিম ও ব্রেড পাওয়া যায়, এগুলোও খেতে পারেন আপনি।
আর মাছের তেল ক্যাপসুল আকারেও পাওয়া যায়। একটি ক্যাপসুলে সাধারাণত ৩০০মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ থাকে। তার মানে আপনাকে ২টি ক্যাপ্সুল খেতে হবে প্রতিদিন।
ওমেগা-৩ আসলেই কার্যকর কিনা?
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল(BMIJ তাদের সম্প্রতিক এক সমীক্ষায় জানিয়েছে-মাছের তেল থেকে যে ওমেগা-৩ পাওয়া যায় তা নির্দ্দিস্টভাবে হার্টডিজিস বা ক্যান্সার এর মৃত্যু ঝুঁকি কমায় না। অন্য একটি পরীক্ষায় আরো দেখা গেছে- মাছের তেলের ক্যাপসুল এবং অতিরিক্ত তেলযুক্ত মাছ নিয়মিত খেলে যাদের angina-(এক প্রকারের হার্টডিজিস) থাকে তাদের জন্য মৃত্যরও কারণ ঘটাতে পারে।
কিন্তু অন্য গবেষকরা BMJ এই রিপোর্টকে প্রত্যাখান করেছেন। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েসন এবং অস্ট্রেলিয়ান হার্ট ফাউন্ডেশন এখনো আপনাকে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ ডায়েট
গ্রহনের পরামর্শ দিচ্ছে।
অন্যকোন ক্ষেত্রে ওমেগা-৩ কি ক্ষতিকর হতে পারে?
ডায়াবেটিস এবং যাদের ব্লিডিং এর ঝুঁকি আছে তাদের ওমেগা-৩ গ্রহনের ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।কারণ, ওমেগা-৩ ব্লাড সুগার বাড়াতে পারে এবং রক্ত জমাট বাঁধায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। যাদের মাছ ও বাদামের প্রতি এলার্জি আছে তাদের এসব উৎস থেকে সংগ্রহিত ওমেগা-৩ গ্রহণ করা উচিৎ নয়। আপনি যদি অন্যকন ঔষুধ নিয়মিত খেয়ে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে মাছের তেলের ক্যাপসুল খাবার আগে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিবেন।
সাবান, শ্যাম্পু, ক্রিম ইত্যাদিতেও কি ওমেগা-৩ থাকে?
সাবান, শ্যাম্পু, ক্রিম ইত্যাদি অনেক পণ্যের গায়ে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ উল্লেখ থাকতে দেখা যায়। যদিও এতে উচ্চ মাত্রায় ওমেগা সমৃদ্ধ তেল থাকে কিন্তু এটা আপনার স্বাস্থের জন্য উপকারী এমন কোন প্রমান পাওয়া যায় না। ওমেগা-৩ খাদ্য হিসাবে গ্রহন না করলে কোন উপকার পাবেন না। সুতারং, এটা শুধুমাত্র বিপণনের কৌশলমাত্র।
Reader’s Digest, October2008 অবলম্বনে রচিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

