অনেক বছর আগের গল্প। স্মৃতির ভারে এখনও জীর্ণ হয়নি। অনার্স পরীক্ষা দিয়ে বাসায়। ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রফেসরের ফোন বাসায়। জিগ্যেস করলেন, ছুটির সময়ে একটা প্রজেক্টে কাজ করব কি-না? অতি উৎসাহে রাজী হয়ে গেলাম। ঠিকানা নিয়ে চলে গেলাম এক এনজিও'র গুলশান অফিসে। ওয়েটিং রুম থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিরেক্টরের অফিসে। মুখোমুখি রাশভারী পরিচালিকার। এক মাসের প্রজেক্ট। কাজ হচ্ছে অনুবাদকের। আমেরিকা থেকে একজন ফটোগ্রাফার আসছেন পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক প্রকল্পগুলোর উপর ছবি সংগ্রহের জন্য। আমি তার সাথে থাকব দোভাষী হিসেবে। জীবনের প্রথম কাজ। খুব এক্সাইটেড।
সময় মতো ঢাকা ছেড়ে গেলাম নাটোরের সিংড়া আর রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দিকে। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে যেতে হলো। নাটোরের অনেক এলাকা ঘুরতে হলো নৌকায়। মার্কিনী ফটোগ্রাফারের ক্যামেরার কারুকাজ আর যন্ত্রপাতি দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছে। সাত দিনের ট্রিপ। এদিকে অতিথি ফটোগ্রাফারের ক্যামেরার বিরামহীনভাবে শাটার সশব্দে ধারণ করছে বাচ্চাদের ছবি, দিগন্তজোড়া গাঢ়ো সবুজ প্রকৃতি, প্রকৃতির অনিন্দ্য সৌন্দর্য। আমি নিজেও মুগ্ধ। অসম্ভব আতিথেয়তা। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষগুলো বড্ডো আপন করে ভালবাসা উজাড় করে দিল। ভ্রমন শেষ হলো গোদাগাড়ীতে। কেন জানি আমি খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করি, যারা যতো দরিদ্র তাদের হূদয়ে ভালবাসা ততো প্রবল। কারণ, বিধাতা দেওয়ার মতো আর কিছু তাদের দেননি। তাই, বিধাতার একমাএ দান তারা একেবারে উজাড় করে দেন। আমার এই বিশ্বাস এতো বছর পরেও একটুও বদলায়নি।
ছোট পরিবারের আন্দোলন সফল হচ্ছে। দেশী-বিদেশী অতিথিরা সবাই খুব খুশী। ফেরার পথে অতিথি ফটোগ্রাফার বলল, আমেরিকায় গিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফটোগ্রাফগুলোর প্রদর্শনী করবে। একটু ধাক্কা খেলাম। নাটোরের কোন শিশুর নিষ্পাপ হাসি অথবা কোন সবুজ ডালে রঙিন পাখি ডিসির কোন এক্সপেনসিভ শোরুমে পোট্রেইট হিসেবে শোভা পাবে। বিক্রি হবে অনেক দামে। বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনায় বিদেশী অর্থের বিনিয়োগে পকেট ভারী হবে বিদেশী একজন ফটোগ্রাফারের। আমরা ধন্য। গ্রহীতার হাত চিরকাল নীচেই থাকে। ভিক্ষের চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া! আমাদের সাফল্যের রঙিন ছবিগুলো ধারণের জন্য আমরা অতিথি ফটোগ্রাফারের কাছে চির কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব। বিদেশী অর্থায়নে পাওয়া গেল দেশীয় সাফল্যের সচিএ প্রত্যয়নপএ!!!
রাজশাহী থেকে ফেরার পথে সবচেয়ে বড্ডো ধাক্কা খেলাম। এনজিও'র পরিচালিকার গাড়ীর ড্রাইভার এসে বলল, "ম্যাডামের জিনিসপএ আপনার গাড়ীতে নিতে বলেছে"। আমি অতিথি মানুষ। তাদের গাড়ীতে তাদের জিনিস তুলবে তাতে আমাকে বলার কি আছে? রাজশাহী শহরে হোটেল ছাড়ার পর ড্রাইভার যখন ম্যাডামের জিনিসের ফিরিস্তি দিল, তখন আমি খেলাম ফাইনাল ধাক্কা। সেসময় ঢাকায় ইন্ডিয়ান শাড়ীর কড়া ডিমান্ড। ম্যাডাম রাজশাহী থেকে ভারতীয় শাড়ীর কার্টন দিয়ে আমার গাড়ীর পেছন ভরে রেখেছেন। ভয়ে আমার হাত পা পেটের ভেতর ঢুকে গেছে। রাস্তায় যদি গাড়ী তল্লাশি হয় আর এতো শাড়ী আমার গাড়ীর পেছনে পায়, তাহলে পরের দিন হয়তো ইওেফাকে উঠবে, "ভারতীয় শাড়ী চোরাচালানি করে ঢাকায় আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাএ গ্রেফতার"!!!
ম্যাডাম অতগুলো শাড়ী দিয়ে কি করবেন? গুলশানে নিজের আলিশান বাড়ীতে এনজিও'র অফিস। সেখান থেকেও অফিস ভাঁড়া পান। প্রকল্পের পয়সা পান। তারপর ভারতীয় শাড়ীর কার্টন দিয়ে কি করবেন? সত্যি 'এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি'!!! প্রজেক্ট শেষে আমার হাতে গুণে গুণে কড়কড়ে নোটের নগদ পাঁচ হাজার টাকা। আমার জন্য অনেক টাকা!!! শাড়ীর গল্প শুনে মা কস্ট পেলেন। রাজশাহী থেকে মায়ের জন্য কোন শাড়ী আনিনি তাই। মাকে বললাম, "গাউসিয়া মার্কেটে গিয়ে তুমি পছন্দ মতো শাড়ী কেনো। আমি কি শাড়ী চিনি যে রাজশাহীতে শাড়ী কিনব"? দেশীয় মুদ্রা দিয়ে বিদেশী রং ঢং আর ব্র্যান্ড কিনতে প্রাণ করে আতিপাতি। দেশ উচ্ছন্নে যাক। বিদেশী কায়দায় আর ঢংয়ে চলতে বড়ো ভাল লাগে। তাই পুরো দেশটা বিদেশীদের পায়ের কাছে সমর্পন করে দিতে আমরা উদগ্রীব হয়ে থাকি। বাংলা বলতে না পারি অসুবিধে নেই, কিন্তু বিদেশী ডাকে কথা না বলতে পারলে উৎক্রান্তি হয় না।
প্রজেক্টের পাওনা টাকা এলো পকেটে ঠিকই। শেষ হলো নিমিষে। কিভাবে হলো জানি না? টাকা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়, তাই বিওশালীদের দরকার হয় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার। দরিদ্রদের খুচরো আধুলী মনে হয় কখনও শেষ হয় না। তাদের পকেটে খুচরো আধুলীর শব্দ তাই সবসময়ই পাওয়া যায়! পকেটে কেবল আধুলীর অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য একসময় টিউশনী করতাম। রোজগার ভাল। হঠাৎ এক বন্ধুর বিপদ। বন্ধুর বান্ধবী যশোহরে গ্রামের বাড়ীতে বেড়াতে গেছে। হঠাৎ সেখানে তার এপেনডিক্স অপারেশন। বন্ধুর মন চলে গেছে । কিন্তু পকেট তো গড়ের মাঠ!!! অবশেষে আমরা তিন বন্ধু জড়ো হয়ে ঠিক করলাম বন্ধুর জন্য যশোহরে যেতে হবে। সম্পূরক বাজেটের পয়সা উৎসর্গ করলাম আমার গাঁটের থেকে। বন্ধুর ভালবাসা সফল করার জন্য নিবেদিত প্রাণপুরুষ আমরা। প্রজেক্টের নাম দিয়ে চলে এলাম যশোহরে তিনদিনের জন্য। উঠলাম এক হোটেলে। তিনজন তরুণ দেখে হোটেলের ম্যানেজার চেক-ইন করার সময় বলল, ব্যাগ চেক করতে হবে, ব্যাগে কোন ড্রাগ আছে কি না তা দেখার জন্য। ম্যানেজারের সামনে ব্যাগ উপড়ু করে দেখালাম আমরা নেহাতই বিশ্ববিদ্যলয় পড়ুয়া ভদ্র ছেলে। ভালবাসার ড্রাগে আসক্ত বন্ধুর মনের চিকিৎসার জন্য যে আমাদের আগমন এই যশোহরে তা কি আর এই বেরসিক ম্যানেজার বুঝবে?
আড্ডার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো ছিল সবচেয়ে স্মৃতিবহুল। রেজাল্ট ভাল ছিল, কিন্তু 40 জনের ক্লাশরুমে চিরকালই শেষ সারিতে বসতাম। সেখান থেকে আড্ডা ও ক্লাশ পার্টিসিপেশন হতো। ডিপার্টমেন্টে এক নতুন তরুণ প্রফেসর যোগ করলেন। আমাদের ক'জনকে সবসময় লাস্ট বেঞ্চে বসাটা তার মনে সৃস্টি করলো অসীম কৌতুহুলের। লাস্ট বেঞ্চে বসে কঠিন আর জটিলসব প্রশ্ন জুড়ে দিয়ে প্রফেসরকে অপ্রস্তুত করাটা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। একদিন মওকা মতো আমাদের ক'জনকে হাতের নাগালে পেয়ে জিগ্যেস করে বসলেন, "আচ্ছা, তোমরা ক্লাশে ভালো পার্টিসিপেট করো, কিন্তু শেষ বেঞ্চে কেন বসো"? যারা ক্লাশে পড়া পারে না, তারাই বসবে শেষ বেঞ্চে। আমাদের উওর শোনার পর বেচারী অধ্যাপক হতবাক। বললাম, "স্যার লাস্ট বেঞ্চের দুর্ণাম ঘুচাবার জন্য শেষ সারিতে বসি"। অনেক বছর পর একদিন সেই স্যারের সাথে দেখা। জিগ্যেস করলাম, "কেমন চলছে স্যার"? উওর দিলেন, "ছাএ অনেক পাই, কিন্তু তোমাদের মতো ঝাল পাই না"। সবাই দায়সারা ভাবে পার পেতে চায়। লেখাপড়ার জন্য গবেষণার জন্য দেশে সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু লেখাপড়ার গুণগত মান কমেছে অতি দ্রুত। সাথের বন্ধু বান্ধব সহযোগী অধ্যাপক হয়ে বসে আছে। বাকীরাও অধ্যাপক হবে হবে করছে। কিন্তু গবেষণা বা প্রকাশনার কথা জিগ্যেস করলে লজ্জা পেতে হয়।
প্রকাশনার কথা আসাতে নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়। কিছুদিন আগে আমার স্কুলের এক শিক্ষকের সাথে দেখা। তিনি একটা ধমর্ীয় বই লিখেছেন। বইটি প্রকাশ ও বিক্রির দায়িত্ব দিয়েছিলেন কাঁটাবনে বইয়ের দোকানের মালিক এক প্রকাশককে। অভাগা স্যার তার বইয়ের তিরিশ হাজার টাকা দুই বছর পরেও ধান্ধাবাজ প্রকাশকের কাছ থেকে উদ্ধার না করতে পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তার কিছুদিন পর একদিন আজিজ মার্কেটে গিয়ে দেখি একটি জনপ্রিয় বইয়ের নতুন কপি ছাপিয়েছে খ্যাতনামা এক প্রকাশক। বইয়ের মূল লেখক মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। স্বত্বাধিকারী বইটির প্রকাশক নতুন এডিশন বের করার সময় পাওনা রয়্যালটি টাকাটা লেখকের পরিবারকে দেওয়ার কথা বেমালুম চেপে গেছে। টাকার ব্যাপারে কাঁটাবনের ধমর্ীয় প্রকাশক আর প্রগতিশীল প্রকাশকের মধ্যে কোন গুণগত ব্যবধান নেই। সবাইকে এক পাল্ল্লায় তুলে মাপতে চাচ্ছি না। তবে ট্রেন্ডটা যে অভিন্ন এবং এটাই যে মূলধারা হতে যাচ্ছে বলে আমি আশঙ্কিত হয়ে পড়ি।
এটা কি ধরণের ভয় তা বুঝাতে পারব না!!! তবে এটা সুশীল সমাজের ভয় না তা হলফ করে বলতে পারি। ভয়ের কথাই যখন হলো তখন মজার একটা গল্প বলি। আমাদের এক বন্ধু বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীার মুখোমুখি। ভয়ে রুমে ঢুকেই সে কাঁপছে। ইন্টারভিউ বোর্ডের এক সদস্য উৎসুক হয়ে জিগ্যেস করলো, "ভয় পাচ্ছ কেন? তোমাকে তো এখনও কোন প্রশ্নই করিনি"। বন্ধু উওর দিল, "স্যার কাঁপনের কি দেখছেন, কোশ্চেন কইরাই দেখেন না, কাঁপন কারে কয়"? আমাদের ভয় বা আশঙ্কা যে অনেক সময় অমূলক না তা বুঝতে একটু দেরী হয় এই যা। অনেক দিন আগের কথা। সামরিক স্বৈরশাসক লেজেহোমো এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। আমি বাসায় থাকি। তবে বিকেলে আড্ডা মারার জন্য যাই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। সেদিন বাসায় ফিরতে একটু রাত হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রতিবেশী এক বান্দর এসে মাকে বলে গেল, "বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাগুলিতে প্রচুর ছেলেমেয়ে মারা গেছে"। এই খবর শুনে মা আমার প্রায় মুচ্র্ছা গেছে। সব মায়ের কাছেই তাদের সন্তান বড্ডো আদরের। বাসায় ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে বলি, "আমি কোন আন্দোলনে যাইনি তারপরেও তুমি উড়ো খবরে এতোটা ভেঙ্গে পড়েছ কেন"? নুর হোসেনও কিন্তু তার বাবা মায়ের অতি আদরের ছিল। কি অসম্ভব সাহসের সাথে আত্মত্যাগ করলো গণতন্ত্রের জন্য!! নুর হোসেনদেরকে বেরোতে হয় বারবার গণতন্ত্র মুক্তি পাক বুকে পিঠে লিখে। আর কতবার আমরা নুর হোসেনদের আত্মত্যাগের সাথে বেঈমানী করে যাব!!! কেন যেন মনে হয় ইতিহাস কেবল পাতা বদলায়, কিন্তু গল্পগুলো একদম বদলায় না।
সময়ের কাঁটা ধরে এগিয়ে চলে জীবনের ঘড়ি। কিন্তু জীবনের গল্পগুলো পায়ে পায়ে চলতে থাকে। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, এই তো সেদিন এসেছি ব্লগে। 2005 সালের ডিসেম্বরের 17 তারিখে তিন লাইনের লেখা দিয়ে [link|http://www.somewhereinblog.net/Adda/post/21|
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



