আমরা সিঁড়িতে বসি। সিঁড়িটা এত লম্বা যে এটার শেষ দেখা যায় না। মনে হয়, শেষ মাথা বুঝি আকাশ ছুঁয়েছে। রাতটা আরও গভীর হয়। স্টেশান থেকে শেষ শাটল ট্রেনটা ছেড়ে যায়। হর্ণ শুনি। আমাদের বুকে ব্যাথা বাজে। পৃথিবীর আলো থেকে মনে হয়, এই বুঝি কেউ আমাদের ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারের গুহায়।
আমাদের আলোচনাটা আস্তে আস্তে বিষয়বস্তু পাল্টায়। হাসান ফস করে ম্যাচের আগুনে সিগারেট ধরায়। অন্ধকারের মধ্যে তার চেহারা গ্রীক দেবপুত্রের মতন মনে হয়। আগুনটা ওঠা নামা করে ওর ঠোটে। তারপর হাত বদলে চলে যায় অন্য কারো ঠোটে। আগুন ক্রমশ ঘুরে আমাদের মাঝে।
আড্ডাটা লাগামহীন চলে। কী নিয়ে শুরু করেছিলাম, মনে করতে পারিনা। মনে করার চেষ্ঠা করি। প্রেম-জীবন-যুদ্ধ-সংসার-কবিতা-সমাজ-নারী, নাকী দেহ? তারপর আর তাল খুজে পাই না। এখন চলছে মাছ চাষ নিয়ে।
কোথ্থেকে যে কোথায় এলাম ভেবে পাই না।
আমাদের মাঝে রুদ্র কবি, কবিতা লেখে। ওর কবিতা প্রায়ই আসছে আজকাল পত্রিকা এবং লিটলম্যাগ গুলোতে। হাসান একটা পত্রিকায় চাকরি করে। আমরা একদিন আগেই সব খবর পেয়ে যাই তার কাছে। মোশারফ জীবটাকে নিয়েছে উপভোগের সামগ্রি হিসেবে। ও পরজন্মে বিশ্বাস করেনা। বলে পরকাল বলে কিছু নেই। " সো লেটস, এনজয়।" আর রুবেল গান গায়। ওরা সবাই কিছু না কিছু করছে। হাসানের মতে পৃথিবীটা বাসের অযোগ্য। এটাকে পাল্টাতে হবে। আর রুদ্র বিশ্বাসীদের দলে। এখনো সে পৃথিবীতে নারী, নদী, আর আর মানুষের মাঝে কোমলতা খুজে পায়। ঝাঁকড়া চুলের রুবেল চায়, গান গেয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতে। আর মোশারফ প্রতিদিন শুনায় তার নতুন নতুন প্রেমের গল্প।
আমি শুধু শুনি। শুনতে শুনতে টের পাই সিড়ির পাশের কামিনি গাছটাতে হু হু করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। এক ধরনের মাদকতা আমাদের চারপাশকে ঘিরে ধরে।
আজ দুপুরে মায়ের চিঠিটা পেয়েছি। মা জানতে চেয়েছে -আমার আর কতদিন বাকী? ছোট বোনটার পরীক্ষার ফিস যোগাড় করতে মায়ের হাতের শেষ চুড়িটাও বিক্রি করতে হয়েছে। কতদিন মা মাথার চুলে নারিকেল তেল দেন না। ডিম বিক্রির টাকাটাও আমার হাতে তুলে দেন বাড়ি গেলে। ওরা সবাই স্বপ্ন দেখছে আমি পাস করেই একটা বড়ো চাকরী পাবো। সংসারের সকল দুঃখ আমি মুছে দেবো। আমার সীমাবদ্ধতা আমি জানি। চিন্তার রেশ কেটে যায়, রুবেল হঠাৎ গান ধরে--"বাউলা কে বানাইলোরে..........."।আমি বাউলা হতে চাই। নিজেকে হঠাৎ করেই হাসন রাজা মনে হয়। ভুলে যেতে চাই সকল সীমাবদ্ধতা। মনে মনে ভাবী, পৃথিবীর কারো কাছে আমার দায়বদ্ধতা নেই। আমার দায়বদ্ধতা শুধু এই সিঁড়িটার কাছে ................
(ঢাবির ছাত্র আবু বকরকে উৎসর্গ করা হলো এ লেখাটা)
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


