আমার প্রিয় পোস্ট

একজন বইপোকা।

জীবনানন্দের মৃত্যু রহস্য

১৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:২০

শেয়ারঃ
0 35 0

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু রহস্য নিয়ে আলোচনার আগে জীবনানন্দের বাস্তব জীবনের কিছু কথা বলে রাখা ভাল। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আধুনিক কবি জীবনানন্দ।
বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ একটি মজবুত স্তম্বের মতো, বাংলা কবিতার ইতিহাস জীবনানন্দ ছাড়া লেখা যাবেনা। সাম্প্রতিক রোদ্দুরের দিক চিহ্নের মতো জীবনানন্দ আমার কাব্য সাহিত্যকে সাজিয়েছিলেন। তার অস্তিত্ব দিগন্তরেখার মতো এই রেখার সূচনা আছে; কিন্তু শেষ দেখা যায় না। বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ এক অমর নাম। যদিও তিনি জীবিত অবস্থায় তেমন সাড়া পাননি। "তার জন্ম
১৩০৫ বঙ্গাব্দের ৬ ফাল্গুন ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ বরিশাল শহরে। জীবনানন্দ দাশ বরিশালের ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজে অধ্যয়ন আরম্ভ এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেন ১৯২১ সালে। ১৯২২ সালেই তিনি যোগ দেন কলকাতার সিটি কলেজে, ছিলেন ১৯২৮ অবধি। এরপর দিলিল্গর রামযশ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন ১৯৩০ থেকে এক বছর; ১৯৩৫ সালে বরিশালে চলে এসে যোগ দেন ব্রজমোহন কলেজে, ছিলেন ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৫১ থেকে '৫২ সাল পর্যন্ত পড়িয়েছেন খড়গপুর কলেজে, ১৯৫৩ সালে বাড়িষা কলেজে, পরের বছর হাওড়া গার্লস কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন। ১৯৩০ সালে বিয়ে করেন লাবণ্য গুপ্তকে; তাদের দুই সন্তান_ মঞ্জুশ্রী ও সমরানন্দ।" (সূত্রঃ সৌমিত্র শেখর)
জীবনানন্দের কবিতা পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন : "তোমার কবিতা চিত্ররূপময়, সেখানে তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।" বুদ্ধদেব বসু লিখলেন : "ছবি আঁকতে তার অসাধারণ নিপুণতা; তার ছবিগুলো শুধু দৃশ্যের নয়, বিশেষভাবে গন্ধের ও স্পর্শের।"

"জীবনানন্দ দাশকে বলা হয় ধূসরতার কবি, নির্জনতার কবি" আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেনঃ "আত্মমগ্ন কবি।" তার কবিতায় যে ধীর গতীর গতীময়তা সত্যি পাঠককে নিয়ে যায় অনেক দূরে। তিনি যে গভীর আবেগ তার রচনায় রেখে গেছেন তা বাংলা কবিতায় বিরল ইতিহাস।এক কথায় জীবনানন্দ দাশ গভীরতর থেকে গভীরতাস্পর্শী কবি। আবেগের তীব্র তীর আর হৃদয় খুঁড়ে জেগে ওঠা বেদনা প্রকাশের ভাব ও ভাষা বাংলা সাহিত্যে তুলনারহিত। তাই, কোন এক জীবনানন্দ গবেষক বলেছিলেনঃ "জীবনানন্দ দাশ শুধু নির্জনতা আর ধূসরতার কবি নন, তিনি স্থিতধী সময়-সচেতন কবিপ্রাণ, তিমির হন্তা আলোকরশ্মিমালা।"
আমরা জীবনানন্দের জীবনী পাঠ করলে দেখি ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হন কবি জীবনানন্দ দাশ। এই দুর্ঘটনার কারণেই ২২ অক্টোবর শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। আজকের আলোচনা মৃত্যু রহস্য নিয়ে। রহস্যের কবি জীবনানন্দ কতো রহস্যের জন্ম দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে এমনকি মৃত্যুটাও রহস্যাবৃত।

জীবনানন্দ সংসারজীবনে সুখী ছিলেন না- এই সন্দেহটা কবির পরিবার ছাড়িয়ে পাঠক মহলে অনুরণিত হতে শুরু করে ট্রাম দূর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর। "লাবণ্য দাশের অনেক অভিযোগ ছিল জীবনানন্দের প্রতি। সরাসরি বলব: রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সংসারজীবনে ছিলেন সুখী, জীবনানন্দ তা ছিলেন না।" ( আবদুল মান্নান সৈয়দ ) আসলে জীবনানন্দ দুর্ঘটনার শিকার নাকি সেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন ? একটা বিশাল প্রশ্ন জীবনানন্দ পাঠকদের।

১৪ অক্টুবর "জলখাবার" "জুয়েল হাউজের" সামনে দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন জীবনানন্দ দাশ। শুধু অন্যমনস্ক নয়, কী এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন কবি। চলন্ত ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম স্পটিং স্টেশন থেকে তখনো প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে। অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিল ট্রাম ড্রাইভার। যা অনিবার্য তাই ঘটলো। গাড়ি থামল তখন, প্রচন্ড এক ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই কবির দেহ যখন ক্যাচারের ভিতর ঢুকে গেছে। ক্যাচারের কঠিন কবল থেকে অতি কষ্টে টেনে হিঁচড়ে বার করলেন সবাই কবির রক্তাপ্লুত, অচেতন দেহ। কেটে, ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে এখানে সেখানে।।....... চুরমার হয়ে গেছে বুকের পাঁজরা, ডান দিকের কটা আর উরুর হাড়।"
( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায়)

জীবনানন্দ সমালোচকরা অনেকেই বলেন জীবনানন্দ আত্মহত্যা করেছেন তারা তার অনেক কবিতা উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন জীবনানন্দ আত্মহত্যাই করেছেন । কারণ তার কবিতায় মৃত্যুময়তার প্রতি আকর্ষণ লক্ষ্য করা গেছে। "পাই নাই কিছু, ঝরা ফসলের বিদায়ের গান তাই
গেয়ে যাই আমি, মরণেরে ঘিরে এ মোর সপ্তপদী" (ঝরা ফসলের গান)
"যেই ঘুম ভাঙ্গেনাকো কোনদিন ঘুমাতে ঘুমাতে সবচেয়ে সুখ আর সবচেয়ে শান্তি আছে তাতে”।
"কোথায় রয়েছে মৃত্যু? কোনদিকে? খুঁজি আমি তারে,"

তারা আরো প্রমাণ পেশ করেন কবি পত্নি লাবণ্য দাশের উক্তি দিয়েঃ "...মৃত্যুর পরপার সম্বন্ধে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষন ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন আচ্ছা বলোতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে? "
(আমার স্বামী জীবনানন্দ দাশঃ লাবণ্য দাশ)

জীবনানন্দের অমর গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দ বলেনঃ তাঁর মৃত্যুকে স্বেচ্ছামৃত্যু বলেই মনে হয় আমাদের। এই মরণেচ্ছার বাস্তব কারণও ছিল। অন্তত একজন লেখক, জীবনানন্দ বিষয়ে অসীম উৎসাহী, জীবনানন্দেরই সমকালীন কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের একটি সাক্ষ্য আমাদের ধারণার সপক্ষে আমরা দাঁড় করাতে পারি। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের একটি পত্রাংশঃ
"আমার মনে হয় জীবনানন্দ ঠিক ট্রাম দূর্ঘটনায় মারা যাননি। যদিও এই কথাটাই সর্বত্র বলা হয়ে থাকে এবং আমরা দেখেছি; তথাপি আমার ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেছেন।"
(জীবনানন্দের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্রঃ আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত)

২০ এপ্রিল বেঙ্গল গ্যালারিতে সাহিত্য পত্রিকা 'কালি ও কলম'-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টি, জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আলোচনা। আলোচক ভূমেন্দ্র গুহ। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুটা আত্মহত্যা ছিল কি না এ জাতীয় প্রশ্ন করা হলে ভূমেন্দ্র গুহ বলেনঃ "কলকাতার ইতিহাসে জীবনানন্দই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তার ডায়েরির লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, তিনি মৃত্যুচিন্তায় চিন্তিত ছিলেন। এক্ষেত্রে এটা আত্মহত্যা হলেও হতে পারে।"

অন্যদিকে আমরা যখন ট্রাম পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা সুবোধ রায়ের মুখে শুনতে পাই তখন বিব্রত হয়ে পড়ি । সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারিনা। শুনুন তার মুখ থেকেঃ "শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে দু নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় কবিকে। খবর পেয়ে দেখতে আসেন অনেকেই। এসে পড়েন কবির নিকটাত্নীয় স্বনামধন্য চিকিৎসক শ্রী অমল দাশ, এবং আরেকজন খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ ডঃ এ.কে.বসু। "ডাক্তার অমল দাশকে দেখে ধড়ে প্রাণ এলো কবির, কে বুবু ? বুবু এসেছিস ? বাঁচিয়ে দে....। শিশুর মতো অসহায় কণ্ঠ বুবু, বাঁচিয়ে দে ভাই!" এখানে কবিকে বেঁচে থাকার জন্য ব্যাকুল হতে দেখতে পাই !
( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায় )

অবশেষে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারি অজানা রয়ে গেল জীবনানন্দের মৃত্যু রহস্য।

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩০
সিউল রায়হান বলেছেন: জীবনানন্দকে নিয়ে আপনার সবগুলো লিখাই পড়লাম :) খুব চমৎকার লাগলো...... নিয়মিত লিখে যান...... শুভকামনা.......
১৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩৫

লেখক বলেছেন: অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

২. ১৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩৩
একলব্যের পুনর্জন্ম বলেছেন: ভালো লাগলো । ধন্যবাদ পোস্ট টার জন্য । ++
১৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৩৬

লেখক বলেছেন: মন থেকে ধন্যবাদ।

৩. ১৭ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:৫৯
একরামুল হক শামীম বলেছেন: ভালো লেখা।

ধন্যবাদ লেখাটার জন্য।
১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:০২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।

৪. ১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:০৫
তমিজ উদ্‌দীন লোদী বলেছেন: ভালো লাগলো।
অনেক শুভেচ্ছা।
১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:১১

লেখক বলেছেন: স্যালুট কমরেড।

৫. ১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১:৩৯
সৌরভ সাখাওয়াত বলেছেন: ভালো লাগলো। প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে লেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ২:০৭

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।

১৮ ই নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:১১

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।

৭. ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:৩৪
শেরিফ আল সায়ার বলেছেন: অসাধারণ একটি লেখা। দেরীতে হলেও পড়া হলো।
চমৎকার বিশ্লেষণ। তবে খারাপ লাগলো, খুব কম পড়া হয়েছে লেখাটি।
ব্লগে ভালো লেখা পড়ার অভ্যাসটা যেনো নিভেই গেছে।

ভালো থাকবেন। :)

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৪৮৮ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে মুক্ত করো হে বন্ধ,
সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ;
চরণপদ্মে মম চিত নিস্পন্দিত করো হে,
নন্দিত...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই