প্রথম পর্ব
৩
ক্লাসজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি। বাংলা স্যার এতো কড়া হতে বোধহয় এই ক্লাসের আর কেউই কোনোদিন দেখেনি। স্যার বেশ জোর গলায় সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছেন। তার ক্লাসে একদিনও পড়া কমপ্লিট না করে আসা যাবে না। তার ক্লাস চলাকালীন টু শব্দ করা যাবে না। তার ক্লাসের সময় কেউ মরে না গেলে বাইরে যেতে পারবে না। এমন আরো অনেক আজগুবি ও মেজাজ খারাপ করা সব নিয়মকানুন জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই স্যারের নাম আশরাফ। তার নাম শুনলেই কলেজসুদ্ধ সবাই থরথর করে কাঁপে। তিনি একবার যে নিয়ম করেছেন, সেটাই সই। তার নড়চড় কোনোভাবেই চলে না। একবার ক্লাসে একটা ছেলে বাথরুমে যেতে চেয়েছিল। স্যার তাকে বেশ কড়া শাস্তি দিয়েছিলেন। তা দেখে সবাই একেবারে সোজা হয়ে গিয়েছিল।
আশরাফ স্যার চলে যেতেই সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সিনথিয়া এসে সাইফের পাশের বেঞ্চে বসে বলল, ‘বাঁচা গেল, তাই না?’
মাথা নেড়ে সাইফ বলল, ‘হুম।’
‘কিছু কিছু স্যারই থাকে এমন বদ। এগুলোর অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া যেন কোনো গতি নেই।’
‘গতি থাকবে কীভাবে বলো? প্রিন্সিপালের সঙ্গে তার ভালো খাতির যে।’
‘সেটাই তো মূল সমস্যা। নইলে কবে তার নামে নালিশ করা যেত। ব্যাটা পড়ায় বাংলার মতো একটা সাবজেক্ট, ভাব দেখায় যেন ক্যালকুলাস পড়াচ্ছে,’ রাগ ঝাড়লো সিনথিয়া।
একটু হেসে সাইফ বলল, ‘তুমি এতো রাগ করছো কেন? তোমাকে তো আজ পর্যন্ত কিছুই বলেনি। কোনো শাস্তিও পাওনি। তাতেই এতো রাগ?
‘শাস্তি দেয়া লাগবে না। লোকটার হামতুম আমার মোটেই পছন্দ নয়।’
‘হুম।’
পরের ক্লাসটা অ্যাকাউন্টিং। প্রধান সাবজেক্ট হওয়ায় এই বিষয়ে সবাই মনোযোগ দেয়। কিন্তু অ্যাকাউন্টিং-এর স্যারটা যেন আবার সুবিধার নয়। তিনি পড়ানোর চেয়ে গল্প করতেই বেশি ভালোবাসেন। অবশ্য এ নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, তিনি যে অল্প সময়টুকু পড়ান, তাতেই ছাত্রছাত্রীদের মাথায় একেবারে গেঁথে দিতে পারেন পড়া। সিনথিয়ার ভাষায়, এই স্যারটা হলেন বর্ন টিচার। মানুষকে শেখানোর জন্যও বুদ্ধি থাকতে হয়। এই স্যারটার সেই বুদ্ধির কোনো অভাবই নেই, এমনটাই মনে করে সিনথিয়া।
৪
এভাবে কলেজের পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে খানিক কথাবার্তা আর সাইফের প্রতি সিনথিয়ার কড়া নজরদারির মধ্যে আরো কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে। এর মধ্যে সাইফ আর সিনথিয়ার বন্ধুত্বও হয়েছে আরও অনেক ঘনিষ্ঠ। কিন্তু এই বন্ধুত্বের মধ্যেও সাইফের কেমন যেন একটা কেয়ারলেস ভাব সবসময়ই খেয়াল করেছে সিনথিয়া। কেবল সিনথিয়াই নয়, ক্লাসের আরো অনেকেই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে। একদিন অনেক আগ্রহ নিয়ে সিনথিয়া বৃষ্টিতে ভেজার জন্য সাইফকে ডেকেছিল। সেদিন বাইরে তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টি না বলে ঝড় বলা ভালো। কলেজের প্রায় সবাই, এমনকি কয়েকজন টিচারও ভিজতে শুরু করেছিল সেদিনের বৃষ্টিতে। আর ছেলেমেয়েদের কথা তো বাদই। তখন সবার দেখাদেখি সিনথিয়াও বেশ লাফালাফি করতে করতে এসে সাইফকে ডাকল, ‘অ্যাই সাইফ, বৃষ্টিতে ভিজবো আসো তো!’
‘তুমি বৃষ্টিতে ভিজবে আমি এসে কী করবো?’ দায়সারাভাবে জবাব দিলো সাইফ।
সেটা গায়ে না মেখে সিনথিয়া বলল, ‘কাম অন দেরি করো না বৃষ্টি কমে গেলে মজা শেষ। এতো জোরে বৃষ্টি পড়তে আমি কোনোদিন দেখিনি। ঠিক যেন বাথরুমের শাওয়ারের ফুল ফোর্সকেও হার মানাবো। তুমি আসো তো! ভিজলে তোমার ভালো লাগবে। আমি বললাম না?’
‘না আমি ভিজবো না। তোমার ভিজতে ইচ্ছে করছে, তুমি যাও। আমাকে টাইনো না। প্লিজ।’
‘আরে কি আশ্চর্য! এমন দিনে কেউ ঘরে বসে থাকে নাকি?’ বলে সাইফের হাত ধরে টানতে শুরু করলো। সাইফ বলল, ‘সিনথি লিভ মি অ্যালোন।’
তাতে কান না দিয়ে টানতে থাকলো সিনথিয়া।
‘সিনথি জাস্ট লিভ মি অ্যালোন!’ রীতিমতো চিৎকার করে বলল সাইফ।
সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ছেড়ে দিল সিনথিয়া। যেন কারেন্টে শক খেয়েছে। কিছুক্ষণ বিমূঢ়ের মতো তার দিকে তাকিয়ে থেকে এক ঝটকায় ঘুরে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল সে।
তখন রুমে অনিক, শাকিলসহ আরও কয়েকজন ছিল। তারা অনেকদিন ধরেই খেয়াল করছে সিনথিয়ার সঙ্গে সাইফের এমন আচরণ। তারা এসে সাইফের পাশে বসল। ‘সাইফ, তোমার সমস্যাটা কী আমাকে বলবা?’
সাইফ ততক্ষণে চুপ হয়ে গেছে। রাগের মাথায় এভাবে ঝাড়াটা ঠিক হয়নি সেটা বুঝতে পেরে এখন তার খারাপ লাগছে।
অনিক আবারো জিজ্ঞেস করল, ‘কী হলো বলো? সিনথিয়া তোমার সাথে অনেক মিশে। তোমার মতো আর কারো সাথে সে এতো মিশে না। ও তোমার খোঁজ-খবরও রাখে অনেক। তবুও কেন তুমি ওকে এভাবে এড়িয়ে চলো?’
‘আমি জানি না,’ বিষন্ন মনে জবাব দেয় সাইফ।
তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল সিনথিয়া।
৫
সিনথিয়াকে এভাবে কষ্ট দেয়ার ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও অনেকবার সাইফ তার সঙ্গে রীতিমতো অনেক কষ্ট দিয়েছে। সিনথিয়া যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে বুঝতে পেরেছে কোনো একটা কষ্টময় অতীতে ডুবে আছে সাইফ। অতীতটা কী, তা সিনথিয়া এখনো জানে না। ও ভেবেছে একদিন সাইফই তাকে সব বলবে। কিন্তু সাইফ আজও তাকে বলেনি কিছু।
কিন্তু আজ বৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে অন্য একটা কথা ভাবছে সিনথিয়া। সে কাঁদছে কেন? সে শক্ত-সামর্থ্য একটা মেয়ে। তার মা বলে, জন্মের পর নাকি ও তেমন একটা কাঁদেইনি। অনেক চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে ও। কোনোকিছুতে কষ্ট পেলে সেটা মানিয়ে নেয়ার এক ক্ষমতা রয়েছে তার যা তাকে যে কোনো পরিস্থিতিতে মনকে শক্ত রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সাইফের সঙ্গে কিছু হলে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না কেন? সাইফ তো তার সঙ্গে তেমন একটা ভালো করে কথাও বলে না। এমনিতে সে খুব ভালো ব্যবহার করে। খোঁজ-খবরও রাখে। কিন্তু সাইফতো ওর সঙ্গে অন্যভাবে কখনো মেশেনি। উল্টো একটু দূরে দূরে থেকেছে। তাহলে কি তার এই দূরে দূরে থাকাটাই তাকে কাছে টেনেছে? প্রতিটি বন্ধন কি দূর থেকেই আবদ্ধ হয়ে যায়?
এমনি নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল সিনথিয়ার মাথায়। সে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে থাকলো। তিন-চারদিন টানা সে শুধু এটা নিয়েই ভাবলো। সবশেষে সে সত্যটা টের পেল, সে সাইফকে পছন্দ করে ফেলেছে। কীভাবে কখন এটা হলো, সে বুঝতেও পারলো না। কিন্তু সত্যটা টের পেয়ে সে খুব কষ্ট পেল। নিজের উপর সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। সাইফ ভালো একটা ছেলে। কিন্তু সম্পর্ক তৈরি করার মতো ছেলে হয়তো সে নয়। এমনিতেই সাইফ তাকে অনেক এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। তার সঙ্গে সম্পর্ক হলে তো তাকে কষ্টই পেতে হবে। তবে কি এতোদিনের হাসিখুশি সিনথিয়া জেনেশুনে কষ্টের জীবন বেছে নিবে?
(তৃতীয় পর্ব )
প্রথম প্রকাশ
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



