(পর্ব ৫ )
১৩
‘সিমির সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব এতোটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে আমাদের দু’জনের এমন কোনো কথা নেই যা অন্যজন জানতো না,’ সাইফ বলতে শুরু করলো। ‘ও ওর জীবনের খুঁটিনাটি যেমন আমার সঙ্গে শেয়ার করতো, আমিও আমার জীবনের খুঁটিনাটি সবই ওর সঙ্গে শেয়ার করতাম। বলা যেতে পারে, আমার জীবনের প্রথম বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ায় আমিও মন খুলে ওর সঙ্গে কথা বলতাম। তবে একটা সময় পরে ওর সঙ্গে যত কথা হতো তার বেশিরভাগই ছিল ওর বয়ফ্রেন্ড নিয়ে। কারণ, ঐ সময়টায় ওদের মধ্যে বেশ সমস্যা চলছিল।’
সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘কী সমস্যা?’
‘সমস্যাটা কী নিয়ে এর উত্তর আসলে এক কথায় দেয়া মুশকিল। আগেই বলেছি, ওর বয়ফ্রেন্ড খুব পজেজিভ মাইন্ডেড ছিল। তাই ছোটখাটো বিষয়েও অনেক বড় সমস্যার সৃষ্টি হতো। যেমন ধরো ওকে জিজ্ঞেস না করে কাউকে সিমি ফেসবুকে ফ্রেন্ড বানালে, কিংবা নিজের কোনো ছবি ফেসবুকে দিলে ও রেগে যেত। এ নিয়ে ওদের সমস্যা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছিল। আর সিমি এই স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছিল।’
‘তখন আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম ওর মন ভালো রাখার। ওর মন অন্য বিষয়ে ডাইভার্ট করার চেষ্টা করতাম। ওকে হাসানোর চেষ্টা করতাম। খুব একটা পারতাম না অবশ্য। ও আমার সঙ্গে ওর মনের সব কথা খুলে বলতো। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। শুনতে ভালো লাগতো ওর কথা। ওর সমস্যা নিয়ে টেনশন করতাম। পরামর্শ দিতাম। আমি যে ওর কথা শুনছি এ নিয়েও ও বেশ খুশি ছিল। ও বলতো, ওর কথা শোনার কেউ নেই। তা শুনে অবশ্য আমার ভালোই লাগতো। কারো জীবনে একেবারে আলাদা কেউ হওয়ার অন্যরকম একটা অনুভূতি আছে। এই অনুভূতি শুধু ভালোবাসা থাকলেই হবে এমন কিন্তু নয়। কারণ, তখন আমাদের মাঝে এমন কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। আমরা অনেক কাছে ছিলাম। আবার একই সঙ্গে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখতাম।’
‘এর মাঝে সিমির সঙ্গে আমার কয়েকবার দেখা হলো। বেশিরভাগই শুক্রবারে। ও পড়ার নাম করে বের হয়ে আমাকে হঠাৎ হঠাৎ ফোন দিয়ে বাইরে ডাকতো। ডেকে নিয়ে অবশ্য সরি বলতো আমাকে এভাবে যখন-তখন ডেকে নেয়ার জন্য। কিন্তু আমার খারাপ লাগতো না। একটা মেয়ে বলে নয়, সিমি বলে, জাস্ট ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সিমি বলে ও আমাকে যখনই ডাকুক আমার যেতে খারাপ লাগতো না। আমরা রাস্তার ধারে বসে কথা বলতাম। বেশিরভাগই ওর আর ওর বয়ফ্রেন্ডের সমস্যার কথা। আমি মন দিয়ে শুনতাম। মন খারাপ করতাম। কারণ, সিমি অনেক ভালো একটা মেয়ে। অ-নে-ক ভালো এবং খুবই এক্সেপশনাল ধরনের একটা মেয়ে। আর ও ওর বয়ফ্রেন্ডকে খুবই ভালোবাসতো। এমন ভালোবাসা পেয়েও কেউ দিনের পর দিন মানসিক কষ্ট দিতে পারে কীভাবে এটা ভেবে অবাক লাগতো।’
সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘ওর বয়ফ্রেন্ড জানতো যে ও তোমার সঙ্গে দেখা করছে?’
সাইফ বলল, ‘দেখা হচ্ছে এটা জানতো। কিন্তু ঠিক কখন দেখা হচ্ছে এটা জানতো না। এ নিয়ে তখন অবশ্য সিমিকে আমি বলতাম যে এটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু সিমি ততোদিনে কষ্ট পেতে পেতে কেয়ারলেস হয়ে গিয়েছিল। আর ওর সব কথা আমাকে না বললে ও শান্তি পেতো না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাইফ। ‘আর আজ ও আমার থেকে কত দূরে চলে গেল। আমার যে এটা ভাবতেই কতোটা ভালো লাগতো যে ও আমার সঙ্গে সব কথা শেয়ার না করলে থাকতে পারে না, ও কোনোদিনই জানবে না।’
সিনথিয়া চুপ করে রইলো। কষ্টটা মেনে নিয়ে সাইফের আবার বলা শুরু করার অপেক্ষায় রইলো। কিছুক্ষণ পরই সাইফ আবার বলতে শুরু করলো, ‘ওর আর আমার বন্ধুত্বের সময়গুলোর মনে রাখার মতো একটা ঘটনা হলো ওর কলেজ পালানোর কথা। ও একদিন খুব সকালে উঠে আমাকে ফোনে জিজ্ঞেস করলো ও আজ কলেজে যাবে না আমি দেখা করতে পারবো কি না। শুনে তো আমি অবাক। আমি তখনো ঘুমাচ্ছিলাম। ও যখন ডাকছে তাই আর না করিনি। রেডি হয়ে বের হলাম। সেদিন ও আর আমি টিএসসি গিয়েই অর্ধেক দিন কাটালাম। ওটাই ছিল আমার প্রথম টিএসসি যাওয়া।’
‘আমরা গিয়ে নামলাম নিউ মার্কেট। সেখান থেকে রিকশায় টিএসসিতে। ওখানে গিয়ে প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না কোথায় বসা যায়। কতগুলো ছেলেকে দেখলাম বারান্দায় ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। আর রাস্তার পাশে অনেকগুলো চা-সিগারেটের দোকান। এখানে দাঁড়িয়ে যখন ভাবছিলাম কী করা যায় তখন এক পিচ্চি কতগুলো গোলাপ ফুল নিয়ে উদয় হলো।’
সিনথিয়া হেসে উঠলো। ‘তাই নাকি? তারপর?’
‘পিচ্চি এসে অনেক রিকুয়েস্ট শুরু করে দিলো ‘আপু’কে একটা গোলাপ ফুল দিতে। আমি অনেক মজা পেলাম। আর সিমি পেল লজ্জা। ওর লজ্জা বাড়াতে আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, কিরে ফুল নিবি একটা? ও যেন কয়েক হাত পিছিয়ে গেল আর অর্ধশত বার না করলো। পরে অবশ্য পিচ্চিটাকে দশ টাকা দিয়ে বিদায় করে দিয়েছিলাম। ফুল আর কেনা হয়নি।’
সিনথিয়া বলে উঠলো, ‘আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে।’
‘কী প্ল্যান?’ সাইফ অবাক চোখে তাকালো।
‘আজ কলেজ পালাবো।’
‘বলো কী? কেন?’
‘গল্প শোনার জন্য। আজ তেমন ইমপরট্যান্ট ক্লাস নেই। আর দুই-একদিন ক্লাস না করলে কিছু হয়না। চলো।’ এই বলে সিনথিয়া উঠে গেটের দিকে পা বাড়ালো। সাইফ যাবে কি না তা জিজ্ঞেসই করলো না। কিছুক্ষণ চিন্তা করলো সাইফ। এখনো ওর ক্লাসের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ছেলেমেয়েও তেমন বেশি আসেনি। ইচ্ছে করলে চলে যাওয়া যায়।
সাইফ ক্লাসরুম থেকে ব্যাগটা নিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে গেল।
১৪
কলেজ থেকে একটু দূরে গিয়ে সিনথিয়াকে দেখতে পেল সাইফ। সে জানালো, কলেজের পাঁচ ঘণ্টা ইচ্ছে করলে কোনো পার্কে বসে বা রেস্টুরেন্টে বসে কাটাতে পারে। সাইফ বলল, ‘রেস্টুরেন্টে পাঁচ ঘণ্টা কাটাবো? মাথা খারাপ নাকি?’
সিনথিয়া হেসে বলল, ‘সমস্যা নেই। আমার পরিচিত একটা রেস্টুরেন্ট আছে। আমার বাসা থেকে একটু দূরে। এখান থেকেও দূরে অবশ্য। যেতে সময় লাগবে। রিকশায় যাওয়া যাবে। ওখানে দু’টোর আগ পর্যন্ত কোনো ভিড়ই হয় না। ইচ্ছে করলে সারা সকালই ওখানে কাটানো যাবে। তাছাড়া যেতে আসতেও তো সময় লাগবে, সব মিলিয়ে হয়ে যাবে। কী বলো?’
সাইফ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘ঠিক আছে। চলো রিকশা নেয়া যাক।’
আকাশে তখন বিশাল এক মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আর সূর্যের আলোর তেজ কমিয়ে দিচ্ছে।
রিকশায় যেতে যেতে সিমির কথা বলতে থাকলো সাইফ। ‘সিমির বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ওর একদিন অনেক ঝগড়া হয়েছিল। খুব খারাপ ভাষায় একটা বকা দেয়ার কারণে সিমি একেবারেই বেপরোয়া হয়ে গেছিল। আমাকে হঠাৎই ফোন করে জানালো ও বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে জানে না। আমার তখন অনেক টেনশন হচ্ছিল। ওকে এতো বোঝানোর চেষ্টা করলাম ও আমার কোনো কথাই শুনলো না। ফোন বন্ধ করে দিল। সারাদিন ওর আর কোনো খবর নেই। চরম দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে দিনটা কাটলো। বিকেলে দিকে ওর ফোন খোলা পেলাম। ফোন ধরে ও জানালো ও বাসা থেকে বেরিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ওর বয়ফ্রেন্ড সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। পরে ওকে বুঝিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেছে। ও তখন সেখানেই ছিল। আমি ও আচ্ছা বলে ফোনটা রেখে দিলাম। সেদিন আমি প্রচণ্ড রকম কষ্ট পেয়েছিলাম।’
সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন? তোমার কথা শোনেনি বলে?’
‘আমার কথা শোনেনি বলে খারাপ লেগেছে এটা ঠিক, কিন্তু ও যে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে মিট করে সব ঠিক হয়ে গেছে এটা আমাকে জানানো উচিৎ ছিল না? ও কি জানতো না যে আমি অনেক টেনশন করছিলাম? জানতো, কিন্তু আমার কথা ওর মনে ছিল না। বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবেই আমি এতটুকু আশা করেছিলাম যে ও কেমন আছে কোথায় আছে এটা আমাকে জানাবে। আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। সেটা রাগ ছিল নাকি অভিমান ছিল জানি না। এর পরের কয়েকদিন ওর সঙ্গে আমি তেমন কথাই বলিনি।’
সিনথিয়ার দিকে তাকালো সাইফ, ‘এমনকি ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাবার আগ পর্যন্ত ঐ ঘটনাটাই ছিল ওর কাছ থেকে আমার সবচাইতে বেশি কষ্ট পাওয়ার ঘটনা।’
সিনথিয়া চুপ করে রইলো। এই প্রথম সে বুঝতে পারছে, কেবল ভালোবাসাই নয়, সাইফ আর সিমির মাঝে অকৃত্রিম একটা বন্ধুত্বও ছিল।
(পর্ব ৭ )
প্রথম প্রকাশ
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



