(পর্ব ৭ )
১৭
দুপুরের পর আবার বৃষ্টি নেমেছে। দুপুরের দিকে বৃষ্টি যা-ই একটু থেমেছিল, সেই ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতেই যেন আকাশ ভেঙ্গে ঢল নেমেছে। একটানা এতো লম্বা সময় এভাবে বৃষ্টি হতে খুব কমই দেখা যায়। সাইফ তার জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটার মাটিতে পড়া দেখছে। পানি জমে আছে তার জানালার সামনে। সেই জমে থাকা পানির উপর অনবরত বৃষ্টির ধারা পড়ছে। সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট একটা লেক তৈরি হয়েছে ওর জানালার সামনেই।
অন্য কোনো সময় হলে হয়তো দৃশ্যটা খুব উপভোগ করতে পারতো সাইফ। কিন্তু এখন আর সে কিছুই উপভোগ করে না। উপভোগ করতে হলেও অনুভূতি থাকতে হয়। আজ তার মধ্য থেকে অনুভূতিগুলো পালিয়ে গেছে। সে এখন চাইলেও কিছু অনুভব করতে পারে না। কেবল একটাই তার অনুভ’তি রয়েছে, তা হলো সিমির অভাব।
তুমুল বৃষ্টির শব্দে কখন থেকে সাইফের ফোন বাজছে সে খেয়ালও করেনি। যখন দেখলো ততক্ষণে দশবার মিসকল হয়ে গেছে। সিনথিয়া ফোন করেছিল। সাইফ আবার ফোন করবে ভাবছে এমন সময় সিনথিয়া আবার ফোন করলো। ফোন ধরলো সাইফ।
‘হ্যালো!’
‘কী ব্যাপার সাইফ? তুমি কোথায় ছিলে? ফোন ধরছিলে না কেন?’ সিনথিয়া উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
‘আমি আসলে শুনতে পাইনি। বৃষ্টি হচ্ছিল তো খুব, টেরই পাইনি কখন থেকে ফোনটা বাজছে। সরি।’
‘ওহ, ইট’স ওকে,’ সিনথিয়ার চেপে রাখা শ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পেলো সাইফ, ‘আর আমি ভাবছি কী না জানি কী হলো। তারপর বলো, কী খবর?’
‘এই তো, আছি। বৃষ্টি দেখছি।’
‘বৃষ্টিতে ভিজেছো?’
‘নাহ, আজ ভিজতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া আমি বৃষ্টি এড়িয়েই চলি।’ মিথ্যেটা সুন্দর করে বলে দিলো সাইফ।
‘হুমম, আমি আজ ভিজেছি অনেকক্ষণ। ছাদে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টার মতো ভিজেছি। এতো জোরে বৃষ্টি হচ্ছে শেষে গায়ে যেন কাঁটা বিঁধছিল। তাই বাধ্য হয়ে চলে আসতে হয়েছে। নইলে আরো অনেকক্ষণ ভিজতাম।’
‘হুম।’
‘দুপুরে খেয়েছো?’
সাইফ প্রশ্নটার জবাব দিলো না। উল্টো প্রশ্ন করলো, ‘আংকেল কিছু বলেননি?’
‘কী ব্যাপারে?’
‘এই যে তোমার সঙ্গে আমাকে দেখলো?’
‘আরে ধুর! ওটা আব্বুর আর মনেও নেই। তুমি চিন্তা করো না। আব্বু এসব নিয়ে এতো ঘাঁটায় না।’
‘হুম।’
‘তুমি তো বললে না খেয়েছো কি না। আমি তো গল্প শুনবো।’ নাছোড়বান্দার মতো আবারও জিজ্ঞেস করলো সিনথিয়া।
‘আমার খিদে লাগেনি। রেস্টুরেন্টে যে খেয়েছিলাম ওটাই এখনো পেটে রয়ে গেছে।’
‘হুম। আমার অবশ্য খিদে লেগেছে আবার। খেয়ে নিয়েছি একটু আগে।’
‘হুম।’
সিনথিয়া বুঝতে পারলো সাইফের মন খারাপ। এই সময় ওকে আবার সিমির কথা জিজ্ঞেস করে মন আরও খারাপ করাতে ইচ্ছে করলো না। তাই ও অন্য বিষয়ে কথা বলতে থাকলো। সাইফও মন খারাপ নিয়েই সিনথিয়ার সঙ্গে কথা বললো। কিন্তু ওর মন কিছুতেই এই কথাবার্তায় থাকছিলো না। ওর কেবলই মনে পড়ছিল সিমির কথা। ওরা একসঙ্গে থাকার সময়, অর্থাৎ ওদের সম্পর্ক থাকার সময় সিমিকে ও কিছুতেই বাসার বাইরে বৃষ্টিতে ভিজতে দিতো না। একদিন সে সিমিকে ভিজে কাঁপতে দেখেছে। সেটাই তার চোখে ভাসে। সে সাফ বলে দিয়েছিল, কোনো জায়গা থেকে বাসায় ফেরার সময় ভিজলে অসুবিধা নেই, কারণ বাসায় ফিরেই কাপড় বদলে ফেলতে পারবে। কিন্তু কোথাও যাওয়ার সময় কিছুতেই যেন বৃষ্টিতে না ভিজে। ভিজলে সাইফ অনেক রাগ করতো। আর সেই রাগটা বুঝতোও সিমি।
আজ সিমি কী করছে, কেমন আছে, সাইফ জানে না। সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পরও ও চেষ্টা করেছিল সিমির খোঁজ-খবর অন্তত রাখতে। কিন্তু সিমি আগের মতো ওর সঙ্গে আর কিছুই শেয়ার করেনি। সাইফের একাকীত্বকেও সিমি কোনো পাত্তা দেয়নি। তাই বাধ্য হয়েই সাইফ কষ্টটা মেনে নিয়েছে। কাউকে ভালোবাসলেই তাকে পাওয়া যায় না। কিন্তু না পাওয়া গেলেও মন খুলে ভালোবাসা যায়। সাইফকে হয়তো বাকি সময়টা এভাবেই সিমিকে ভালোবাসতে হবে। তার সঙ্গী এখন কেবল সিমির স্মৃতি।
১৮
সেদিন রাতে সিনথিয়া ফোন করলো। অসময়ে সিনথিয়ার ফোন দেখে সাইফ বেশ অবাক হলো। ফোন রিসিভ করে অবাক হয়ে সে বলল, ‘হ্যালো, সিনথি?’
‘হ্যাঁ, সাইফ, ডিস্টার্ব করছি না তো?’
‘না বলো, তুমি এই সময়ে?’
‘কথা বলতে ইচ্ছে করছিল তাই ফোন করলাম। তোমার বাসায় সমস্যা হবে না তো?’
‘আমার কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু তোমার সমস্যা হবে না? রাতে ফোনে কথা বলছো?’
‘না আমার সমস্যা হবে না। আজ আমার বড় আপু বাসায় নেই, তার রুমটা দখল করেছি। তাই আজ কথা বলা নিরাপদ।’
‘আপু কোথায় গেছে?’
‘আপু ঢাকার বাইরে গেছে বেড়াতে। সঙ্গে তার কয়েকজন বান্ধবীও গেছে।’
‘হুম। তারপর কী খবর?’
‘এই তো। তুমি কী করছিলে?’
‘পড়া রেডি করলাম। এখন পিসিতে বসতাম।’
‘কাজ আছে নাকি? তাহলে আমি রাখবো?’
‘না কোনো কাজ নেই। প্রতিদিন কম্পিউটারে বসা আমার অভ্যাস। সেটাই। জরুরি কিছু না।’
‘হুম।’
এরপর সিনথিয়া আর সাইফ দু’জনই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। দু’জনেই অপরজনের কথা বলার অপেক্ষা করছে, কিন্তু নিজে বুঝতে পারছে না কী বলা যায়। অবশেষে সিনথিয়াই নীরবতা ভাঙলো। ‘সিমির ব্যাপারে কি এখন বলবে?’
সাইফ এবার জিজ্ঞেস করলো, ‘ওর ব্যাপারে শুনতে তোমার এতো আগ্রহ কেন বলতো?’
সিনথিয়া যেন একটু থমকে গেল। কিছুটা তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘না মানে এমনি। তোমার কথা থেকে যতটুকু বুঝেছি, মনে হয়েছে তোমাদের খুব ভালো একটা সম্পর্ক ছিল। সেটা কীভাবে ভাঙলো, কেনই বা ভাঙলো, এটা জানার আগ্রহই একটু বেশি। আর কিছু না।’
‘তবে তোমার এ ব্যাপারে কথা বলতে ইচ্ছে না করলে না বললেও চলবে,’ তাড়াতাড়ি এটাও বলে নিল সিনথিয়া।
সাইফ বলল, ‘না ঠিক আছে। তোমার শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে, আমার বলতে আপত্তি নেই।’
তারপর আবারো নীরবতা।
তবে এবার নীরবতা ভাঙলো সাইফই। ‘সিমির সঙ্গে ওর বয়ফ্রেন্ডের ব্রেকআপ-এর পর যথারীতি আমাদের ফ্রেন্ডশিপ থাকলো। আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলতাম। সময় কাটাতাম। দেখা করতাম; যদিও সেটা একেবারেই মাঝে মাঝে। তো এভাবে আমরা একে অপরের আরো কাছে চলে আসলাম।’
‘একটা পর্যায়ে ওর সঙ্গে আমার কথা বলার আর কোনো বাঁধও রইলো না। আমরা দুনিয়ার যত বিষয় আছে সব নিয়ে কথা বলতাম। ওর সঙ্গে টিটকারি দিতাম। আর প্রচুর দুষ্টামি করতাম। এভাবে দুষ্টামি করতে করতেই আমাদের দিন পার হতো।’
‘কী রকম দুষ্টামি?’ সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো।
সাইফ সেটার উত্তর না দিয়ে হাসলো। সিনথিয়া বুঝতে পারলো সাইফ বলতে চাচ্ছে না। ‘আচ্ছা ঠিক আছে তারপর বলো।’
‘তারপর একদিন ও ভাবলো, আমরা দু’জন যেসব দুষ্টামি করতাম, এগুলো যদি সত্যি হতো, তাহলে ভালো হতো। একসময় ও আমাকে জানালো এটা। তখন আমার নিজেকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি। ও খুবই ভালো একটা মেয়ে। বিশেষ করে একটা সম্পর্কে ও যতোটা অনেস্ট থাকে, আমি নিজেই দেখেছি, এমন একটা মেয়েকে পাওয়া নিতান্তই ভাগ্যের ব্যাপার। আমি নিজের জন্য ওকে নিয়ে কখনোই ভাবিনি। কারণ, নিজেকে এতোটা লাকি ভাবতে পারিনি আমি। সেই ও-ই যখন নিজে থেকেই বলে সম্পর্কের কথা, তখন নিজের কানকে বিশ্বাস করাও কঠিন হয়ে যায়।’
‘এরপর আর কি। আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয় খুবই নাটকীয়ভাবে। ও একদিন এক জায়গায় বেড়াতে যায়। সেখান থেকে ফেরার সময় রাতে মেসেজের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আমাদের মাঝে খুব ইনটিমেটলি কথা হয়। প্রথম ‘ভালোবাসি’ কথাটা ওর মুখ থেকে শুনি।’
‘আমাদের সম্পর্ক এগিয়ে চলে। ওকে পেয়ে আমার মনে হয় অবিশ্বাস্য কিন্তু অতি আকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু পেয়ে গেছি। নিজের জীবনকে নিয়ে, নিজেকে নিয়ে এর আগে কোনোদিনই আমি এতোটা সুখী হতে পারিনি যতোটা ওকে পাওয়ার পর হয়েছিলাম। আমার জীবনের কষ্টের শেষ ছিল না। নানা কারণে, নানা সমস্যায় এতটুকু জীবন তখনো জর্জরিত ছিল। কিন্তু কেবল সিমির উপস্থিতি, সিমির ভালোবাসাই আমার হাসিখুশি থাকার প্রেরণা ছিল। হাজারটা কষ্টের মাঝে আমি সুখ খুঁজে নিয়েছি সিমির কথা ভেবে। যে কোনো কষ্ট, বিপদ উপেক্ষা করেছি কেবল ভবিষ্যতে আমি আর ও একসঙ্গে থাকবো ভেবে। আসলে সিনথি, আমার পক্ষে কোনোভাবেই বলা সম্ভব নয় ওকে পেয়ে আমি কতোটা সুখী হয়েছি, ওকে কী পরিমাণ ভালোবেসেছি, আর ওরও কতো ভালোবাসা আমি পেয়েছি।’
‘আমি বুঝতে পারছি সাইফ,’ সান্তনা দেয়ার জন্য বলল সিনথিয়া। কিন্তু সে জানে, প্রিয় কেউ যখন দূরে চলে যায়, সেই কষ্টে কোনো সান্তনাই কাজে লাগে না।
সাইফ বলতে থাকলো, ‘আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো ওর খোঁজ-খবর রাখতে, ওর টেক কেয়ার করতে। ও মেয়েটা ছিল বেশ খামখেয়ালী। শরীর খারাপ হলে ডাক্তার ওষুধ দিলে কীভাবে সেই ওষুধ ফাঁকি দেবে সারাক্ষণ এই কুটনামি করতো। আর ভাত খেতো এক প্লেটের চারভাগের একভাগ। শুধু তাই না, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় তিলের সমান পাথর বা ইটের টুকরোর সঙ্গে পা লেগে বারবারই পড়ে যেতে নিতো।’
সিনথিয়া হাসলো। তার কল্পনায় একটু একটু করে সিমি ভেসে উঠছে। সে বলল, ‘আর তুমি নিশ্চয়ই তাকে খুব বকতে?’
‘তা অবশ্য বকতাম। এক বেলা ওষুধ না খেলে আমি তিন বেলা কিছু খেতাম না। আর কোনো ভাবে দেখা হলে তো কথাই নেই। দোকান থেকে ওষুধ কিনে চেপে ধরে ওষুধ খাইয়ে দিতাম। আর রাস্তায় হাঁটার সময় পিচ্চি মেয়ের মতো ধরে রাখতাম। তারপরও খালি হোঁচট খেতো।’ সাইফ থামলো। তার সেই সুখময় পুরনো দিনগুলোর কথা খুব বেশি মনে পড়ছে।
সিনথিয়া অপেক্ষা করছে।
সাইফ আবার বলতে শুরু করলো, ‘আমার খুবই ভালো লাগতো ওর খেয়াল রাখতে। ওকে পিচ্চি বাবুর মতোই ট্রিট করতাম অনেকটা। একইসঙ্গে ওর মতেরও মূল্য দেয়ার চেষ্টা করতাম। আমার কিছু করতে ইচ্ছে না করলেও ওর খুশির জন্য চেষ্টা করতাম করতে। ওকে খুব বেশিই ভালোবাসতাম আমি। এতোটাই বেশি যে, ওর জন্য আমি সবই করতে পারতাম। মাঝে মাঝে না বুঝে ওকে কষ্টও দিয়ে ফেলতাম। কিন্তু তার জন্য পরে আমি নিজেই বেশি কষ্ট পেতাম।’
‘আর তারপর একদিনের ঘটনায় আমার এতো স্বপ্ন, এতো আশা ভালোবাসা নিয়ে তিলে তিলে গড়া স্বপ্নীল ভবিষ্যত ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেল। ও চরমতম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে আমাকে ছেড়ে দূরে চলে গেল। আর আসলো না। হয়তো আসবেও না। কিন্তু ওর এই নিষ্ঠুরতায় ছিন্নভিন্ন হয়েও যে ওকে ঘৃণা করতে পারি না। ওকে ভুলতে পারি না। ওর প্রতি রাগ জন্মাতে পারি না। আমি কী করবো সিনথি? আমার সব আশা এভাবেই ভেঙ্গে যাওয়ার দরকার ছিল?’
সিনথিয়া কী বলবে খুঁজে পেলো না। ওর এখন নিজেরই কষ্ট হচ্ছে। সাইফের মনটা মোটামুটি ভালোই ছিল। এখন এই রাতে ফোন করে সাইফের কষ্টটা জাগিয়ে তোলার জন্য নিজেরই অনুশোচনা হচ্ছে। তাই সিনথিয়া আজ রাতে আর তেমন কিছু জিজ্ঞেস করলো না। ঠিক করলো, পরদিন কলেজে গিয়ে জানবে। কী এমন ঘটনা এক জোড়া সুন্দর স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে দিল?
(পর্ব ৯ )
প্রথম প্রকাশ
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০১১ রাত ১২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



