একুশের মহান ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা আর গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করেছে জাতি। নগ্ন পায়ে পরম শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে দলে দলে ভিড় করেছে অসংখ্য মানুষ। তবে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নিয়ে দেখলাম ক্ষমতার ফ্যাসিবাদী চরিত্র ও নির্লজ্জ বেহায়াপনা। ক্ষমতার স্ট্যাটাস কো অনুসারে প্রথমেই শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার সুযোগ পেলেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ।
রীতি অনুযায়ী তাদের পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের পর সুযোগ পাওয়ার কথা বিরোধী দলীয় নেত্রীর। কিন্তু গত দুই বছর ধরে এই রেওয়াজ মানা হচ্ছে না। বিরোধী দলীয় নেত্রীর আগেই শহীদ মিনার দখলে নেয় সরকার দলীয় নানা ভূঁইফোড় সংগঠন। শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানের আয়োজক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে অনেকটা সাক্ষী গোপালের পরিচয়ই দেয়।
২০০৯ সালে একুশে প্রথম প্রহরে ফুল দিতে এসে এক প্রকার লাঞ্ছিত হন বিরোধী দলীয় নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেটা বুঝতে পেরে বিএনপির কয়েক নেতা তখন তীব্র প্রতিবাদ করেন। তোপের মুখে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করে শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করার আগেই শ্রদ্ধা জানানোর জায়গা দখলে নেয় সরকার দলীয় সংগঠনগুলো। এর আগেই দোয়েল চত্বর এলাকায় আটকে দেয়া হয় বিরোধী দলীয় নেত্রীর গাড়ি বহর। নিরাপত্তার (!) অজুহাত দেখিয়ে বসিয়ে রাখা হয় তাকে।
একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার দাপট আর বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখার স্বৈরতন্ত্রের যে নমুনা দেখেছি তাতে হতবাক হয়েছি। ক্ষমতায় এসে হাট-বাজার, মসজিদ-মাদ্রাসা, জমি-জিরতসহ কত কিছুই সরকারি দলের ক্যাডার-সন্ত্রাসীরা দখল করে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শহীদ মিনার দখল করে নেয়ার মানসিকতাকে মেনে নিতে পারছি না। বার বার মনে হচ্ছে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর নাম করে একুশের মহান চেতনা ‘সাম্য’কে অশ্রদ্ধা করা হয়েছে।
শহীদ মিনারে এমন অপকর্ম দেখতে দেখতে আমার চোখে ভাসছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য শহীদ এক মেধাবী শিক্ষার্থীর কথা। আবু বকর সিদ্দিক, যিনি এই ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে স্যার এফ রহমান হলে নিজ কক্ষে ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেন ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষে। সেই আবু বকর হত্যার জন্য অভিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও পুলিশ সবাই একুশের প্রথম প্রহরে ভিড় জমিয়েছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। তাদের মুখগুলো যত আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তত বেশি চোখে ভাসে হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকা আবু বকরের মৃতদেহটি।
হায়! আবু বকরের মৃত্যু শোকে যখন শোকে মুহ্যমান দেশবাসী সরকার-পুলিশ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসছিল তখন দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র শুরু করল হত্যার মহড়া। একের পর এক খুন হতে থাকল ছাত্ররা। গৃহযুদ্ধের আদলে দেশব্যাপী শুরু হলো মহা তাণ্ডব। মৃত্যুর মিছিলে শামিল হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ফারুক হোসেন, যাকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে ম্যানহোলে ঢুকিয়ে রাখা হয়; রাজশাহী কলেজের হাফিজুর রহমান শাহীন, যাকে গলায় বন্দুক ঠেকিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে পুলিশ; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিউদ্দিন মাসুম, মেধাবী এই ছাত্রকে উপর্যুপুরি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ছাত্র হত্যার এই উত্সবে প্রকৃত খুনিদের খুঁজে বের করার কোনো উদ্যোগ না নিয়েই শুরু হলো চিরুনি (!) অভিযান। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের পতাকাধারী মন্ত্রীর মুখ থেকে বিশাল জনগোষ্ঠীকে নির্মুলের হুঙ্কার। চলতে থাকল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান। অবৈধ মারণাস্ত্রের ধ্বংসের ছুতোয় ২০০৩ সালে ইরাকের উপর ইঙ্গ-মার্কিন হামলার সঙ্গে এই অভিযানের কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, হোস্টেল, মেস, বাসা-বাড়ি কোথাও আর ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিরাপদ থাকল না। তথাকথিত গোপন বৈঠকের ধুয়া তুলে কোমরে দড়ি (!) বেঁধে হাজতে চালান করা হলো দেশের মেধাবী ছাত্রদের। কোরআন-হাদিস, নামাজ পড়া ছাত্র, বোরকা পরা ছাত্রীরা পেল জঙ্গির তকমা। উদ্বাস্তু হলো হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসার শ্রেণী কক্ষ—সব এখন ফাঁকা। প্রিয় অনেক শিক্ষার্থী জেলে যাওয়ায় শিক্ষকরা ক্লাস নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। রাস্তায় নামলেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে মৃত্যু। কিন্তু চিরুনি অভিযানের ফল কি? ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী যেমন কোনো মারণাস্ত্র পায়নি, ধ্বংস করেছে সভ্যতা, সংস্কৃতি, মানুষ আর মূল্যবোধ। বাংলাদেশের চিরুনি অভিযানের ফলও তাই। এই অভিযানে ধ্বংস হয়ে গেছে মানুষের সাংবিধানিক নাগরিক অধিকার, জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার, বাংলার আবহমানকালের নিজ ধর্ম পালনের অবাধ স্বাধীনতা। তবে দৃষ্টান্ত হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচিত হওয়ার মতো ঘটনা হচ্ছে এই ফেব্রুয়ারিতে মানুষের মুখ স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে। মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে শহীদ মিনারে ক্ষমতার দাপট আর স্তব্ধ মুখের ভাষাহীন মানুষের অমর একুশে পালন করতে দেখে মনে হয়েছে ভাষা-শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতরা এত বছর পরে কত বড় ভণ্ডামীর না শিকার হলেন! এই শহীদরা ৫৮ বছর আগে মানুষের অধিকারের জন্য প্রাণ দিয়ে আজ মানুষের প্রাণ হরণকারীদের ফুলের শ্রদ্ধা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ লজ্জা কার?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



