দু'বছর আগের কথা । UNDP পরিচালিত একটি জরিপের কাজে প্রথমবারের মত একটি মাদ্রাসায় গিয়েছি । এটা ছিল মূলত তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত একটি জরিপ। বিভিন্ন পেশাজীবী সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে কতটুকু ধারণা রয়েছে , কিভাবে তারা এটি ব্যবহার করছেন , এবং ভবিষ্যতে কিভাবে ব্যবহার করতে চান , মোটামুটি এসব বিষয় জানাটাই মূল উদ্দেশ্য ছিল ।
আমার নিজের উদ্দেশ্য ছিল অজস্র সাধারণ মানুষের সাথে মেশার অভিজ্ঞতা লাভ করা । সন্দেহ নেই সেটা হয়েছিলো ।
মাদ্রাসায় ঢোকার আগে আমি একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম । আগে কখনো কোন মাদ্রাসায় ঢুকিনি এটাও একটা কারণ , আরও একটা কারণ এই যে , মাদ্রাসা সম্পর্কে আমার কিছুটা নেতিবাচক ধারণা ছিলো। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি আমি কোনদিনই পছন্দ করিনা । আমার বিশ্বাস , ধর্ম প্রতিটি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার হয়েই থাকা উচিত , এবং শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে কোন প্রতিষ্ঠান তৈরী করা উচিত নয় । তাছাড়া মাদ্রাসা-ছাত্রদের ব্যাপারে কিছু কু-ধারণাও আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে , যেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনই জ্ঞান নেই। যাই হোক , ঢুকবার সময়েই একটি ছোট্ট বাধা পেয়ে মনটা বিগড়ে গেল ।
ছেলেদের মাদ্রাসা । এখানে মেয়েদের ঢোকার কোন ব্যাপার নেই । আমাদের ছোট্ট দলটিতে ছেলেমানুষ ছিল । জরিপের ব্যাপারটা সে বুঝিয়ে বলাতে অথবা যে কারণেই হোক , দারোয়ান আমাদের ঢুকতে দিল । তবে "পর্দা"-র একটা ব্যাপার আছে ! মাথায় কাপড় দিয়ে ঢুকতে হবে ।
এসব ক্ষেত্রে আমার অনেককিছুই বলার ও করার থাকে । কিন্তু ওই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম , "সামাজিক সচেতনতা" জাগ্রত করবার প্রকল্প এটা নয় । তাছাড়া মাথায় কাপড় দেয়াটা তো আর বাজে কিছু না। এটা আমি স্বাভাবিকভাবেই করতে পারি । রোদ থেকে বাঁচার জন্য সর্বদাই করি । তবু একটু বিরূপ মন নিয়েই ঢুকেছিলাম মনে আছে । ভেতরে ঢুকে কিন্তু খুব একটা খারাপ লাগলো না । বেশ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ । এটা একইসাথে একটা এতিমখানা । অনেক দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী শিশুরাও থাকে।
প্রধান শিক্ষক যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করলেন । চা খাওয়ালেন। প্রয়োজনীয় সহযোগীতা করলেন। আসবার সময় তাদের ক্যালেন্ডার, কলম এবং এমন আরো কয়েকটা ছোটখাট জিনিস আমাদের সবাইকেই উপহার দিলেন। এতটা ভালো ব্যবহার কয়েকটি সরকারি অফিসেও পাইনি। এমনকি ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে যা ঘটলো ! .....থাক ওটা পরে বলব, যদি কেউ জানতে চায়।
অন্যান্য শিক্ষকদেরকেও বেশ ভালোই মনে হলো। তবে তারা বেশ কৌতুহলী। কেউ কেউ জরিপের ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। ভেবেছিলেন আমরা হয়তো দুঃস্থদের খুঁজে বের করে ঋণ দেয়া জাতীয় কোন কাজ করছি । সবচাইতে মজার মনে হয়েছে সেখানকার বাবুর্চীর জবাবগুলো। টিভিতে সে বাউলগান দেখতে খুব ভালোবাসে । এবং আরো বেশী বেশী বাউলগান টিভিতে দেখানো উচিত।
উল্লেখ্য, মাদ্রাসায় কোন টিভি নেই। তবে ছাত্ররা বাড়িতে টিভি দেখে । তাতে কোন নিষেধ নেই । সবমিলিয়ে মানুষগুলোকে আমার খারাপ লাগেনি । তাদের ইসলাম ধর্মের ধারণায় কোনো উৎকট মৌলবাদের গন্ধ পাইনি যা আমি ঘৃণা করি। তবে মনে হয়েছে , এরা বঞ্চিত। ধর্মভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হবার কারণেই বঞ্চিত। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির জাদুর কাঠির ছোয়া তাদের গায়ে লাগেনি। এ ব্যাপারে তাদের ধারণা খুবই কম।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার বিপক্ষে । কিন্তু তার কারণ এই নয় যে, মাদ্রাসাগুলো থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে জঙ্গী বের হয়ে আসছে , অথবা সব মাদ্রাসার সবকিছুই খারাপ ।
আমি এর বিপক্ষে, কারণ , আরবী মাধ্যম - মাদ্রাসা / বাংলা মাধ্যম স্কুল / ইংরেজী মাধ্যম স্কুল ----- একই দেশে তিন রকম শিক্ষা ব্যবস্থা --- একটা ভীষন শ্রেণীবিভেদ ও বৈষম্য তৈরী করছে। তিনটি আলাদা শ্রেণী তৈরী হচ্ছে যারা একে অপরকে মোটেই নেক-নজরে দেখেনা । বলাবাহুল্য , এর মধ্যে মাদ্রাসা ছাত্ররাই সবদিক দিয়ে বঞ্চিত। তারা প্রয়োজনীয় মৌলিক এবং সুষম শিক্ষা পাচ্ছেনা যা দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত---অর্থনৈতিক---মানসিক উন্নতি সম্ভব। তাদের মধ্যে একটা ভূল ধারণা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে যে আল্লাহ্-র রাস্তায় জিহাদ করে (আসলে রাজনৈতিক দলের পক্ষে জিহাদ করে) মরে যাওয়াটাই তাদের জীবনের সফলতা। স্বাভাবিক শিক্ষার মান নিম্ন হবার কারণে এসব মিথ্যা উপলব্ধি করার ক্ষমতাও তাদের থাকেনা। ফলে ধর্মের নামে যেভাবে খুশী ব্যবহার করার জন্য এরাই সবচে' ভালো টার্গেট। আর আমরা জানি , যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত নিম্নশ্রেণীর মানুষদেরকে পরকালের সুখ-সুবিধার লোভ দেখিয়েই ইহকালে ব্যবহার করে সুবিধাবাদীরা। কি ভীষনরকম মানবাধিকার-লঙ্ঘন ! একটা মানুষ শুধুমাত্র আরবী -- একটা ভাষা -- পড়তে শিখবে। সে সাহিত্য পড়বেনা , ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ইতিহাস জানবেনা , বিখ্যাত মনিষীদের জীবন ও কাজ জানবেনা , গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের আনন্দ পাবেনা , যুক্তিবিদ্যা শিখবেনা । সমাজ ও রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য -- নৈতিকতা -- আইন -- কিছুই সে জানবেনা । কিভাবে তার কাছ থেকে আমরা ভালো কিছু আশা করতে পারি ? সবক'টি অপশন সম্পর্কে যে জ্ঞান রাখেনা সে কিভাবে বাছাই করবে কোনটা বেশী ভালো ? কিভাবে এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা কাউকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে ?
অনেক বিভেদ , অনেক রাগ , অনেক আক্রোশ দেখলাম। কিন্তু আমরা কেন ভূলে যাই যে সবাই আমরা এই দেশের সাধারণ মানুষেরই অংশ। আমরাই কেউ ঘুষ খাওয়া সরকারি কর্মচারী হই , দূর্নীতিবাজ আমলা হই , ভেজাইল্যা ব্যবসায়ী হই । ভিন্ দেশী কেউ নই। তাই কোনো একটা বিশেষ গোষ্ঠীকে 'খারাপ' বলে নিজেদের থেকে আলাদা করে দিতে পারিনা। যেটা করতে হবে তা হলো , এই সমস্যাটার বিপরীতে ব্যবস্থা নেয়া। মানুষগুলোর বিপরীতে নয়।
আমি দেখেছি , সাধারণত , গ্রামাঞ্চলের গরীব মানুষেরা ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসায় পাঠান সাধারণ স্কুলে পাঠাবার অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকে না বলে। আবার কোনো কোনো বাবা-মা সন্তানকে ধার্মিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান -- এ কারণেও পাঠান । কিন্তু আমার মনে হয়না , কোনো বাবা-মা , যত নিম্নশ্রেণীরই হোন না কেন , সন্তানকে জঙ্গী-মৌলবাদী হিসেবে গড়ে তুলবার জন্য মাদ্রাসায় পাঠান। শুধুমাত্র সিস্টেমটাতে পড়েই তাদের এ দশা হয় বলে আমার বিশ্বাস।
বুদ্ধিমান শিক্ষিত মানুষরাই যেখানে ধর্মের নামে অন্ধ হয়ে যায় , সেখানে নিম্ন-শিক্ষিত ছেলেমেয়েগুলোর ব্রেন-ওয়াশ তো খুবই সম্ভব।
কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ আপামর জনগণের ধর্মবোধের মূলসুরটি কখনোই কট্টর মৌলবাদী ছিলোনা। তাই হাজার বেহেশ্তের লোভ দেখিয়েও একজন অশিক্ষিত কৃষকের কাছ থেকেও জামাত ভোট আদায় করতে পারেনা। যে কোনো মুসলিমের নাক ঘৃণায় কুচকে ওঠে বাংলা ভাইয়ের কথায়।
আমরা বাংলাদেশীরা যে ইসলাম ধর্ম পালন করি তা মানবিক বোধসম্পন্ন ইসলাম , সৌদিআরবের বা পাকিস্থানের উৎকট উদ্ভট ইসলাম নয়। এইসব জঙ্গী মানসিকতা যদি আমাদের দেশের মানুষের চিন্তাধারায় ঢুকে থাকে , তবে অবশ্যই বাইরের কেউই ঢুকিয়েছে ।
ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের কথা এখানে বলছিনা কারণ ওটা এই পোস্টের বিষয় নয়। তবে আমার মনে হয় , শিক্ষা ব্যবস্থা একটিই হওয়া উচিত , যেখানে সবকিছুর সুষম সমন্বয় করা হবে। কেউ কোনোদিক দিয়েই যেন বঞ্চিত না হয়।
আর সেই স্কুলে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর 'ধর্ম'-কে পড়ার বিষয় হিসেবে নেয়া শিক্ষার্থীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে । যে পড়তে চায় সে পড়বে। যে পড়তে চায় না তাকে জোর করে ধর্ম গেলানো হবেনা।
শেষ কথা : অনেক কিছুর ব্যাপারেই আমার জ্ঞান খুব সীমিত , তাই অনেক অভিজ্ঞতা বা ধারণায় ভূল থাকতে পারে। কেউ যদি কোনো ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন তবে অবশ্যই বুঝিয়ে বলে আমার ভূল শুধরে নিতে সাহায্য করবেন। কৃতজ্ঞ থাকবো ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



