আর যায় কোথায়? মাইর রে মাইর - গাজুরিয়া মাইর। হুজুর অক্করে 440yds রেসে ফার্স্ট হইয়্যা গেলেন। এক দৌড়ে কাপ্তান বাজারের কসাইপট্টি।
পকেটে মাত্র তিনশ টাকা নিয়ে বের হয়েছি টেক্সট বই কিনব বলে। লোভ সামলাতে না পেরে কিনে ফেললাম এম আর আখতার মুকুলের 'চরমপত্র' । ছোটবেলা থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের সাথে সাথে চরমপত্রের কথা শুনেছি । খুব ইচ্ছা করত যদি শুনতে পাই। বই দেখা মাত্র আর অপেক্ষা করতে পারলামনা। পরে আরও একটা বই কিনেছিলাম, একই লেখকের ' আমি বিজয় দেখেছি' । এটা অবশ্য আগেই পড়া ছিল। কিন্তু অনেক ছোটবেলায়। নতুন করে বই দুটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল, সবার সাথে অবশ্যই শেয়ার করা উচিত। যারা এখনও পড়েনি তাদেরকে বইটা সম্পর্কে জানাতেই এই পোস্ট। আর যারা পড়েছে তারাও নাহয় আবার মনে করলো। অসংখ্যবার পড়া যায় এই লেখা। আমি নিজে পড়তে গিয়ে কখনও হাসি সামলাতে পারিনি, কখনও চোখের পানি।
জামাতে ইসলামীর আদি কাজকারবার সম্পর্কে লেখাটা পড়ুন :
১৪ জুন ১৯৭১
চেইত্যা গেছেন। লাহোরের জামাতে ইসলামীর নেতা মওলানা আবুল আলা মওদুদী অহন অক্করে চেইত্যা গেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য বন্ধের প্রস্তাবের কথা শুনে মওলানা মওদুদী এখন একেবারে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, জাতীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্যে ইয়াহিয়া সরকারের মার্কিন সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা উচিত । শুধু তাই-ই নয় মওলানা সা'ব আরও বলেছেন যে, নিকসন-সরকারের মুখের উপর মার্কিন সাহায্য ছুঁড়ে ফেলে আমেরিকান বিশেষজ্ঞদের এই মুহূর্তে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়া উচিত। পাকিস্তানী শিল্পপতিদের আদরের দুলাল মওলানা আবুল আলা মওদুদী এলায় গোস্বা করেছেন। পশ্চিমা দেশগুলা থেকে সাহায্য আসার ব্যাপারে সন্দেহ হওয়ায় মওলানা মওদুদী আগে থেকেই মাথার ঘোমটা টেনে মেহেন্দি মাখা দাড়ি লুকিয়ে অভিমান করেছেন। মওদুদী সা'ব করিৎকর্মা লোক। একবার লাহোরে তার জামাতে ইসলামী দল কাফের ফতোয়া দিয়ে প্রায় দশ হাজার কাদিয়ানী মুসলমানকে হত্যা করেছিল। শেষ পর্যন্ত সেখানে 'মার্শাল ল' জারি করে মেজর জেনারেল আজম খান জামাতওয়ালাদের ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করেছিলেন। আর নরহত্যার দায়ে বিচারে মওলানা মওদুদীর উপর ফাঁসীর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ভবিষ্যতে কামে লাগতে পারে এই আশায় ফাঁসীর নির্দেশ বাতিল করে দিয়েছিল।
এরপর জামাতে ইসলামী দলের মাইনে করা আমীর মওলানা আবুল আলা মওদুদী তথাকথিত পাকিস্তানে মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জোর সুপারিশ করতে থাকেন । তার মতে বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করে মক্তব-মাদ্রাসার শিক্ষা চালু করা উচিত। মেয়েদের লেখাপড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। নাটক, সিনেমা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বেআইনী ঘোষণা করতে হবে। চুরি ডাকাতির শাস্তি হিসেবে জ্যান্ত মানুষের হাত কেটে দোররা মারতে হবে, আর অমুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে 'জিম্মী' বলে ঘোষণা করতে হবে।
১৯৫৬ সাল। মওলানা আবুল আলা মওদুদী পৃথক নির্বাচনের শ্লোগানওয়ালা পতাকা কাঁধে ঢাকায় এসে হাজির হলেন । পল্টন ময়দানে বিরাট সভামঞ্চ তৈরী হল। আলাদা ডায়নামা ফিট করে ইলেকট্রিক লাইটের ব্যবস্থা। মঞ্চের উপর এক ইঞ্চি পুরু গালিচা পেতে সোফা সেট বসানো হল। আর হুজুরদের পানের পিক ফেলবার জন্যে কুলুক-দান আনা হল। সভাক্ষেত্র একেবারে লোকে লোকারণ্য। হল্কুম দিয়ে উচ্চারণ করে চমৎকারভাবে পবিত্র কোরান তেলাওয়াত করা হল। এরপর হুজুর বাঙালি মুসলমানদের সবক দেয়ার জন্যে যেইমাত্র উর্দুতে মুখ খুলেছেন। আর যায় কোথায়? মাইর রে মাইর - গাজুরিয়া মাইর। হুজুর অক্করে 440yds রেসে ফার্স্ট হইয়্যা গেলেন। এক দৌড়ে কাপ্তান বাজারের কসাইপট্টি। এদিকে ভাঙ্গা সভামঞ্চের পাশে বেশী না আধফুট পরিমাণ ইটের স্তুপ আর কুলুক-দানগুলো উল্টে রয়েছে। পরদিনই মওলানা সাব লাহোর পালিয়ে গেলেন। চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয়ে তার সাধের আম জলসার এই পরিণতি হল।
এরপর মওলানা আবুল আলা মওদুদীর চোটপাট পশ্চিম পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকলো। আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুথ্থানের মধ্যে ক্ষমতায় আসলে জামাতে ইসলামী তাকে পূর্ণ সমর্থন দিল। কিন্তু আইয়ুব খানের ফ্যামিলি প্ল্যানিং আর একলগে চারটা সাদী বন্ধ করণের আইনে হুজুর খুবই খাপচুরিয়াস হয়ে উঠলেন। তাই আইয়ুব-বিরোধী গণঅভ্যুথ্থানের সময় জামাত-আলারা শুধু একটা কামই করলেন। সেটা হচ্ছে, রাস্তার ধারের সমস্ত ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেললেন।
জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষেমতায় আসার পর মওদুদী সাবের জামাত অক্করে আহ্লাদে আটখানা। কেননা আইয়ুব খানের যখন দম ফাটফাট অবস্থা, তখন একটা চিঠি লিখে তিনি সেনাপতি ইয়াহিয়াকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। কি অদ্ভুত আর অপূর্ব ব্যবস্থা। সেই চিঠিটা বগলে করে সেনাপতি ইয়াহিয়া দিব্বি এসে গদীতে বসে দেশবাসীর প্রতি ফরমান ঝাড়তে শুরু করলেন। ছাগলের দুইটা বাচ্চা দুধ খায় আর বাকীগুলো এমনি আনন্দে লাফাতে থাকে। পাকিস্তানের মওদুদী, ভুট্টো দলনেতার দল ছাগলের বাচ্চার মতই ফাল পাড়তে শুরু করলেন।
১৯৭০ সালের পহেলা জানুয়ারি। সেনাপতি ইয়াহিয়া সমগ্র দেশে রাজনৈতিক কাজকর্ম করবার পারমিশন দিলেন। মওলানা মওদুদীর খুবই খায়েশ ঢাকার পল্টন ময়দানে চৌদ্দ বছর পর একটা জলসায় তকবির ফরমাবেন। যেমন চিন্তা তেমনি কাজ। জামাতে ইসলামীর মাইনে করা কর্মীরা সব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। রং বেরং-এর অফসেটে ছাপা পোস্টারে ঢাকা শহর ছেয়ে গেল। চব্বিশটা বেবীট্যাকসিতে মাইক ফিট করে আমজলসার প্রচার করা হল। বিরাট উঁচু ডায়াস তৈরী করে গালিচা পেতে আবার কুলুক-দানের ব্যবস্থা হল। আর এবার ট্রাক বোঝাই করে চাকু, ছোরা ও লাঠি মসজিদের ওপাশটায় লুকিয়ে রাখা হল। হুজুরের আম জলসার এগুলো হল সরঞ্জাম। এছাড়া মফস্বলের মক্তব-মাদ্রাসা থেকে পাঁচ টাকা দিন হিসেবে বিনা ভাড়ায় ট্রেনে করে তালেবেলেম আনা হল। হাজার হাজার লোক পল্টনে এসে হাজির হল।
সভার উদ্যোক্তাদের দিল আনন্দে একেবারে ভরে উঠলো। কিন্তু একি ? মাইকে অবিরাম চিৎকার করা সত্ত্বেও কেউই বসতে রাজী নয়। জলসার শুরুতেই চট্টগ্রামের জামাতে ইসলামীর আমীর উর্দুতে খালি একটা লাইন বলেছেন যে, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা সব হিন্দু হয়ে যাচ্ছে। ব্যাস ওইখানেই full stop. বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আপনারা মনে করবেন না যে পানির বৃষ্টি। এটা হচ্ছে ইটের বৃষ্টি। আরে ইটরে ইট। হাজারে হাজার ইট এসে পড়তে লাগলো। ওদিকে মাইকে অবিরাম চিৎকার হচ্ছে 'ভাইসব বদরের জঙ্গ শুরু হয়ে গেছে। আপনারা ইয়া আলী বলে লাঠি-ছোরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।' কিন্তু কিসের কি ? এদিকে নারায়ে তকবির আর জয় বাংলা শ্লোগানের মধ্যে ইটের চোটে হুজুররা সব মতিঝিলের দিকে ভাগোয়াট। লড়াই শেষ হলো। দু'জন নিহত আর ১০৬ জন আহত। বাঙালিদের জাত তুলে গালাগালি দেয়ার পরিণতি।
এটাই শেষ। এরপর মওলানা মওদুদীকে আর ক্রেন দিয়ে টেনেও ঢাকায় আনা যায়নি। ১৯৭০-এর ইলেকশনের রেজাল্ট হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে সাত আর বাংলাদেশে রসগোল্লা অর্থাৎ শূন্য। একটা ছোট্ট গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। এক ছেলে পরীক্ষায় result out হবার পর বাপের কাছে progress রিপোর্ট দেখাচ্ছে। বাপ বললো,'ইংরেজীতে মাত্র চার পেয়েছিস।' ছেলেটা উত্তর দিলো,'হ্যাঁ' । এরপর বাপ আবার জিজ্ঞেস করলো,'একি, অংকে যে শূন্য পেয়েছিস।' ছেলেটা গম্ভীরভাবে জবাব দিলো, 'ইংরেজীতে ভালো result করলে অংকে একটু খারাপই হয়।' মওলানা মওদুদীর জামাতে ইসলামীর এবারের নির্বাচনে এরকমই Brilliant Result হয়েছে।
এহেন মওলানা মওদুদী যে বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় হানাদার বাহিনীর কুফা অবস্থায় একটু চেইত্যা যাবেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এর মধ্যে মুক্তিফৌজ আবার অনেক কটা জামাত নেতাকে কোতল করেছে। আর বাকীগুলোকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই বলেছিলাম, চেইত্যা গেছেন। লাহোরের জামাতে ইসলামীর আমীর মওলানা আবুল আলা মওদুদী অহন অক্করে চেইত্যা গেছেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

