"আপু , একটা গল্প বলবে ?"
অন্ধকার ঘর । কারেন্ট চলে গেছে অনেকক্ষন। আজকে রাতে আর আসবে বলে মনে হয়না । খোলা জানালার পাশে গালে হাত দিয়ে বসে আছি আমরা দু'বোন। অদ্ভুত সুন্দর একটা বাতাস বইছে । এমনি সময় আমার ছোটবোনের এই আব্দার। গল্প শুনতে ভালবাসে ও ।
বললাম , " কি গল্প ?"
ও বোধহয় আশা করেনি আমি এত সহজে রাজি হয়ে যাব । দাঁত বের করে বললো, " যা ইচ্ছা তাই।"
হাসিমুখে বললাম, "কিন্তু আমার গল্প শুনবার শর্ত মনে আছে তো ? কোন প্রশ্ন করা যাবেনা । "
এটা হচ্ছে বিশেষ সাবধানতা । প্রশ্ন করা যাবে না বললেও ও কমপক্ষে এক ডজন প্রশ্ন করে, আর এটা না বললে অন্তত পঞ্চাশটা ।
ও তাড়াতাড়ি মাথা ঝাকিয়ে সায় দিলো । আমি আমার গল্প শুরু করলাম। রূপকথার গল্প ।
"অ-নে-ক অ-নে-ক কাল আগে , মানুষের পৃথিবী থেকে অনে-ক দূরে , ছিল এক পরীর রাজ্য । "
এটুকু বলতেই চেঁচিয়ে উঠল ও , " কি-ই ! আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি যে ........সরি সরি , আর করবনা । "
হাসি পেল আমার । এগার বছর বয়স ওর , কিন্তু ভাব দেখাবে যেন কত বড় হয়ে গেছে ।
হাসি বাইরে প্রকাশ করলামনা । রেগে যাবে । বললাম, " গল্পটা আগে শোন । তারপর বলিস । "
" অনে-ক দূরের সেই পরীরাজ্যে থাকত দুজন পরী । একটা ছেলে পরী, একটা মেয়ে পরী। "
" মাত্র দু'জন পরী ? "
" আসলে অনেক পরীই থাকত, কিন্তু আমার গল্প হচ্ছে শুধু ওদের দু'জনকে নিয়ে ।"
"ও-ও আচ্ছা"
" পরীদের দেশে তো কোন দুঃখ কষ্ট নেই, তাই ওরা দু'জন খুব আনন্দে থাকত । একজন আরেকজনকে খুব ভালবাসতো তো তাই। সেখানে বড় বড় ফুলের বাগানে দু'জন হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াতো আর......."
" হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াতো কেন আপু ?"
" আসলে ওরা যে একজন আরেকজনকে ছেড়ে একদম থাকতে পারতোনা, তাই ।"
" ও-ও আচ্ছা "
" হঠাৎ একদিন সৃষ্টিকর্তার দরবারে ওদের ডাক পড়লো বিচারের জন্য । অবাক হয়ে ওরা ভাবলো, আমরা তো কোন অপরাধ করিনি, তবে কিসের বিচার ?
ভয়ে ভয়ে দু'জনে উপস্থিত হল বিচারসভায়। জানতে চাইল , হে খোদা, কি আমাদের অপরাধ ?
সৃষ্টিকর্তা তখন বললেন, তোমাদের অপরাধ এটাই যে তোমরা একজন অন্যজনকে খুব বেশী ভালোবাসো। ভালবাসাটা অন্যায় নয় । কিন্তু আমি তো বলেছি , তোমরা কাউকে এত বেশী ভালবাসবেনা যে ভালবাসাটা আসলে আমার প্রাপ্য । তাই তোমাদেরকে একটা পরীক্ষা দিতে হবে। তোমাদের আলাদা হয়ে যেতে হবে। মানুষ হয়ে জন্ম নিতে হবে মানুষের পৃথিবীতে । পরীস্থানে কোনো কষ্ট নেই, কোনো বাঁধা নেই বলেই হয়তো তোমরা একে অপরকে এতটা ভালবাসতে পারছো । মানুষ হয়ে জন্ম নিলে বুঝবে ভালবাসা কতটা যন্ত্রনাদায়ক । প্রমাণ হবে যে তোমাদের ভালবাসা কতটুকু খাঁটি ।
ওরা দুজন কেঁদে খোদার কাছে দয়াভিক্ষা চাইল । কারণ ওরা তো অল্প কিছুক্ষনও আলাদা হয়ে থাকতে পারেনা , একটা জন্ম কিভাবে থাকবে ?
সৃষ্টিকর্তা বোধহয় একটু নরম হলেন। বললেন , ঠিক আছে, এটুকু কথা দিতে পারি , তোমাদের দুজনের কখনো না কখনো দেখা হবে। তখন যদি চিনে নিতে পারো, তবে বাকি জীবন একসাথে থাকতে পারবে ।
"তারপর ?"
"তারপর আর কি ? দুজনকে পাঠিয়ে দেয়া হল পৃথিবীতে । কে জানে কাকে কোথায় ? তবে একটা বিপদ হয়ে গেল । মানুষ হয়ে জন্ম নেয়াতে ওদের পুরনো স্মৃতি গেল হারিয়ে। এটা হয়তো মনে পড়ে যে কাউকে খুঁজতে হবে, কিন্তু সে যে কেমন , সে যে কে , তা আর কিছুতেই মনে পড়েনা । কুয়াশার ঘোলা চাদরের মধ্য দিয়ে আবছায়া তার অবয়ব মনে ফুটে ওঠে শুধু । "
"তারপর ?"
"তার আর পর নেই। আর কিছু আমি জানিনা। "
"মানে-এ-এ-এ ? শেষে কি হল বল আমাকে ?"
"শেষ আমি জানব কি করে ? ওরা যে কে কই গেছে তা কেউ জানেনা।"
"কি-ই ! " , প্রায় কেঁদে ফেলে ও ," এরকম অর্ধেক গল্প বললে কেন আমাকে ?"
আমি হাসিমুখে বলি, "শেষটুকু নিজে নিজে ভেবে নে তুই, কারণ গল্পটা এখনও অসমাপ্ত।"
অন্ধকার ঘর । কারেন্ট আসেনি এখনও । খোলা জানালার পাশে হাতের ওপর মাথা রেখে বসে আছি আমি একা । আমার ছোট বোনটা রেগে-মেগে ও ঘরে চলে গেছে।
অদ্ভুত সুন্দর একটা বাতাস বইছে । আমার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে যেন আমার কানে কানে এসে কথা বলে যাচ্ছে হাজার বছরের পুরনো কোন কন্ঠ । যেন মনে করিয়ে দিতে চাইছে অনেক অনেক আগে ভূলে যাওয়া কোন স্মৃতি ।
কোন স্বপ্নসখার স্মৃতি ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


