সেইদিন ট্রেনে আমার সিটের পিছনের সিটে বসেছে এক অদ্ভুত পরিবার। দম্পতি আর তাদের তিন-চারজন ছেলেমেয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। সব কয়টা দেখতে সুন্দর। বিশেষ করে ছোট’দুটো কে দেখে মনে হয় এরা মানুষের বাচ্চা না; জ্বীন-পরীর বাচ্চা। ধবধবে ফর্সা মুখ, মাথা ভর্তি লালচে চুল।
কিন্তু সমস্যায় যেটা পড়লাম সেটা হল “শিশুদেরকে হ্যাঁ বলুন” এই স্লোগানে নয়, “শিশুদের কিছুই না বলুন, কিংবা এমন ভাব করুন যে তাদের কোনও অস্তিত্বই নাই” এমন আদর্শে বিশ্বাসী ঐ দম্পতি!
পরীর বাচ্চার মত দেখতে একেবারে পিচ্চিটা, নাপিত যেমন চুল কাটা হয়ে গেলে মাথা বানিয়ে দেয়, সেইভাবে প্রথম দফায় আমার মাথা বানিয়ে দিল। আমি অপ্রস্তুত হওয়া থেকে বাঁচার জন্য জিজ্ঞেস করলাম,
তোমার নাম কি?
প্রশ্নের উত্তরে সজোরে চুল টানা শুরু হয়ে গেল। মুখের হাসি এই কান থেকে ঐ কান! মাঝে মাঝে টুনটুনির মত খুশির হওয়ার শব্দ করছে, "হিহি কিচ কিচ হিহি কিচ কিচ"! বাচ্চার বাবামা নির্বিকার! কোনও ধেওচেও* নাই!
চুল টেনে কাজটা এক ঘেয়ে হয়ে যেতেই বাপের কোলে দাঁড়িয়ে সিটের পিছন থেকে আমার গলা পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালালো কিছুক্ষণ।
কোনও রকমে মুক্ত হয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি, একই ভাবে হাসছে পিচ্চিটা- হিহি কিচ কিচ হিহি কিচ কিচ! পিচ্চির বাপ জানালা দিয়ে হা করে তাকিয়ে আকাশ বাতাস দেখছে! যেন এরকম আকাশবাতাস অনেক দিন দেখে না!
আমি তো আর ধমক লাগাতে পারি না বাচ্চাটাকে? বরং আদর করলাম! - "বাবু তোমার নাম কি?"
কোনও উত্তর নাই। শুধু হাসি-হিহি কিচ কিচ হিহি কিচ কিচ!
আবার কিছুটা বিরতি দিয়ে এইবার আমার সিটের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে ঝুলে পড়ল! একেবারে ছোট বাচ্চা নয়। হাঁটতে পারে। মানে ওজন আছে। আমার হাতটা'তো কনুই থেকে ছিঁড়ে পড়ে যায় আরকি! আদর-টাদর করে অনেক কষ্ট করে হাতটারে বাঁচালাম। তাকিয়ে দেখি, বাপ-মা হাই তুলছে সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে। বরং মনে হল আমার উপর যেন একটু বিরক্ত। পিচ্চির ভাইবোনরা মাঝে মাঝে আলস চোখে তাকিয়ে দেখছে পিচ্চির কর্মকাণ্ড। যেন চেনেই না! দৃষ্টিতে, “এই যে হুবুহু আমাদের মত দেখতে পিচ্চিটা; এইটা কে?” এমন প্রশ্ন!
কিছুক্ষণ পরে ঘুমে আমার চোখ ভারী হয়ে এলে ভাবলাম একটু ঘুমাই! কিসের ঘুম, কিসের কি? চোখ লেগে আসলেই পরী-পিচ্চি এসে আমাকে কাঁধে ধাক্কা দিয়ে হিহিহি করে পিছনে লুকিয়ে যায়। আমি জেগে প্রথমে সজীব, তারপর কাষ্ঠ হাসি দেই, ঘুমের ভান করে গলায় ভুতের আওয়াজ করে ভয় দেখানো চেষ্টা করি! ঘুমের ভান, ঘুমের ভান, হঠাৎ উঠে, "হালুম" করে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করি!
কিসের কি?- “হিহি কিচ কিচ হিহি কিচ কিচ”!
পরীর-বাচ্চায় ভয়ও পায় না দুষ্টামি থামে না! পেছনে পিচ্চির বাপে ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে আধো আধো করে চোখ খুলে আয়েশ করছে। কেমুন’ডা লাগে? বেটা নিজে ঘুমাচ্ছে। আর সামনের যে অপরিচিত ভদ্রলোক তার বাচ্চার জন্য ঘুমাতে পারছে না, সেটা নিয়ে ভ্রুক্ষেপও নাই!
কিছুক্ষণ পর আমার উপর থেকে ইন্টারেস্ট হারিয়ে অনেককেই একইভাবে বিরক্ত করা শুরু করল পিচ্চিটা। সবাই প্রথম প্রথম আদর করছে। বিরক্ত করার মাত্রা বেড়ে যেতেই ভ্রূ কুচকে বাচ্চার বাবা-মাকে খুঁজছে!
ভাবলাম তাদের বলি,- “ওনারা ঘুমচ্ছেন এই আমার পিছনের সিটেই। বাচ্চাটাকে কিছুক্ষণ রাখেন। ওনারা ঘুম থেকে উঠলে আপনাকে জানাবো।”
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০১৩ দুপুর ১২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



