এক.
আমি এসএসসি'র আগে টেস্ট পরীক্ষায় পেয়েছিলাম মাত্র ২৬৫ !!
২৬৫ নিশ্চয়ই ভয়াবহ নম্বর , কিন্তু আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম যে এই নম্বরই বা আমি কিভাবে পেলাম ।
ক্লাস নাইনে থাকতেই আমার বিগড়ানোর চূড়ান্ত হয়েছিল , সেই তুলনায় ২৬৫ নম্বর পাওয়ার মতো লেখাও পরীক্ষার খাতায় লেখার কথা ছিল না আমার ।
আমাদের স্কুল ছিল তখনকার চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা দশটি স্কুলের একটি , সেই স্কুলের কোন ছাত্র যদি পাশ নম্বর ৩৩০ই তুলতে না পারে , তাহলে তাকে এসএসসি পরীক্ষায় বসতে দেয়ার কোন মানে হয় না ।
তৃতীয় বিভাগ বা পাশ মার্ক তুলতে না পারা সেধরনের ছাত্রের সংখ্যা ছিল ৯ জন । সেই ৯ জন ছাত্রকে ফরম ফিলাপ করতে দিলেন না ক্লাস টিচার , আমরা গিয়ে হেডস্যারকে ধরলাম ।
স্কাউট বিএনসিসি আর ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ার সুবাদে , আমাদের হেডস্যার দরছ আলী আমাকে আলাদা ভাবে স্নেহ করতেন ।
তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন - তোরা কি পাশ করতে পারবি ? পরীক্ষার আর মাত্র ৩ মাস বাকী । পড়াশোনা করবি তো ?
আমি গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছি - পারব স্যার ।
স্যার আমাদেরকে পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিলেন ।
আমরা স্যারের সেই বিশ্বাসের সম্মান রেখেছিলাম ।
আমি নিজে নিজে তখন বীজগনিতের সূত্র শিখেছি , রাতের পর রাত টেস্ট পেপারের প্রশ্নের পর প্রশ্ন সমাধান করেছি , বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নোট এনেছি , নিজে নোট তৈরী করেছি , রুটিন তৈরী করে সেই মতো পড়েছি ।
রেজাল্ট বের হওয়ার পরে দেখা গেল আমরা সেই ৯জনই প্রথম বিভাগে পাশ করেছি , দুইজন স্টার মার্কস পেয়েছে ( সেকালে স্টার পাওয়াটা এক বিশাল ব্যাপার ছিল )
বাকীদের মাঝে আমাদের কয়েকজনের স্টার মার্কস সামান্যের জন্য মিস হয়েছে , মোটের উপর অনেক ভালো রেজাল্ট বলা যেতে পারে ।
সেই ৯ জনের মাঝে ৭ জন পরবর্তী জীবনেও লেখাপড়া করেছি ,একজন ডাক্তার হয়েছে , বাকীরাও জীবনে সফলই বলা যেতে পারে । সেদিন একজনের সাথে বার্মিংহামে দেখা হল , লয়েডস ব্যাংকে দাপটের সাথে চাকুরি করছে , তার কাছেই আরেকজনের খবর পেলাম যে নাকি ঢাকাতে একটা বিদেশী সাহায্য সংস্থায় বাড়ীগাড়ীঅলা কর্মকর্তা , বেতন লাখের ঘর পেরিয়ে গেছে ।
দুই.
এই গল্পটি উল্লেখ করার কারন , সেই দিন থেকেই আমি জানি এবং বিশ্বাস করি যে জীবনের কোন পর্যায়েই শেষ বলে কিছু নেই । প্রত্যেককেই বার বার সুযোগ দেয়া উচিত , প্রত্যেকেরই অধিকার আছে বারংবার সুযোগ পাওয়ার ।
দরছ আলী স্যার আমাদেরকে সেই সুযোগ দিয়েছিলেন ।
তিন.
এবছর ভুরি ভুরি ছেলেমেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে । কাগজপত্রের হিসেব অনুযায়ী এদের প্রত্যেকের মেধার মান সমান ।
এখন সমস্যা দেখা দিয়েছে এদের কলেজ ভর্তি নিয়ে ।
সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ( এটা মনে হয় গতবছরের সিদ্ধান্ত ) যে মার্কশীটের নাম্বার অনুযায়ী এদেরকে ভর্তি করা হবে ।
শুধু তাই নয় , গতবছর একটা হাস্যকর নিয়ম শুনেছিলাম যে যাদের বয়েস বেশী তারা ভালো কলেজে ভর্তিতে প্রায়োরিটি পাবে । আল্লাহ মাবুদ বলতে পারবেন এই সব বদ্ধ উন্মাদীয় সিদ্ধান্ত যারা দেয় , তারা পরবর্তী জীবনে পাগলামি বাড়লে মেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি হয় কি না )
চার.
আমি মনে করি কলেজে ভর্তির ব্যাপারে একটা ভর্তি পরীক্ষা নেয়া উচিত । যারা হয়তো সামান্যের জন্য নম্বর একটু কম পেয়েছে , তাদেরকে আবার সুযোগ দেয়া উচিত নিজেদেরকে প্রমান করার জন্য ।
আমি নিশ্চিত সেই সুযোগ পেলে তাদের অনেকেই এবার ভালো করবে ।
ভালো কলেজ কখনোই তার ইট সিমেন্ট ডেস্ক বেঞ্চির জন্য ভালো হয় না , সেই কলেজকে ভালো বলা হয় তার শিক্ষাপদ্ধতির জন্য ।
সরকার যেহেতু সব কলেজে সমান পদ্ধতি চালু করতে পারে নি , সব কলেজে একই মাপের শিক্ষক দিতে পারেনি , তাই তাদের উচিত হবে না কাউকে ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া থেকে বঞ্চিত করা ।
আমাদের সকলেরই মনে রাখা উচিত , জীবন এক অন্তহীন সম্ভাবনার নাম । সেই সম্ভাবনার দ্বার সকলের জন্য সবসময় উন্মুক্ত রাখার কোন বিকল্প নেই ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

