এ দুই শিল্পই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী তথ্য সঞ্চালন এর পরিধি বাড়ছে; ফলে বেশী মানুষকে এই তথ্য সঞ্চালন আওতার ভেতরে নিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। আমেরিকার অভিষ্ঠ মতাদর্শ প্রচারের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে যার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের সপক্ষে উপরিকাঠামো নির্মান প্রক্রিয়া চলছে। দেশে দেশে তাদের নিয়োজিত বুদ্ধিজীবিরা উৎপাদন করছে তথ্য এবং তত্ত্ব। এসব তথ্য এবং তত্ত্ব মানুষের মনোজগতের উপর স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করছে। দৈনন্দিন জীবনযাপনে রুচি-মুল্যবোধ- থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। মিডিয়ার প্রভাবে বাড়ছে পন্যের বিক্রি, টিকিয়ে রাখছে বাজার ব্যাবস্থা। তথ্যপ্রযুক্তির প্রায় সবেক্ষত্রেই আমেরিকার একছত্র আধিপত্য রয়েছে। এ শিল্পের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটেছে মুলত তাদের বুদ্ধিজীবিদের দ্বারা উৎপাদিত তথ্য'পন্য ভোক্তাদের কাছে পৌছে দেয়ার উদ্দ্যেশ্যে যা পুঁজির নিরাপত্তায় মতাদর্শিক সহায়তা দেবে। আর এ কৌশল তারা অর্জন করে স্নায়ুযুদ্ধকালীন (সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে বিশ্ব পুজিবাদের ঠান্ডাযুদ্ধ) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ বিদায় নিলেও উপনিবেশীক শাসনের অভিজ্ঞতা, মানুষের মনোজগতে স্থায়ীভাবে প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সবক্ষেত্রেই রয়ে গেছে ইংরেজী ভাষা শিক্ষা; রয়েছে তাদের সৃষ্ট এবং লিখিত ইতিহাস, দর্শন, সমাজতত্ত্ব এবং তাদের লিখিত সাহিত্যের আধিপত্য। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনের ফলে যে মধ্যবিত্তের জন্ম তাদের বিকাশের ধারাবাহিকতায় এখনও মধ্যবিত্তদের মনোজগত জুড়ে আগ্রাসনকারী শাসকদের প্রসস্তিগাথা; ইউরোপিয়ানরা মানবিক আদর্শের ত্রানকর্তা, আমাদের পূর্বপুরুষদের তারা সভ্যতা শিখিয়েছিলেন। যার প্রভাবে ইউরোপিয় সাম্রাজ্যবাদী শাসকদেরকে সভ্যতার আলোকবাহী ত্রানকর্তা হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
উপনিবেশবাদীদের হত্যা-জুলুমের প্রতিবাদে মানবতাবাদের নামে মানববন্ধন, অনশন, বিক্ষোভের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস প্রতিবাদ তথাকথিত ইউরোপিয় সভ্যতার কৌশলী ধারণা। এ মনোভাব বা ইউরোপিয় সংস্কৃতি কৌশলে ইউরোপের আধিপত্যবাদী নীতিকে নিরাপত্তা দেয়। এ অবস্থায় আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে হত্যা নির্যাতন চালিয়ে যাবে কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম বা খৃষ্টান বা ইহুদী বা হিন্দু অহিংস পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানাতে পারবে, ব্যতিক্রম হলে তারা সন্ত্রাসী হয়ে যাবে, ধর্মযুদ্ধের নামে চলবে সামরিক আগ্রাসন- যুদ্ধের বিভিষিকা।
গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উপনিবেশবাদ ধ্বংস হয়ে অসংখ্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হলেও মতাদর্শিক আধিপত্য মধ্যবৃত্তেরই হাতে; পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি তাদের আনুগত্য বিগত শতকের উপনিবেশীক শাসন আমলের মতোই প্রভু ভৃত্যের মতো প্রতিষ্ঠিত। আর আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ সেই উপনিবেশীক শাসন আমলের ইউরোপিয়ান সংস্কৃতির উপর ডাল-পালা বিস্তার ঘটিয়েছে। বিশ্বব্যাপি মিডিয়া বা তথ্যউৎপাদনের এবং প্রচারের জন্য আমেরিকা বেছে নিয়েছে সেই সাম্রাজ্যবাদী ভাষা ইংরেজীকে; মিশনারীদের মাধ্যমে যে ভাষার বিস্তার ঘটেছিল। আমেরিকার শাসকদের উত্তরসুরীরা সেই ইংরেজী ভাষা-ভাষী ইউরোপের দেশত্যাগী লূন্ঠনকারী, যারা রেড ইন্ডিয়ানদের কচুকাটা করে তাদের সম্পদসহ আমেরিকা মহাদেশটাকে দখল করেছিল। ইউরোপিয়ান উপনিবেশেবাদের প্রথম দিকে ইংরেজী লুন্ঠনকারীদের ভাষা হিসেবে এসেছিল। আর এই পর্যায়ে ইংরেজীর উপর ভর দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ তার স্বার্থরক্ষাকারী উপরিকাঠামো প্রতিষ্ঠা করছে বিশ্বব্যাপি। সাম্রাজ্যবাদের কল্যানে ইংরেজী আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ায় 'ইংরেজী' ভিন্ন ভাষা-ভাষী মানুষের বৈশ্বিক যোগাযোগের একমাত্র ভাষা হয়ে উঠেছে। যেমন ফরাসি আরবি চাইনিজ বা জাপানিজ ভাষা সবাই বোঝে না ফলে সেসব দেশের সম্পর্কে জানতে হলে ইংরেজী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আল জাজিরা বা অন্যান্য ভিন্ন ভাষার টিভি আমরা দেখিনা কারণ তার ভাষা আমরা বুঝিনা ( সাম্প্রতিক সময়ে আল-জাজিরার গুরুত্ব সবাই জানেন, যদিও এখন তারা ইংরেজিতে প্রচার শুরু করেছে )। অতএব মধ্যপ্রাচ্য লাটিন আমেরিকা অথবা এশিয়ার কোন সংবাদ জানতে হলে আমাদের ইংরেজী প্রচার মাধ্যমগুলোর উপর নির্ভর করতে হয়।
এখন আমেরিকার যুদ্ধশিল্প আর তথ্যশিল্প এই দুই শিল্প আমাদের শাসন করছে।
অর্থাৎ বিশ্বব্যপি আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিপক্ষে প্রতিবাদ করতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে আমাদের দেশীয় অর্থনীতিতে তাদের নিয়ন্ত্রনের কথা; আমেরিকার তাক করা ক্ষেপনাস্ত্র অথবা এম-১৬ রাইফেল ধারী সৈনিকদের কথা। আর তথ্যশিল্প আমাদের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আফিমের মতো ভুলিয়ে রাখছে ব্যক্তিগত ভোগবাদী স্বর্গের হরেক রকম পন্যের দুলংর্ঘ লালসায়; মনোজগত জুড়ে ইউরোপিয়ান-আমেরিকান মিডিয়া আর কালচারের আধিপত্য। বর্হিবিশ্বের যেসব খবর আমরা শেষমেষ জানতে পারি সবই আমেরিকান ভাইদের মাষ্টার এডিটিং এর পর আসে; আমেরিকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় ইরাকের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সামান্যই জানানো হয় আমাদের, অথচ যে আমেরিকার অন্যায় আগ্রাসনের কারণে মরছে ইরাকের নারী-শিশু সহ নিরীহ জনগন সেই আমেরিকার প্রসস্তিগাঁথা সারাদিনই চলতে থাকে। বিশ্বের ১ নম্বর সন্ত্রাসী রাষ্ট্র যারা নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে খুন করছে নিরীহ মানুষ; বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে আক্রান্তদের হাতে তুলে নিতে হচ্ছে অস্ত্র। সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি- যারা বিশ্বব্যাপি লুন্ঠনের রাজত্ব কায়েম করেছে, বাড়িয়েছে পারমানবিক যুদ্ধের ঝুকি, ধংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে ভবিষ্যত পৃথিবীকে এবং যারা সমগ্র পৃথিবীর সাধারণ মানুষের ঘৃনা অর্জন করেছে, সে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিপক্ষে কোন কার্যকর আন্দোলন গড়ে উঠছে না তার সামরিক শক্তির ভয়ে আর প্রপাগান্ডার গোলকধাঁধাঁয়। সবচেয়ে বড় কথা হল তথ্যশিল্পের বিপুল উৎপাদনের ফলে ইতিহাসের খন্ডিত ব্যাখ্যা, বিকৃতি এবং ভূলব্যাখ্যা তারা প্রচার করছে। তথ্য উৎপাদনের এবং প্রচারের এই মহোৎসব চলছে সেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী ভাষা ইংরেজীর উপর ভর করে। আমরা হারাতে বসেছি মানবজাতির মঙ্গলের জন্য যা ছিল আমাদের ঐতিহাসিক অর্জন, গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব এবং তথ্য। কারণ তারাই সব তথ্যের প্রক্রিয়াজাত করে ইন্টারনেটে প্রচার করছে। ইন্টারনেট এখন তথ্য আদান প্রদানের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম, যখন ইন্টরনেট এর মাধমে কেউ জানতে চাইবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে অথবা লুমুম্বার কঙ্গো সম্পর্কে অথবা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তখন ওদের জাত শত্রু বুর্জোয়া শ্রেনী এবং তাদের মিডিয়া গিল্ডদের টাকায়, ভাড়াটে বুদ্ধিজীবিদের লেখা পড়ে জানতে হবে সে ইতিহাস। কারণ বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের টন-কে-টন কাগজের গবেষনা নামের বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী তত্ত্ব ও তথ্যের মড়ক শুরু হয়েছে।
দেশীয় কাঁচামাল থেকে মতামত উৎপাদনের জন্য বাছাইকৃত এজেন্টদের দেয়া হচ্ছে নামী-দামী উপাধি, দেশী সম্পদশালীদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে তাদের খ্যাতির কেচ্ছা। তাদের প্রধান অতিথি বানিয়ে টি.ভি. তে বিশেষ প্রোগ্রাম, কিছু কিছু খবরের কাগজ ছাপাচ্ছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। আর জনগনের বিপক্ষে রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্তগুলোকে জায়েজ করানোর জন্য জনমত গঠনের নামে ভাড়া খাটছে এসব দালাল চক্র, বিভিন্ন গবেষনা প্রতিষ্ঠান। চকচকে চেহারার দেশহিতৈষী লোকেরা বাংলায় কথা বলেন টেলিভিশনে। ছবিসহ লেখা ছাপা হয় সংবাদপত্রে। সাধারণ মানুষ হাঁ করে এদের কথা শোনেন আর বিশ্বাস করেন। আর শহুরে উঠতি চাকরীজীবি মধ্যবিত্তেরা তথাকথিত সিভিল সোসাইটির লোকেরা সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে ওরকম চকচকে চেহারার বুদ্ধিজীবি বানাবার স্বপ্ন দেখছেন। কারণ তারা জানেন, এসব বুদ্ধিজীবিগণ ভাড়া খেটে ভালই কামাচ্ছেন আজকাল।
এই আমাদের সময় ও বাস্তবতা।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


