বাংলাদেশে সিডও সনদ : প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতাঃ
আমাদের আর্থ-সমাজ কাঠামোর মধ্যে যুগ যুগ ধরে শোষণ-বঞ্চনা চলছে। আর এই শোষণ-বঞ্চনা নারীদের বেলায় বিশেষভাবে প্রযোজ্য। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সেই আদিম যুগে নারী পুরুষতান্ত্রিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকা পড়েছিল। হাজার হাজার বছর পেরিয়ে এই দাসত্ব আজও চলছে। এর ফলে শারীরিক ও মানসিক শক্তিতে পুরুষের সঙ্গে নারীর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধিনিষেধ এ ব্যবধানকে আরও ব্যাপক ও গভীর করেছে। আমাদের সমাজে নারী সর্বক্ষেত্রেই নানা বৈষম্যের শিকার। নারীও যে মানুষ, তারও যে আনন্দ-বেদনা, আবেগ-অনুভূতি, ইচ্ছা-অনিচ্ছা আছে অধিকাংশ পুরুষের কাছ থেকে এখনও সে-স্বীকৃতিটুকুও মেলেনি। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে তাদের এ স্বীকৃতি মিললেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যায় না, এ জন্য শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের লড়াইয়ে তারা শামিল আছেন। গোটা দুনিয়াতেই এ লড়াই চলছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস তারই একটি স্মারক।
নারীর এ লড়াইয়ের ফল হিসেবেই নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। সিডও সনদ (ইংরেজিতে Convention of the Elimination of All Forms of Discrimination Aganist Women - CEDAW) প্রণয়ন ও তার কিছু কিছু ধারার বাস্তবায়ন তারই একটি দৃষ্টান্ত। নারীর অধিকার সম্পর্কে সকলকে সজাগ করে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে 'বিশ্ব নারী বর্ষ' হিসাবে ঘোষণা করে । এর পর আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৯ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ-সিডও। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ২০টি রাষ্ট্রের অনুমোদন লাভের পর সিডও সনদ কার্যকর বলে ঘোষিত হয়। লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি বা বয়স নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে অধিকার যে একটি মৌলিক মূল্যবোধ - সিডও সনদ এ প্রেক্ষিতে নারীর অধিকারকে ব্যাখ্যা করেছে। এই সনদ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতিকে পরিবর্তনের মতো নির্দিষ্ট ইস্যুগুলোকে মোকাবেলা করার কথা বলেছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় দায়-দায়িত্বের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে। সিডও সনদের মূল বাণী হলো - মানব সমাজে সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নে যুগে যুগে নারী যে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে তার যথাযথ স্বীকৃতি দান। সমাজ, রাষ্ট্র তথা সমস্ত বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপন করা। মানুষ হিসাবে নারীর নিজের উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা। এর জন্য আইন প্রণয়ন, প্রচলিত আইনের সংস্কার এবং আইন প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি তথা প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করা। সিডও সনদের মূল লক্ষ্য হলো, মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতার নিশ্চয়তা বিধানের আবশ্যকীয়তা তুলে ধরা এবং নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দান। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর সিডও সনদ অনুমোদন করেছে। এর অর্থ হলো - বাংলাদেশ সরকার সিডও বাস্তবায়নের জন্য সকল প্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অঙ্গিকারাবদ্ধ। কিন্তু কী অবস্থা ওই অঙ্গিকারের? এ বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখাই এ রচনার উদ্দেশ্য।
সিডও সনদ তিনটি মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো - সমতার নীতি, বৈষম্যহীনতার নীতি এবং শরীক রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্বের নীতি। সিডও সনদ ৩০টি ধারা সম্বলিত। এই ৩০টি ধারা ৩ ভাগে বিভক্ত -
ক) ১ থেকে ১৬ ধারা - নারী-পুরুষের সমতা সম্পর্কিত।
খ) ১৭ থেকে ২২ ধারা - সিডও কর্মপন্থা ও দায়িত্ব বিষয়ক।
গ) ২৩ থেকে ৩০ ধারা - সিডও প্রশাসন সংক্রান্ত।
১-১৬ ধারা সিডও সনদের মূল ধারা হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশ সিডও সনদের দুটি ধারা - ধারা-২ এবং ১৬-১(গ)-এ আপত্তি জানিয়ে অনুমোদন করেনি। এ দুটি ধারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশ স্পর্শকাতর এবং তা বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তাই ধারা দুটো নিয়ে পরবর্তী কিস্তিতে আলোচনা করবো। এ পর্যায়ে আমরা বাংলাদেশ স্বাক্ষরকৃত ধারাসমূহ এবং ধারা বাস্তবায়নের পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলবো। আলোচনার পরিসর স্বল্প বলে শুধু মূল ধারার সহজ ভাষ্যগুলো প্রথমে তুলে ধরা হলো। এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আমাদের সংবিধানে ও প্রচলিত আইনের ভাষ্যগুলোও (যেখানে আছে) দিয়ে দেওয়া হলো। বলা বাহুল্য, সংবিধানে ও প্রচলিত আইনের কিছু কিছু ধারায় বেশ ভালো ভালো কথা বলা থাকলেও বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এখানে উল্লেখ্য, বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের অন্যান্য কনভেনশনের সাথে সিডও সনদের বিশেষ পার্থক্য হল এ সনদে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সিডও সনদ স্বাক্ষরের
দুই বছরের মধ্যে প্রতিটি দেশকে তাদের দেশে নারীর বর্তমান অবস্থা, উন্নয়নে বাধা এবং সনদের নীতিমালা অনুসরণে গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে শ্যাডো রিপোর্ট বা ছায়া প্রতিবেদন পেশ করতে হয়। সিডও কার্যকরি পরিষদের সভা বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়। সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র কর্তৃক নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে কার্যকরি কমিটি গঠিত হয়। যার দায়িত্ব বিভিন্ন দেশের সব রিপোর্ট পরীক্ষা করা ও সিডও সনদ বাস্তবায়নে যথাযথ সুপারিশ করা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোথায় আছে তাও এ আলেচনায় বোঝা যাবে।
সিডও সনদের মূল ধারাসমূহ
ধারা-১ : নারীর প্রতি বৈষ্যমের ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞা প্রদান। নারীর প্রতি বৈষম্য হলো - নারী-পুরুষের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে নারীকে সবসময় পুরুষের
চেয়ে ছোট করে দেখা। জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারীর অধিকার, স্বাধীনতা ও পছন্দ-অপছন্দ হরণ করা।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন ধারায়, যেমন - অনুচ্ছেদ ১০, ১৯(১,২), ২৭, ২৮(১,২,৩), ২৯(১,২)-এ জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা বিধানের কথা ঘোষিত হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষ ভেদে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
সিডও সনদ ধারা-৩ : পুরুষের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা উপভোগের ক্ষেত্রে নারীকে নিশ্চয়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে এবং নারীর পূর্ণ উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, শরীক রাষ্ট্রসমূহ সকল ক্ষেত্রে বিশেষ করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নসহ সকল প্রকার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তি আইনের সমান আশ্রয় লাভ করবে এবং আইন ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। এবং আইনানুযায়ী জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না।
সিডও সনদ ধারা-৪ : নারী-পুরুষের মধ্যে প্রকৃত সমতা আনয়নে সাময়িক ও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ। যেমন - নারীর জন্য সংসদে আসন সংরক্ষণ, চাকুরীর ক্ষেত্রে নারী কোটার প্রবর্তন, মাতৃত্বকালীন ৪ মাস সবেতন ছুটি। এসব ব্যবস্থা পুরুষের প্রতি বৈষম্য বলে বিবেচিত হবে না এবং নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপিত হলে এসব ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে। অনুরূপভাবে মাতৃত্ব রক্ষায় নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণও অন্যের প্রতি বৈষম্য বলে বিবেচিত হবে না।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৯, ২৮(৪), ২৯(৩-ক,গ), এবং ৬৫(৩)-এ প্রজাতন্ত্রের অনগ্রসর অংশের জন্য সংরক্ষণের নিয়ম আছে।
আইনি বিধান :- স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ ১৯৭৬, (সংশোধনী)১৯৮০, ইউনিয়ন পরিষদ(সংশোধনী) ১৯৮৩, জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৮, ইউনিয়ন পরিষদ(সংশোধনী) ১৯৯৩ ও ১৯৯৭, গ্রাম পরিষদ আইন ১৯৯৭-এ চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচনে প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রাম পরিষদে নারী সদস্য মনোনীত করার বিধান আছে।
মাতৃত্ব কল্যাণ আইন :- মাতৃত্বকালে সবেতন ছুটিসহ বিশেষ সুযোগ সুবিধা প্রদান।
সিডও সনদ ধারা-৫ : নারী-পুরুষের প্রচলিত ভূমিকা ও কর্মকা-ভিত্তিক নেতিবাচক সংস্কৃতি পরিবর্তন। নারী ও পুরুষ সম্পর্কে উঁচু নিচু ধারণা কিংবা নারীপুরুষের গঁৎবাধা ভূমিকা ও কাজকর্মকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রচলিত কুসংস্কার, রীতিনীতি, ধ্যান-ধারণা, প্রথা ও অভ্যাস দূর করা। মাতৃত্বকে সামাজিক কাজ রূপে বিবেচনা করা এবং সন্তান লালন-পালনে বাবা ও মা উভয়ের একই রকম দায়িত্বের বিষয়ে শিক্ষা দান।
সিডও সনদ ধারা-৬ : পতিতাবৃত্তি দূরীকরণ। নারী পাচার, পতিতাবৃত্তি বা দেহ ব্যবসা ও নারী শোষণ বন্ধের জন্য রাষ্ট্রকর্তৃক আইনসহ সকল প্রকার
যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- অনুচ্ছেদ ১৮(২) ও ৩৪(১)-অনুযায়ী গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দন্ডনীয়।
আইনি বিধান :- দেহ ব্যবসা নিরোধ দ-বিধি ১৮৬০-ধারা ৩৭২; অবৈধ নারী পাচার দমন এ্যাক্ট ১৯৩৩; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০।
সিডও সনদ ধারা-৭ : রাজনীতি ও জীবনের সর্বত্র নারীর অংশগ্রহণের সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ। রাজনীতি ও সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের মতো সমভাবে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। সকল প্রকার নির্বাচনে ভোটদান ও প্রতিদ্বন্দিতায় নারীর সমান অধিকার এবং সকল পর্যায়ের সরকারী-বেসরকারী পদ লাভ, সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ করার ও নীতি নির্ধারণে নারীর যুক্ত হবার সমঅধিকার নিশ্চিত করা।
সংবিধানে সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- অনুচ্ছেদ ৯, ১০, ১৯(১), ২৭, ২৮(২), ৬৬(১), ১২২(১,২) এবং অনুচ্ছেদ ৩৮-এ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে এবং
জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার সকল নাগরিকের থাকবে এবং মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সিডও সনদ ধারা-৮ : আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিরূপে নারীর অংশগ্রহণ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার এবং আন্তর্জাতিক
সংস্থায় যোগদানের জন্য নারীদের সমান সুযোগ প্রদান।
সিডও সনদ ধারা-৯ : নারীর জাতীয়তা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। নারীর নিজের ও স্বীয় সন্তানের জাতীয়তা অর্জন, পরিবর্তন ও বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুরুষের মতো সমান অধিকার লাভ।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা : অনুচ্ছেদ ৬(১,২)-অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া বিবেচিত এবং আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইবে।
আইনি বিধান :- বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন ১৯৫১; রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ১৪৯ (১৯৭২)-যার বাবা বা দাদা জন্মসূত্রে বাংলাদেশে বসবাস করছেন তিনি এদেশের নাগরিক হতে পারবেন। সম্প্রতি, বৈবাহিক সূত্রে কোন বাংলাদেশী নারীর বিদেশী স্বামীকে এ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার দিয়ে একটা আইন করা হয়েছে, আগে এ অধিকার শুধু পুরুষের বেলায় প্রযোজ্য ছিল।
সিডও সনদ ধারা-১০ : সকল ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ। শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, বৃত্তি ও অনুমোদন লাভে নারীর সমান সুযোগ। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রচলন। সহশিক্ষা প্রবর্তন। নারী-পুরুষ সম্পর্কিত গতানুগতিক ধ্যানধারণা বদলের জন্য পাঠ্যপুস্তক ও কর্মসূচির সংশোধন। ছাত্রীদের স্কুল ত্যাগের হার কমানো। ক্রীড়া ও শরীর চর্চায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ দান। সাক্ষরতাসহ অব্যাহত নারী শিক্ষা কর্মসূচি। নারীদের পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত তথ্য প্রদান।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- অনুচ্ছেদ ১৭(ক,খ,গ) এবং ২৮(৩)-এ ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন
শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উল্লেখ আছে।
সিডও সনদ ধারা-১১ : চাকুরী, কর্মসংস্থান ও কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা। কর্মে নিয়োগ, স্বাধীনভাবে পেশা ও চাকুরী নির্বাচন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ এবং বেতন-ভাতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার ও সুযোগ সুবিধা লাভ। কর্মে অক্ষম নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা প্রদান। মাতৃত্বকালে সবেতন ছুটির বিধান। গর্ভধারণ, মাতৃত্ব ও বিয়ের কারণে চাকুরী ও কর্মসংস্থানে নারীর প্রতি বৈষম্য রোধ। কর্মক্ষেত্রে শিশু যতœকেন্দ্র স্থাপন। গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখা।
সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- অনুচ্ছেদ ১৫(খ,ঘ), ২০(১), ৪০, ২৯(১,২,৩) ও ২৮(১,২,৩)-অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব সকল
নাগরিকদের জন্য কাজের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আইনি বিধান :- মজুরি পরিশোধ আইন ১৯৩৬; শ্রমিক ক্ষতিপূূূরণ আইন ১৯২৩; কলকারখানা আইন ১৯৬৫ ও বিধিমালা ১৯৭৭, শ্রমিক নিয়োগ আইন ১৯৬৫, ১৯৮৫ (সংশোধনী)।
সিডও সনদ ধারা-১২ : নারীর জন্য মাতৃত্বকালীন পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান। পরিবার পরিকল্পনা সেবাসহ স্বাস্থ্য পরিষেবায় নারীর সমান সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ব্যবস্থা গ্রহণ। গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের পুষ্টির ব্যবস্থা করা।
সংবিধানে সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- অনুচ্ছেদ ১৫(ক) ও ১৮(১)-এ অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা
করা। জনগণের পুষ্টির স্তর ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে ব্যবস্থাগ্রহণ ও মাদক নিষিদ্ধকরণ।
সিডও সনদ ধারা-১৩ : অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তিতে নারীর সমান অধিকার। পারিবারিক কল্যাণ, ব্যাংক, ঋণ, কর্জ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে নারীদের সমান সুযোগ প্রদান। নারীদের অবসর, বিনোদনের সুযোগ লাভ এবং খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক জীবনে নারীর অংশগ্রহণের অধিকার সুরক্ষিত করা।
সংবিধানে সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- অধিকার সংক্রান্ত অন্যান্য ধারার সাথে অনুচ্ছেদ ১৫(গ) অনুযায়ী নাগরিকদের জন্য যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার থাকবে।
সিডও সনদ ধারা-১৪ : গ্রামীণ নারীর উন্নয়ন এবং পল্লীউন্নয়নে তাদের সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। গ্রামীণ নারীদের বিশেষ সমস্যাগুলি বিবেচনা করা।
তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি দক্ষতা লাভ, গ্রুপ গঠন, কৃষি ঋণ ও খাস জমি বণ্টন
ইত্যাদিতে সমান সুযোগ সুবিধা ও অধিকার লাভ। গৃহায়ন, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, যোগাযোগ ইত্যাদির সুফল পল্লী নারীদের কাছে
পৌঁছানো।
সংবিধানে সংশ্লিষ্ট সম্পূরক ধারা :- অনুচ্ছেদ ১৩(খ), ১৮, ১৫ (ঘ), ১৬, ১৯(১,২), ২৮(২)-অনুযায়ী নগর ও গ্রমাঞ্চলের জীবনযাত্রার বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আইনি বিধান :- রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নের পাশাপাশি অখঙ বা কৃষি শ্রমিক অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এবং ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ (এল আর ও) ১৯৯৪:
খাস জমি বণ্টনের ক্ষেত্রে ভূমিহীন নারীদের অগ্রাধিকার প্রদান।
সিডও সনদ ধারা-১৫ : নারীর আইনগত ও নাগরিক সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আইনের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের সমতা স্থাপন। চুক্তি সম্পাদন, সম্পত্তি
দেখাশুনা, আইন-আদালতের আশ্রয় লাভ, বাসস্থান ও স্থায়ী নিবাস নির্ধারণে, পছন্দ-অপছন্দ, অবাধে চলাফেরা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার লাভ।
আইনি বিধান :- সাক্ষ্য আইন ১৯৭২ : সাক্ষীর ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান ; চুক্তি আইন ১৯৭২ : যে কোন চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন সাবালক এবং আইনে অযোগ্য নয় এমন যে কেউ চুক্তি সম্পাদনের অধিকার সংরক্ষণ করে; উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫।
সিডও সনদ ধারা-১৬ : বিয়েসহ সকল ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে নারী-পুরুষের সম অধিকার। বিয়ে, বিয়েতে পছন্দ-অপছন্দ এবং বিবাহ
বিচ্ছেদকালে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়-দায়িত্ব। সন্তান গর্ভে ধারণ ও জন্মদান এবং সন্তান ধারণে বিরতি ও সন্তান সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। সম্পত্তির মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, ভোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে নারী-পুরুষের একই অধিকার। বাল্য বিবাহ বা বাল্যকালে বাগদান নিষিদ্ধকরণ এবং বিয়ের নূন্যতম বয়স নির্ধারণ ও বিয়ে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা।
আইনি বিধান :- অভিভাবকত্ব ও প্রতিপাল্য আইন (৮ নং এ্যাক্ট) ১৮৯০; বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯; পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ ও সংশোধনী ১৯৮৯; ব্যক্তিগত পারিবারিক উত্তরাধিকার আইন; বিয়ের বয়স ও রেজিস্ট্রিকরণ আইন।
সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও আইনে বর্ণিত কথামালা এবং বাস্তবতা
আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর অধিকার রক্ষায় সিডও সনদের কিছু বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলোতে দৃষ্টি দেয়া ছাড়া নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। যেমন - সিডও সনদের ৫ নং ধারায় মাতৃত্বকে সামাজিক কাজ হিসাবে বিবেচনা করার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু এ বিষয়ে সংবিধানে কিছুই বলা নেই। আমরা খুব ভালো করেই জানি, এখানে মাতৃত্বকে সামাজিক কাজ হিসাবে দেখা হয় না। এমনকি সন্তান লালন-পালনেও পুরুষদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। সন্তান যেন নারীরা শুধুমাত্র নিজেদের প্রয়োজনে জন্ম দেয় এবং এর লালন-পালনের দায়িত্ব শুধুমাত্র মায়ের। আমরা জানি, কোন প্রগতি বা উন্নতিই নারীকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। বিষয়টা বোঝার জন্য সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার দিকে একটু ফিরে তাকালে হয়তো সুবিধা হবে।
সাবেক সোভিয়েট রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটা ছিল নারীকে পারিবারিক শ্রমের দায় থেকে মুক্ত করা। সেখানে বলা হতো, রাষ্ট্রের উচিত একজন নারীকে প্রথমে শ্রম স্বার্থের জায়গা থেকে দেখা এবং তারপর একজন মা হিসাবে। এজন্য সেখানে নারীদেরকে পারিবারিক অনুৎপাদনশীল কাজ থেকে মুক্ত করে সামাজিক উৎপাদনে নিয়োজিত করার নানারকম প্রচেষ্টা ছিল। 'সুরক্ষিত মাতৃত্ব এবং শৈশবকালের নীতি' - বিষয়টিকে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলেকজান্দ্রা কোলনতাই এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপবিভাগের প্রধান ভেরা পাভলোভনা লেবেডেভা দারুণভাবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন নারীকে তার প্রকৃতি বা মাতৃত্বের জায়গায় ঠিক রেখে উৎপাদনশীল কাজে দেখতে চাইলে নারীর ওপর থেকে মাতৃত্বের কঠিন বোঝা কমাতে হবে। মায়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মাত্র দুটি কাজ। সন্তান জন্মের পূর্বে গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপন করা এবং সন্তান জন্মের পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে একজন নারী শুধুমাত্র তার নিজের জন্য নয়, নিজের রক্ত মাংস দিয়ে দেশের জন্য নতুন সদস্য, নতুন শ্রম শক্তি, নতুন প্রজন্ম তৈরি করছে। কাজেই একজন মায়ের প্রধান কাজ হলো সুস্থ বাচ্চা জন্ম
দেওয়া। সন্তান লালন-পালনের বাকী দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এজন্যই তৎকালীন রাশিয়া 'মাতৃত্বের স্বর্গ' মডেল তৈরি করেছিল। প্রতিটা কর্মস্থলে শিশু যত্ন কেন্দ্র এবং পরামর্শ কেন্দ্র ছিল। এমনকি দুধের রান্নাঘরও তৈরি করা হয়েছিল। যে কারণে কর্মজীবী মায়েরা সামাজিক উৎপাদনে যুক্ত থাকতে পারতো।
কিন্তু আমরা দেখি এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের দেশে নারীরা অনেক পিছিয়ে। যদিও কিছুসংখ্যক নারী এখন অনেক ধরনের পেশায় যুক্ত।
তথাপি কোনো প্রতিষ্ঠানে বা কর্মস্থলে শিশু লালনের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। গার্মেন্টেসে কর্মরত নারীদের করুণ অবস্থা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
অথচ বাংলাদেশ সরকার সিডও সনদের এসব ধারায় স্বাক্ষর করেছে। আর মাতৃত্বকালীন ছুটির অবস্থা তো আরও নাজুক। আমাদের দেশে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতন ৪ মাস। কিন্তু বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এটিকে নিজেদের মতো করে কাটছাঁট করে। আর গার্মেন্টসসহ অনেক প্রতিষ্ঠান তো ওই সময় বিনা বেতনে ছুটি দেওয়া দূরে থাক, চাকুরী থেকে ছাঁটাই পর্যন্ত করে। পুরো সামাজিক পরিবেশে বিষয়টিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে তা বেআইনি নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পতিতালয় রয়েছে। যেগুলো সম্পর্কে কম-বেশী সবাই অবগত। আইনানুযায়ী পতিতাদের উদ্ধার করে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করার কথা। এ উদ্দেশ্যে কিছু ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এগুলো বাস্তবে পতিতালয়ের চেয়েও জঘন্য। সেখানে আশ্রিতরা আরও বেশি নিরাপত্তাহীন ও মানবেতর জীবন-যাপন করছে। অন্যদিকে আইনের আড়ালে বাস্তবে পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসাবে দেখানোর একটা জোর প্রচারণা আছে। যে কারণে পতিতাদের যৌনকর্মী নামে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন এটা কি কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক নারীর পেশা হতে পারে? আর দশটা কর্মক্ষেত্রের মতো এটাও কি নারীর কর্মক্ষেত্র হওয়া উচিত?
এখন খোলা চোখেই দেখা যায়, পুঁজিবাদের শিরোমণি আমেরিকা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা দেশেই পতিতাবৃত্তি চালু আছে। এর কারণ হলো মানুষকে ভোগ লালসায় মত্ত রাখা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ নষ্ট করে আদিরসকে চাড়িয়ে দিয়ে মুনাফা লোটা। এ কারণে বিশ্বব্যাপী নারী পাচার কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। অথচ আমরা যদি সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার দিকে তাকাই তাহলে জানতে পারবো, রাশিয়াই পৃথিবীর একমাত্র দেশ ছিল যেখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর একটা পর্যায়ে এসে কোনো পতিতা ছিল না। সেখানে নারী পাচার ছিল অকল্পনীয়।
আমাদের দেশে প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণ, খুন, এসিড নিক্ষেপ, ফতোয়াবাজি, প্রতারণা ও লাঞ্চনার খবর পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সরকার এসব বিষয় প্রতিরোধে সিডও সনদে অঙ্গীকারাবদ্ধ। দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং নারী পাচার দমন আইনও আছে। কিন্তু এসব আইনের বাস্তবায়ন খুবই দুর্বল ও প্রায় অকার্যকর। বিভিন্ন সমীক্ষা মতে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪ হাজার নারী ও শিশু বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়। তাদেরকে বাধ্যতামূলক পতিতাবৃত্তি, শ্রমদাসত্ব, অশ্লীল ছবি ও ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়। এখনো প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশী কিশোরী পাকিস্তানে পতিতাবৃত্তিতে আটকে আছে; কলকাতার গণিকালয়ে ১৪% নারী বাংলাদেশী।
বাংলাদেশে কারখানা শ্রমআইন অনুযায়ী মজুরিসহ বাৎসরিক ছুটি, মাতৃত্বকল্যাণ ছুটি, কর্মজীবী মায়েদের শিশুসন্তানদের জন্য কর্মস্থলে দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার সেন্টার) স্থাপন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা (বিশুদ্ধ পানীয় জল, খাবার কেন্টিন) প্রদান, নারী-পুরুষভেদে শ্রমিকদের জন্য পৃথক পায়খানা ও প্রসাবখানাসহ স্বাস্থ্যসম্মত পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করার দায়িত্ব মালিকের। কিন্তু এখানে নারী শ্রমিকরা নূন্যতম মানসম্পন্ন কর্ম পরিবেশ থেকে বঞ্চিত।
কর্মক্ষেত্রে হরহামেশাই তারা ধর্ষণসহ নানাবিধ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। অধিকাংশ কারখানাতেই নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, গার্মেন্টেসে কর্মরত নারীদের শতকরা ৩০ ভাগ পেটের পীড়ায়, ২০ ভাগ মূত্রনালীর সংক্রমণ, ২৫ ভাগ চোখের অসুখ ও মাথাব্যথা এবং ১৫ ভাগ দুর্বলতায় ভোগে। এর বাইরে মজুরি বৈষম্য তো আছেই। এছাড়া অন্যান্য পেশায় মেধার ভিত্তিতে
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হলেও নানান প্রতিকূলতার কারণে চাকুরী করতে পারে না। কারণ কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল এবং তাদের শিশুদের জন্য কর্মক্ষেত্রে দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এক্ষেত্রে আইনগত বাধা না থাকলেও প্রয়োজনীয় আয়োজন ও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নারীর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করছে। শৈশবকাল থেকেই মেয়েদের দেহমনে বেড়ে ওঠার সুযোগ খুবই কম। ছেলেবেলাতেই মেয়েদের ইনডোর গেমসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়। শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত/উচ্চবিত্ত নারীদের জন্য সীমিত পরিসরে অবসর, বিনোদন ও খেলাধূলার সুযোগ থাকলেও গ্রামীণ নারীরা এসব সুযোগ থেকে একেবারেই বঞ্চিত। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নারীদের উপস্থিতি মূলত বাণিজ্যিক স্বার্থে।
নাটক, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে নারীকে ভোগ্যপণ্য বা যৌন সামগ্রীরূপে দেখানো হয়। সমাজে নারী ও পুরুষের বিরাট বৈষম্য থাকলেও প্রত্যক্ষ নারী উন্নয়নে জাতীয় বাজেটের মাত্র ৩.১০ শতাংশ ব্যয় করা হয়।
বাংলাদেশে প্রচলিত নাগরিক আইন নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক। যা সিডও সনদ ধারা-৮ এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯৫১ সালের আইন অনুসারে পিতার নাগরিকত্ব সন্তানে বর্তায়, কিন্তু মাতার নাগরিকত্ব সন্তানের উপর বর্তায় না। অর্থাৎ শুধু বাবার দিক থেকে নাগরিকত্ব আসে। অথচ আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা আছে। ২০০৪ সালে সরকারী প্রতিনিধিরা ১৯৫১ সালের আইন পরিবর্তন করে সিডও সনদের নবম ধারার সঙ্গে মানানসই আইন করার বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। অথচ এই আইন পরিবর্তন করা হলে কোন নারী বিদেশীকে বিয়ে করলে তার স্বামী ও সন্তানেরা এ দেশের নাগরিক হতে পারবে। সম্প্রতি এ আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত তা কী দাঁড়ায়।
বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ অনুযায়ী ধর্মপ্রচলিত প্রথা অনুমোদিত বাল্যবিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিয়েতে বর-কনের সম্মতি, বিয়ের নূন্যতম বয়স (ছেলে ২১ ও মেয়ে ১৮) এবং বিয়ে রেজিস্ট্রিকরণ বাধ্যতামূলক। কিন্ত গ্রামে এখনো বাল্য বিবাহ হয়। বাল্যবিবাহ বন্ধে সরকার জন্ম রেজিস্ট্রিকরণের বিধান বাধ্যতামূলক করলেও বাস্তবে হাতুড়ে ধাত্রী দিয়ে বাসা-বাড়িতে সন্তান জন্ম দানের ফলে এবং মানুষের সচেতনতার অভাবে এটা এখনো কার্যকর নয়। ধর্মীয় অনুশাসনে যেভাবে বিষয়টা দেখা হয় তাতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ছাড়া আইনের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আইনের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের সমতার কথা উল্লেখ থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় পারিবারিক আইন বলবৎ থাকায় সমভাবে নারীর অধিকার ভোগে প্রবল অন্তরায় সৃষ্টি হয়। যেমন - মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী হিসাবে নারীর ক্ষমতা পুরুষের অর্ধেক। অর্থাৎ ১ জন পুরুষ ২ জন নারীর সমান। বিয়েতে এজন্য ১ জন পুরুষ সাক্ষীর স্থলে ২ জন নারী সাক্ষী হতে হবে। এমনকি ২ জন পুরুষের বদলে ৪ জন নারী সাক্ষী হলে চলবে না। সেক্ষেত্রে একজন পুরুষকে অবশ্যই সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত থাকতে হবে। অর্থাৎ একজন নারীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। একইভাবে বাংলাদেশের সকল ধর্মাবলম্বী নারীদের পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রটি পর্যালোচনা করলে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চনার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। যেমন - আমাদের দেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান
ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী আছে। সম্পত্তির উত্তরাধিকারে বিভিন্ন ধর্মীয় পারিবারিক আইন বিদ্যমান থাকায় মেয়েরা সম্পত্তির সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
যেমন - মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী বাবার সম্পত্তি মেয়েরা ছেলেদের অর্ধেক পায়। আর হিন্দু আইন তো একেবারেই সনাতন, এক্ষেত্রে মেয়েদের বাবার সম্পত্তিতে কোনো অধিকার নেই। বৌদ্ধ আইন হিন্দু আইনের মতোই। একমাত্র খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে বাবার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ের সমানাধিকার আছে। এজন্য সর্বজনীন পারিবারিক আইন বা ইউনিফরম ফ্যামিলিকোডের দাবি তোলা হয়। কিন্তু আমরা মনে করি মানুষ সভ্যতার যতটা পথ অতিক্রম করেছে, গণতান্ত্রিক চিন্তা ও আধুনিকতার ছোঁয়া আমাদের জীবনে যতটা লেগেছে, এখন ইউনিফরম ফ্যামিলিকোডের বদলে ইউনিফরম সিভিলকোড বা সর্বজনীন নাগরিক আইন চালু করা প্রয়োজন। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন নাগরিক ধর্মীয়-পারিবারিক জীবনযাপন করুক আর না করুক, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে অধিকার সমান। আর এই অধিকার নারী-পুরুষ, ধর্ম, বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে একই হওয়া উচিত। কাজেই সম্পত্তির অধিকার, বিয়ে
এবং অন্যান্য অধিকারের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আইন অর্থাৎ সিভিল আইন প্রয়োজন। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা মনে করি একই দেশের সকল মানুষ বা নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য দূর করার জন্য ইউনিফরম সিভিলকোড চালু করা উচিত।
জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যে বৈষম্য, পদে পদে নারীরা যে নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার এর মূল অনেক গভীরে। পুরো বিষয়টা নির্ভর করে নারীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। আমাদের সমাজে নারীরা একদিকে সামাজিক বৈষম্য অর্থাৎ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বৈষম্য, আর অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার শিকার। এ দ্বৈত শোষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে এ সমাজটার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একমাত্র সমাজতান্ত্রিক সমাজেই নারী-পুরুষের এ বৈষম্য বিলোপের ভিত্তি রচনা করা সম্ভব। তবে সব ধরনের বৈষম্যহীন সম্পর্ক গড়ার সমাজে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিডও সনদ দলিল হিসেবে নারীর অধিকার রক্ষার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করবে, অন্তত অতন্দ্র প্রহরী হয়ে যন্ত্রণার এ স্থবিরতা থেকে সামনে এগোতে ভূমিকা রাখবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০০৯ সকাল ১১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


