প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা। জন্ম: মে ৫, ১৯১১; মৃত্যু সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৩২। তত্কালীন পূর্ববঙ্গে জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তখনকার ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, এবং জীবন বিসর্জন করেন।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ই মে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহন করেন। চট্টগ্রামের ডাঃ খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিক পাস করার পর ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ ইডেন কলেজ হতে আই এ তে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। মাসিক বিশ টাকা বৃত্তিতে কলকাতার বেথুন কলেজে পড়তে যান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ পরীক্ষায় ডিস্টিংশনসহ পাস করেন এবং চট্টগ্রামের নন্দন কানন অর্পণাচরণ ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষয়ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন।
ইডেন কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী সংগঠন 'দিপালী সঙ্ঘ'র সাথে যুক্ত হন। বেথুন কলেজে ছাত্রীবস্থায় ছাত্রী সঙ্ঘ'র সক্রিয় কর্মী ছিলেন। চট্টগ্রামে বিপ্লবী দলের মেয়ে সদস্য ও ছাত্রীদের নিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন। সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বোমা তৈরির খোল আনার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রীতিলতার নেতৃত্বের গ্রুপকে। তারা সুটকেসে লুকিয়ে খোল নিয়ে আসেন যা পরবর্তী বিপ্লবী কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হয়। ১৯৩২ সালের ১৩ই জুন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র ধলঘাটের ঘাঁটিতে সূর্যসেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করলে সূর্যসেন ও প্রীতিলতা বাড়ির পেছন দিয়ে সরে যেতে সক্ষম হন। সেখানে বিপ্লবীদের সাথে বন্দুক যুদ্ধে বিপ্লবী নির্মলকুমার সেন নিহত হন। এর পরে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে প্রীতিলতা এতে অংশগ্রহন করেন। চট্টগ্রাম ইউরোপীয়ান ক্লাবের ফটকে লেখা ছিল কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে সূর্য সেন অভিযানের নেতৃত্ব প্রীতিলতাকে দেন। সেদিন রাতে তিনি সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযানে হতাহত হয় অনেক ইংরেজ। আভিযানের শেষে ফেরার সময় আত্মগোপনকারী এক ইংরেজ তরুণের গুলিতে আহত হন। আহতাবস্থায় ধরা পড়ার চাইতে আত্মাহুতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন।[১] তার মৃতদেহের পোশাকে নিজ হাতে লেখা বিবৃতিতে এক জায়গায় লেখা ছিল,
“ ১৯৩০ সালে পড়বার উদ্দেশ্যে কলিকাতা চলে আসিলাম। আমার কোন বিপ্লবী ভাইয়ের নির্দেশে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করার জন্য তৈয়ার হইলাম। দেশকে ভালবাসার অপরাধে ব্রিটিশ কানুনের শৃঙ্খলে বন্দি রামকৃষ্ণ ফাঁসির আগ্রহে অপেক্ষমাণঃ তার সমাহিত রূপ, অকপট আলাপ আলোচনা, মৃত্যুর তপস্যায় প্রশান্ত আত্মসমর্পণ, দ্বন্দহীন ভগবৎ ভক্তি, শিশুসুলভ সারল্য, গভীর জ্ঞান, নিবিড় আত্মানুভূতি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কৃষ্ণদা’র ফাঁসির পর সক্রিয়ভাবে বৈপ্লবিক একশনে যাবার আগ্রহ আমার প্রচণ্ড হয়ে উঠে। ১৯৩২ সালে বিএ পরীক্ষা দিয়েই চট্টগ্রাম এসেছিলাম। দুর্জয় ইচ্ছা মাস্টারদা’র সঙ্গে পরিচিত হবার। নির্মলদার মৃত্যু আমাকে প্রচণ্ড আঘাত দিল, আরও দুঃসাহসীনি করে তুলল। আমি অনতিবিলম্বে বৈপ্লবিক কর্মযজ্ঞে আমার আত্মা ও সহৃদয়কে নিবেদন করলাম। স্নেহরক্ষা গৃহের বন্ধন পশ্চাতে পড়িয়া রইল। ”[২]
সূত্র : ১. ফজলুর রহমান, "শতাব্দীর দর্পণ", ২০০০, পৃষ্ঠা ১২৮
২.‘অগ্নিযুগ’ - সংকলন 'শৈলেশ দে'
৩. উইকিপিডিয়া

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

