আরে.....আরে...... এ আমি কোথায় এসে পড়লাম! এটা কি পানির মহাসমুদ্র নাকি তথ্যের মহাসমুদ্র। বসের মাথার ১০১ বিলিয়ন নিউরন দেখি পুরোটাই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক সংকেতে রুপান্তরিত হয়ে বাইনারি ডিজিটে পরিণত হয়ে গেলো। চারিদিকে আমি শুধু দেখছি বাইনারি ডিজিট ১ এবং ০। ১ এবং ০ এর মহাসমুদ্র বলা যায় অবস্থাটিকে। প্রতিটা নিউরনে বাইনারি ডিজিট '১' এবং '০' কেমন গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। '১' টা লেজের দিকে, আর '০'টা মাথার দিকে। উল্টো দেখানো ১ টির মাথায় কেমন যেনো উজ্জ্বল সবুজাভ একটি চোখ দেখা যাচ্ছে। এটি কি নিউরনটির নিউক্লিয়াস? ঠিক চোখের মতো দেখতে নিউক্লিয়াসটি আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। ভাবখানা, কেমন মজা! আমাদের ১০১ বিলিয়ন নিউরনকে প্রভাবিত করতে এসেছো, তাই না! এবার মজা বোঝ!
আমার মাথায় স্বাভাবিকভাবেই বায়োলজিক্যাল জীবিত নিউরন অনেক কম আছে। ওয়ান ইলেভেনের ধাক্কায় মাথায় প্রচন্ড আঘাতে অধিকাংশ টিস্যু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যে কয়টি ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় বেঁচে ছিল সেগুলোকে নিউরো সার্জারির মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা হয়েছে। বাকী মৃত কোষগুলোকে খুলির পেছনে বসানো অপটিক্যাল ক্রিস্টাল চিপস এর সাহায্যে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং দিয়ে ধীরে ধীরে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক সংকেত গ্রহণে অভ্যস্ত করে ফেলা হয়েছে। তাই আমি রোবোটিক্স ম্যান। প্রায় একই প্রক্রিয়ায় হিমিডা, এন্ডামিন, থিয়ামিন এবং সিডর ও রোবোটিক্স ম্যান। তবে তাদের জীবিত নিউরনের সংখ্যা অনেক বেশি বিধায় তাদের মানবিক অনুভূতিগুলো আমার চেয়ে অনেক বেশি।
আমার অল্প সংখ্যক জীবিত নিউরন বসের ১০১ বিলিয়ন বাইনারি ডিজিটে রুপান্তরিত হওয়া নিউরনের মধ্যে পড়ে মুহূর্তের মধ্যেই মার্জ হয়ে গেলো। আমি বুঝতে পারছি আমি তথ্যের মহাসারণিতে পড়ে গেলাম। ইংরেজিতে বলে ইনফরমেশন হাইওয়ে। আমার মস্তিস্কে ১৬৯ মিলিয়ন জীবিত নিউরন আছে। কোথায় বিলিয়ন আর কোথায় মিলিয়ন! ১০১ বিলিয়ন নিউরনের মধ্যে ১৬৯ মিলিয়ন নিউরন প্রবেশ করে হারিয়ে যাওয়ারই কথা। কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কারণ আমার নিউরনগুলোকে ঢেকে রেখেছে যে খুলিটি, সেই খুলির পেছনে ছোট্ট একটি অপটিক্যাল ক্রিস্টাল চিপস বসানো। আগের বসানো অপটিক্যাল ফাইবার চিপসটি সরিয়ে নতুন এই চিপসটি বসানো হয়েছে। এটি দিয়ে ১৬৯ মিলিয়ন নিউরনকে মনিটরিং করা হচ্ছে।
তথ্য মহাসড়কের এই বিশাল পথে প্রবেশ করে আমার মস্তিস্কের ১৬৯ মিলিয়ন নিউরন যে যার মতো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো। পিকনিকে গিয়ে অনেকটা দলছুট হয়ে উদ্দেশ্য কেন্দ্রিক হারিয়ে যাওয়ার মতো। পিকনিকে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার আগে সবাইকে একটা 'ইভেন্ট প্রোগ্রাম' জানিয়ে দেওয়া হয়। পিকনিক স্পটে কয়টার সময় ফিরতে হবে তাও বলে দেওয়া হয়। আমার মস্তিস্কের পেছনে স্থাপিত সেই ফাইবার ক্রিস্টাল চিপসটি থেকে পুরো বিষয়টি মনিটর করা হচ্ছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া কোন নিউরনটি কোনদিকে যাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সবগুলো নিউরনকে আবার কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত আপডেটেড তথ্য ক্ষণে ক্ষণে সরবরাহ করে যেতে হবে। জোরদার মনিটরিং ব্যবস্থা। আমার মস্তিস্কের ১৬৯ মিলিয়ন নিউরনের সবাই নির্ভয়ে এবং স্বাধীনভাবে বসের মস্তিস্কের ১০১ বিলিয়ন নিউরন থেকে পথ খুঁজে নিতে লাগলো।
*********************************************************************
আমি সবুজ একটি বৃত্তকে লক্ষ্য করে ছুটে চলেছি। আমার অস্তিত্ব এই মুহূর্তে একটি সংকেতে রুপান্তরিত। সংকেত হয়ে বাইনারি ডিজিট '১' নামক একটি বাহনের পিঠে চড়ে আমি '০' নামক অসীম জগতে ভ্রমণ করতে চলেছি। আমার মনে হচ্ছে বুলেট গতির একটি ট্রেনে আমি বসে আছি। নাহ্, ভুল বললাম... ট্রেনটি আলোর গতি সম্পন্ন। আলোর গতিতে আমি চলছি। আলো চলে প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল বেগে। শত আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ গ্রহান্তরে যেতে হলে আমাকে গতি আরো বাড়াতে হবে।
আমার কাছে বিটলসের একটি মজার গান আছে। শান্তিময় পৃথিবীর গুণকীর্তন বর্ণনা করে গানটি লেখা। গানটি নিয়ে যাওয়ার জন্য আমেরিকার গবেষণাকেন্দ্র 'নাসা' আমাকে গছিয়ে দিয়েছে। এই গানটির সাথে আমি ইসলাম ধর্মে বর্ণিত পবিত্র শব-ই-মিরাজের ঘটনা এবং বাংলা ভাষায় অনূদিত পুরো কোরআন শরীফের একটি সিডি (কম্প্যাক্ট ডিস্ক) নিয়ে নিয়েছি।
আমার কড়ে আঙ্গুলের নখের সমান সেই সিডি। ১০০ টেরাবাইট ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন সেই সিডিতে হিন্দু ধর্মের শান্তির বাণী, ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের শান্তির বাণী, বৌদ্ধ-জৈন এমনকি বাংলাদেশের উপজাতিরাও যে ধর্মের কথা বলে তাও নিয়ে নিয়েছি। ওখানে গিয়ে বলবো, দেখো ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বেই আলোর চেয়েও অধিক গতিসম্পন্ন বাহনে চড়ে শান্তির বাণী বয়ে এনেছে এই পৃথিবীতে। আরও দেখো পৃথিবীতে কোন ধর্মেই মন্দ কোন কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়নি।
মুহূর্তের মধ্যেই আমার গতি আরও বেড়ে যায়। একশ আলোকবর্ষ আমি এক ন্যানো সেকেন্ডেই অতিক্রম করছি। গ্রহ গ্রহান্তর ঘুরতে ঘুরতে আমার ক্লান্তি এসে যায়। আরে! এ আবার কী! সামনে একটি লাল গালিচা বিছানো পথ দেখতে পাচ্ছি। ৭টি ধাপ সিঁড়িটিতে। সিঁড়িটি দেখতে উল্টানো '১' এর মতো। একেকটি ধাপ পেরোতেই শত আলোকবর্ষ লাগছে। এই কাজটি আমি করছি মাত্র এক ন্যানো সেকেন্ডে। সবার উপরের ধাপটির অপর পাশে আমাকে দ্রুত পৌঁছতে হবে। আমার হাতে সময় খুব অল্প।
সিঁড়ির শেষ ধাপটা পেরিয়ে চুড়ায় উঠতেই দেখি, আরিব্বাপ! সামনে বিশাল এক মহাসমুদ্র। কিছুদিন আগে মারা যাওয়া এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং হিলারীও এভারেস্টের শীর্ষ থেকে নিচে তাকিয়ে ভূ-পৃষ্ঠটাকে মহাসমুদ্রের মতোই দেখেছিলেন। আমার কাছে এই অবস্থাটিকে কুল নাই কিনার নাই অবস্থা বলে মনে হচ্ছে। আমি এই মহাসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছি মুগ্ধ দৃষ্টিতে। হঠাৎ করে ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে যাওয়া সিডরের ঢেউয়ের সমান উঁচু সে বিশাল ঢেউ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
আরে......আরে........এ জাহাজটি আবার কোথা থেকে এলো! ঢেউয়ের দোলায় জাহাজটি আস্তে করে আমাকে লুফে নিলো। আমি জাহাজের সামনে একেবারে ডেকে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি। জাহাজটি ঠিক টাইটানিক ছবির জাহাজের মতো দেখতে। আমি টাইটানিক ছবির নায়কের মতো সামনে দুহাত প্রসারিত করে ভবিষ্যতকে আমার বুকে ধারণ করার মতো করে জাহাজের ডেকে দাঁড়ালাম। শান্তির অগ্রদূত ড. ইউনূসের এরকম একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি আমার স্থায়ী মেমোরিতে আছে। তবে আমি সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি বিধায় আমার পেছন দিকটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দুহাত প্রসারিত করে সুদূর ভবিষ্যতকে বুকে ধারণ করার চেষ্টায় সুদূর ভবিষ্যত পানে তাকিয়ে আছি।
********************************************************************
আমার মাথায় যে ১৯৬ মিলিয়ন জীবিত নিউরন আছে তা একদিন হিমিডা আমাকে গুণে বের করে দিয়েছিল। ১৯৬ সংখ্যাটি খুবই রহস্যময় একটি সংখ্যা। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানী গণিতবিদরা এই ১৯৬ সংখ্যাটিকে নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন এর প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা বের করার জন্য। সমস্যাটির নাম দেওয়া হয়েছে ১৯৬ অ্যালগরিদম। ১৯৬ অ্যালগরিদম সমস্যার কারণে আমার মাথায় ১৯৬ মিলিয়ন জীবিত নিউরনের সংখ্যাটি আমার মনে আছে। ১৯৬ এর প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা বের করার খেলা আমার কাছে খুবই প্রিয় একটি খেলা। আমি অবসর সময়ে এই খেলাটি নিয়ে মেতে থাকি।
আমার মস্তিস্কে বায়োলজিক্যাল জীবিত এই ১৯৬ মিলিয়ন নিউরনই কেবল ইলেক্ট্রো-কেমিক্যাল সংকেত বুঝে। বাকিগুলো প্রোগ্রাম চালিত নিউরন। সংখ্যায় এগুলো অনেক বেশি। সিডরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমার মস্তিস্কের বাইনারি ডিজিট ১ এবং ০ এর মাধ্যমে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক সংকেত বোঝে এরকম ভার্চুয়াল নিউরন কতগুলো আছে তা গুণে বের করার জন্য। সিডর বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনায় এমনই মগ্ন যে এখনো গুণে শেষ করতে পারেনি।
গত বছরের ১৫ নভেম্বর যেদিন সিডর নামক ভয়াবহ সাইক্লোনটি পুরো বাংলাদেশের চেয়েও বিশাল আয়তনের শক্তি নিয়ে আঘাত হেনেছিল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত বিশাল এক ধাক্কা খেয়েছিল। সিডরকে সেই ভবিষ্যত ভাবতে প্রোগ্রামিং করে দিয়েছিলেন বস। সেই ভবিষ্যত ভাবতে গিয়ে ও অনেকটা চুপচাপ থাকে। ১৫ বছর বয়সী এই কিশোর রোবোটিক্স সিডর মাঝে মাঝে এমন বুদ্ধি বৃত্তিক কথা বলে উঠে, আমার কাছে মনে হয় সিডর ৫০ বছরকে সামনে দেখে কথা বলছে।
সিডর হঠাৎ হঠাৎ চমৎকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে উঠে। ভবিষ্যত নিয়ে ওর মধ্যে যে চমৎকার দর্শন তা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। সিডরকে সংকেত পাঠিয়েছি -হোয়াট ইজ ফিউচার?
সিডরের জবাব, "ভবিষ্যত! হেইয়া কি খামু না মাথায় দিমু? বর্তমানডার কতা জিগান.....মুই কমু বাংলাদেশের ভবিষ্যত ব্ল্যাকহোলের চাইরপাশে ঘুরপাক খাইতে আছে।"
পিরোজপুরের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে সিডর। ওর ভাষার প্রোগ্রামিংটা চেঞ্জ করা হয়নি। সিডরকে ব্ল্যাকহোল ধারণাটি আমি দিয়েছিলাম। বাংলাদেশের জাতীয় প্রায় সবগুলো দৈনিকে কিছুদিন আগে একটি খবর ছাপা হয়েছিল। পৃথিবীতে বিজ্ঞানীরা এমন একটি ব্ল্যাকহোল তৈরি করেছেন যেটি ৯৯.৫০% আলো শোষণ করে নিতে পারে। নিজ অক্ষে, সৌরজগতকে কেন্দ্র করে ঘুরতে ঘুরতে গ্রহ নক্ষত্রগুলো একসময় এই ব্ল্যাকহোলে প্রবেশ করে হারিয়ে যায়। তারপরে কি হয় সেটা বিজ্ঞানীদের অজানা। অনেকটা বারমুডা ট্রায়াঙ্গালের সেই হারিয়ে যাওয়ার রহস্যের মতো। পৃথিবীতে যদি এরকম অজানা রহস্য থাকতে পারে, সৌরজগতে অবশ্যই আছে। কিন্তু এই ব্ল্যাকহোলের ভিতর কি ঘটছে তা বিজ্ঞানীরা এখনো উদঘাটন করতে পারেন নি।
সিডরের কথাগুলো ভাবছি। ব্ল্যাকহোল...........বাংলাদেশ......বর্তমান..........ভবিষ্যত......খামু............দিমু...............ঘুরপাক..........
********************************************************************
আরে.......... কী আশ্চর্য! বসের বাইনারি ডিজিটে রুপান্তরিত নিউরনগুলোর ঠিক মধ্যিখানে একটি বিশাল গ্রহ দেখতে পাচ্ছি। গ্রহের কেন্দ্রে আরেকটি গোলাকার বৃত্ত। এটি কি নিউরনের নিউক্লিয়াস? প্রচন্ড গতিসম্পন্ন টাইটানিক জাহাজটি নিউক্লিয়াসটির আকর্ষণে আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছে। জাহাজটি যতোই গ্রহটির নিকটবর্তী হচ্ছে আমি নিউক্লিয়াসটিকে আরও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এই মুহূর্তে আমার কাছে নিউক্লিয়াসটিকে একটি বিশাল গ্রহের সমান মনে হচ্ছে। আরও কাছে যাচ্ছি গ্রহটি আরও বড়ো দেখাচ্ছে। বড়ো হতে হতে এটি একসময় আমার কাছে একটি আলাদা সৌরজগতের মতোই মনে হলো। কী আশ্চর্য, এখানেও স্পষ্ট সূর্য দেখতে পাচ্ছি। কেমন সবুজাভ -নীল রং সূর্যটির। আচ্ছা এটিই কি নিউরনের কেন্দ্রবিন্দু।
আমি নিউরনটির লেজের দিকে লাল গালিচার মতো বিছানো সিঁড়ি ধরে ধরে সবুজাভ-নীল অদ্ভূত গ্রহের মতো দেখতে নিউক্লিয়াসটির কাছাকাছি যাচ্ছি। নিউক্লিয়াসটির যতোই নিকটবর্তী হচ্ছি..........আমার কাছে আরও স্পষ্ট মনে হচ্ছে সবকিছু। আমি দশ মাত্রার দৃষ্টি দিয়ে স্পষ্ট সবকিছু দেখতে পাচ্ছি............আরও স্পষ্ট...............হ্যা.............হ্যা...................আমি এখন একটি জানালা দেখতে পাচ্ছি...................ইংরেজিতে বলে উইন্ডো........আচ্ছা..............আমার কী যেনো মনে পড়তে চায়.........।
ও... হ্যাঁ.....এইটা কি মাইক্রোসফটের উইন্ডো..............?
ওমা! কী আশ্চর্য! জানালা দিয়ে মাথা বের করে বিল গেটস কেমন দাঁত কেলিয়ে হাসছে দেখো। তথ্যের মহাসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে আমি সমুদ্রের এপাড়ে বিল গেটসের বাড়ির জানালার কাছে চলে এসেছি। আমাদের বাংলাদেশের গ্রিলের জানালা নয়। একেবারে খোলা জানালা। এই খোলা জানালা দিয়ে দুনিয়ার সব তথ্য হুড়মুড় করে ঢুকে যাচ্ছে। বিল গেটস জানালা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। ওরে বাবা, টাইটানিক জাহাজ সমেত আমিও কি জানালা গলে ওপাশে পড়ে যাবো নাকি?
আমি জানালার কাছে পৌঁছে গেছি। বিল গেটস আমাকে দেখতে পেয়েছে। সবুজ শার্টের উপর অ্যাশ কালারের ফুলহাতা পুলওভারে গেটসকে দেখতে কেমন ম্যানলি মনে হচ্ছে। চোখে লাগানো চেহারার সাথে মানানসই চশমাটিতে হাজার বছরের ভবিষ্যত ঝিলিক দিচ্ছে। আমাকে দেখে বুক থেকে হাত দুটো নামিয়ে বিল গেটস ডান হাতটি বাড়িয়ে ধরলো। আমার নিজকে কেমন সরকারি অতিথি অতিথি মনে হচ্ছে। বড় সরকারি কর্মকর্তা ফিল্ড ভিজিটে গেলে যেমন করে সবাই স্যারের সাথে হাত মিলানোটাকে সৌভাগ্যের বিষয় মনে করে, তেমন আন্তরিকতার সাথেই বাড়ানো হাতটি। আমিও সরকারি কর্মকর্তার ভাবটি বজায় রেখেই গেটসের বাড়ানো হাতে আন্তরিকতার সাথে চেপে ধরে ঝাঁকুনি দিলাম। গেটস মৃদু হেসে একেবারে স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠল,
"স্বাগতম! স্বাগতম!! মাইক্রোসফট উইন্ডোজে স্বাগতম!!!
আমি চমকে উঠি। কী আশ্চর্য! বাংলাভাষাকেও দেখি ব্যাটা একদম আমাদের মতো করেই শিখে ফেলেছে। কী মতলব কে জানে। বাংলা শিখে বাংলাদেশের সমস্ত ইনফরমেশন যদি সে দখল করে নেয়-এই ভয়েই আধমরা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং আমলারা। একবার ইন্ডিয়া যাওয়ার পথে কয়েক ঘন্টার জন্য বাংলাদেশের অতিথি হয়েছিলেন বিল গেটস। এই কয়েক ঘন্টার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে বাংলাদেশের জন্য কি ষড়যন্ত্র করে ফেলেছে কে জানে। নয়া সাম্রাজ্যবাদী কৌশল হতে পারে।
আচ্ছা, আমি যে এভাবে কাউকে না বলে একেবারে বিল গেটসের উইন্ডোজ দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম, না জানি কী অপরাধ করে ফেললাম। সরকার জানতে পারলে তথ্য পাচার আইনে ফাসিয়ে দিতে পারে। কার কোথায় শত্রু বসে আছে কে জানে! দেশের জরুরী অবস্থায় ভয়াবহতা বিরাজ করছে। অসৎ লোকেরা আতঙ্কে আছে। সৎ লোকেরাও আতঙ্কে আছে, শত্রুতার আতেঙ্কে। কেউ শত্রুতা করে দুর্নীতি দমন কমিশনে জানিয়ে দিলেই হলো। কেউ জানতে পারলে সহায়-সম্পদতো যাবেই, কারাগারে বসেই কাটাতে হতে পারে বাকি জীবন।
বিল গেটসের আতিথেয়তা গ্রহণের পেছনে আমার একটা যুক্তি আছে। আমি স্বেচ্ছায় এখানে আসিনি। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। প্রলয়ংকরী সাইক্লোন সিডর নাকি ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচু ঢেউ নিয়ে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে আঘাত হেনেছিল। আমার মনে হচ্ছিল বসের এই ল্যাবরুম থেকে বসের মস্তিস্কের নিউরনগুলোকে প্রভাবিত করতে গিয়ে এরকম একটি ঢেউয়ের তোড়ে তথ্যের এই মহাসমুদ্রে পড়ে গিয়েছি।
********************************************************************
গেটস যে আন্তরিকতার সাথে আমাকে ভিতরে ডেকে একটি হাতলযুক্ত কাঠের চেয়ারে বসতে দিচ্ছে, নিশ্চয়ই ব্যাটার কোন মতলব থাকতে পারে। আমার কাছ থেকে তথ্য বাগিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা হতে পারে। আমি সতর্ক হই। আমলাদের মতো করে গাম্ভীর্য বজায় রেখে চেয়ারে বসি। স্থির দৃষ্টিতে বিল গেটসের চোখের দিকে তাকাই। ১০ মাত্রার দৃষ্টি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি কি রহস্য আছে এই চোখ দুটোতে?
আমি চেয়ারে বসতে বসতে বললাম,"থ্যাংকস এ লট। নাইস টু মিট য়্যু।" বিল গেটস বাংলায় বলেছে তাই আমি ইংরেজিতে বললাম। সৌজন্যটি ইংরেজিতে করলাম এই কারণে, তাকে বুঝিয়ে দিলাম যে, তোমার যেমন বাংলা ভাষা জানার দরকার আছে........আমাদেরও ইংরেজি জানার দরকার আছে। বাংলাদেশ যেমন তোমার কাছে ১৫ কোটি লোকের একটি বাজার, পুরো বিশ্ব আমাদের কাছে আরও আরও বিশাল এবং সম্ভাবনাময় একটি বাজার।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

