মানুষের জীবনটা বড়ই বিচিত্র। স্থান কাল পাত্র ভেদে পরিবর্তন হয় মানুষের মন। আজ যা ভাল লাগে, গতকাল হয়তো তা ভাল লাগতো না, অথবা আগামীকাল হয়তো আবার ভাল লাগবে না। জীবনের বিভিন্ন সময় যখন নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আমার সবচেয়ে প্রিয়গান কোনটি? বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন গান ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। কখনো হেমন্ত, কখনো এসডি বর্মন, কখনো জগজিৎ, কখনো মান্নাদে, কখনো কিশোর কুমার কখনো রবীন্দ্র সংগীত কখনোবা নজরুল। এমন এমন সময় গেছে একটি ৯০ মিনিটের ক্যাসেটের দুই পিঠে শুধু মাত্র দু'টি গান বার বার রেকর্ড করে ওয়াকম্যান অথবা ক্যাসেট প্লেয়ারে সারাক্ষন শুনতাম। বয়সের সাথে সাথে সেসব গান ছিল অর্থবহ। এই বয়সে এসে এখনও সেসব গান ভাল লাগে, তবে তখনকার মত নয়। আমি যখন এই পোষ্টটি লিখছি, তখন আমার পিসিতে একের পর এক বেজে যাচ্ছে: ১। আয় খুকু আয় - হেমন্ত ২। তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে - মান্নাদে ৩। আমি যাচ্ছি বাবা - ঝিনুক। আর আমার চার পাশে ঘুর ঘুর করছে আমার পিচ্চি মেয়ে, এই আগস্টে যার বয়স হবে চার।
আমার মেয়েটার যখন মাত্র দুই বছর বয়স, তখন সকালে খুব তারাতারি তার ঘুম ভেঙ্গে যেত। আর আমার ঘুম ভাঙ্গত তার ছোট্ট কোমল হাতে ছোঁয়ায়। আমি ঘুমে থাকা অবস্থায় সে লোসানের বোতল থেকে লোসান নিয় আমার হাতে, পায়ে, মুখে মেখে দিত। মনে হত আমি ছোট্ট শিশু, আর সে আমার স্নেহময়ী মা।
বাসায় পিসিতে বসে কাজের পাশাপাশি যদি রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, উর্দ্দূ গজল অথবা পুরানো বাংলা গান শুনতে শুরু করি তখন সে এসে হাজির হয়ে বলে খুকুর গান দাও, পুতুল পুতুল গান দাও। আমাকে তখন তাই করতে হয়। বাসায় যখন লোডশেডিং হয়, টিভিতে কার্টুন দেখা যায় না, কম্পিউটারে গেম খেলা যায় না, অথবা তার যখন কোন কাজই থাকে না, তখন হটাৎ হটাৎ তার আবদার হল আমার মোবাইল থেকে গান শোনা। তাও আবার হেডফোনের একটি তার আমার কানে আরেকটি তার কানে থাকতে হবে, না হলে সে শুনবে না। আয় খুকু আয় গানটির প্রথম অংশ তার মুখস্ত, আমি একটু শুরু করে দিলেই সে বাকিটুকু গেয়ে শুনায়। অসুদ্ধ উচ্চারন শুনতে ভীষন মজা লাগে, না শুনলে বোঝানো সম্ভব নয়। সে গায়- "কাতেনা সময় যখন আর কিছুতে, বুন্ধুর তেলিফোনে মোন বছে না।"
এখন আমার এবং আমার চার বছর বয়সের কন্যা, দুজনেরই সবচেয়ে প্রিয় গান হচ্ছে - আয় খুকু আয়। এটা শুধু আমার নয়, মনে হয় সব বাঙ্গালি পিতা কন্যারই সবচেয়ে প্রিয় গান। দিনের অনেকটা সময়ই এখন এই গান শুনতে হয়, শুনি। এটা তার একটি প্রত্যহিক আবদার। এছাড়া তার বাকি সমস্ত আবদার আমার কাছে, প্রতিদিন আমাকে তার অসংখ্য আবাদার পূরন করতে হয়। তার আরেকটি আবদার হল, "আমি কিন্তু ফট করে তোমার কোলে উঠে বসবো"। আমি তাকে বলি, মা তুমি বড় হয়ে ডাক্তার হবে, আমার জ্বর হলে আমাকে ঔষধ দিবে, আমার মাথায় পানি দিয়ে দিবে। আর ডাক্তারি করে টাকা আয় করে সবার আগে আমাকে একটি জামা কিনে দিবে। সে বলে, তোমার কাছেতো টাকা আছে তুমি নিজে জামা কিনে নাও। এই মেয়েকে কি করে বুঝাই, সেই জামা আর এই জামার ব্যবধান কতটুকু।
এভাবেই কেটে যাচ্ছে আমাদের প্রতিটি দিন, এভাবেই কাটিয়ে দিতে চাই আমার জীবনের বাকি দিনগুলো। আমি না চাইলেও দিনে দিনে বড় হবে সে। আস্তে আস্তে সৃষ্টি হবে তার একান্ত নিজস্ব ভুবন, আলাদা একটি স্বতন্ত্র স্বত্তা। সেই ভুবনে, সেই স্বত্তায় আমি বেচে থাকতে চাই ঠিক আজকের মতই। বেড়ে উঠার সাথে সাথে তৈরি হবে তার নিজস্ব মতামত, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা। তার কাছে আমার একটাই প্রত্যাশা, জীবনের যেকোন সিদ্ধান্ত অথবা সিদ্ধান্তহীনতা যেন সবার আগে আমিই জানতে পারি। জীবনে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে এমন কোন ভুল করিস না, যার জন্য তোর জীবনে নেমে আসে ঘোড় অন্ধকার, আর শেষ হয়ে যায় আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছে।
আমার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যেন আমার মনে হয় তুই ভাবছিস, "বাবা যেন বলছে আমায় - আয় খুকু আয়"। আর আমিও যেন ডাকতে পারি - হারনো সেদিনে চল চলে যাই, ছোট্টবেলা তোর ফিরিয়ে আনি, আয় খুকু আয়।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০১২ রাত ১০:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



