আমিও একদিন সেই যন্ত্রটার সাহায্য নিলাম আমার মনের মানুষকে মনের কথা জানানোর জন্য। তার সাথে আমার কথোপকথন নিম্নরূপ:
আমি: কেমন আছো?
সে: ফ্যানটাসটিক, মাইন্ডব্লোয়িং, ইমেজিং...
আমি: থামো, থামো। বুঝতে পেরেছি, তুমি ভালোই আছো। জিজ্ঞেস করলেনা, আমি কেমন আছি?
সে: ওহ্, সরি। কেমন আছো?
আমি: ভালো নেই। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কি করছিলে?
সে: দারুণ একটা ছবি দেখছিলাম স্টার মুভিজে। মেল গিবসনের। যা সুন্দর না ছবিটা! তুমি কী করছিলে?
আমি: তোমাকে ভাবছিলাম। বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। আমার জানালা দিয়ে বাইরে পরিষ্কার দেখা যায়। রাতের আঁধারে বৃষ্টির সৌন্দর্য হাজারগুণ বেড়ে যায়। তুমি দেখছো না?
সে: না, বৃষ্টি একটা দেখার জিনিস হলো নাকি? এই বিচ্ছিরি আবহাওয়ার জন্যই তো বেরুতে মন চাইলো না। জানো, আজ ফারিয়ার বার্থডে পার্টি ছিলো। ইস্! কী মজাই না হতো গেলে।
খানিক নীরবতা। তারপর-
সে: কী হলো, কথা বলছো না কেন?’
আমি:তোমাকে অনেক কথা বলার ছিলো।
সে: তো বলো।
আমি: বলবো। আচ্ছা বলোতো, তোমার কোন ফুল পছন্দ?
সে: কেন?
আমি:আহা, বলোই না।
সে: ডেফোডিল। ড্যাডি লাস্ট বিজনেস ট্যুরে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলো, সেখান থেকে ডেফোডিলের চারা এনেছিলো। আমাদের ছাদে কি সুন্দরই না লাগছে এগুলো! তোমার কোনটা পছন্দ?’
আমি: শিউলি।
সে: কেনো?
আমি: অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে এটা আমার দেশের ফুল বলেই। কোন রঙ ভালো লাগে তোমার?
সে: তোমার হলোটা কী বলোতো? হঠাৎ....
আমি: প্রশ্ন করোনা প্লিজ, উত্তর দাও।
সে: আচ্ছা যাও, আর প্রশ্ন করবোনা। আমার প্রিয় কালার হচ্ছে ভায়োলেট। গেল সামারে বড়ো মামার সাথে ইনডিয়া বেড়াতে গিয়েছিলাম। মামা আমাকে ভায়োলেট কালারের একটা লেহেঙ্গা কিনে দিয়েছিলো। জানো কতো দাম ওটার? বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সোয়া লাখ টাকা। কোনো ফাংশানে ওটা পরে গেলে সবাই আমার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে। আমার বান্ধবীরা তো হিংসায়.....’
আমি(তাকে থামিয়ে দিয়ে): আমার প্রিয় রঙ সবুজ; প্রকৃতির রঙ। জানো, তোমাকে সবুজ শাড়ি পরলে কী সুন্দরই না লাগবে!
সে: শাড়ি! এমা, আমি পরবো শাড়ি! তাহলেই হয়েছে।
আমি: কেনো?
সে: ওটা পেঁচাতে পেঁচাতে যতো সময় লাগবে ততোক্ষণে আমি দশবার জিনস আর ফতুয়া পড়তে পারবো।’
আবার নাতিদীর্ঘ নীরবতা। তারপর...
আমি: অবসরে তুমি কী করো?
সে: আমার অবসর বলতে কিছু নেই। ভার্সিটি, ড্যান্স ক্লাস, জিম এসব করতে করতেই তো সময় বেরিয়ে যায়। তবুও যেটুকু সময় পাই আমার অ্যামপিথিয়েটারে ফুল ভলিউমে গান শুনি। জানো,আমি না আবার কম আওয়াজে গান শুনতে পারি না। তোমার জিজ্ঞেস করতে হবে না, আমার প্রিয় শিল্পীদের নাম বলে দিচ্ছি- ব্রিটনি, হুইটনি, সেলিন ডিওন আমার ফেভারিট। এছাড়া ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের গানও আমার ভালো লাগে। ওদের গানের সাথে হালকা ড্যান্স আমার অসম্ভব প্রিয়। এবার বলো তোমার প্রিয় শিল্পী কারা।
আমি: অনেকেই। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন মান্না দে। তার কফি হাউজ গানটার জন্য তাকে গ্রামি অ্যাওয়ার্ড দেওয়া দরকার। এই একটি গান যে যতোবার শুনেছে, আমি নিশ্চিত সে তার হারানো দিনগুলোতে একবার হলেও ফিরে গেছে। অবসরে আমি তার গান শুনি। এছাড়া জীবনানন্দ, মহাদেব সাহা, কাজী আনোয়ার হোসেন, এরা আমার অবসর জুড়ে থাকেন।’
সে: আচ্ছা, মান্না দে কোন দেশের সিঙ্গার?
খানিক নীরবতা তৃতীয়বারের মতো। ওর প্রশ্নের জবাব দিলাম না আমি, বলা উচিত প্রয়োজন বোধ করলাম না।
তারপর...
আমি: এবার বলো, কোন বাহনে চড়তে পছন্দ করো তুমি?
সে: মার্সিডিজ, তবে দুঃখ একটাই, ঢাকার সরু রাস্তাগুলোতে মার্সিডিজ চালানোর কথা চিন্তাও করা যায়না। নাহলে ড্যাডি কবেই আমাকে মার্সিডিজ কিনে দিতো। তাই সেকেন্ড চয়েজ হিসেবে মারুতি সুজুকিই আমার প্রিয়। তোমার?
আমি: রিকশা। পড়ন্ত বিকেলে হুড খোলা রিকশায় বেড়িয়েছো কখনো?
সে: প্রশ্নই আসেনা। ড্যাডি জানতে পারলে আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।
আবার খানিক চুপচাপ। তারপর...
আমি: তুমি কি দিঘির জলে সাঁতার কাটতে পছন্দ করো?
সে: মাথা খারাপ! বাসার লনে এতো সুন্দর সুইমিং পুল থাকতে কোন দুঃখে আমি দিঘির পঁচা পানিতে নামতে যাবো? বান্ধবীদের নিয়ে আমি প্রায়ই পুলে নেমে পড়ি।
এরপর নীরবতা দীর্ঘ হলো। সে ওপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো করতে লাগলো। তারপর...
সে: কী হলো, অমন চুপ করে গেলে যে।
আমি: আমি ফোন রাখছি।
সে: তুমি না কী বলবে বলেছিলে?
আমি: আজ না, অন্য কোনোদিন। বাই!
লাইন কেটে দিলাম ।
আবার নীরবতা, এবার একান্তে।
তার সাথে বলা কথাগুলো আমার মনের মধ্যে ঝড় তুলতে লাগলো।
সে কি কখনও জানবে, ফোনের মাঝে যতোবার নীরবতা এসেছে, ততোবারই আমি এক একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করেছি। কারন, রাতে যখন বৃষ্টি হবে তখন আমি বাইরে যেতে চাইবো, আর সে ঘরে। আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে যখন আমি ওকে শিউলি ফুলের তোড়া দেবো তখন সে নাক সিঁটকাবে সস্তা ফুলের গন্ধে। চাঁদনি রাতে যখন মন উচাটন করা মাতাল হওয়া বইবে, তখন আমি তাকে সবুজ শাড়িতে আচ্ছাদিত দেখতে চাইবো, আর সে সোয়া লাখ টাকা দামের লেহেঙ্গা পরে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেবে।
আমার নদীসম ভালোবাসা দিয়ে যখন ওকে জয় করতে চাইবো, তখন তার সুইমিং পুলের অগভীর ভালোবাসা আমাকে কাঁদাবে।
আমি যখন রিকশায় পাশাপাশি বসে ওকে নিয়ে ঘুরতে চাইবো, তখন ওর মারুতি আমার রিকশাকে পেছনে ফেলে অনেকদূর চলে যাবে।
ছোটবেলায় একবার ট্রেনে চড়েছিলাম। জানালার পাশের সিটে বসে প্রত্যক্ষ করেছিলাম ট্রেনের অবিরাম ছুটে চলা। যখন ওটা বিরামহীন গতিতে ছুটে চলেছিলো গ্রাম, প্রকৃতিকে পেছন ফেলে যাচ্ছিলো।
মনে হলো সে হচ্ছে এক্সপ্রেস ট্রেন, আর আমি পেছনে পড়ে থাকা প্রকৃতি। সে ছুটতে থাকবে স্টেশনের পর স্টেশন, জংশনের পর জংশন। আর আমি প্রকৃতির মতো পেছনে পড়ে থাকবো। সারাজীবন ওকে ধরার জন্য পিছনে ছুটতে হবে আমাকে।
‘তাই আলবিদা তোমাকে!’ মনে মনে ওকে বিদায় জানালাম। আমি অপেক্ষায় থাকবো, যতোদিন না আমার স্বপ্নের রানির দেখা মেলে।
বৃষ্টি দেখতে লাগলাম আমি। দেখতে দেখতেই একটা গানের কলি মনে পড়ে গেলো;
ও আমার উড়ালপঙ্খিরে, যা যা তুই উড়াল দিয়া যা,
আমি থাকবো মাটির ঘরে, আমার চক্ষে বৃষ্টি পড়ে,
তোর হইবো মেঘের উপরে বাসা,
ও, আমার উড়ালপঙ্কিরে.......
রিপোস্ট: মাফ করবেন, নতুন কোন আইডিয়া মাথায় আসছেনা; তাই...
****
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০১০ রাত ১২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



