দেশের মানুষকে কথা বলানোর জন্য মোবাইল কোম্পানীগুলো আপ্রাণ চেষ্টায় রত। তাদের আন্তরকিতা(!), নিষ্ঠা(!) এবং একাগ্রতার(!) দরুণ মানুষ এখন দিনরাত কাজ-র্কম ফেলে কথার উৎসবে মেতেছে। অবশ্য মুঠোফোনের এই মহোৎসবে মানুষের উপকারই হচ্ছে বেশি।
আমিও একদিন সেই যন্ত্রটার সাহায্য নিলাম আমার মনের মানুষকে মনের কথা জানানোর জন্য। তার সাথে আমার কথোপকথন নিম্নরুপ:
আমি: কেমন আছো?
সে: ফ্যানটাসটিক! মাইন্ড ব্লোয়িং! অ্যামেজিং!.....
আমি: থামো, থামো। বুঝতে পারছি, তুমি ভালোই আছো। জিজ্ঞেস করলেনা, আমি কেমন আছি?
সে: ওহ্! সরি! কেমন আছো তুমি?
আমি: ভালো নেই। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
সে: দারুণ একটা ছবি দেখছিলাম স্টার মুভিজে। মেল গিবসনের। যা সুন্দর না ছবিটা! তুমি কী করছিলে?
আমি: তোমাকে ভাবছিলাম। আমার জানালা দিয়ে বাইরে পরিষ্কার দেখা যায়। আজ বৃষ্টি হচ্ছে; দেখছো?
সে: না, বৃষ্টি একটা দেখার জিনিস হলো নাকি? এই বিচ্ছিরি আবহাওয়ার জন্যই তো বেরুতে মন চাইলো না। জানো, আজ ফারিয়ার বার্থডে পার্টি ছিলো। ইস্! কী মজাই না হতো গেলে!
খানিক নীরবতা। তারপর....
সে: কী হলো, কথা বলছো না কেন?’
আমি:তোমাকে অনকে কথা বলার ছিলো।
সে: তো বলো।
আমি: বলবো। আচ্ছা বলোতো, তোমার কোন ফুল পছন্দ?
সে: কেন?
আমি: আহা, বলোই না!
সে: ড্যাফোডিল। ড্যাডি লাস্ট বিজনেস ট্যুরে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলো। সেখান থেকে ড্যাফোডিলের চারা এনেছিলো। আমাদরে ছাদে কি সুন্দরই না লাগছে এগুলো! তোমার কোনটা পছন্দ?’
আমি: শিউলি।
সে: কেন?
আমি: অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে এটা আমার দেশের ফুল বলেই। কোন রঙ ভালো লাগে তোমার?’
সে: তোমার হলোটা কী বলোতো? হঠাৎ....
আমি: প্রশ্ন করোনা প্লীজ, উত্তর দাও।
সে: আচ্ছা যাও, আর প্রশ্ন করবোনা। আমার প্রিয় কালার হচ্ছে ভায়োলেট। গেল সামারে বড়ো মামার সাথে ইনডিয়া বেড়াতে গিয়েছিলাম। মামা আমাকে ভায়োলেট কালারের একটা লেহেঙ্গা কিনে দিয়েছিলো। জানো কতো দাম ওটার? বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সোয়া লাখ টাকা। কোনো ফাংশনে ওটা পড়ে গেলে সবাই আমার দিকে হা করে চেয়ে থাকে। আমার বান্ধবীরা তো হিংসায়.....'
আমি: আমার প্রিয় রঙ সবুজ; প্রকৃতরি রঙ। জানো, তোমাকে সবুজ শাড়ি পরলে কী সুন্দরই না লাগব!
সে: এমা! আমি পড়বো শাড়ি!! তাহলেই হয়েছে!
আমি: কেন?
সে: ওটা প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে যতো সময় লাগবে ততোক্ষণে আমি দশবার জিনস আর ফতুয়া পড়তে পারবো।’
আবার নাতিদীর্ঘ নীরবতা। তারপর...
আমি: অবসরে তুমি কী করো?
সে: আমার অবসর বলতে কিচ্ছু নেই। ভার্সিটি, জিম, ড্যান্স ক্লাস.. এসব করতে করতেই তো সময় বেরিয়ে যায়। তবুও যেটুকু সময় পাই আমার অ্যামপথিয়েটারে ফুল ভলিউমে গান শুনি। জানো,আমি না আবার কম আওয়াজে গান শুনতে পারি না। তোমার জিজ্ঞেস করতে হবে না, আমার প্রিয় শিল্পীদের নাম বলে দিচ্ছি-ব্রিটনি, হুইটনি, সেলিন ডিওন আমার ফেভারিট। এছাড়া ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের গানও আমার ভালো লাগ। ওদের গানের সাথে হালাকা ড্যান্স আমার অসম্ভব প্রিয়। এবার বলো তোমার প্রিয় শিল্পী কারা।
আমি: অনেকেই। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন মান্না দে। কফি হাউজ গানটার জন্য তাকে গ্রামি অ্যাওয়অর্ড দেওয়া দরকার। এই একটি গান যে যতোবার শুনেছে, আমি নিশ্চিত, সে তার হারানো দিনগুলোতে একবার হলেও ফিরে গেছে। অবসরে আমি তার গান শুনি। এছাড়া জীবনানন্দ, মহাদেব সাহা, কাজী আনোয়ার হোসেন এরা আমার অবসর জুড়ে থাকেন।’
সে: আচ্ছা, মান্না দে কোন দেশের সিঙ্গার?
খানিক নীরবতা তৃতীয়বারের মতো। ওর প্রশ্নের জবাব দিলাম না আমি। বলা উচিত, প্রয়োজন বোধ করলাম না।
তারপর...
আমি: এবার বলো, কোন বাহনে চড়তে পছন্দ করো তুমি?
সে: মার্সিডিজ, তবে দুঃখ একটাই, ঢাকার সরু রাস্তাগুলোতে মার্সিডিজ চালানোর কথা চিন্তাও করা যায়না। নাহলে ড্যাডি কবেই আমাকে মার্সিডিজ কিনে দিতো। তাই সেকেন্ডে চয়েজ হিসেবে মারুতি সুজিকিই আমার প্রিয়। তোমার?
আমি: রিকশা। পড়ন্ত বিকেলে হুড খোলা রিকশায় বেড়িয়েছো কখনো?
সে: প্রশ্নই আসেনা। ড্যাডি জানতে পারলে আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।
আবার চুপচাপ। তারপর...
আমি: তুমি কি দীঘির জলে সাঁতার কাটতে পছন্দ করো?
সে: মাথা খারাপ! বাসার লনে এতো সুন্দর সুইমিং পুল থাকতে কোন দুঃখে আমি দীঘির পঁচা পানিতে নামতে যাবো? বান্ধবীদের নিয়ে আমি প্রায়ই আমি ওখানে নেমে পড়ি।
এরপর নীরবতা দীর্ঘ হলো। সে ওপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো করতে লাগলো। তারপর...
সে: কী হলো, কথা বলছোনা কেন?
আমি: ফোন রাখছি।
সে: তুমি না কী বলবে বলেছিলে?
আমি: আজ না, অন্য কোনোদিন। বাই!
লাইন কেটে দিলাম।
আবার নীরবতা, এবার একান্তে।
তার সাথে বলা কথাগুলো আমার মনের মধ্যে ঝড় তুলতে লাগলো।
সে কি কখনও জানবে, ফোনের মাঝে যতোবার নীরবতা এসছে, ততোবারই আমি এক একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করেছি। কারণ, রাতে যখন বৃষ্টি হবে তখন আমি বাইরে যেতে চাইবো আর সে ঘরে। আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে যখন আমি ওকে শিউলি ফুলের তোড়া দেবো, তখন সে নাক সিঁটকাবে সস্তা ফুলের গন্ধে। চাঁদনি রাতে যখন মন উচাটন করা মাতাল হওয়া বইবে, তখন আমি তাকে সবুজ শাড়িতে আচ্ছাদিত দেখতে চাইবো, আর সে সোয়া লাখ টাকা দামের লেহেঙ্গা পরে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেবে।
আমার নদীসম ভালোবাসা দিয়ে যখন ওকে জয় করতে চাইবো, তখন তার সুইমিং পুলের অগভীর ভালোবাসা আমাকে কাঁদাব।আমি যখন কিকশায় পাশাপাশি বসে ওকে নিয়ে ঘুরতে চাইবো, তখন ওর মারুতি আমার রিকশাকে পেছনে ফেলে অনেকদুর চলে যাবে।
ছোটবেলায় একবার ট্রেনে চড়েছিলাম। জানালার পাশের সিটে বসে প্রত্যক্ষ করেছিলাম ট্রেনের অবিরাম ছুটে চলা। যখন ওটা বিরামহীন গতিতে ছুটে চলছিলো; গ্রাম, প্রকৃতিকে পেছনে ফেলে যাচ্ছিলো।
মনে হলো সে হচ্ছে এক্সপ্রেস ট্রেন, আর আমি পিছনে পড়ে থাকা প্রকৃতি। সে ছুটতে থাকবে স্টেশনের পর স্টেশন, জংশনের পর জংশন। আর আমি প্রকৃতির মতো পিছনে পড়ে থাকবো। সারাজীবন ওকে ধরার জন্য পিছন পিছন ছুটতে হবে আমাকে।
''তাই আলবিদা তোমাকে!'' মনে মনে ওকে বিদায় জানালাম। আমি অপেক্ষায় থাকবো, যতোদিন না আমার স্বপ্নের রানীর দেখা মিলে।
বৃষ্টি দেখতে লাগলাম আম। দেখতে দেখতেই একটা গানের কলি মনে পড়ে গেলো।
ও আমার উড়ালপঙ্খীরে, যা যা তুই উড়াল দিয়া যা,
আমি থাকবো মাটির ঘরে, আমার চক্ষে বৃষ্টি পড়ে;
তোর হইবো মেঘের উপরে বাসা,
ও, আমার উড়ালপঙ্খীরে......
****
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


