ভন্ড জ্যোতিষঃ-শেষ পর্ব
সিংগাপুরে চিকিৎসাধীন থাকার সময় আমার অন্যতম প্রিয় ব্লগার ফরহাদ ঊদ্দিন স্বপন ভাইয়ের 'উদ্দিন হওয়া গচ্চা' লেখাটিতে জনৈক হস্তরেখাবিদের কাহিনী পড়ে এ সব তথাকথিত হস্তরেখাবিদদের সাথে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার সাথে আপনাদের সংযুক্ত করার প্রবল অভিপ্রায় সৃষ্টি হয়। সেই প্রয়াসের প্রথম পর্বে আমার চাকুরী জীবনের একেবারেই প্রারম্ভে চট্টগ্রামে তথাকথিত জ্যোতিষ সম্রাট হাওলাদার মহোদয়ের ছোট ভাই অর্থাৎ ছোট হাওলাদের সাথে সংঘঠিত একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রায় জ্যোতিষদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করার মানসে আমি এবং আনোয়ার সাদাতের কয়েকজন মেয়ে বন্ধু নিয়ে বলতে গেলে ঢাকার সব জ্যোতিষদের হাত দেখাই, তাদের ভন্ডামীর লিখিত প্রেসক্রিপশন যোগার করি, তাদের কথোপথোন রেকর্ড করি যা পরবর্তীতে ফলাও করে বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়। এ সাক্ষাতের একবারেই প্রথমেই আমরা গাওছিয়া মার্কেটের প্রফেসর হাওলাদার অর্থাৎ বড় হাওলাদার মহোদয়ের সাথে সাক্ষাৎ করি যার কাহিনী আমি আপনাদের এ সংক্রান্ত লেখার দ্বিতীয় পর্বে বর্ণনা করেছেন। প্রতিবেদন তৈরির কাজে বাকি যেসব জ্যোতিষীদের সাক্ষাৎ নিয়েছিলাম তাদের কীর্তি নিয়ে আমার আজকের এই লেখাটি।
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে পুনরায় বলি, যে আমি তখন বিবাহিত ছিলাম। তবুও জ্যোতিষীদের বোকা বানানোর জন্য অবিবাহিতের অভিনয় করি এবং বন্ধু আনোয়ারের এক মেয়ে বান্ধবীকে (পরবর্তীতে য়ানোয়ারের বউ) আমার প্রেমিকা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেই। তাছাড়া, জ্যোতিষ মহোদয়দের জ্ঞানের বহর পরীক্ষা করার জন্য বান্দরের হাতের ছাপ নেই যা তাদের নিকট আমার ছোট ভাইয়ের হাতের ছাপ হিসেবে উল্লেখ করি।
পূর্ব নির্ধারিত এপয়নমেন্ট মোতাবেক হাওলাদার সাহেবের সাক্ষাতকার সম্পন্ন করে পরদিন যাই নতুন বি ডি আর ২ নং গেইটস্থ পল্টন লাইনের (এখন বন্ধ) প্রফেসর জ্যোতিষ এন আই খানের চেম্বারে। প্রফেসর এন আই খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর ছিলেন। বেশ পরিপাটি চেম্বার, সাজানো ড্রইং রুম। বয়স্ক মানুষ, দেখতে বেশ সুদর্শন। তার কৃপা লাভের আশায় আমার মতোই অনেক সাজু-গুজু করা সুন্দরী মহিলা বসে আছেন। তিনিও কাউকে বঞ্চিত করছেন না। সুন্দর ভাষার মিশ্রণে সবার সাথে মিট মিট করে হেসে কথা বলছেন।
যথাসময়ে আমার ডাক এলো। আগমণের কারণ জিজ্ঞসা করতে জানালাম, খবরের কাগজে তার বিজ্জাপন দেখে বরিশাল থেকে এসেছি। নিজের হাত দেখালাম, প্রেস্ক্রিপশন নিলাম। পাথর কেনার কমিটমেন্ট করলাম। ব্যাগ থেকে সেই বানরের পায়ের ছাপ বের করে বললাম, "স্যার! আমার ছোট ভাই গ্রামে থাকে, ওকে নিয়ে আসতে পারিনি, তবে হাতের ছাঁপ নিয়ে এসেছি"। প্রফেসর সাহেব ম্যগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে সেই বানরের পায়ের ছাঁপ অনেক্ষন যাবত খুটিয়ে দেখে বিজ্ঞের মতো বললেন, "বাচ্চাটা মীন রাশীর জাতক, ঠান্ডাজনিত সমস্যা আছে। একটা 'যমরুদ' পাথর ব্যাবহার করলেই ঠিক হয়ে যাবে"।
আমি বললাম, "স্যার! ও পাথরের আংটি ব্যাবহার করবে কি ভাবে! ওর আংগুলগুলো খুব সরু-মোটেই মাংস নেই"। প্রফেসর সাহেব অভয় দিয়ে বললেন, "কোন সমস্যা নেই, গলায় পড়ালেও চলবে"।
মালিবাগে বসতেন বিশিষ্ট আধ্যাতিক গুরু 'লালন ফকির'। তার চ্যালারা বলতেন তাদের গুরু চেহারা না দেখেই সব কিছু বলে দিতে পারেন। তবে এসব গুণের আড়ালে মহান গুরুর বিরুদ্ধে বাজারে কিছু দুর্নামও চালু ছিল। অনেকেই বলত গুরুজী মহিলাদের শ্লীলতাহানির বিষয়ে খুবই সিদ্ধহস্ত। পুলিশের প্যাদানী খেয়েছে এমন অভিযোগও শুনা যেত। সেই মহান গুরুজী আমার ছোট ভাইয়ের (বানরের) হাত দেখে বললেন, "আপনার ছোট ভাই মিথুন রাশির জাতক, পেটের অসুখে ভুগছে" । শুধু তাই নয় গুরুজী আমার বিষয়েও কিছু মূল্যবান বয়ান করলেন। যদিও যাকিছু বলেছে পূর্বেই মতই সব ভুল। প্রতিশ্রুতি দিলেন আমি যাতে আমার প্রেমিকাকে বিয়ে করতে পারি তার ব্যবস্থা করে দিবেন। বিনিময়ে অবশ্য মাত্র ৫০০০ টাকা দিতে হবে। আমি খানিকটা শংকার সুরে বললাম, যদি কাজ নাহয়? লালন ফকির অভয় দিয়ে বললেন, ৩০ টাকার স্টাম্পে লিখিত অঙ্গগীকারনামা দিয়ে তিনি টাকা নিবেন। ৭ দিনের মধ্যে কন্যা আমার ঘরে দৌড়ে চলে না আসলে টাকা ফেরত। আমি টাকা সংগ্রহ করতে বেড়িয়ে এলাম।
বাংলা মোটরে বসতেন প্রফেসর টি, আহমে। ওনি একটা পাথর ব্যাবহারের পরামর্শ দিয়ে বললেন, এর ব্যাবহারে আমি ১ মাসের ভিতর চাকুরী নিয়ে বিদেশ যেতে পারবো। বিদেশ যেতে পারলেই আমার প্রেমিকার সাথে বিয়ে হবে। বিফলে টাকা ফেরত। বান্দর ভাইয়ের জন্যও পাথর নিতে বললেন।
গেলাম যমদুতের পোষাক পরা 'মহাজাতক'র কাছে। প্রথমেই রিসিপশনিস্ট বললেন-একজনের বেশী ঢোকা যাবেনা। অনেক রিকোয়েস্ট করে আনোয়ার সাদাতের মেয়ে বন্ধু এবং আমি 'স্বামী-স্ত্রী' হয়ে ঢুকলাম। রুমটা খুব সুন্দর সাজানো গোছানো। তবে রুমের চাইতেও মাহজাতক সাহেব বেশি পরিপাটি। মুখে তার মার্ক টোয়েনের মতো ইয়া বড় গোফ। চমৎকার করে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ধীর লয়ে, খুব আস্তে আস্তে কথা বলেন। অল্প একটু কথা বলেই বুঝলাম, প্রচুর পড়াশুনা করেন। আরও জানলাম তার আসল নাম সৈয়দ শহীদ আল বোখারী(পুরো নামটা এখন মনে নেই)।
কথা বলার মাঝেই হঠাৎ ওনার ফোন বেজে উঠল। ফোনটা রিসিভ করেই তিনি সটান করে চেয়ার হতে দাড়িয়ে অবিরত বলতে চললেন, 'স্যার...স্যার ...কোন চিন্তা করবেননা আপনি ঐ আংটিটা অনামিকায় ব্যবহার করেন.........' কথা শেষ করে ধপাস করে নিজের চেয়ারে বসে বিরাটকায় মুখটাকে চতুর্ভুজের মতো করে বললেন, 'জানেন কে ফোন করেছিলেন?...জেনারেল এরশাদ!'
আমি যেহেতু আর্মি পরিবারে বড় হয়েছি, নিজেও এক্স ক্যাডেট এবং বিএমএ ক্যাডেট ছিলাম এবং ঐ সময় আমার ছোট চাচা এরশাদ সাহেবের এডিসি ছিলেন তাই কিছু নিয়ম কানুন জানি। সে জানার সূত্র ধরেই বললাম, 'ওনিতো ডাইরেক্ট কল করার কথা নয়, ওনার এডিসি কল করে ওনাকে আপনাকে দেয়ার কথা'। মহাজাতক মহাচালাক। তিনি বুঝতে পারলেন টোপটা ভুল জায়গায় ফেলেছেন। অনাকাংখিত ঝামেলা এড়াতেই সম্ভবতো ব্যস্ততা দেখিয়ে বললেন, 'আমি এখন বাইরে যাবো, আপনারা পরে আসেন'। বলেই উঠে দাড়ালেন । আমি অনুনয় করে বান্দর ভাইয়ের ছাপটা বের করে বললাম, 'স্যার, আমার ছোট ভাইর হাতের ছাপ, খুব অসুস্থ্য ...যদি দয়া করে এইটা একটু দেখে দিতেন'। মহাজাতক নিঃসন্দেহে পুর্বের জ্যোতিষীদের চেয়ে চালাক ছিলেন। আমরা সাধারন কোন খদ্দের নয় বিষয়টা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই মনে হল। সে কারণেই সম্ভবতো বললেন, "রোগী না দেখে প্রেশক্রিপশন দেয়া যাবেনা"। উল্লেক্ষ্য যে-প্রায় সব জ্যোতিষরাই যারা হাত দেখাতে যান তাদের 'রোগী' বলে। আমাদের দেয়া ৫০০ টাকা ফেরত দিয়ে সাদা রংয়ের টয়োটা গাড়ী করে দ্রুত চলে গেলেন।
জ্যোতিষ সম্রাট আনিছুল হক, জ্যোতিষ জ্যোতিস্ক বিভুতি ভুষন, প্রফেসর (অস্টম শ্রেনী পাশ) ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালি্ম, জৌতিষ জি, সরকার সহ সব জ্যোতিষরাই একই জাতীয় মন্তব্য করেন এবং সবাই কোন না কোন পাথর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ঢাকার প্রায় সব জৌতিষীদের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করে আমরা যে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলাম তার সারমর্ম ছিল, 'সব জ্যোতিষ ভুয়া। ওরা প্রাইমারি পাস করা 'প্রফেসর'। সবাই গোল্ড মেডালিস্ট। সবাই বিশাল বিশাল ঊপাধীর ধারক। সর্বোপরি ওরা প্রতারক, ওরা ভন্ড।
বলাবাহুল্য, আমাদের প্রতিবেদনটি সে সময়ে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হলেও যে মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমরা এ পরিশ্রম ও বিপদের কাজটি করেছিলাম তাতে সফল হয়েছিলাম তা বলতে পারিনা। তাঁরা সে সময়েও প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে অসহায় মানুষকে সর্বশ্রান্ত করেছে, এখনও করছে। সম্ভবতো নিয়মিত মাসোহারা পাওয়ার কারণেই সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে এমন নীরব ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দেশের বুদ্ধিজীবী মহল এদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতনে ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু এই মহান বুদ্ধিজীবী যাদেরকে আমরা জাতির বিবেক বলে জানি এবং মানি তারাও কিছু উচ্ছিস্টের বিনিময়ে এসব জৌতিষদের বড়, বড় পুরস্কার দেয়, উপাধি প্রদান করেন। এসব পুরস্কার দেয়ার ছবি সব জ্যোতিষদের দেয়ালে বাধাই করে ঝোলান থাকে। দুর্বল চিত্তের মানুষ এসব দেখে আকৃষ্ট হয়ে প্রতারিত হয়। পত্রিকাওয়ালারা ওদের বিজ্ঞাপন পাবার লোভে চুপচাপ থাকে। ব্যক্তিগতভাবে তাই আমি মনে করি এই তিন শ্রেণীর (প্রশাসন, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্র) মাঝে বিবেকবোধ জাগ্রত না হলে এসব ভূয়া, রক্তচোষক, অশিক্ষিত জ্যোতিষদের কোনক্রমেই উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়।
(স্বপন ভাই, আপনি হাওলাদারকে কি শাস্তি দিয়েছেন তা জানিনা। তবে আমি দুই প্রফেসর হাওলাদারকেই পিটিয়েছিলাম। সেই পিটুনীটা আজ আপনার সৌজন্যে উৎসর্গ করলাম)
পুনশচঃ স্বপন ভাই, সব 'উদ্দিন'রাই ধামাধরা বা খয়ের খাঁ নয়। বর্তমানের এই তল্পিবাহক উদ্দিনদের ভীড়ে একজন উদ্দিন আছেন যিনি স্ব-মহিমায় উজ্জল। তিনি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন। সেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকে স্যালুট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

