লোকটাকে দেখার পর থেকেই কেন যেন আমার খুব একটা সুবিধের মনে হয়নি। এমনিতেই দাঁড়িঅলা লোক মানে আমার কাছে ধর্মভীরু। আর ধর্মভীরু লোক মানে সে হবে একটু অন্যরকম। তার চলাফেরা, কথাবার্তা একটু আলাদা হবে। সে কথা বলবে কম, হাসবে না, আর হাসলেও মুচকি হাসবে বা গাম্ভীর্যপূর্ণ হাসি দেবে। অথচ এই লোকটার দাঁড়ি যতো বড়, হাসি তত বড়, কথা তত বেষি বলে এবং ইয়ার্কিচ্ছলে বাজে উদ্ধৃতি এবং কৌতুক বলে। আমাকে ডাকে ছোট মা, এবং ছোট মা ছোট মা বলে সে আমাকে কয়েকবারই গাল টিপে দিয়েছে। আমি ভীষণ লজ্জা পেয়েছি এবং এরপর আর তার সামনে যেন না পড়ি সে চেষ্টা করেছি। তবু ঘরের সর্বত্র তার খোলামেলা পদচারণায় বেশ চিন্তিত হয়ে থাকলাম। বড় আপুরা দুষ্টুমি করে বলছে তোকে মনে হয় তার মনে ধরেছে, চিন্তা করিস না, পীরবাবার নজড়ে পড়া মানে বেহেশতে চলে যাওয়া।...
রাতের বেলা জলসা বসলো। পুরো গ্রামের মানুষকে ডেকে গড়ো করা হয়েছে। সকলের মাকসুদ পূরণ করার টেন্ডার নিয়ে এসছেন পীরবাবা। আমার বড় ফুপী সবাইকে ইন্স্ট্রাকশন দিলেন, যেন কোনওভাবেই এবার বাবাকে অমর্যাদা করা না হয়। গতবার কেউ একজন বাবাকে ভণ্ড বলে গালি দিয়েছিল বলে এবার ফসলের ক্ষেতে এই অবস্থা।...
গতবার বাবা নতুন এক নববধুর গায়ে নিজের ফায়েজ ঢেলে ছিলেন বলে মহিলা ক্ষেপে গিয়ে পীর বাবাকে আজেবাজে গালি দেয়।...
গ্রামে তাকে নিয়ে দুইধরণের মত পাওয়া যায়, একশ্রেণী এর প্রবল ভক্ত! আর একশ্রেণী একে সহ্যই করতে পারে না, বলে এ নাকি চরম ভণ্ড!... যারা তাকে অসম্মান করে তাদের নাকি নানা রকম কাফফারা যায়। কারও ছেলে মরে কারও গরু মরে কারও ছাগল হারায় কারও ধনি চুরি হয় কারও পুকুরের মাছ মরে যায়। এই এক আজব রহস্য এই আধুনিক যুগে এসেও।
রাতে সব মহিলারা পালাক্রমে তার সেবা করে। আর তাদের মাকসুদ পূরণ হয়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি না বলে, বলে তুই আর কী জানিস! কত বড় বড় শিক্ষিত মানুষ আসে! তারা কিছু বলে না, তাদের বউরা, মেয়েরা বাবার পায়ে গড়াগড়ি খায়...
যে মহিলা বাবাকে গালি দিয়েছির সে এর কিছুদিন পরই গাছে ঝুলে মারা যায়। তার স্বামী তাকে তালাক দেয়,সে নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিল। সবাই বলাবলি করে এটা ওই পীরবাবাকে গালি দেওয়ার পরিণাম।...
আমাকে সবাই সাবধান করে দেয় আমি যেন তাকে কিছু না বলি। এবয় রাতে যেন অবশ্যই তার খেদমতে হাজির হই। নববধু হিসেবে আমার যাওয়াটা এখন অনেক ফায়দার। মা ও বলে যা, পীর মানুষ! তোরই ভালো হবে। আমি বললাম; তুমি গেছ কখনও? মা বলে না, আমিতো নামাজকালামই পড়ি না, এসব পীর টির দিয়া কী করুম।... আমারও লাগবে না।
তোর ফুপু কিন্তু কষ্ট পাবে।
তোমার জামাইকে জানানো উচিৎ!
আমি জানতাম ও যেই মাথাভাঙ্গা, কোনওভাবেই রাজি হবে না। আমি ওকে ফোনে বললাম--- ও শুনেতো মহাক্ষাপা! বলে আজকের মধ্যে এইটারে পানিতে চুবাইয়া মারো, এরা হলো বড় ভণ্ড। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের কুপ্রবৃত্তিকে পূরণ করে...
ওকে ক্ষাপানোর জন্য বললাম
কী যে বলো! লোকটা কী সুন্দর করে হাসে, আর কত মজার মজার কথা বলে, গ্রামের সব মানুষ তার ভক্ত!
ও তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে, বলে তাইলে আপনি অলরেডি হিপনোটাইজড? ভালোই! আমার কাছে আর ফিরে আসতে হবে না। ওই বাবার সঙ্গেই রাত কাটান, আপনার মাকেও নিয়েন সঙ্গে...
মা তো যাবে না, সেতো পবিত্র না.... ফুপু যাবে, আরও কতো মহিলারা থাকবে...
ওর নাচন কে দেখে। ও ক্ষেপে গেলে মুখ দিয়ে কথা বের হতে চায় না। বিশ্রী ভাষায় গালি দিতে শুরু করে। আমার চৌদ্দগুষ্ঠি এক করে। আমার ফুপুকে যা বলে তাতে আমার গা রিরি করে ওঠে।....
আমি বললাম, আরে হইছে আমি যাবো তার কাছে? মাথা খারাপ! আমিতো এই ব্যাটারে দেখতে পারি না ছোটকাল থেকেই।
তার মানে এইলোক তোদের বাড়িতে নিয়মিত?
না বছরে একবার আসে। সবার প্রত্যাশাপূরণ করে দিয়ে যায়।
-বিশেষকরে যাদের সন্তান হয় না তাদের বাসনা পূরণ করে!
আরে হ্যাঁ তাইতো! তুমি জানলে কী করে?
আরে এইসব ভণ্ডদের কথা অনেক শুনেছি। তুমি শিগগির ফুপিকে বলো এই ভণ্ডটাকে তাড়াতে।
না বাবা, তা আমি পারবো না, আমার তিনকালই ধংস হয়ে যাবে। আর ফুপি তা শুনবেও না। আব্বু কতো বুঝালো! ফুপু পাত্তাই দেয় না।
তা দেবে কেন, তারতো আর স্বামী নাই। এতো বড় বড় পোলাপানরে থুইয়াতো আর বিয়েও করতে পারে না, নষ্টামিও করতে পারে না, তাই এই ভণ্ডামিটা বেছে নিয়েছে...তুমি আজকের মধ্যে এই বাড়ি ছাড়বা। ওই ব্যাটা কোনও যাদুটোনা, বদ মন্ত্র টন্ত্র দিয়ে তোমার ক্ষতি করবে। তোমার কোনও দরকার নাই ফুপুর বাড়ি বেড়ানোর।
সবাইতো এখানে, আমি একলা যাবো?
কুত্তারবাচ্চা তোর মারে বর্গা দিয়া যা.... বলে লাইন কেটে দিল। আমি আবার ফোন দিয়ে বললাম ঠিক আছে আমি এখনই বড় আপুর(ফুপুর বড় মেয়ে) বাসায় চলে যাচ্ছি।...
পরদিন সকালে গ্রামে একজন মহিলা মারা যায়, মাসিক হতে হতে কেউ বলে ডায়রিয়া হয়ে আর কেউ বলে তাও জোর গলায় বলে না, যে ওই লোকটাই মেরেছে। মহিলা নাকি কী বলেছে পীরটাকে।... তারপর বাসায় গিয়ে শুরু হয় তার ডায়রিয়া।.... সকালে হাসপাতালে না নিতেই....
এই গ্রামটাতে এসব ঘটনা নিয়ে তেমন কেউ মাথা ঘামায় না, কেউ কিছু জানতে চাইলে কেউ মুখ খোলে না। সবাই একটা আতঙ্কে থাকে। আসলে এরা কী? এ কি পীর? নাকি ভণ্ড?...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



