প্রথমেই মধ্যের ঘটনা দিয়ে শুরু করি।
২০০৪ সালের এপ্রিল মাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে দিন ক্ষণ দিয়ে সরকারের পতন ঘটানো হবে। এটা শুধু এ দেশে নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়াতেও আলোচিত হল। এর প্রবক্তা হলেন আলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল। তিনি বীরদর্পে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন আগামী ৩০ এপ্রিল বিএনপি-জামাত জোট সরকারের পতন দিবস। এই দিনের পরে খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং পরবর্তীতে গণতন্ত্রের মানস কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সরকার গঠন করব। উপস্থিত একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলে জলিল জবাব দেন যে আপনি কিভাবে নিশ্চিত যে জোট সরকার ৩০শে এপ্রিলের পর ক্ষমতায় টিকে থাকবে? সেই কি বাঘের গর্জন যে জলিল জোট সরকারের পতন ঘটিয়েই ছাড়বে এবং তার কাছে নাকি বিশেষ ট্রাম্প কার্ড আছে। আর এদিকে হাসিনা মিন মিন করতে লাগলেন যে আমার সাধারণ সম্পাদকের হুমকিতেই সরকার ভয় পেয়ে গেছে। এভাবে করে যেই ২৫-২৭শে এপ্রিল এসে পরলেও জোট সরকার যখন বহাল তবিয়তে এবং পতনের কোন সম্ভাবনাই নাই তখন যখন সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করল যে ৩০শে এপ্রিলই কি সরকারের পতন ঘটবে? জলিল বলেন আমি এখন ব্লাইন্ড খেলছি সময় হলেই ট্রাম্প করব! কিন্তু তাসের নিয়মে ব্লাইন্ড খেললে ট্রাম্প করা যায় না এটা আব্দুল জলিল ভুলে গেছেন। এরপর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আবার যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুললেন যে আপনি ব্যার্থ হয়েছেন তো জবাবে জলিল বলেন আপনারা সাংবাদিকগণ বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করেছেন। স্রেফ মুষ্টিমেয় অন্ধ, বদ্ধ উন্মাদ ও বেকুব আলীগের সমর্থকই ৩০শে এপ্রিল জোট সরকারের পতন হবে বলে খুশীতে গদগদ হয়েছিল। বাকীরা সবাই জলিলকে যা তা গালি দিয়েছিল। যে ব্যাটা ছাগল এভাবে কি সরকারের পতন হয়! হাসিনা কি ভাবে তাকে দলের এই পদে রাখে? কিন্তু এই সাধারণ সমর্থকগণ যতই জলিলকে দূষক, জলিল এই কথা বললেও ৪/৩০ এর ষড়যন্ত্রের আসল শয়তানি বুদ্ধি হল স্বয়ং শেখ হাসিনার।হাসিনা ২০০১ নির্বাচনে বাজে ভাবে পরাজয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ ছিল এবং চক্রান্ত করছিল যে কি ভাবে জোট সরকারকে দ্রুত হটিয়ে আবার ক্ষমতায় এসে ভারতের সেবা, বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানীকে ব্লক সমূহ উপহার দেওয়া এবং নিজেরা দেশকে লুটে পুটে খেতে পারবে সেই স্বপ্নে বিভোর ছিল। তাই ব্যার্থ হলে তার বদনাম হবে সে কারণেই জলিলের কাধে বন্দুক রেখে শিকার করতে চেয়েছিল। হাসিনা কি এতই বোকা যে জলিলের এই ছাগলামী আচরণের পরও তাকে সাধারণ সম্পাদকের পদে রাখবে? হাসিনা হল ধূরন্ধরের ধূরন্ধর! বস্তুত জলিল নেত্রীর বদ খায়েশের কাছে নিজেকে বলি দিয়ে দল ও দেশের কাছে নিজেকে ভাড় প্রমাণ করেছিলেন।
১৯৯৬ সালে ১২ই জুনের নির্বাচনে বেশী সংখ্যক সিটে জিতে এবং জাপার সমর্থন নিয়ে হাসিনার আলীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের শেয়ার বাজার দ্রুত গতি পেল। হাসিনার প্রথমবারের ক্ষমতায় আসার আগে যেখানে জানু-মে ১৯৯৬ সর্বোচ্চ ডিএসইতে ১২ কোটি টাকার লেনদেন হয়নি সেখানে জুলাই ১৯৯৬তে গড় লেনদেন দাড়াল ২৫-৩০ কোটি টাকা। তখনই যারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী তারা বললেন যে কৃত্রিম ভাবে শেয়ার বাজারে কারসাজি চলছে। তখন খালেদা জিয়া বার বার বিভিন্ন জনসভায় এবং সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন যে আওয়ামী শীর্ষ নেতা ও ব্যাবসায়ীরা ভারতীয় মাড়োয়ারী বিশেষ করে হার্ষাদ মেহেতা মিলে শেয়ার মার্কেটে ম্যানুপুলেশন করছে। তখন হাসিনা সহ আলীগ নেতারা বললেন যে আমাদের আমলে শেয়ার বাজার তেজী হওয়াতে খালেদা জিয়া হিংসা করছেন। এরপর ঠিক সেই ডিসেম্বর ১৯৯৬তে শেয়ার বাজারে ধ্বস নামল। যে শাইন পুকুর শুরুতে ৬০-৭০ টাকা ছিল সেটা ১০০০ টাকার মত পৌছে এক লাফে ৪৫০তে নেমে আবার ১০০ টাকার নীচে চলে যায়। ঐ ৯৬ সালে ডিএসই ও চট্টগ্রাম এক্সচেঞ্জ মিলিয়ে ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়। তখনকার অর্থমন্ত্রী মরহুম কিবরিয়া বলেন যে শেয়ার বাজার কি জিনিস উনি তা বুঝেন না। এমন ভাবে কথা বললেন যে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েছিলেন। যে ব্যাক্তি একদা সচিব ছিলেন এবং রাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী তারপরেও যদি শেয়ার মার্কেট কি তা না বুঝেন তাহলে কি হাসিনা তাকে মাছি মারা কেরাণী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন? তারপরে খালেদা সহ বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বার বার হুশিয়ারী দেওয়া সত্ত্বেও কেন কিবরিয়া সময়মত ব্যাবস্থা নেন নি? কারণ তিনি ভাল করেই জানতেন খোদ শেখ হাসিনা এই কারসাজির সাথে জড়িত। বস্তুত এর জন্যই ৯৬ সালের শেয়ার বাজার লুটপাটের ঘটনায় সালমান এফ রহমান সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এমন দূর্বল ভিত্তিতে মামলা করা হয় তা না পারে জড়িতদের শাস্তি দিতে না পারে নতুন মামলা দিতে। ৯৬তে কম্পিউটারে অন লাইন ট্রেডিং না হলেও যদি ধরি আরকি তর্কের খাতিরে অজ্ঞাত কারণে এই লুটপাট হয় তবে কেন জেনে শুনে হাল্কা ভিত্তিতে মামলা দেওয়া হল? হাসিনার ইচ্ছাতেই কর্ম। হাসিনার প্রথম আমলে এই লুটপাটের পর শেয়ার বাজার আর ঘুরে দাড়াতে পারেনি।
বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সমন্ধে আওয়ামীলীগারদের হাক ডাক বাহাদুরির অন্ত ছিল না। ২০০৮ সালে আগাচৌতো বলেই দিয়েছিলেন যে মরহুম সাইফুর রহমান হলেন একাউন্টেট আর মুহিত অর্থনীতিবিদ। তারপরেও সেই চারদলীয় জোট সরকারের সময়েই শেয়ার বাজার আবাস স্বাভাবিক গতিতে ঘুরে দাড়াতে পেরেছিল। ২০০১-০৬ যেই কোন কোম্পানীর শেয়ারের ১ কি ২ দিন অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল সাথে সাথে তার লেনদেন বন্ধ করে দিত সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন। মরহুম সাইফুরের সততা এবং খালেদা জিয়ার আন্তরিকতার জন্যই জোট সরকারের সময় দেশের শেয়ার বাজারে কোন লুটপাট বা হরিলুটের ঘটনা ঘটেনি। এবার হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে মহাজোট সরকারের রুপে এসে ধীরে ধীরে শেয়ার বাজারে পুনরায় লুটপাটের ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এইবার ক্ষমতার ঐ প্রথম বছর ২০০৯ সালে তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন শেয়ার কারসাজিমূলক ভাবে কৃত্রিম দাম না বাড়িয়ে ২০১০ সালকেই টার্গেট করা হয়। কারণ ৯৬ এর কারণে সাধারণ শেয়ার ব্যাবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই দেখা গেল আগষ্ট-সেপ্টেম্বর বেশ কয়েকটি কোম্পানীর শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ঘটলে যখন সিএসই এর লেনদেন বন্ধ করে দেয় তার পরের দিনই রহস্যজনক ভাবে আবার সেগুলো লেনদেনে হাজির। এখন বোঝা যাচ্ছে যে মুহিতের কিছুটা সততার কারণে এগুলো সাময়িক ভাবে লেনদেন বন্ধ হলেও সরাসরি হাসিনার নির্দেশে বার বার এগুলো চালু হচ্ছিল। সিএসইর সাহস নাই যে মুহিতকে উপেক্ষা করে ব্ল্যাক লিষ্টেড কাউকে পুনরায় শেয়ার বাজারে ছাড়ে। একটি ক্যারিবীয় কোম্পানী সহ বেশ কয়েকটি কাগুজে তথা ভূয়া কোম্পানী শেয়ার বাজারে তালিকা ভূক্ত হয়ে পাগলা ঘোড়ার মত তাদের দাম বাড়তে থাকে। শুরুতে ১০ টাকার শেয়ার ২ সপ্তাহ পর হয় ৫০০ টাকারও বেশী। এই ভাবে হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে পুনরায় শেয়ার বাজারে লুটপাট করে ধ্বস নামানো হয় এবং এর পরিমাণ ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশী। এটা ২০১০-১১র বাজেটের সমান। এবারও বেক্সিমকো সহ আলীগের বড় বড় ব্যাবসায়ীরাই জড়িত। এদের অনেকের নামও তদন্তে এসেছে। কিন্তু তাদেরকে ধারতো দূর এখন পর্যন্ত কোন মামলাও হয় নি বলেই জানি। মুহিত যতই সৎ হৌন না কেন বাংলাদেশের চেয়ে তার কাছে নেত্রী হাসিনাই অনেক অনেক বড়। তাই ইচ্ছে করেই জড়িতদের বিরুদ্ধে কোন ব্যাবস্থাই নিচ্ছেন না। প্রথমে সাধাসিদে ও শান্তভাবে এমনকি নীরবে তার ব্যার্থতার অভিযোগ সয়ে নিয়েছেন। যেমন এবার ২০১১-১২ সালে বাজেট ঘোষণার জন্য আহুত সংসদ অধিবেশনের শুরুতে হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ সেলিম প্রচন্ড ভাবে মুহিতকে ঝাড়েন তথা এক হাত নেন। মুহিতও ভেজা বেড়ালের মত বিনা প্রতিবাদে শুনে যায়। পরের দিন জনকন্ঠ, কালের কন্ঠ সহ BAL ঘরাণার সংবাদপত্র সমূহ বড় বড় হেডিং তোপের মুখে অর্থমন্ত্রী যার অর্থ দাড়ায় শেখ হাসিনা ও তার সরকার র্দূনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। শেখ সেলিম সহ আলীগের কয়েকজনের সংসদ সদস্যদের গর্জনে এমন মনে হল যে তারা সংসদেই হাতি শিকার তথা শেয়ার কেলেংকারীর হোতাদের গ্রেফতার করে লুটপাট হয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধার করে ফেলেছেন। কিন্তু আজকে প্রায় এক মাস হতে চলল যে লাউ সেই কদুই রয়ে গেছে। বরং সালমান এফ রহমান, লোটাস কামাল, সামিট গ্রুপ বুক ফুলিয়ে চলছে। এমন ভাব যে একেতো চূড়ি তার উপর শিনা জুড়ি। আর অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবী উঠলে তিনি ধমকে উঠেন যে কারো কথায় তিনি পদত্যাগ করবেন না। মুহিততো বাহাদুরি দেখাবেনই। কারণ উনি ভাল করেই জানেন আমার কান্ধে হাসিনা যতই বন্দুক রেখে গুলি করুক তাতে কেউ আমার গায়ের একটা লোমও স্পর্শ করতে পারবে না। হাসিনাকে আমি হাজার হাজার কোটি টাকা এক লাফে উপার্জন করিয়ে দিয়েছি উনি যদি আমাকে অভয় দেন বাংলাদেশে কার বাপের সাধ্য আছে তাকে অর্থমন্ত্রীর পদ হতে সরিয়ে দেওয়া।
শেখ সেলিম গংরা যতই কৃত্রিম বাঘের গর্জন দেখাক তাদের সৎ সাহস নেই যে হাসিনা বুবুর বিরুদ্ধে সামান্যতম অভিযোগ করবে। বরং হাসিনার সাথে লুটপাটের অর্থ ভাগ বাটোয়ারা করবে। ১৯৯৬তে কিবরিয়া, ২০০৪এ জলিল এবং এবার ২০১০এ মুহিতকে বলির পাঠা বানিয়ে শেখ সেলিম গংরা লুটপাট করে বা সাথী হয়ে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে বাঘের মত গর্জন দিবে আমরা গণতন্ত্রের মানস কন্যা, দেশ নেত্রী হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি এক কাতরে আছি। দেশ যেখানে খুশী যায় যাক তবুও জয় হাসিনার, হাসিনার জয়!
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুন, ২০১১ রাত ১১:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



