বিশ্ববিখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েলের বহুল আলোচিত সাহিত্যকর্ম এনিমেল ফার্ম গ্রন্থটি হয়তো আমারা অনেকেই পড়েছি। এগ্রন্থের কাহিনীতে- এক বিশাল পশু খামার ম্যানর ফার্মের মালিক মিস্টার জোন্স।
পশু নেতা শূকর ওল্ড মেজর ব্যথিত হৃদয়ে একদিন পশুদের দুঃখ, কষ্ট নিয়ে এক আবেগঘন বক্তব্য দেন । তিনি বলেন, ‘পশুদের জীবন খুবই কষ্টের এবং সীমিত সময়ের। পশুরা সারা জীবন মানুষকে শধুই দিয়ে যায়। কিন্তু অকৃতজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে তারা কিছুই পায় না। কোন পশু বৃদ্ধ হলে তার প্রতি সদয় হওয়া তো দূরের কথা , তাকে বিক্রি করে দেয় অথবা জবাই করে খেয়ে ফেলে। এই হলো পশুর জীবন।’ ওল্ড মেজর স্বপ্ন দেখে,পশুরা মানুয়ের কাছ থেকে মুক্তি ছিনিয়ে নিয়ে সুন্দর, স্বাধীন ও সম্মানের জীবন গড়েছে। তার এই বক্তব্যে ফার্মের পশুরা উদ্বুদ্ধ হয়। ক’দিন পর ওল্ড মেজর মারা যায়। কিছু দিন পর আরেক শূকর স্নোবলের নেতৃত্বে ফার্মের সব পশুরা বিদ্রোহ করে ফার্মের মালিক মিস্টার জোন্সকে বিতারিত করে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ম্যানর ফার্মের নাম রাখা হয় এনিমেল ফার্ম। স্নোবল তার যোগ্য নেতৃত্বে কে কোথায়,কোন কাজ, কখন কীভাবে সম্পন্ন্ করবে, কার কী দায়িত্ব- তা বুঝিয়ে দিয়ে পশুদের জীবনে শৃঙ্খলা এবং শান্তি ফিরিয়ে আনেন। স্বাধীন জীবনে ভালোই দিন কাটতে লাগলো পশুদের । কিন্তু নেপিলিয়ন নামের আরেক শূকর স্নোবলকে ফার্ম থেকে বিতাড়িত করে নেজেই স্বঘোষিত নেতা বনে যান। নেপিলিয়ন বলে, যেহেতু তোমাদের রোজগারসহ যাবতীয় কর্মকান্ড নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হয়, তাই আমাকে বেশি করে ভাবতে হবে, এজন্য আমাকে বেশি করে খেতে হবে, আরাম আয়েশে থাকতে হবে। এভাবে আস্তে আস্তে শূকর প্রজাতির সবাই বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে আরাম আয়েসের ডুবে যেতে লাগলো। ফার্মের সব ডিম বিক্রি করে শূকরদের জন্য মদ কিনে আনা হলো। শুরু হলো পশুতে পশুতে শুরু হলো চরম বৈষম্য। একদিন বক্সার নামের সবচেয়ে কাজের ঘোড়াটি অক্ষম হয়ে পড়লে তাকে কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়া হলো। একসময় পশুদের উপলব্ধি হলো স্বাধীন হতে গিয়ে তারা নির্কষ্ট প্রজাতির শূকরদের দ্বারা তারা শাসিত হচ্ছে, শোষিত হচ্ছে । এর চেয়ে ম্যানর ফার্মে মিস্টার জোন্সের অধীনেই তারা অনেক ভালো ছিলো -সেখানে পশুতে পশুতে বৈষম্য ছিলো না ,অন্তত খাবারের কষ্ট ছিলো না।
একদিন ঢাকা থেকে ফেরার পথে আরিচা ফেরীঘাটে কথা হলো এক টোকাইয়ের সাথে। সে বলল, ‘টোকাইদেরও সংগঠন আছে। টোকাই সমিতি। নিজেদেরে অধিকার রায় তারাও সংঘবদ্ধ হয়েছে। কয়েক’শ টোকাই এসমিতির সদস্য হয়েছে। সমিতির সদস্য হওয়া ছাড়া কেই এ এলাকাতে টোকাইয়ের ব্যবসা করতে পারে না। সমিতির সদস্যদের প্রতিমাসে ২০ টাকা করে মাসিক চাঁদা দেয়া লাগে। টোকাইরা ভোট দিয়ে সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারী নির্বাচিত করেছে। আরিচা ফেরীঘাটে তাদের অফিস আছে। সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারী সব সময় অফিসের রঙিন টেলিভিশন দেখে- তাদের কোন কাজ করতে হয় না।’
আমি টোকাইটির কাছে জানতে চাইলাম, কয়েক’শ টোকাই তোমরা যে প্রতিমাসে ২০ টাকা করে চাঁদা দাও - এঅর্থ কোন কাজে ব্যয় করা হয় ?
এর উত্তর টোকাইটির জানা নেই। জানা নেই অন্য টোকাইদেরও । স্বাধীনতার নামে,অধিকার রক্ষার নামে তাদেরকে যে ম্যানর ফার্ম থেকে এনিমেল ফার্মে ঢোকানো হয়েছে , এটা তারা বুঝতে পারে না। সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারী যে তাদের এনিমেল ফার্মের শূকর নেপোলিয়নের মতো শোষণ করছে এ উপলব্ধি তাদের নেই।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কাছ থেকে কর্মচারী সমিতির কর্মকান্ড প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর প্রায় ৫০০ কর্মচারী এ সমিতির সদস্য । সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারীর জন্য প্রশাসনিক ভবনের দু’তলায় বিশাল অফিস। সমিতির সভাপতি , সেক্রেটারীসহ অন্য নেতারা ভুলেও তাদের কর্মস্থলে যায় না। সমিতির অফিসে বসে আড্ডা দেয় আর খবরদারী করে। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও ভিসির সঙ্গে মেহমান হয়ে বিভিন্ন প্রগ্রামে যায়। কিন্তু কর্মচারীদের অধিকার নিয়ে ,তাদের প্রমোশন,নিয়োগ স্থায়ীকরণসহ কর্মচারীদের স্বার্থ নিয়ে একটি কথাও বলে না। এমনকি সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারী প্রমোশন পেয়ে অফিসার হয়ে গেলে কর্মচারী সমিতিতে থাকতে পারবে না, এজন্য তারা প্রমোশনও নেয় না। কিন্তু উলুখাগরা কর্মচারীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।
আজ নারীর সম অধিকার আইন নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলছে। সরকার নারীর সম অধিকার আইন নিয়ে বেপরোয়া। মহামান্য রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ধর্মীয় গোড়ামী দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা। নারীর সম অধিকার বাস্তবায়নের পথে আজ সরকার কোরআনের আইন, ইসলামী শরীয়া সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে কোরানের নতুন ব্যাখার প্রচেষ্টাতেও পিছপা হচ্ছে না।
একসময় আমি যখন ছোট ছিলাম ভ্রমণের সময় বাসে উঠলে দেখতাম, ‘মহিলাদের জন্য সংরতি আসন’ লেখা। এসব আসনে পুরুষের বসার অধিকার ছিলো না। বিভিন্ন বাস কাউন্টার ,স্টেশনে দেখতাম, মহিলাদের বিশ্রামাগার। এখনো বিভিন্ন স্থানে মহিলাদের জন্য আলাদা টয়লেট লেখা দেখি। একদিন হয়তো এটাও উঠে যাবে।
মহিলাদের অধিকার নিয়ে নারীবাদী সংগঠনগুলো যখন সরব ছিলো না -বাসে সে সময় দেখতাম, কোন মহিলা দাঁড়িয়ে থাকলে পুরুষেরা উঠে তার বসার জায়গা করে দিতো। ব্যাংকে বিদ্যৎ বিল দিতে গেয়েছি , প্রচন্ড ভীড় । অনেক মানুষ লাইনে দাড়িয়ে আছি। কোন মহিলা হয়তো আছে লাইনের পেছনে। সবাই সমস্বরে বলেছে, মহিলাটিকে আগে যেতে দাও ,তাকে আগে ছেড়ে দাও। হয়তো হসপিটালে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি, সবাই লাইনে দাড়িয়ে আছি, সবার সম্মতিতে মহিলা রুগীটিকে আগে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সে সময় সম অধিকার ছিলো না। কিন্তু বাস্তবে মহিলারা অধিকার ভোগ করতো বেশি। সবাই তাদের প্রতি সহানুভতি দেখাতো, আন্তরিকতা দেখাতো। মা বোন বলে সম্মান করতো। আর আজ বাসে উঠলে প্রায় দেখি, কেউ কোন মহিলার জন্য সীট ছাড়ে না । কেউ অনুরোধ করলে বলে, এখন সমান অধিকার সীট ছাড়বো কেন?
হসপিটালে, স্টেশনে, অফিস আদালতে কোন খানেই আর মহিলাদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে না,সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে না। কিন্তু মহিলারা যে পুরুষের তুলনায় দুর্বল,কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সহানুভুতি ছাড়া যে তারা গতিহীন- এটা কি আমরা অস্বীকার করতে পারি। নইলে অফিসে কেন মহিলা সহকর্মীটিকে কাজের ক্ষেত্রে অনেক ছাড় দেওয়া হয়, আগে ছেড়ে দেওয়া হয়? তাকে বেশি বেশি ছুটি দেওয়া হয়। আর যদি প্রসূতি হয় তাহলে তো কথাই নেই।
আসলে প্রকৃতিগতভাবেই নারীরা সম অধিকার নিয়ে চলতে পারে না, বরং ক্ষেত্রে বিশেষে তাদের বেশি অধিকার দেওয়া লাগে। এটাই বাস্তবতা। নইলে কেন চাকরির ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য কোটা রাখা হচ্ছে। কেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মহিলাদের জন্য ৬০% কোটা আজো সংরতি। কেন আজো মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ,তাদের জন্য উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা?
কোন কৃষক তো বলে না, তার বউকে মাঠে গিয়ে তার মতো লাঙল ঠেলতে হবে। ধান লাগাতে হবে । মাটি কাটতে হবে।
রাস্তার মাটি কাটার জন্য এদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ মহিলাদের রাস্তায় নামায় নি। নামিয়েছে সরকারের মদদপুষ্ট বিদেশি এনজিওরা । কিন্তু এসব মহিলাদের কাটা মাটিতে গ্রাম গঞ্জের রাস্তা কতটা প্রসস্থ হয়েছে,তা আমরা যেমন জানি, তেমনি জানি এসব চাকরিজীবি নারীরা দাম্পত্যজীবনে কতোটা অশান্তির কারণ হয়েছে।
নারী উন্নয়নের শ্লোগানের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বাসে ‘সংরতি মহিলা আসন’-এর মতো লেখাগুলো। হারিয়ে যাচ্ছে নারীর প্রতি সহানুভূতির মানসিকতাটুকু। আসলে নারীবাদীরা চায়, নারীরা শুধু নারী নয়, মানুষ হোক। তারাও পুরুষের মতো পুরুষের সঙ্গে চাপাচাপি,গাদাগাদী ,ঠেলাঠেলি করে পুরুষের কাছে হেনস্থা হোক । এভাবে তারা নারীকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
অসম শক্তির দ’জন মানুষকে যদি কোন সম প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হয় তাহলে যে দুর্বল চিত্তের মানুষটিকে পিষ্ট করা হয়, অবমাননা করা ,তার প্রতি অবিচার করা হয় - এউপলব্ধির বোধ আমরা হারিয়ে ফেলছি।
গণতন্ত্রের কথা বলে,নারী উন্নয়নের বুলি আওড়াতে আওড়াতে আমরা যে দু’নারীকে আমাদের মাথায় বসিয়ে, আমাদের জাতির ললাটে অভিষাপের কালিমা একে দিয়েছি, এউপলব্ধি আমাদের কবে হবে? সমগ্র জাতি আজ দু’নারীর অনুসারী হয়ে, দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে দু’ সতিনের সংসারের মতো চুলাচুলি, কলহ, গঞ্জনা আর হাঙ্গামায় লিপ্ত হয়েছে। নারী উন্নয়নের কথা বলে এদু’নারী যে জাতির উন্নয়নের সব পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ্যা করে দিয়েছে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা। বন্ধ্যা এদু’নারী কোল থেকে যে কোন মহাথির মুহাম্মদের জন্ম হবে না। এ উপলব্ধি আমাদের কবে হবে?
উদার গণতন্ত্রকামীরা প্রগতির কথা বলে, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে। আজ দেশের ৬৪ টি জেলার অধিকাংশ জেলা প্রশাসক হিন্দু সম্প্রদায়ের। কোন কোন জেলায় দেখা যায়, ডিসি হিন্দু, এসপি হিন্দু, ওসি হিন্দু তাছাড়া প্রশাসনের গুরুত্বপুর্ণ পদগুলোতে রয়েছে হিন্দু কিংবা উপজাতি। আজ মুসলমানদের কাছে মুসলমানরাই বিশ্বস্ত নয় তাই বিধর্র্মীদের মাথায় তুলে নাচতে পারলে স্বস্তি পাই। বিধর্মীদের দ্বারা আমরা শোষিত হবো, নিগৃহীত হবো- এটাই কি অসাম্প্রদায়িকতা?
গণতন্ত্রের নামে,স্বাধীনতার নামে, অধিকার রক্ষার নামে, মানবতার নামে আমরা যে এনিমেল ফার্মের মতো নিকৃষ্ট প্রজাতির দ্বারা শোষিত হচ্ছি , এউপলব্ধি আমাদের কবে হবে? কবে হবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


