ঠাকুমা, ঠাকুরদা, নানা, নানী সবারই ব্যাথা আর ব্যাথা, হাতে পায়ে হাটুতে, কোমোরে সবখানেই। সবাই বাতের রুগী।বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাত জেকে ধরে আর ব্যাথাতে কষ্ট পান বয়স্কেরা।বৃদ্ধ বয়সের এমনি এক রোগ অস্টিওআরথ্রাইটিস । অনেক ডাক নাম আছে রোগটার যেমন “ডিজেনারেটিভ জয়েন্ট ডিজিজ”, “অস্টিও আরথ্রোসিস” জয়েন্ট ক্ষয় রোগ’ ইত্যাদি। নামের থেকেই বোঝা যায় রোগটা হল গিঠ বা জোড়ার প্রদাহ আর জন্ম হয়েছে ডিজেনারেশান বা ক্রমাগত ক্ষয়ের ফলে।কথাটা এসেছে গ্রীক ভাষা থেকে।মানব সভ্যতার মতই পূরোনো রোগটি।সেই প্রস্তরযুগের ফসিল, মিসরের “মমি” সবারই হাড়ে পাওয়া গেছে এই রোগের চিহ্ন। একশোর ও বেশী প্রকারের আরথ্রাইটিস রোগের মধ্যে সবচে’বেশি হল এ রোগ, প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ।আমেরিকাতে দু থেকে আড়াই কোটি আর বৃটেনে ৩০ থেকে ৪০লক্ষ লোক এই রোগের রুগী।
গিঠের গঠনঃ-আমাদের শরীরের ফ্রেম হল হাড় দিয়ে তৈরী যার উপর ভর দিয়ে আমরা সোজা হয়ে দাড়াতে পারি, কাজ করতে পারি।একটা হাড় আরেকটা হাড়ের সাথে গিঠ এর মাধ্যমে যুক্ত। মাংশপেশীর কাজ হোলো এই জয়েন্ট বা গিঠকে নড়াচড়া করানো ভাজ করা্নো ইত্যাদি।দুটো হাড় গিঠের যেখানে এসে মিশেছে সেখানে হাড়ের প্রান্তদুটো কার্টিলেজ দিয়ে ঢাকা থাকে।এই কার্টিলেজ হাড়ের প্রান্তদুটোতে মসৃন গদি হিসেবে কাজ করে। হাড় দুটো জোড়া থাকে একটা থলি বা জয়েন্ট ক্যাপসুল দিয়ে।থলির দুই প্রান্ত দুই হাড়ে লাগান থাকে আর থলির ভিতর দিককার লাইনিং হোলো “সাইনোভিয়াম”। এই সাইনোভিয়াম তৈরি করে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড যা জমা থাকে থলি বা ক্যাপসুলএর মধ্যে।সাইনোভিয়াল ফ্লুইড কাজ করে লুব্রিক্যান্ট বা পিচ্ছিলকারক হিসেবে।সাইনোভিয়াল ফ্লুইড এবং কার্টিলেজ দুটোতে মিলে জোড়াকে ঘর্ষনবিহীন মসৃন নড়াচড়াতে সাহায্য করে।
অস্টিওআরথ্রাইটিস রোগটা কি?
এক কথায় এটা হল গিঠ ক্ষয়ে যাওয়া রোগ আর সবচে’ বেশি আক্রান্ত হয় হাড়কে ঢেকে রাখা কার্টিলেজ ।বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের গিঠের কারটিলেজে পানি কমতে থাকে আর ভঙ্গুর হয়ে যায়।ক্রমাগত ঘর্ষনের ফলে এক সময় কার্টিলেজ মসৃনতা হারায় আর পৃষ্ঠদেশে ছোট ছোটো ক্ষত সৃষ্টি হয় যা আস্তে আস্তে গভীর হতে হতে গভীরতর হতে থাকে এবং এক সময় নিচের হাড় বেরিয়ে আসে।কার্টিলেজ হয়ে যায় পাতলা।গিঠের ভিতরে জায়গা যায় কমে।কার্টিলেজ না থাকাতে গিঠের মসৃনতা থাকে না,গিঠের চলাচল ব্যাহত হয়, সাথে ব্যাথা।হাড়ে হাড়ে ঘষা খেয়ে অনেক সময় শব্দ হয় গিঠের ভিতর।গিঠ জাম মেরে ধরে থাকে।আর গিঠের প্রান্তে তৈরি হয় ছোটো ছোটো হাড় যার নাম অস্টিওফাইট।স্বাভাবিক অবস্থায় খুব বেশী প্রদাহ না থাকলেও আঘাত, অত্যধিক ব্যাবহার বা অন্য কোনো কারনে গিঠ মাঝে মাঝে প্রদাহে আক্রান্ত হয়। তখন গিঠের ফোলা এবং ব্যাথাও বেড়ে যায়।
অস্টিওআরথ্রাইটিস রোগের কারনঃ- সঠিক একক কারন জানা যায় নি। বরং অনেক গুলো কারনই এই রোগ হওয়ার পেছনে দায়ী।
১) বয়সঃ-রোগটা শুরু হয় ৪০ বা ৫০ বছর বয়সের পর থেকে। সে হিসেবে বৃদ্ধ বয়সের রোগ এটি।বয়স যদিও গুরুত্বপুর্ন এটি কিন্ত অবধারিত কারন নয়।কদাচিত কখনো কখনো রোগটি অল্প বয়সেও দেখা যায় আবার অতি বৃদ্ধ বয়সেও রোগের লক্ষন দেখা যায় না ।
২) গিঠ আঘাতপ্রাপ্ত হলে, অত্যধিক ব্যবহৃত হোলে বা অন্য কোনো রোগগ্রস্থ হলেও অস্টিওআরথ্রাইটিস দেখা দিতে পারে।
৩) লিঙ্গঃ- পুরুষ বা মহিলা যে কারও এ রোগ হতে পারে।তবে আনুপাতিক হারে মহিলার সংখ্যা বেশি।
৪) শরীরের ওজনঃ – বেশি ওজন একটি গুরুত্বপুর্ন কারন।মোটা হলে বা ওজন বেশি হলে গিঠের উপর বেশি চাপ পড়ে এবং জয়েন্ট কারটিলেজ দ্রুত ক্ষয়ে যেতে থাকে।
৫)পেশাঃ- কোনো কোনো পেশা তে গিঠের উপর বেশী চাপ পড়ে এবং কার্টিলেজের ক্ষয় তরন্বিত হয়ে অস্টিওআরথ্রাইটিস হতে পারে।
৬) বংশগতঃ- সরাসরি বংশগত রোগ নয় তবে পারিবারিক প্রভাব আছে।
৭)মাংসপেশীর দুর্বলতাঃ সবল পেশী গিঠের সাপোর্ট। মাংশপেশি দুর্বল হলে গিঠ সহজেই আঘাত প্রাপ্ত হয় এবং গিঠের ক্ষয় তরান্বিত হয়।
প্রকারভেদঃ- অস্টিওআরথ্রাইটিস দুই প্রকার, -প্রাইমারি, যখন অস্টিওআরথ্রাইটিস অন্য কোন কারন বা রোগ ছাড়াই হয়, সেকেনডারি- যখন রোগটি অন্য কোন কারনে বা রোগের ফলে হয়।
যে সমস্ত গিঠে অস্টিও আরথ্রাইটিস বেশী দেখা যায় সেগুলো হলঃ-
হাটু, হি্প, মেরুদন্ড, হাত্, কনুই ইত্যাদি।যে সমস্ত গিঠকে শরীরের ওজন বহন করতে হয় যেমন হাটু বা হিপ জয়েন্ট সে গুলোতে অস্টিও আরথ্রাইটিস বেশি দেখা যায় আর এই সমস্ত গিঠের রোগই বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে হাটা, চলাফেরা,ওঠাবসা করতে।
রোগের লক্ষনঃ-
১)গিঠে ব্যাথা , গিঠ ফোলা ,গিঠ ব্যবহার করতে কষ্ট, গিঠে জাম মেরে ধরে থাকা ইত্যাদি এই রোগের প্রধান লক্ষন।
২)এ রোগে সবচে বেশি আক্রান্ত হয় হাটু তাই হাটু ভেঙ্গে নিচে বসা, নিচে বসা, নামাজ পড়া, পায়খানা প্রস্রাব করা, সিড়ি ভেঙ্গে ওঠা নামা করা কাজ গুলো করতে অসুবিধা হয়।সকালে ঘুম থেকে উঠার পর বা কাজ কোরে একটু বিশ্রাম নিলে জাম মেরে ধরে থাকা ভাবটা বেশি অনুভুত হয়। একটু কিছুক্ষন ব্যবহার করলে গিঠের নড়াচড়া সহজ হয়ে আসে।
৩)মাঝে মাঝে গিঠের ফোলা এবং ব্যাথা বেড়ে গিয়ে হাটা চলা এবং কাজ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
৪)অনেক সময় ক্ষয়ে যাওয়া হাড় একটা আরেকটার সাথে ঘষা খেয়ে ব্যাথার সাথে সাথে গিঠের মধ্যে কট কট শব্দ হয়।
ডায়াগনোসিসঃ- রোগীর বয়স, উপসর্গ, লক্ষন ইত্যাদির সাথে সাথে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার দরকার পড়ে।
X-Ray:-এই পরীক্ষাটি রোগ নির্নয়ের জন্য যথেষ্ট। অসুবিধা হলো প্রাথমিক স্তরে অস্টিওআরথ্রাইটিস রোগ এই পরীক্ষায় ধরা সম্ভব হয় না।আর X-Ray এর সাথে রোগীর উপসর্গ এবং লক্ষনের অমিল।অনেকের হয়তো দেখা যায় খুব বেশী বেশী ক্ষয় কিন্ত সেই তুলনায় রোগীর লক্ষন ততো বেশি নয়। আবার X-Ray তে অল্প সল্প ক্ষয় থাকলেও প্রচন্ড ব্যাথা এবং ফোলাতে রোগী কাহিল থাকতে পারেন।
MRI- পরীক্ষা টি প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে সব সময়ই রোগ নির্নয়ে সহায়ক, মুশকিল হল পরীক্ষাটি ব্যয়বহুল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ ডায়াগনোসিসের জন্য প্রয়োজনীয় নয়।
Joint fluid Aspiration- অনেক সময় গিঠের থেকে পানি বের করে তা পরীক্ষা করা হয়।গিঠের ইনফেকশান,বা অনান্য বাত(Gout)রোগ ডায়াগনসিসে যথেষ্ট সহায়ক।
Blood tests-এই রোগ ডায়াগনোসিসের জন্য রক্ত পরিক্ষা সহায়ক নয় তবে অন্য কোন বাত রোগ উপসর্গ বা লক্ষনের কারন কিনা দেখার জন্য TC,DC ESR, HB%,R/A Test, Serum Uric acid level,ইত্যাদি করা হয়ে থাকে।
চিকিৎসাঃ- সুনিদ্দৃষ্ট চিকিৎসা নেই এটির।জয়েন্ট কার্টিলেজ ক্ষয় হয়ে যাওয়া রোধ করা সম্ভব নয়।নীচের চিকিতসা গুলো উপকারী-
১,ব্যাথার ঔষধঃ- - প্যারাসিটামোল,ডাইক্লোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন, ইত্যাদি ব্যাথা এবং ফোলা নিরাময়ে উপকারী।যত কম মাত্রা বা যত অল্প দিন খেয়ে পারা যায় ততো ভাল।ঔষধ গুলোর পার্শ প্রতিক্রিয়া অনেক বিশেষ করে পাকস্থলি বা কিডনীর উপর। অল্প সল্প ব্যাথা থাকলে বা ব্যাথা সহ্যের মধ্যে থাকলে ঔষধ না খাওয়াই শ্রেয়।
২,ফিজিওথেরাপি-পার্শপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিতসা হিসেবে ব্যাথা নিরাময়ে সহায়ক।শর্ট ওয়েভ ডায়াথার্মি বা ইনফ্রারেড রেডিয়েশান ব্যাথা নিরাময়ে উপকারী।
৩,গিঠের সাপোর্ট:- বিভিন্ন ধরনের ব্রেস, লাঠি, হুইল চেয়ার, ক্রাচ ইত্যাদি ব্যাথা নিরাময় ও চলাচলে সহায়ক।
৪, ব্যায়াম ও শরীরের ওজন কমানো গুরুত্বপুর্নঃ-ব্যায়াম করলে ব্যাথা না বাড়ে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। ভরবিহীন গিঠের ব্যায়াম যেমন সাতার এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
৫, ষ্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ ব্যাথা নিরাময়ে সহায়ক। অনেক সময় গিঠে ইঞ্জেকশান করে দিলে রোগী দীর্ঘকাল ব্যাথা মুক্ত থাকতে পারেন।
৬,গিঠে ইঞ্জেকশানঃ- বিভিন্ন ধরনের ঔষধ যেমন “হায়ালুরোনিক এসিড” গিঠের ভিতর ইঞ্জেকশান দিলে ব্যাথা কমতে পারে।
৭,কার্টিলেজের ক্ষয় রোধ করার জন্য ‘গ্লুকোস্যামাইন”,”কন্ড্রোইটিন” “ডায়াসেরিন” ইত্যাদি ঔষধ ব্যবহার করা হয়, খুব ফলপ্রসু নয় এগুলো।
৮,নতুন চিকিৎসাঃ- কার্টিলেজের আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে “স্টেম সেল”,“লুব্রিসিন’ কার্টিলেজ গ্রাফট” ইত্যাদি করাহয়। চিকিৎসা গুলো এখনো পরিক্ষামুলক।
৯,অপারেশানের মাধ্যমে গিঠের প্রতিস্থাপন বা জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট খুব ফলপ্রদ চিকিৎসা।যখন কোনও চিকিৎসা তে ব্যাথা কমে না এবং অচল করে দেয় অস্ত্রপচার ই শেষ ভরসা।দ্রুত রোগী ব্যাথামুক্ত হয়ে চলাচল করতে পারেন। অস্ত্রোপচার চিকিৎসাটি ব্যায়বহুল। কয়েক লক্ষ টাকার ব্যাপার।
১০, উপদেশঃ- রোগীকে গিঠের যত্ন নিতে হবে। হাটুর ব্যাথায় হাটুভেঙ্গে নিচু জায়গার পরিবর্তে চেয়ার এ বসতে হবে, পায়খানা প্রস্রাবের জন্য কমোড, চেয়ার টেবিল এ নামাজ পড়তে হবে, ১৫-২০ মিঃ পর পর অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। হাটুর ব্যায়াম করতে হবে। গরম সেক, এবং কোনো কোন ক্ষেত্রে বরফ, ব্যাথা নিরাময়ে সহায়ক।যে সমস্ত কাজে গিঠের উপর চাপ পড়ে সে কাজগুলো পরিহার করতে হবে।
ডাঃ বীরেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্
এমববিএস, এফসিপিএস, এমএস(অর্থোপেডিক্স)
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন।
টরেন্টো, কানাডা।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০১১ রাত ৮:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


