একাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দাবীদাওয়া ও আব্দার যেন ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে যে দাবীগুলো তারা মুখে আনতে সাহস পায়নি এখন তা নিয়ে বাংলাদেশের উপর অবিরাম চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। পাকিস্তান আমলে তারা বেরুবাড়ির দাবী করেনি, কিন' একাত্তরে শুধু দাবিই করেনি, ছিনিয়েও নিয়েছে। এবং সেটি মুজিবের হাত দিয়ে। প্রতিদানে কথা ছিল তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে দিবে। কিন্তু সেটি দেয়নি। আঙরপোতা, দহগ্রামের ন্যায় বহু বাংলাদেশী ছিটমহল এখনও ভারতের কাছে জিম্মি। ভারত সেগুলিতে যাওয়ার করিডোর দিতে নারাজ। এখন তারা জোরে সোরে চাইছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট যা দিয়ে তারা পূর্ব ভারতের প্রদেশগুলিতে যাবে। এটি চাইছে প্রতিবেশীর প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতার দোহাই দিয়ে। অথচ এমন সহযোগিতা কোন কালেই তারা প্রতিবেশীকে দেয়নি। ষাটের দশকে পাকিস্তান তার পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগের স্বার্থে ট্রানজিট চেয়েছিল। সেটিকে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু একটি অদ্ভুদ দেশের অদ্ভুত আব্দার বলে মস্করা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের নিরাপত্তার প্রতি এমন ট্রানজিট হবে মারাত্মক হুমকি। শুধু তাই নয়, একাত্তরে ভারতীয় ভূমির উপর দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পিআইয়ের বেসামরিক বাণিজ্য বিমান উড়তে দেয়নি। এমন কি শ্রীলংকার উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পাকিস্তানি বেসামরিক বিমানকে কোন জ্বালানী তেল না দেয়। বাংলাদেশের সাথেই কি আচরন ভিন্নতর? একাত্তরের যুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। ফলে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছিল বন্দরে মালামাল বোঝাই ও উত্তোলনের কাজে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। ছিল নিতান-ই দুঃসময়। বাংলাদেশের জন্য চট্রগ্রাম বন্দরটিই ছিল মূল বন্দর। এমন দুঃসময়ে অন্য কেউ নয়, ভারতের অতি বন্ধুভাজন শেখ মুজিব অনুমতি চেয়েছিলেন অন্ততঃ ৬ মাসের জন্য কোলকাতার বন্দর ব্যবহারের। তখন ভারত সরকার জবাবে বলেছিল ৬ মাস কেন ৬ ঘন্টার জন্যও বাংলাদেশকে এ সুবিধা দেয়া যাবে না। এটিকেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেছিল। প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতার বুলি তখন নর্দমায় স্থান পেয়েছিল।
প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের এমন অবন্ধু-সুলভ আচরন নিত্যদিনের। প্রতিবেশী নেপাল ও ভূটানের সাথে বাণিজ্য চলাচল সহজতর করার জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট চেয়েছিল বাংলাদেশ। নেপাল চেয়েছিল মংলা বন্দর ব্যবহারের লক্ষ্যে ভারতের উপর দিয়ে মালবাহি ট্রাক চলাচলের ট্রানজিট। ভারত সে দাবি মানেনি। অথচ সে ভারতই চায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রায় ছয় শত মাইলের ট্রানজিট। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, পারস্পারিক সহযোগিতা বলতে ভারত যেটি বুঝে সেটি হলো যে কোন প্রকারে নিজের সুবিধা আদায়। প্রতিবেশীর সুবিধাদান নয়। কথা হলো, বাংলাদেশের জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট যদি ভারতের জন্য নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করে তবে সে যুক্তি তো বাংলাদেশের জন্যও খাটে। তাছাড়া বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ভারতের সৃষ্ট ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে মুজিব নিহত হওয়ার পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্ব অনেক আওয়ামী লীগ ক্যাডার ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের সীমানে- তারা সন্ত্রাসী হামলাও শুরু করে। তাদেও হামলায় বহু বাংলাদেশী নিরীহ নাগরিক নিহতও হয়। ভারতীয় গুপ্তচর সংস'াগুলি তাদেরকে যে শুধু অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাই নয়, নিজ ভূমিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারেরও পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের টিকেট পিরোজপুর থেকে দুই-দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে গিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সত্তরের দশক থেকেই। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এসব সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া দূরে থাক তাদেরকে নিজভূমি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। এসব কি প্রতিবেশী-সুলভ আচরণ? অথচ সে ভারতই এখন দাবি তুলেছে আসামের উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। অথচ অনুপ চেটিয়া এখনও বাংলাদেশের জেলে। কাদের সিদ্দিকী ও চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় তার ভাগ্যে বাংলাদেশের মাটিতে জামাই আদর জুটেনি। ঘাঁটি নির্মান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের ভূমি থেকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার সুযোগও জুটেনি।
বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের ট্রানজিট বা করিডোর যে কতটা আত্মঘাতি সে বিষয়ে বিষদ আলোচনা হওয়া দরকার। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে ভারতের সাতটি প্রদেশ। এগুলো হলো, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম। এ রাজ্যগুলির জন্য এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এক). সমগ্র এলাকার আয়তন বাংলাদেশের চেয়েও বৃহৎ অথচ অতি জনবিরল।
দুই) সমগ্র এলাকাটিতে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ট। ফলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ নিয়ে সমগ্র উপমহদেশে যে রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তাপ এ এলাকায় সেটি নেই। ফলে এখানে বাংলাদেশ পেতে পারে বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী যা তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্ঠিত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিন). একমাত্র ব্রিটিশ আমল ছাড়া এলাকাটি কখনই ভারতের অন-র্ভূক্ত ছিল না, এমনকি প্রতাপশালী মুঘল আমলেও নয়। হিন্দু আমলে তো নয়ই। ভারতভূক্ত হয় ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে। ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া সেজন্যই এখানে ততটা সফলতা পায়নি। গণভিত্তি পায়নি ভারতপনি' রাজনৈতিক দলগুলি।
চার). সমগ্র এলাকাটি শিল্পে অনুন্নত এবং নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। অথচ এলাকাটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। ভারতের সিংহভাগ তেল, চা, টিম্বার এ এলাকাতে উৎপন্ন হয়। অথচ চা ও তেল কোম্মানীগুলোর হেড-অফিসগুলো কোলকাতায়। কাঁচামালের রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলিও এলাকার বাইরের। ফলে রাজস্ব আয় থেকে এ এলাকার রাজ্যগুলি বঞ্চিত হচ্ছে শুরু থেকেই। শিল্পোন্নত রাজ্য ও শহরগুলো অনেক দূরে হওয়ায় পণ্যপরিহন ব্যয়ও অধিক। ফলে সহজে ও সস-ায় পণ্য পেতে পারে একমাত্র উৎস বাংলাদেশ থেকেই। ট্রানজিট দিলে সে সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য।
পাঁচ) যুদ্ধাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু এ এলাকায় সে সুযোগ ভারতের নেই। ভারতের সাথে এ এলাকার সংযোগের একমাত্র পথ হলো পার্বত্যভূমি ও বৈরী জনবসতি অধ্যুষিত এলাকার মধ্য অবসি'ত ১৬ কিলোমিটার চওড়া করিডোর। এ করিডোরে স'াপিত রেল ও সড়ক পথের কোনটাই নিরাপদ নয়। ইতিমধ্যে শত শত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সেখানে প্রাণনাশ হয়েছে।
ছয়). নৃতাত্বিক দিক দিকে তারা মাঙ্গোলিয়। ফলে মূল ভারতের অন্য যে কোন শহরে বা প্রদেশে পা রাখলেই একজন নাগা, মিজো বা মনিপুরি চিহ্নিত হয় বিদেশী রূপে। তারা যে ভারতী নয় সেটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এ ভিন্নতায় যথেষ্ট। এ ভিন্নতার জন্যই সেখানে স্বাধীন হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৬০ বছর ধরে। ভারতীয় বাহিনীর অবিরাম রক্ত ঝরছে এলাকায়। বহু চুক্তি, বহু সমঝোতা, বহু নির্বাচন হয়েছে কিন' স্বাধীনতার সে যুদ্ধ না থেমে বরং দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। ফলে বাড়ছে ভারতের অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতা। সমগ্র এলাকা হয়ে পড়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনাম। আফগানিস'ানে একই রূপ অবস'ার সৃষ্টি হয়েছিল রাশিয়ার জন্য। সে অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতার কারনে বিশাল দেহী রাশিয়ার মানচিত্র ভেঙ্গে বহু রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ভারত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। তেমনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে এ এলাকার মানুষের অঙ্গিকার, আত্মত্যাগ এবং ক্ষমতাও নগণ্য নয়। ফলে এ সংঘাত থামার নয়। ভারত চায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ভারতের কাছে সংকট মুক্তির সে রাস্তা খুব একটা খোলা নাই।
ভারত ট্রানজিট চাচ্ছে পণ্য-পরিবহন ও আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দোহাই দিয়ে। বিষয়টি কি আসলেই তাই? মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের সমুদয় জনসংখ্যা ঢাকা জেলার জনসংখ্যার চেয়েও কম। এমন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পণ্যসরবরাহ বা লোক-চলাচলের জন্য এত কি প্রয়োজন পড়লো যে তার জন্য অন্য একটি প্রতিবেশী দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইতে হবে? যখন তাদের নিজের দেশের মধ্য দিয়েই ১৭ কিলোমিটারের প্রশস- করিডোর রয়েছে? এ করিডোর দিয়ে একটি নয়, ডজনের বেশী রেল ও সড়ক পথ নির্মাণ করা যেতে পারে। এলাকায় নির্মিত হতে পারে বহু বিমান বন্দর। ভারতের সে দিকে খেয়াল নাই, দাবী তুলেছে বাংলাদেশের মাঝ খান দিয়ে যাওয়ার পথ চাই-ই। যেন কর্তা ব্যক্তির তোগলোকি আব্দার। গ্রামের রাস্তা ঘুরে যাওয়ায় রুচি নেই, অন্যের শোবার ঘরের ভিতর দিয়ে যেতেই হবে। গ্রামের ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তায় পথ চলতে অত্যাচারি কর্তার ভয় হয়। কারণ তার কুর্মের কারণে শত্রুও বেশী। না জানি কখন কে হামলা করে বসে। একই ভয় চেপে বসেছে ভারতীয়দের মাথায়। সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারতে তারা চিহ্নিত হয়েছে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপে। জনগণ চায় ভারতীয় শাসন থেকে আশু মুক্তি। এ লক্ষে জানবাজি রেখে তারা যুদ্ধে নেমেছে। ফলে ভারতের জন্য অবস'া অতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। একদিকে কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ দমনে যেমন চার লাখেরও বেশী ভারতীয় সৈন্য অন-হীন এক যুদ্ধে আটকা পড়ে আছে তেমনি দুই লাখের বেশী সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত উত্তর-পূর্ব এ ভারতে। যুদ্ধাবস'ায় অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে যতই এ যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে ততই জোরদার হচ্ছে এ করিডোরের দাবী। তাই ভারত এখন দিশেহারা। বাংলাদেশে স্বৈরাচারি বা নির্বাচিত যে সরকাররই আসুক না কেন তারা তাদের যে কাছে যে দাবীটি অতি জোরালো ভাবে পেশ করছে তা হলো এই ট্রানজিটের দাবী।
এ বিষয়টি কি বুঝতে আদৌ বাঁকি থাকে, ভারত করিডোর চাচ্ছে নিতান-ই সামরিক প্রয়োজনে? আর বাংলাদেশের জন্য শংকার কারণ মূলত এখানেই। ভারত তার চলমান রক্তাত্ব যুদ্ধে বাংলাদেশকেও জড়াতে চায়। কারো ঘরের মধ্য দিয়ে পথ চললে সে পথে কিছু ঘটলো সহজেই সেটির দায়-দায়িত্ব ঘরের মালিকের ঘাড়ে চাপানো যায়। তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা ঠুকা যায়। কিন' বিজন মাঠ বা ঝোপঝাড়ের পাশে সেটি ঘটলে আসামী খুঁজে পাওয়াই দায়। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের অভ্যন-রে ৬ শত মাইলের করিডোর এবং সে করিডোরের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চায়। তখন এ পথে ভারতীয়দের উপর হামলা হলে বাংলাদেশকে সহজেই একটি সন্ত্রাসী দেশ রূপে আখ্যায়ীত করে আন-র্জাতিক মহলে নাস-ানাবুদ করা যাবে। প্রয়োজনে আন-র্জাতিক আদালতেও তোলা যাবে।
তাছাড়া তেমন হামলার সম্ভাবনা কি কম? ভারতী বাহিনী কাশ্মীরের মুসলমানদের উপর নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ ৬০ বছর যাবত। হাজার হাজার কাশ্মীরীকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে, নারীরা হচ্ছে ধর্ষিতা। এখনও সে হত্যাকান্ড চলছে অবিরাম ভাবে। জাতিসংঘের কাছে ভারত সরকার ওয়াদা করেছিল কাশ্মীরীদের ভাগ্য নির্ধারণে সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দিবে। জাতিসংঘ নিরাপত্ত পরিষদ এ্যাডমিরাল নিমিটস্ এর উপর দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস'তিও শুরু হয়েছিল। কিন' ভারত সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। নিছক গায়ের জোরে। এভাবে কাশ্মীরীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের পথে। অপর দিকে দেশটিতে মুসলিম হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়ীতে আগুণ, এমনকি মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয় অতি ধুমধামে ও উৎসবভরে। অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয়েছে হাজার পুলিশের সামনে দিন-দুপুরে। হাজার হাজার সন্ত্রাসী হিন্দুদের দ্বারা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি যখন নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও, বিরোধী দলীয় নেতা বাজপেয়ী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ সম্ভবতঃ আনন্দ ও উৎসবভরে ডুগডুগি বাজাচ্ছিলেন। এটি ছিল বড় মাপের একটি ঐতিহাসি অপরাধ। অথচ এ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভারত সরকারের কোন পুলিশ কোন অপরাধীকেই গ্রেফতার করেনি। আদালতে কারো কোন জেল-জরিমানাও হয়নি। ভাবটা যেন, সেদেশে কিছুই ঘটেনি। ভারতীয়দের মানবতাবোধ ও মূল্যবোধের এটিই প্রকৃত অবস'া। এমন একটি দেশ থেকে কি সুস'্য পররাষ্টনীতি আশা করা যায়?
দেশটিতে দাঙ্গার নামে হাজার হাজার মুসলমানকে জ্বালিয়ে মারার উৎসব হয় বার বার। সামপ্রতিক কালে আহমেদাবাদে যে মুসলিম গণহত্যা হলো সংখ্যালঘূদের বিরুদ্ধে তেমন কান্ড পাকিস-ানের ৬০ বছরের জীবনে একবারও হয়নি। বাংলাদেশের ৩০ বছরের জীবনেও হয়নি। কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন, ‘‘আফ্রিকার কোন জঙ্গলে কোন মুসলমান সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটা বিদ্ধ হয় আর সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও।” সুত্রঃ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রচনাবলী, প্রকাশক: ইসলামী ফাউন্ডেশন, ঢাকা। এমন চেতনা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একার নয়, এটিই ইসলামের বিশ্ব-ভাতৃত্বেও কথা। বাস-বতা হলো, বাংলাদেশে যেমন সেকুলারিজমের জোয়ারে ভাসা ভারতপনি' বহু ক্যাডার আছে তেমনি প্যান-ইসলামের চেতনায় উজ্জিবীতত বহু লক্ষ মুসলমানও আছে। সাক্ষাৎ চোখের সামনে তথা হাতের সামনে মুসলিম হত্যাকারি ও মসজিদ ধ্বংসকারি ভারতীয় সৈনিকদের কাছে পেয়ে এদের কেউ কেউ যে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না সে গ্যারান্টি কে দেবে? তাছাড়া বাংলাদেশীদের প্রতি ভারতীয় সৈনিকদের আচরণটাই কি কম উসকানিমূলক? গত ৫ বছরে ৪৬০ জন বাংলাদেশী নাগরিককে ভারতীয় বর্ডার সিকুরিটি ফোর্স তথা বিএসএফ হত্যা করেছে (সুত্রঃ সাপ্তাহিক হলি ডে, ঢাকা ১৮/০৭/০৮)। অথচ এমন বিশাল সংখ্যক নিরপরাধ মানুষের হত্যাকান্ড বিএসএফ পাকিস্তান সীমান্তে বিগত ৬০ বছরেও ঘটাতে পারিনি। এমনকি নেপাল বা ভূটান সীমান্তেও হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভারত সরকারের কাছে যে কতটা মূল্যহীন ও তুচ্ছ সেটি বোঝানোর জন্য এ তথ্যটিই কি যথেষ্ট নয়? বহুবার তারা বাংলাদেশের অভ্যন-রে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ইচ্ছামত গরুবাছুড়ও ধরে নিয়ে গেছে। বাঁধ দিয়ে সীমানে-র ৫৪টি যৌথ নদীর পানি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই। ফারাক্কা নির্মান করেছে এবং পদ্মার পানি তুলে নিয়েছে এক তরফা ভাবেই। সুরমা, কুশিয়ারা ও তিস-ার উপর উজানে বাঁধ দিয়ে এ নদীগুলোকে পানি শূণ্য করার ষড়যন্ত্র করছে। এদের মুখে আবার প্রতিবেশী মূলক সহযোগিতার ভাষা?
ভারতের এমন আগ্রাসী ভূমিকার কারণ ভারতবিরোধী চেতনা এখন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বেতনভোগী র’এর এজেন্ট দিয়ে এমন চেতনাধারিদের দমন অসম্ভব। সেটি ভারতও বুঝে। তাই চায়, বাংলাদেশ সরকার ভারত বিরোধীদের শায়েস-া করতে বিশ্বস- ও অনুগত ঠ্যাঙ্গারের ভূমিকা নিক। যেমনটি মার্কিন সরকার চাচ্ছে পাকিস-ান সরকার থেকে। দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী সীমান- ছেড়ে কামানের নলগুলি নিজ দেশের জনগণের দিকে তাক করুক। যেমনটি পাকিস্তানের স্বৈরাচারি পারভেজ মোশাররফ করেছে। ট্রানজিট দিলে তেমন একটি যুদ্ধাবস্থা বাংলাদেশে সৃষ্টি হতে বাধ্য। তখন দেশটি পরিণত হবে আরেক ইরাক বা আফগানিস্তানে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়-দায়িত্ব একান্তই ভারতের। কিন্তু ভারত সেখানে চরম ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। আর সে ব্যর্থতার দায়ভার চাপাচ্ছে বাংলাদেশের ঘাড়ে। ভারতের অভিযোগ, বাংলাদেশ তার নিজ ভূমিতে বিচ্ছিন্নবাদী ভারতবিরোধী গেরিলাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে। আরো গুরুতর অভিযোগ, এ কাজে তারা পাকিস-ানের আই.এস.আইয়ের সাথে সহযোগিতা করছে। অথচ এর কোন প্রমান তারা দেয়নি। সমপ্রতি তাদের বিদেশ নীতিতে আরেক উপসর্গ যোগ হয়েছে। ভারতের যে কোন শহরে বোমা বিস্ফোরণ হলে তদন্ত শুরুর আগেই ভারত সরকার বাংলাদেশীদের দায়ী করে বিবৃতি দিচ্ছে। যেন এমন একটি বিবৃতি প্রচারের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস'ত থাকে। কিন' এ অবধি এমন কাজে বাংলাদেশীদের জড়িত থাকার পক্ষে আজ অবধি কোন প্রমান তারা পেশ করতে পারিনি। এমন অপপ্রচারের লক্ষ্য একটিই। আর তা হলো, বাংলাদেশের দুর্বল সরকারকে ব্লাক-মেইল করা। এভাবে ট্রানজিটসহ ভারত যে সুবিধাগুলো চায় সেগুলি আদায়ে প্রচন্ড চাপসৃষ্টি করা। ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির এটিই হলো এখন মূল স্ট্রাটেজী। লক্ষ্যনীয় হল, সেদেশে বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের এ নীতিতে কোন পরিবর্তন নেই। কিন' বাংলাদেশের জন্য বিপদ বাড়বে যদি এ লড়ায়ে বালাদেশ ভারতের পক্ষ নেয়। পণ্যের পাশাপাশি সৈন্য ও সামরিক রশদ তখন রণাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। ফলে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রতিপক্ষ রূপে চিহ্নিত হবে বাংলাদেশ। আজ অবধি যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি তীরও ছুঁড়েনি তারাই পরিণত হবে পরম শত্রুরূপে। তখন সসস্ত্র হামলার লক্ষ্যে পরিণত হবে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা। তখন অশান্ত হয়ে উঠবে দেশের হাজার মাইল ব্যাপী উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত। অহেতুক এক রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ। কথা হলো, যে গেরিলা যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে বিশাল ভারতীয় বাহিনীই হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের মত দেশ কি সফলতা পাবে? তখন বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীগণ বন্ধু ও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবে এ এলাকায়। এ কারণেই বাংলাদেশের জন্য অতিশয় আত্মঘাতি হলো ভারতের জন্য ট্রানজিট দান।
আরো লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী এ এলাকাটিতে ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন হচ্ছে অতি দ্রুতগতিতে। মেঘালায়, মিজোরাম ও ন্যাগাল্যান্ড রাজ্যগুলি ইতিমধ্যেই পরিণত হয়েছে খৃষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে। খৃষ্টান ধর্ম জোরে সোরে প্রচার পাচ্ছে পাশ্ববর্তী প্রদেশগুলিতেও। ফিলিপাইনের পর সমগ্র এশিয়ায় এটিই এখন সর্ববৃহৎ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা। তাছাড়া ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের আচরণে এ ধর্মমতের অনুসারিরাও অতি অতিষ্ঠ। উগ্র হিন্দুদের কাছে হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মে দীক্ষা নেওয়া এক অমার্জনীয় অপরাধ। ফলে অতি জোরদার হচেছ খৃষ্টান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে একটি অখন্ড খৃষ্টান রাষ্ট্র নির্মানের ধারণা। পশ্চিমা খৃষ্টান জগতে এমন রাষ্ট্রের পক্ষে আগ্রহ দিন দিন বাড়বে সেটিই স্বাভাবিক। ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে আলাদা করার পিছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল সে যুক্তির প্রয়োগ তখন ভারতের বিরুদ্ধেও হবে। ফলে খৃষ্টান জগত এবং চীনের ন্যায় বৃহৎ শক্তিও নিজ নিজ স্বার্থে স্বাধীনতাকামীদের পক্ষ নিবে। এ অবস'ায় ভারতের পক্ষ নেওয়ার খেসারত দিতে হবে অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৃহৎ শক্তির বিরাগ ভাজন হয়ে। বাংলাদেশের জন্য সেটিও অতি বিপদজনক দিক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

