somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

-()()বাঘের অসুখ()()-সুনীল জানা

০১ লা জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৫:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক যে ছিল বাঘ।
তার গায়ে ডোরা ডোরা দাগ। কিন্তু হলে কি হবে, ডোরাগুলোই তো ডোবাল তাকে। দিব্যি মনের সুখে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বেচারা, হঠাৎ কি যে এক অলক্ষুণে অসুখ ধরলো তার! অমন বিদঘুটে বিতিকিচ্ছিরি অসুখের কথা বাঘের বংশে সাত-পুরুষেও কেউ শোনে নি।

সেদিন হয়েছে কি, আস্ত একটা হরিণছানা আর গোটা তিনেক বুনো খরগোশ দিয়ে সকালবেলান টিফিন সেরেছে বাঘ বাঘবাবাজি, তারপর মুখ ধুতে গেছে নদীর ঘাটে। ভরা পেটে তার তখন ফুর্তি দেখে কে! রোজ সকালে এমনি টিফিন জুটলে দু-দিনেই সে ফুলেফেঁপে কেঁদো হয়ে যাবে একেবারে। আর কেঁদো বাঘের কদর বেশি, সে কথা কে না জানে।

ভালো করে মুখটুখ ধুয়ে দু-এক ঢোক জল খেয়ে বাঘ উঠে আসতে যাবে, হঠাৎ নদীর জলে তার নজর পড়ল নিজের ছায়াটার দিকে। ব্যস-বাঘ অমনি থমকে দাড়িয়ে রইল তো দাড়িয়ে রইল, তার গলা দিয়ে আর জল গলতেই চায় না।

দাড়িয়ে দাড়িয়ে নিজের ছায়াটা দেখতে দেখতে বাঘের চোখে জল এসে গেল শেষকালে। ইশ-এ কী দশা হয়েছে তার! সারা গা-জোড়া অমন কুচকুচে কালো ডোরাগুলো যে আর চেনাই যায় না এমন বিচ্ছিরি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে দাগগুলো যে, সেদিকে তাকাতেই ঘেন্না করে। বনের জন্তু-জানোয়ারগুলো এই সেদিনও ফিরে ফিরে তাকাত তার দিকে, তার কালো ডোরাগুলোর জেল্লা দেখে চোখ ফেরাতেই পারত না। এখন তো সবাই টিটকিরি দেবে তাকে। তাছাড়া ভগবান না করুন, ডোরাগুলো যদি এমনি ফ্যাকাশে হতে হতে একদম মিলিয়ে যায় শেষকালে, তাহলে বাঘ বলে আর কেউ তাকে মানতেই চাইবে না। ডোরাকাটা না হলে আবার বাঘ কিসের! বেচারা বাঘ মনের দুঃখে মরেই যাবে তাহলে।

নাঃ, বাঘ আর ভাবতেই পারে না। নিশ্চয়ই ভারি শক্ত অসুখ করেছে তার, এখন ভালো করে চিকিচ্ছে করানো দরকার। তারপর বন ছেড়ে চলল শহরের দিকে। কত বড় বড় ডাক্তার-বদ্যি থাকে শহরে, বাঘের কামড়ে মরা মানুষও নাকি বেঁচে যায় তাদের ওষুধ খেলে। সুতরাং বাঘের আর ভাবনা কি!

শহরে ঢুকে প্রথমেই যে ডাক্তারখানা ফাঁকা। আস্ত একটা বাঘ দেখে ডাক্তারবাবু তো ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে কাঁপতে মুচ্ছো যান আর কি!

বাঘের অতশত দেখবার সময় নেই। ডাক্তারবাবুর সামনে থাবা গেড়ে সে হাঁউ মাউ করে বলতে শুরু করল, আমার জাত গেল, মান গেল, আপনি আমাকে দয়া করে বাঁচান ডাক্তারবাবু। আমি আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকব। বাঘের রকমসকম দেখে ডাক্তারবাবু বুকে বল পেলেন আর জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে তোমার? বাঘ অমনি ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে লাগলেন তার ছিষ্টিছাড়া অসুখের কথা, আর থামতেই চায় না। তারপর ডাক্তারবাবু কাগজ টেনে নিয়ে খস্ খস্ করে প্রেসক্রিপশান লিখলেন-
তিন ঠোঙা ভুসো কালি জলৈ গুলিয়ে প্রত্যহ স্নানের পর সেব্য।
ব্যস, আর যায় কোথা। প্রশক্রিপশানের তলায় ডাক্তারবাবুর তখনও সই করাই হয় নি, কিন্তু বাঘের আর তর শইল না। একলাফে প্রেসক্রিপশানটা টেনে নিয়ে দু’লাফে রাস্তায় রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তারপর পড়ি কি মরি করে ওষুধ খুঁজতে সারা শহর তোলপাড় করে ফেল বেচারা, কিন্তু কোথাও আর ওষুধ পাওয়া যায় না।


খুঁজতে খুঁজতে সব শেষে ভুষোকালি পাওয়া গেল এক মুদির দোকানে। বাঘের মনটা প্রথমে একটু খুঁতখুঁত করছিল। মুদির দোকানে পাওয়া যায় এ আবার কেমন ধারা ওষুধ কে জানে। তবে অতবড় গোফওয়ালা ডাক্তার যখন দিয়েছে, বাঘ আর আপত্তি করল না। তিন ঠোঙা ভুষোকালি কিনে নিয়ে মনের আনন্দে বনে ফিরে এল। তারপর তড়িঘড়ি স্নান করে, একটা গর্তের জলে তিন ঠোঙা কালি গুলে এ নিশ্বাসে খেয়ে ফেলল সবটা। ওয়াক্-থুঃ থুঃ, ওষুধটা কি বিচ্ছিরি খেতে রে বাবা। ওষুধ খেয়ে বাঘের রীতিমত গা গুলাতে লাগল। কোনোরকমে দাঁতে দাঁত চেপে বাঘ ভাবল, তা একটু বিচ্ছিরি তো হবেই। ওষুধ কি আর হরিণ ছানার মত খেতে হয় কখনও।

ঠিক তিন মিনিট পরেই বাঘের এমন জোরে পেট কামড়াতে আরম্ভ করল যে বেচারা আর সামলাতে পারে না। পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে খালি লুটোপুটি খায় আর বনবাঁদার কাঁপিয়ে বেদম চিৎকার করতে থাকে-হালুম রে, গেলুম রে, মলুম রে!

জীবনে কত ভালো মন্দ জন্তু-জানোয়ার খেয়ে সে বেমালুম হজম করে ফেলল, আর এই ক ফোঁটা ওষুধেই কিনা কাবু হয়ে পড়ল একেবারে। নেহাৎ যখন আর সামলানো গেল না, তখন বাঘ আবার লেজ তুলে দে দৌড়-সোজা শহরের ডাক্তারখানার দিকে।


বাঘকে অমন বেসামাল হয়ে দৌড়ে আসতে দেখে তো বেজায় ঘাবড়ে গেলেন ডাক্তারবাবু। আরে-কি হয়েছে, কি হয়েছে-বলতে না বলতেই বাঘ ততক্ষণে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ডাক্তারের পায়ের কাছে। পেটের যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল, হালুম হুলুম হুম-একেবারে মরে গেলাম ডাক্তারবাবু। আপনার তিন ঠোঙা ওষুধ খেয়েই পেটের সব নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে গেল বোধহয়। বাপরে বাপ, কি কড়া ওষুধ, রাস্তায় আমার আঠারো বার বমি হয়ে গেছে-বলতে বলতে উনিশ বারের বার এমন বমির বেগ এল যে, মাঝপথে বাঘের কথাই আটকে গেল।

বাঘের ওই আধখানা কথা শুনেই ডাক্তার চোখ কপালৈ তুলে আঁতকে উঠে বললেন, কী সব্বোনাশ! তোমাকে গায়ে লাগাবার ওষুধ দিলাম, আর তুমি কিনা খেয়ে বসে আছ। পেট তো কামড়াবেই এখন। পেটের আর দোষ কি। দাঁড়াও, আচ্ছা করে এক বোতল জোলাপ বানিয়ে দিচ্ছি, তাতেই পেট পরিস্কার হয়ে যাবে একেবারে। বাঘকে মস্ত এক শিশি জোলাপ দিয়ে বিদেয় করলেন ডাক্তারবাবু। ওষুধ নিয়ে ফিরতে ফিরতে বাঘ ভাবল, ছিছি-আগের ওষুধটা বোকার মত খেয়ে ফেলে কি ভুলই না করেছি। এবার আর ভুল হবে না। ভুল মানুষের-থুড়ি, বাঘের একবারই হয়।

রাস্তার ধারে নিরিবিলি দেখে একটা গাছের ছায়ায় বসল বাঘবাবাজি, তারপর জোলাপের বোতল খুলে ডোরাগুলোর গায়ে খুব যত্ন করে ওষুধ লাগাতে শুরু করল। বেশ ঠান্ডা আর দিব্বি আরামই লাগছিল প্রথমে। কিন্তু মুশকিল হল কি, ওষুধটা গায়ে যত শুকিয়ে আসতে লাগল, ততই কেমন আঠার মত চটচটে হয়ে সারা গা চুলকোতে চুলকোতে বাঘের সারা গায়ে রক্তারক্তি হয়ে গেল একেবারে। কী আপদ, চুলকোনি তবু কমতে চায় না। চুলকোনির চোটে ঝালাপালা হয়ে বাঘ আবার দৌড় মারল ডাক্তারবাবুর কাছে।

ব্যাগ হাতে করে তখন বাড়ি ফিরছেন ডাক্তার। পথের মধ্যে আবার বাঘের সঙ্গে দেখা। বাঘের কান্ড শুনেই ডাক্তারের মেজাজ গেল বিগড়ে। চোখ পাকিয়ে তিনি ধমকে উঠলেন, তোমার মত এমন আহাম্মক বাঘ আমি জন্মে দেখিনি বাপু। গায়ে লাগাবার ওষুধ খেয়ে ফ্যালো, খাওয়ার ওষুধ গায়ে লাগাও- অমন উল্টোপাল্টা বুদ্ধি নিয়ে কি করে বাঘগিরি করছো কে জানে। এই নাও, একটা সাবান দিচ্ছি, ভালো করে গায়ে মেখে চান করে ফ্যালো গে যাও।
চটেমটে ব্যাগ থেকে আস্ত একটা সাবান বের করে বাঘের দিকে ছুড়ে দিলেন ডাক্তারবাবু। তারপর হনহন করে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। বাঘটা খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। কি যে ভুল করেছে- তখনো সে ধরতেই পারছিল না।
দূর ছাই, এই মানুষগুলোর গোলমেলে ওষুধ বাঘের কি পোষায় কখনো! যাক গে, যা হবার হয়েছে, সাবানটা তুলে নিয়ে বাঘ এবার গুটিগুটি নদীর দিকে পা বাড়াল।
নদীতে চান করতে নেমেই বাঘের আর ফুর্তি ধরে না। একবার গায়ে সাবান মাখে আর একটা করে ডুব দেয়, ফি-বারেই গায়ের ধুলোবালি সাফ হয়ে তার ডোরাগুলো যেন ঝকমক্ করতে থাকে। খুশির চোটে বাঘ আর থামতেই চায় না। আশ মিটিয়ে সাবান মাখতে মাখতে সাবান যখন ফুরিয়ে গেল, ডুব দিয়ে দিয়ে বাঘের তখন সর্দি লাগার জোগাড়। বাধ্য হয়ে বাঘ এবার উঠে এল জল থেকে, মনের আনন্দে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিজের চকচক চেহারাখানা দেখতে লাগল একশোবার। দেখতে দেখতে বাঘের মনে কেমন একটা খটকা লাগল, অমনি নাক ঠেকিয়ে সে নিজের গা শুঁকতে শুরু করল।

ও হরি! বাঘের গায়ে তার সাতপুরুষের বোটকা গন্ধ গেল কোথায়? এ তো ঠিক মানুষগুলোর মত ভুরভুরে মিষ্টি গন্ধ বেরুচ্ছে তার গা থেকে। হায় হায়‍! মানুষ ডাক্তারের পাল্লায় পড়ে বাঘ কিনা মানুষ হয়ে গেল শেষকালে!
মনের দুঃখে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বাঘ তখন ঠিক মানুষের মত ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল-
হাঁউ মাঁউ কাঁউ
আমার গায়ে বোটকা গন্ধ
কোথায় পাঁউ!:((


এই গল্পটা যখন পড়ি তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। আব্বু এই বইটা এনে দেবার পর আমি দাম বাড়িয়ে বলেছিলাম.....এই সব কি এখন আমি পড়ি নাকি! অথচ এখন এত বড় হয়ে এইসব বই পড়তেও ভাল লাগে। :)

১৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×