গলির মুখে কয়েকটি দোকান। দুটো মুদি, একটা সেলুন, একটা ডিভিডির দোকান, পাশে একটা চা-স্টল। চায়ের দোকানটা ছোট, ভেতবে বসার জায়গা নেই। দোকানের মুখেই চুলোটা, কেতলীতে চা পাতা সহ পানি ফুটছে। পাশেই টিনের ট্রেতে চার-পাঁচটা কাপ, একটা চামচ, কনডেন্সড মিল্কের কৌটা।
দোকানদার খুব মনযোগ দিয়ে কেটলি থেকে পাঁচটা কাপে চা ঢালল - পরিমানমতো। চামচটা তুলে চিনির কৌটা থেকে দেড় চামচ চিনি আর দেড় চামচ কনডেন্সড দুধ নিয়ে কাপগুলোতে ছোটখাটো একটা ঝড় তুলল - চামচ নেড়ে। তারপর "চা নেন" বলে চামচটা তুলে রাখল।
দোকানের পাশে দাড়ানো পাচটা ছেলের একটা দল, হৈ হুল্লোড়ে ব্যস্ত। ডিভিডির দোকান থেকে হিন্দী গান ভেসে আসছে, তার তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে একজন, সামান্য দুলছে তার হালকা শরীর। একটি ছেলে কাপগুলো হাতে হাতে তুলে দিল, শেষ কাপটা নেয়ার সময় অরেকটা যেনো আনমনেই বললো - "একটা বেনসন!"
সিগারেটটা নিয়ে একহাতে চায়ের কাপ ধরে অন্যহাতে লাইটারটা ধরাতেই হুল্লোরমুখর ছেলের দল থেকে একটি কন্ঠ ভেসে এলো - "ও টুনির মা, তোমার টুনি কথা শোনে না ..."
সিগারেট ধরাতে ধরাতেই ছেলেটি 'টুনিকে' দেখার জন্য মাথা ঘুরিয়ে তাকালো - টুনি নয়, গত মাসেই যে পরিবারটি ছ'তলা বিল্ডিং এ উঠল, তারেদ বড় মেয়েটা, বয়স আঠারো-উনিশ। ছেলেটা দাত বের করে হাসল, তারপর সিগ্রেটটা হাতে নিয়ে সমান স্বরে চিৎকার করলো - "এই বেয়াদব, তোদের মা বোন নাই?" কিন্তু ছেলেদের চিৎকারে আর উচ্চ হাসিতে তার কণ্ঠ ঢাকা পড়ে গেলো।
গান চলতে লাগলো ....
ও টুনির মা, তোমার টুনি কথা শোনে না
দিনে রাতে মিসকল দেয় কল করে না
টুনি স্কুলে যাইবো, টুনি বারান্দায় আইবো
............................ পরাণ জুড়াইবো ।।
গানের সাথে সাথে চায়ের কাপে চুমুক আর বিচিত্র অঙ্গ ভঙ্গির সাতে সিগারেটটা হাত বদল হতে লাগলো। প্রত্যেকেই দুটো তিনটে টান দিয়ে সিগারেট ছেড়ে দিচ্ছে পাশের জনকে। আরেকটি ছেলে গানের সাথে গলা মেলানো থামিয়ে বললো - "মামার পকেট ভারী মনে হৈতাছে, তাইলে বিড়ি একটা ক্যান? আরেকটা লও, জমায়া টানি।"
যাকে মামা বলা হলো সে হাসল, "পরে খাইস। বিশ টাকাতো এখনি খাওয়াইলাম।"
আরেকটি রিকশা চলে গেলো সামনে দিয়ে - তাতে দুটো মেয়ে বসা। ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া - এবারও প্রথম ছেলেটি চিৎকার করলো - "ঢাকা বেশ্যাবিদ্যালয়!" - সাথে সাথেই বাকীরা হো হো করে হাসতে লাগল। এর মাঝেই একটা সিএনজি ঢুকল গলিতে - ভেতরে একজন পুরুষ ও একজন নারী ঘনিষ্ট হয়ে বসে আছে - প্রথমে উকি দিয়ে দেখার চেষ্টা এবং তারপর তৃতীয় একটি ছেলে চেঁচালো - "শক্ত কইরা ধর, ছাড়িস না!" এই ডায়লগগুলোর একটা কমন বৈশিস্ট্য আছে - একে খুব সহজেই অস্বীকার করা যায়। ' উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে উত্যক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে ' - এ ধরনের অভিযোগে সহজেই পাশের বন্ধুটিকে দেখিয়ে বলা যায় - "ওরে বলছি!"
দূর থেকেই দেখা গেলো একটা রিকশা আসছে। হুড তোলা বলে ভেতরের একমাত্র মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে না। প্রথম ছেলেটি একবার জানতে চাইল, "ওইটা কে রে?" - উত্তর এল না। ততক্ষনে রিকশাটি সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল।
কোন অভিবাদন ছাড়াই চলে যাবে - এ ব্যাপারটা বোধহয় ছেলেটির সহ্য হলো না। সে একটু উচ্চ স্বরেই ডাকলো - "এই খালি, একা নাকি?"
রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো কিন্তু গতি কমলো না। ছেলেরা হাসলো - হো হো হো হো হো ...
কিন্তু একটু সামনে গিয়েই রিকশাটা থেমে গেলো। রিকশাওয়ালা নেমে রিকশা ঠেলে পেছন দিকে এগোতে লাগলো। এবার ছেলেগুলো একটু থমকালো, তাই একটু নড়েচড়ে নিজেদেরকে ঘিরে কথা বার্তা চালিয়ে যেতে লাগলো - উদ্দেশ্য মেয়েটা ডাকলেও উপেক্ষা করা।
রিকশাটা তাদের বরাবর এসে দাড়ালো, হুড ফেলে দিয়ে মেয়েটি গলা বাড়িয়ে ডাকলো - "এই বাবু!"
বাবু নামের প্রথম ছেলেটির মাথায় যেনো বজ্রপাত হলো - সর্বোনাশ! কিন্তু ঘুরে দাড়ানোর সাহসটুকু হলো না। যে ছেলেটা সবাইকে চা খাওয়ালো সে নিচের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বললো - "বাইব্যা! তোর বোন!"
বাবু কথা বললো না। বাবুর বোন আবার ডাকলো - "এই বাবু! শুনে যা, বাসায় চল আমার সাথে!"
বাবু ঘুরে বলল, "তুই যা না... আমি আসতেছি!"
কিন্তু বাবুর বোন দাড়িয়ে থাকলো, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ভাব, যেনো এ সমস্যার সমাধান না করে সে একপাও নড়বে না !
এটি একটি গল্প। বাস্তবের সাথে কোন মিল নেই
আমার ব্লগ
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


