ইউনিতে এডমিশনের সময় একটা ছেলের সাথেই শুধু আমার পরিচয় হয়েছিল। দুজন মিলে একসাথে সব ফরমালিটিজ গুলো শেষ করেছিলাম। তারপর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ক্লাস শুরু হলো। প্রথম ক্লাসেই ছেলেটি আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বললো
“এই কেমন আছ? তুমি নিশ্চয় আমার নাম ভুলে গেছ,তাই না? আমিও তোমার নাম ভুলে গেছি।”
আমি যথাসম্ভব মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললাম “কেমন আছ শিপলু?”
একেবারেই থতমত খেয়ে গেল ছেলেটি। তারপর দুঃখ প্রকাশ করে আমার নাম জানতে চাইলো। আমার মাথায় কি ভুত চাপলো জানি না,আমি কিছুতেই তাকে আমার নাম বললাম না। সে ক্লাসের পর ক্লাস আমার কাছে একি আবদার করে। একে ওকে জিজ্ঞেশ করে। কেউ আমার নাম জানে না তখনো। আমি মুখ টিপে টিপে হাসি আর অকারনেই তার নাম ধরে ডাকি।
একদিন ক্লাসে বসে আছি। যথারিতী সে আমার পাশে, মুখ কালো করুন সুরে বললো
“বলনা প্লীজ?”
আমি শুধু হাসি। তারপর সে আমার পাশের ছেলেটাকে আমার নাম জিজ্ঞেশ করলো। কালো মতন হাসি মুখের ছেলেটা আমার খাতা দেখে ওকে আমার নামটা বলে দিল। আমারতো গেল মেজাজ খারাপ হয়ে। খেলা ভঙের বেদনায় আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কষে ছেলেটার পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিলাম। হতভম্বের মতন হা করে ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি ওকে কেন আমার নাম বললে?”
“একজন নাম জানতে চাইল,তাই বললাম। এটা কি অপরাধ হয়ে গেল নাকি?”
এটাই ছিল আমার সাথে তার প্রথম পরিচয়। গায়ের রঙ কালো হলেও দেখতে মন্দ না ছেলেটা। আর খুব সুন্দর করে কথা বলে। সুন্দর করে মানে কিছুটা ক্যালকেশিয়ান বাংলা। তবে এসব কোনো কিছুই তখন আমার চোখে পড়ছিল না। তার কয়েকদিন পর আবিষ্কার করলাম কিভাবে কিভাবে যেন ক্লাসে সে প্রায়ই আমার পাশে বসে। তারপর বুঝতে পারলাম আসলে এটা হলো একি লজিক মেনে চলার ফল। ক্লাসে ঢুকেই আমি প্রথমে তাকাতাম উপরের দিকে। তারপর পেছনের দিকে। মানে পেছনের সারির ফ্যানের নিচের সিট ছিল আমার পছন্দের। ছেলেটারও তাই। এভাবেই একসাথে পথ চলার শুরু। ছেলেটা আর কেউ নয়। ব্লগার সব্যসাচী প্রসূন।
একটু পেছনে যাই। প্রথম ক্লাস। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছিল। আমি পরিচয় দিয়ে মাত্র বসলাম। পেছনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে বললো জয়া দাশ,চিটাগাং কলেজ। তাকিয়ে দেখি অপরিচিত মুখ। অথচ আমরা একি কলেজে পড়েছি।আরেকবার নিজের পরিচয় দিয়ে পরিচিত হলাম। চট্টগ্রাম থেকে এত দূরে গিয়ে চট্টগ্রাম শুনলেই কেমন যেন আপন মনে হত। তারপর কিছু সময় খুব দ্রুতই কেটে গেছে। ফ্যানের নিচে বসতে বসতে তখন আমার আর প্রসূনের মাঝে মোটামুটি একটা ভালোই বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছিল।আর আমাদের সাথে আরেকজন ছিল। প্রসূনের স্কুলের বন্ধু আরাফাত। প্রসূন আর আরাফাত দুজনেরই মেয়ে মহলে বেশ ভাল সাড়া ছিল। ইউনিতে শুরুর দিকে বেশিরভাগ ইমেজ গড়ে উঠত এসাইনমেন্টকে কেন্দ্র করে। এরা দুইটাই আঁতেল ছিল। তাই সবসময় দেখতাম কোনো ক্লাসে এসাইনমেন্ট থাকলেই এই দুইটাকে ঘিরে ব্যাপাক ভীড়।আর ওদের মুড দেখলেই বোঝা যেত,যতটা না এসাইনমেন্ট করার জন্য করা তার চেয়ে বেশি মেয়েদের এই ক্ষনিকের ভীড়ের মধ্য মনি হবার জন্যই এত আয়োজন।
একদিন আমরা বসে আছি। হঠাৎ জয়া আমাদের সামনে এসে বললো “প্রসূন,আজকে তুমি আমাকে আইসক্রিম খাওয়াবে।” প্রসূন আনন্দে আত্নহারা হয়ে বললো “আচ্ছা। ক্লাস শেষে খাওয়াব।” ঠিক এই সময় আরাফাতের মাথায় কুবুদ্ধি চাপল। সে গিয়ে ক্লাসের সব মেয়েকে বললো প্রসূন আজকে জয়াকে আইস্ক্রিম খাওয়াবে। ব্যস আইসক্রিমের প্রতি মেয়েদের আজন্ম দূর্বলতার কথা কে না জানে,সব কয়টা মেয়ে মিলে প্রসূনকে চেপে ধরল আইসক্রিমের জন্য। প্রসূনের ঠোঁটে তখন শুকনা হাসি। খড়ার উপর মরার ঘা হলো আরাফাত, এই দুঃসময়ে প্রসূনের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সদম্ভে ঘোষনা করলো প্রয়োজনে সে টাকা ধার দিবে। এইবার প্রসূনের আত্নসন্মান বোধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, এত বড় অপমান, আর মনে মনে আরাফাতকে বললো এক মাঘে শীত যায় না। আর আমরা দল বেধে রওনা হলাম আইসক্রিম খেতে। সেদিন থেকেই প্রসূন আর জয়ার সম্পর্কের মাঝে একটা অন্যরকম গন্ধ পেতে শুরু করে সবাই। আর এই গন্ধের সমাপ্তি টানতে ওরা সময় নিয়েছিল মাত্র ৫০ দিন। আমাদের ব্যাচের দ্রুততম জুটির অঘোষিত স্বীকৃতিটা ওরা আদায় করে নিল।
প্রসূন আর আমি একি সাথে ছিলাম ইউনির পাঁচ বছর। ততদিনে সময়ের সাথে সাথে হয়তো বন্ধুত্ব অনেক গভীর হয়েছে। কিন্ত বন্ধুত্ব ব্যাপারটা এমন কিনা ঠিক জানি না,কাছে থাকলে ঠিক ফিল করা যায় না। কিন্ত দূরত্ব একটু বাড়লেই অদ্ভুত অদৃশ্য টানটা টের পাওয়া যায়। ইউনির পাট চুকিয়ে সবাই যখন একে একে বিদায় নিচ্ছিল, মনে আছে এখনো খুব ভালো ভাবে, খুব শক্ত অদৃশ্য সেই টানের কথা। তবে মজার ব্যাপার হলো খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি আমাদের। সৌভাগ্যই বলতে হবে,পাশ করে বের হবার এক মাসের মধ্যেই চাকরী হয়ে গেল। আমি, প্রসূন আর আরাফাত, একি অফিসে। সে কি আনন্দ আমাদের। আবার একসাথে থাকতে পারবো কখনো ভাবিনি। তাই ইউনি জীবনটা যেন শেষ হয়ে আবার নতুন করে শুরু হলো।
ও মাঝ খানে আসল কথা বলতে ভুলেই গেছি। ইউনির প্রথম মাসের মধ্যেই সবচেয়ে দ্রুততম জুটির সাথে সাথে ইউনি শেষ হবার সময় দীর্ঘতম জুটির খেতাবটাও ছিনিয়ে নেয় প্রসূন আর জয়া। এরপর আরো একটা বছর। তারপর ওদের বিয়ে হয়। বিয়ের পরেও কিছুদিন প্রসূনকে আমাদের সাথে থাকতে হয় জয়ার চাকরী সংক্রান্ত ঝামেলায়। একসময় জয়ার ঢাকায় চাকরী হয়। প্রসূন নতুন করে সত্যিকারের নিজের সংসার শুরু করে। আমি আর আরাফাত দুজন মিলে সব কিছু গুছিয়ে দিয়েছি। ওদেরকে বাসায় তুলে দিয়ে যখন আমরা ফিরছিলাম,আরাফাত আমাকে বললো
“ছয় বছর অনেক লম্বা সময়, তাই না?”
আমি আনমনে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কাটতে কাটতে বললাম “হমম্ অনেক লম্বা সময়।” এই অনেক লম্বা সময়ের অর্ন্তনিহিত অর্থ নিয়ে আমরা আর কখনই কথা বলিনি। তবে অদৃশ্য সেই টানটা আরো একবার অনুভূত হলো যেন সেদিন।
এইবার মোদ্দা কথায় আসি। আমি বেশি কথা বলা প্রজাতীর মানুষ। অল্প কথায় কিছুই বলতে পারিনা। এই পোষ্টটা লেখার পেছনে একটা কারন আছে। কয়েকদিন ধরে আবারো চিন চিন ব্যথা অনুভব করছি। সাথে একটা অন্যরকম টেনশন। চাপা উত্তেজনাও বটে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু সময় নিয়ে ভাবি,কি কি করবো। কিংবা কি কি করা উচিত। কতটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কতটা নিজে থেকেই করবো? মাঝে মাঝে এটা ভাবতেই অবাক লাগে, আমাদের প্রসূন বাবা হবে। প্রসূনের অনাগত সন্তানের কারনে বুকের চিন চিন ব্যাথাটা অন্যরকম আনন্দ হয়ে এসেছে। আমি আসলে ঠিক জানি না প্রসূনের অনুভূতিটা কি। সেটা বোঝার কোনো রকমের চেষ্টাও করছি না। ওর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন,উৎকন্ঠা এবং একই সাথে আনন্দের সময়ে ওর পাশে থাকতে পারবো, এটা ভেবেই ভালো লাগছে। ওই ছোট্ট শিশূটির আলোর কাছাকাছি আসার অপেক্ষাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করে আবার যেনো নিজেদেরকেই আবিষ্কার করা।ঠিক একি সময় নুশেরা আপুর গান ও গল্পের চরিত্রেরা পড়তে পড়তে মনে পড়ে গেল অঞ্জনের সেই গান বন্ধুত্বের বয়স বাড়ে না।
পুরোটা লেখাটা পড়ে স্মৃতিচারন মূলক পোষ্ট মনে হতে পারে। স্মৃতিচারন করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। সেটা অন্য আরেকদিন অন্য কোনো পোষ্টে করা যাবে। আসুন সবাই প্রসূনের সামনের দিনগুলোর জন্য প্রার্থনা করি। আর প্রার্থনার শুরুটা নাহয় আমিই করে দিলাম এটাকে একটা প্রার্থনামূলক পোষ্ট হিসেবেই ট্যাগ করে।
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।