কোন এক ছুটিতে আরাফাত বাড়ি থেকে ফিরেই দেখি শুধু অস্থির ভাবে ছুটোছুটি করতাছে। কোথাও স্থির হয়ে বসে না। চোখে মুখে সারাক্ষন একটা চোর চোর ভাব। জিজ্ঞেশ করলে কিছু ঠিক মতন বলেও না। আলাদা আলাদা ভাবে কয়েকবার কয়েকজন তারে জিগাইল কি হইছে। কোনো কথা নাই। মোটামুটি সন্দেহজনক চলাফেরায় আমরা বুঝতেই পারতেছিলাম কেইস খারাপ। ইয়ে দিল কি মামলা হ্যায়। আর যাহাতক মামলা দিলকি সেখানেই হারুনের ভেল্কি। তাই আমরা হারুনের উপর দায়িত্ব ছাইড়া দিইয়া নিশ্চিন্তে নিজেদের কাজে ব্যস্ত হইয়ে গেলাম। অবশেষে আরাফাত হারুনের একটা একান্ত নাতিদীর্ঘ বৈঠকের পর আমাদের সবার সামনে হারুন একটা বক্তব্য রাখল, যার সারমর্ম হইল আরাফাত হ্যাজ ফলেন। যথারীতি আমরা লাফ দিয়া উঠলাম ছবি কই ছবি কই? বেচারা মুখ কালো করে বললো একটা গ্রুপ ছবি আছে শুধু। সেই গ্রুপ ছবি থেকে কাইটা একজনরে আলাদা করা হইল। সব মিলাইয়া মায়াবি চেহারা আর লম্বা চুল। তাতেই আরাফাত শেষ। কিন্তু ঘটনা হইল মাত্র শুরু। মানে আরাফাত শুধু দেখেই ফল করছে। কোনো অগ্রগতি নাই, কোনো বাক্য বিনিময়ও না। আর এত দূর থেকে অগ্রগতি কন্ট্রোল করার কোনো উপায়ও নাই। সিলেট আর গাইবান্ধা। পরের ছুটি পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আরাফাতের আর কোনো উপায় ছিল না। ইত্যবসরে হারুন ওর জারিজুরি শুরু কইরা দিছিল। এইটা সেইটা কুবুদ্ধি দিয়ে আরাফাতের মাথা খারাপ কইরা দিচ্ছিল। একটা ছোট নমুনা দিই। সে আরাফাতকে বললো, “তুই একটা চিঠি লেখ।তুই ওকে কতটুকু ভালোবাসোস এইটা লেখ।” আরাফাত জিজ্ঞেস করে সে কি লিখবে? হারুনের উত্তর “আকাশের বিশালতার যেমন কোনো সীমা পরিসীমা নেই,বাতাসের স্পর্শের অনুভূতি যেমন বর্ণনাহীন, ফুলের সৌরভের মধুময়তা যেমন মায়াময়, চরম তেষ্টায় এক গ্লাস রুহাফজা যেমন শান্তির পরশ, গরম কালের এসি যেমন, শীতকালের গরম পানি দিয়া গোসল যেমন…………ঠিক তেমন………” উফ, সে এক ভয়াল বুদ্ধি ছিল। ভাগ্যিস আরাফাত এইগুলা এপ্ল্যাই করে নাই। ঠান্ডা মাথায় পরের ছুটিতে বাড়িতে গিয়া ওই মেয়ের সাথে দেখা সাক্ষাৎ কইরা সব কিছু খুব সুন্দর কইরা ম্যানেজ করছে। দেখতে না দেখতেই ছুটি ফুরুৎ। সিলেট আইসা ব্যাচারার মন খারাপ। তখনো মোবাইল মানিব্যাগের মতন পকেটে পকেটে ছিল না। আমরা কইলাম একখান মোবাইল কিন। নইলে কেম্নে চলবে? কয়েকদিনের মধ্যেই কোনো এক সন্ধ্যায় আরাফাত গিয়া কিন্না নিয়া আসলো ওর জীবনের প্রথথম মোবাইল। যতদূর মনে পরে বাংলালিঙ্কের সেই মোবাইল সেটের প্যাকেজটা। ওই প্যাকেজ দিয়া শুরু। এর পর বাংলাদেশের মোবাইলের কোনো প্যাকেজ বাদ রাখে নাই। এর পরে আসলো ডিজুস। ওইটাও কিনলো। কয়দিন বাদে কিনলো সিটিসেল, অফার ছিল সিটিসেল থেকে সিটিসেল ফ্রী। অবশ্যই দুইটা মোবাইল কিনছিল। এর কয়েকদিন পর ডিজুস টু ডিজুস ফ্রী। সো ব্যাক টু ডিজুস। এর পরে একটেল জয়, উফ । এমনো দিন গেছে প্রায় প্রতিদিন ঘুম ভাঙতো আরাফাত আর প্রসূনের (ব্লগার প্রসূন)মারামারিতে। দুইজন পত্রিকায় প্রথমেই খুঁজতো মোবাইলের নিত্যনতুন অফার। আর কার ব্যবহৃত অফারে ভাল সুবিধা দিচ্ছে এই নিয়া মারামারি।
যাই হোক আবার একটু পেছনে যাই। তো মোবাইল কিনে এনে মাত্রই আরাফাত উতলা হয়ে উঠল তার প্রেমিকার সাথে কথা বলতে। কিন্ত তার প্রেমিকার কোনো মোবাইল নেই। আছে প্রেমিকার বাপের। এখন কি করা যায়? কুবুদ্ধি আইসা পড়ল মাথায়। কোনো একটা মাইয়ারে দিয়া ফোন করাইতে হবে, কইতে হবে ওর বান্ধবী। কিন্ত এই রাইতে কোনো মাইয়া পাওয়া যাইব কই? সকাল হইলে না হয় আমাগো ক্লাসের কাউরে দিয়া ফোন করানো যাইব। কিন্ত আরাফাতের উতলা অবস্থা দেইখা কার মাথাত্তে যে কুবুদ্ধি আইলো অহন মনে পরতাছে না (মনে হয় আমার মাথাত্তে

) বুয়ারে দিয়া ফোন করা। আমাগো বুয়া মুটামুটি ইসমাট আছিল কথা বার্তায়, তাই সবতে মিল্লা রাজী হইয়া গেল। তো বুয়ারে ট্রেনিং দেয়া হইল কি কি কইতে হইব। কওয়া হইল যে এক আধ বুইড়া ব্যাটা ফোন ধরব। তারে খুব সুন্দর কইরা কইতে হইব “স্লামালাইকুম, তমা কি বাসায় আছে? আমি তমার বান্ধবী।” অহন নাম জিগাইলে কি কইব এইটা নিয়া আরেক ক্ষ্যাপা। শেষ পর্যন্ত ঠিক হইল বেশি মিছা কথা কওয়নের কাম নাই, বুয়া নিজের নাম কইব। তো ফাইনাল ট্রায়াল। “হ্যালো স্লামালাইকুম, তমা কি বাসায় আছে? আমি তমার বান্ধবী, নসিমন (বুয়ার নাম ভুইলা গেছি।) তমাকে কি একটু ফোনটা দেয়া যাবে? জ্বী আমার বাসা প্রফেসরস কলোনীতে”।" যাই হোক, ফোন নাম্বারে ডায়াল করে রিং শুরু হতেই বুয়ার হাতে ফোন দিয়ে খুব উদ্ববিগ্ন হয়ে আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরেই শুন্তে পেলাম এক কর্কশ চিৎকার। “হ্যালু, তমা আছেনি? আমি নসিমুন।” আরাফাতের চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ঝট করে বুয়ার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে লাইন কেটে দিল। আর ইত্যবসরে আমরা খুব দ্রুত এলাকা ত্যাগ করলাম।
আরাফাত আর হারুন দুইজনের মধ্যে একটা চরম বৈপরিত্য ছিল। হারুন ছিল হিন্দী মুভির জ্ঞানের ব্যাপারে মুকুটহীন সম্রাট, আর আরাফাত হিন্দী কিছু বুঝে না। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে হারুন একটা করে নতুন হিন্দী মুভির সিডি নিয়ে আসতো (যদি না দেখা মুভি পাইতো আর কি)। শুরুর দিকে আমরা সবাই একসাথে মুভি দেখতে বসতাম। পরে বুঝতে পারলাম বেশির ভাগই অখাদ্য। তাই পরে আমরা ফিল্টার করে দেখতাম। যাই হোক। সমস্যা হত আরাফাত কে নিয়ে। মুভির খুব সিরিয়াস মুহুর্তে সে জিজ্ঞেস করত “কি হলো কি হলো?" হারুন খুব আগ্রহ নিয়ে মুভি পস করে ওকে বুঝাইয়া দিত। খুব বিরক্তিকর ব্যাপার। সবচেয়ে বিরক্ত লাগতো কমেডি মুভি দেখতে বসলে। হাসি থামাইয়া আরাফাতরে বুঝানো লাগতো কি হইছে। কোনো কারনে ও কিছু বুইঝা যদি হাসতো, আমরা খুব সন্দেহের দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাইতাম। ও আরো ভ্যাব্লার মতন হাসতো । তখন বহুব্রীহির কথা মনে পরত। মামা (আলী জাকের) মুভি দেখত, কাদের আর রহিমার মা মাটিতে বসা। আর ডাক্তার (আফজাল) মামার সাথে বিছানায়। হাসির দৃশ্যে মামা আর ডাক্তার হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। কাদের আর রহিমার মা মুখ গোমড়া করে বসে থাকে। মামা জিজ্ঞেস করে “কিরে তোরা হাসিস না কেন? এত হাসির মুভি।” কাদের বলে মামা আমরাতো কিছু বুঝি নাই। মামা বলে "তাওতো ঠিক না বুঝে হাসবি কি করে।" তখন মামা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে ডাক্তার তুমি কিছু বুঝেছ। ডাক্তার হাসতে হাসতে মাথা দুদিকে নেড়ে বলে না বুঝিনি। যাই হোক, আস্তে আস্তে আরাফাত হিন্দী একটু একটু শিখতে শুরু করলো। অবধারিত ভাবে কয়েকটা হিন্দী মুভি দেখার পর সে যেই বাক্যটা বুঝতে শিখল তা হলো ম্যায় তুমছে পেয়ার করতা হু (হিন্দীর এই কারতা আর কারতি নিয়া আমার এখনো ঝামেলা হয়)। তো নিজের কৃতিত্বে গর্বে বুক দুই হাত ফুলিয়ে সে আমাদের ক্লাসের এক মেয়েকে তার শেখা হিন্দী কথাটা বলতে গেল (ফাজলামো করে),এবং বলেও ফেললো। সব কিছু ঠিক ছিল। হঠাৎ কি যেন হলো, ওর মুখ দিয়ে আরেকটা বাক্য বের হয়ে গেল। সেইটা ছিল তু মুঝে সব কুছ দেখা দে (এই বাক্যের মানে কি তখনো সে জানত না)। আশে পাশের সবাই মোটামুটি হাসতে হাসতে শেষ। আরাফাত তখনো বুঝতে পারছিল না কি হয়েছে। বরাবরের মতন হাসি থামিয়ে ওকে বুঝিয়ে দিতে হলো। লজ্জা পেলে আরাফাতের মুখ চোখ কান সব লাল হয়ে যায়। সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম।
ক্রমশ চলবে
[ লিখতে লিখতে এতা যে কখন একটা সিরিজ হয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। তবে সবাইকে এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে এই সিরিজের আগের কোনো পর্ব না পরেই যে কোন পর্বের পুরোটাই বুঝতে পারবেন। এখানে বর্ণিত সব চরিত্রই আমার খুব কাছের বন্ধুরা। তার পরেও যারা আগের গুলো পড়তে আগ্রহী তাদের জন্য আগের পর্বগুলোর লিঙ্ক দিয়ে দিলাম।
Click This Link
Click This Link
Click This Link
]
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:০৩