সন্ধ্যা নামার পর থেকেই ভিন্ন এক রূপ ধারণ করে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। রাজ্যের সমস্ত রূপ যেন নেমে আসে এই স্টেডিয়ামে। এ যেন অন্য এক বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। আর এমনই আলো ঝলমলে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করলো বিশ্বকাপ ক্রিকেটের দশম আসর। আগের বিশ্বকাপগুলোতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বলতে যা বুঝায় সেরকম কিছুই ছিলনা। তাইতো প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে সংযোজন হওয়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সফল করতে পারবেতো বাংলাদেশ সে রকম অজানা সংশয় ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সব সংশয় আর শংকাকে পেছনে ফেলে নতুন এক বিশ্বকাপ যেন উপহার দিল বিশ্ববাসীকে। সত্যিই বিশ্বকাপের সূচনা সংগীতের মত “ ও পৃথিবী একবার এসে বাংলাকে নাও চিনে” “ ও পৃথিবী একবার এসে বাংলাদেশ নাও চিনে”। সত্যিই নতুন এক বাংলাদেশের রূপ যেন দেখল বিশ্ববাসী। এ যেন চির চেনা বাংলার রূপ নয়, এ যেন ফাগুনের আগুন ঝরানো দিনে ফুল ,ফল আর পত্র-পল্লবে সাজানো এক অন্য বাংলাদেশ।
সন্ধ্যা ৬ টা ২০ মিনিটে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু জমকালো এই অনুষ্ঠানের। লাল-সবুজের পোশাক পরে শিল্পীরা যখন জাতীয় সংগীত পরিবেশন করছিলেন তখন পুরো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম যেন লাল-সবুজের আলোয় ভাসছিল। এ যেন বাংলাদেশের অন্য এক রূপ। এরপর বিশ্বকাপের আগের নয়টি আসরের কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত দেখানো হয় জায়ান্ট স্ক্রিনে। এরপর সেই সূচনা সংগীত। মিলা,কনা ,এলিটা ,বালাম, হৃদয় খান,অর্নব এবং ইবরার টিপু মিলে পরিবেশন করেন “ও পৃথিবী একবার এসে বাংলাকে দেখে যাও” গানের তালে তালে ছেলে মেয়েদের নৃত্য যেন অন্য মাত্রা যোগ করে অনুষ্ঠানে ।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে বোধহয় ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে বাংলাদেশের রিকশা। দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান বাহন এই রিকশায় চড়ে যখন বিশ্বকাপের ১৪ অধিনায়ক মাঠে প্রবেশ করেন তখন বোধ হয় বাংলাদেশের রিকশাও যেন পৌঁছে গেল বিশ্ব দরবারে। একে একে ১৩ অধিনায়ক মাঠে প্রবেশ করার পর সবার শেষে মাঠে প্রবেশ করেন টাইগারদের দলনেতা সাকিব আল হাসান। আর এতেই পুরো গ্যালারি যেন নেচে ওঠে। গ্যালারিতে উপস্থিত ত্রিশ হাজার দর্শক যেন জানিয়ে দিলেন এগিয়ে যাও সাকিব, বাংলাদেশ তোমাদের সাথে। মাঠের মাঝখানে স্থাপিত মঞ্চে ১৪ অধিনায়ককে সামনে রেখে গান গেয়ে শোনান ভারতের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী সনু নিগাম।
সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিসিবি সভাপতি মোস্তফা কামালের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এরপর একে একে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, আইসিসি সভাপতি শারদ পাওয়ার , অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধন ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন ঘোষণার সাথে সাথে স্টেডিয়ামের সাথে লাগোয়া শিল্প ব্যাংক ভবনে টানানো পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয় বিশ্বকাপ ট্রফি। এরপর চলে ঐ পর্দায় প্রতীকি ক্রিকেট খেলা। আর এসব ফুটিয়ে তোলা হয় লেজারের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সাথে সাথে আতশবাজির ফোয়ারা এবং লেজারের আলোয় বর্ণিল হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। উড়িয়ে দেওয়া হয় রঙ-বেরং এর কৃত্রিম প্রজাপতি। এই প্রজাপতিরা যতই ডানা মেলে উড়ছিল আকাশে ততই যেন অন্যরকম মনে হচ্ছিল স্টেডিয়ামকে।
এরপর বিশ্বকাপের আয়োজক তিন দেশকে নিয়ে পরিবেশন করা হয় তিনটি বিশেষ পর্ব। ভারতকে দিয়ে শুরু করা এ পর্বে শ্রীলংকার পর্ব শেষে একে একে মাঠে আসেন বাংলাদেশের তিন বরেণ্য শিল্পী। প্রথমে সাবিনা ইয়াসমিন এসে গেয়ে যান “রসিয়া বন্ধুরে এবং একবার যেতে দেনা আমায় চোট্ট সোনার গাঁয়” তবে মমতাজ মঞ্চে উঠতেই যেন অন্যরকম পুরো গ্যালারি। মরার কোকিলার ডাকে যেন উত্তাল গ্যালারি। তার সাথে হাইরুন লো গেয়ে ভালই জমিয়ে যান মমতাজ। রুনা লায়লার ‘শিল্পী আমি তোমাদের গান শোনাব এবং দমাদম মাস্ত ক্যালেন্ডার গেয়ে আরো একবার নাচিয়ে যান গ্যালারি। এই তিন শিল্পীর পরিবেশনার পর শুরু হয় বাংলাদেশকে নিয়ে পর্ব। প্রায় ২০ মিনিটের এই পর্বে বাংলাদেশের ৫২,৭১ থেকে শুরু করে সবকিছু ফুটিয়ে তোলা হয়। দেখানো হয় ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। বাংলাদেশ পর্বে বাংলাদেশের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন উপজাতির জীবন প্রণালী ফুটিয়ে তোলা হয়। গ্রাম বাংলার চিরায়ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা এই পর্ব দর্শকদের বিমোহিত করে।বিখ্যাত কানাডিয়ান শিল্পী ব্রায়ান এডামসের পরিবেশনাও ভালই উপভোগ করেছে দর্শকরা। এদেশের মানুষের প্রতি তার ভালবাসার টান যেন ফুটে ওঠে এই গানে।
এবারের বিশ্বকাপের থিম সং “জিতবে এবার জিতবে ক্রিকেট” ভারতের বিখ্যাত তিন সুরকার শংকর, এহসান, লয় এর সুর করা এবং গানটি বাংলা, হিন্দি এবং সিংহলী ভাষায় গেয়ে শোনান শিল্পী ত্রয়ী। শিল্পী ত্রয়ীর সাথে মাঠে তখন কয়েকশ তরুণ-তরুণী। এই গানটি যখন গাওয়া হচ্ছিল তখন থেমে থেমে আলো ছড়াচ্ছিল আতশবাজি। মাঠে তখন তিন দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পড়া কয়েকশ তরুণ-তরুণী। এই গানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ভেতরে যখন আলোকিত করছিল তরুণ-তরুণীরা তখন মাঠের বাইরে বিভিন্ন দালানের ছাদ থেকে আতশবাজির আলোকচ্ছটায় পুরো ঢাকার আকাশ যেন রঙিন হয়ে ওঠে। নানা রঙের আতশবাজির আলোয় আলোকিত ঢাকা জানিয়ে দিল বিশ্বকাপের যাত্রা ধ্বনি। ঘণ্টা বাজিয়ে দিল বিশ্বকাপের। মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগে বিশ্বকাপের আগমনটাকে বাংলাদেশ স্মরণীয় করে রাখল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দিয়ে বাংলাদেশ জানিয়ে দিল যে কোন বড় আসর আয়োজনের দায়িত্ব দিলে তা পালন করার ক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বকাপের মত বড় এই আসরের ময়দানি লড়াইয়ে শামিল হওয়া টাইগাররা যেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আতশবাজির মত মাঠেও আলো ছড়াতে পারে সেটাই এখন প্রত্যাশা দেশবাসীর।
বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জমকালো উদ্বোধন ।। নতুন এক বাংলাদেশকে দেখলো বিশ্ব
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।