বিষয়টি বিবাহ সংক্রান্ত চুক্তিপত্র নিয়ে; যেটি বিবাহিত ৮০% মানুষ (নারী ও পুরূষ) না পড়েই সাক্ষর করেছেন বলে আমার ধারনা (অন্তত আমার পরিচিত মহলে এমন কাউকে পাইনি যিনি পড়েছেন) এবং খুব সম্ভবত প্রায় কেউই কোন দিন পড়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেননি। মুসলিম বিবাহের বিবাহ চুক্তিপত্রটি'র (নিকাহনামা) কয়েকটি পয়েন্ট পড়ে মনে হবে যেন এটি একটি পন্য বা সম্পত্তি লিজিং এর চুক্তি যেখানে বর হলো লিজ গ্রহীতা এবং কনে হলো পন্য বা সম্পত্তি। বিষয়টি পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য নিকাহনামার (যেটি আমার এক পরিচিতের) একটি নমুনা নিচে হুবুহু তুলে দেয়া হল। এর মধ্যে ব্রাকেটে দেয়া অংশগুলো পূরনকৃত তথ্য।
নিকাহনামা:
১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিষ্ট্রেশন) আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী প্রতিলিপি।
১। ওয়ার্ড, শহর, ইউনিয়ন, তহসিল এবং জিলা যেখানে বিবাহকার্য নিষ্পন্ন হইয়াছে:_______________________
২। নিজ নিজ বাসস্থান সহ বর ও তাহার পিতার নাম:________________________________________
৩। বরের বয়স:_________________
৪। নিজ নিজ বাসস্থান সহ কন্যা ও তাহার পিতার নাম:__________________________________________
৫। কন্যা কুমারী, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা নারী কিনা: _________________________
৬। কন্যার বয়স:_________________
৭। কন্যা কতৃক উকিল নিযুক্ত হইলে ঐ উকিলের পিতার নাম ও বাসস্থানের ঠিকানা: ___________________________
৮। পিতার নাম, বাসস্থান ও কন্যার সহিত সম্পর্কের বর্ননাসহ কন্যার উকীল নিয়োগের ব্যাপারে সাক্ষীদের নাম:
(১) _________________
(২)_________________
৯। বর কতৃক উকিল নিযুক্ত হইলে ঐ উকিলের এবং তাহার পিতার নাম ও বাসস্থানের ঠিকানা:___________________
১০। পিতার নাম, বাসস্থান সহ বরের উকীল নিয়োগের ব্যাপারে সাক্ষীদের নাম:
(১) _________________
(২)_________________
১১। বিবাহের সাক্ষীদের নাম, তাহাদের পিতার নাম ও বাসস্থানের ঠিকানা:________________________
(১) _________________________
(২) _________________________
১২। যে তারিখে বিবাহের কথাবার্তা ঠিক হইয়াছিল সে তারিখ: _________________
১৩। দেনমোহরের পরিমান: _____ (৳ ৫,০০,০০১/- (পাঁচ লক্ষ এক টাকা মাত্র)) _________
১৪। দেনমোহরের কি পরিমান মু'য়াজ্জল এবং কি পরিমান মু'অজ্জল: __ (৳ ৩,০০,০০০/- (তিন লক্ষ টাকা) বাকী রহিল) ____________
১৫। বিবাহের সময় দেনমোহরের কোন অংশ পরিশোধ করা হইয়াছে কিনা? যদি হইয়া থাকে তবে উহার পরিমান কত: __ (৳ ২,০০,০০১/- (দুই লক্ষ এক টাকা) আদায়) ________
১৬। বিশেষ বিবরন ও পক্ষগনের মধ্যে চুক্তিসূত্রে নির্ণীত মূন্যসহ কোন সম্পত্তি সম্পূর্ন দেনমোহর বা উহার অংশ বিশেষের পরিবর্তে প্রদত্ত হইয়াছে কিনা: ____________________________
১৭। বিশেষ শর্তাদি থাকিলে তাহা: ______ (মাসিক ভদ্রোচিত হারে খোরাকী পাইবে ) __________________
১৮। স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পন করিয়াছে কিনা? করিয়া থাকিলে কি কি শর্তে: ________________
১৯। স্বামীর তালাক প্রদানের অধিকার কোন প্রকারে খর্ব করা হইয়াছে কিনা: ____________________________
২০। বিবাহের সময় দেনমোহর, খোরপোষ ইত্যাদি সম্পর্কে কোন দলিল করা হইয়াছে কিনা? যদি হইয়া থাকে তবে উহার সংক্ষিপ্ত বিবরন: ______________________________
২১। বরের কোন স্ত্রী বর্তমান আছে কিনা এবং থাকিলে অন্য বিবাহে আবদ্ধ হইবার জন্য বর ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অর্ডিন্যান্স মোতাবেক সালিসী কাউন্সিলের অনুমতি লইয়াছে কিনা:___________________________
২২। অন্য বিবাহে আবদ্ধ হইবার জন্য সালিশী কাউন্সিলের নিকট হইতে বরের নিকট প্রেরিত অনুমতিপত্রের সময় ও তারিখ:___________________________________
২৩। যেই ব্যক্তির দ্বারা বিবাহ পড়ান হইয়াছে তাহার নাম ও তাহার পিতার নাম: ___________________________
২৪। বিবাহ রেজিষ্ট্রি করার তারিখ: ____________________
২৫। পরিশোধিত রেজিষ্ট্রি ফি: _________________
বিবিধ স্বাক্ষর সমুহ
=====
আমার বিশ্লেষন:
চুক্তিপত্রটি বরকে প্রাধান্য দিয়ে করা হয়েছে এবং এতে কনের প্রতি তুলনামূলক অবহেলা বেশ প্রকট। যেমন-
১৭নং পয়েন্টটি লক্ষ্য করুন: বিশেষ শর্ত- "মাসিক ভদ্রোচিত হারে খোরাকী পাইবে"। সাধারনত কায়িক শ্রমের বিনিময়ে যারা অর্থনৈতীক চুক্তিতে আবদ্ধ হন তাদের ক্ষেত্রে অনুষঙ্গ চুক্তি স্বরুপ খোরাকীর কথা উল্লেখ থাকে। তাহলে কি ধরে নেয়া যায় যে একজন পুরূষ একজন নারীকে বিয়ে করেন তার কিছু বিশেষ সার্ভিসের প্রয়োজন মেটাতে, যেমন- ঘর-দোর ঠিক রাখা, রান্না করা, বংশ বৃদ্ধি করা, শারীরিক চাহিদা পূরন করা ইত্যাদি ইত্যাদি? আর এই সার্ভিস চার্জই হলো 'ভদ্রোচিত হারে খোরাকী'?
১৮নং পয়েন্টে বলা হয়েছে- "স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পন করিয়াছে কিনা? করিয়া থাকিলে কি কি শর্তে?"- লক্ষ্য করুন 'তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পন করিয়াছে কিনা'; তার মানে বাই ডিফল্ট স্ত্রীর সে ক্ষমতা থাকে না এবং সেই ক্ষমতা স্ত্রী পাবে কি পাবে না তা নির্ভর করে স্বামীর ইচ্ছার উপর। অর্থাৎ স্বামী চাইলে স্ত্রীর একটা মৌলিক অধিকার (প্রয়োজনে স্বাধীন হবার অধিকার) কেড়ে নিতে পারেন। বিষয়টা কৃতদাস প্রথার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে কি?
অবশ্য ১৯নং পয়েন্টে স্ত্রীকে কিছুটা ক্ষমতার আভাস দেয়া হয়েছে। তিনি স্বামীর তালাক দেয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি কেড়ে নিতে না পারলেও কিছুটা কমিয়ে (খর্ব) দিতে পারেন। হয়তো অর্থ বা সম্পদের লেনদেনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমানই কমিয়ে দিতে পারেন।
১৩, ১৪, ১৫ ও ১৬নং পয়েন্টগুলো সেলফ এক্সপ্লেনেটরী। প্রথমটা মোট লিজ এমাউন্ট (বা বিক্রয়মূল্য), দ্বিতীয়টা বকেয়ার পরিমান (যদি থাকে), তৃতীয়টা ডাউন পেমেন্ট বা প্রাথমিক পরিশোধিত মূল্য এবং চতুর্থটি এই তিনটি পয়েন্টের এক্সটেনডেড শর্তাদি। অবশ্য বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিচারে এটাকে এভাবেও বলা যেতে পারে যে, এগুলো সবই স্ত্রী'র তালাক পরবর্তী বিপদকালীন সিকিউরিটি ডিপোজিট।
যে যেভাবেই নিন না কেন এই চুক্তির ভাষা ও নির্দেশনা ক্ষেত্র বিশেষে নারীর সন্মানকে খর্ব করে বলেই আমার মনে হয়। ইসলামি আইন বা অনুশাসন মেনেই এই আইনগুলোকে কি (অন্তত ভাষাগুলোকে) এমন ভাবে মডিফাই করা যেতে পারে যাতে করে নারীর সন্মান যথাযোগ্য ভাবে রক্ষা হয়?
আচ্ছা, নারী প্রগতিবাদ আর সম-অধিকার নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত কথা বলে যাচ্ছেন তারা কেন এই বিষয়টি লক্ষ্য করছেন না? নাকি চুক্তিটি অর্থনৈতিক ভাবে (পরিমান নগন্য হলেও) তাদের পক্ষে বলে তারা ইচ্ছাকৃত ভাবেই এড়িয়ে যাচ্ছেন? নাকি আমিই ভুল ভাবে দেখছি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

