ইসলামের নারী সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হরহামেশায়ই সমালোচনা হয়। কিছু দিন আগে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকায়, ইরাকে বসরায় এক পিতা তার ১৯ বৎসরের মেয়ে কে কিভাবে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করার পর দড়িতে ঝুলিয়ে চুরি আঘাতে মৃত দেহকে ছিন্ন ভিন্ন করেছিল, সে লোমহর্ষক কাহিনীর বর্ণনা ছাপা হয়েছিল। মেয়েটির অপরাধ ছিল ইরাকে কর্মরত এক ব্রিটিশ সেনার সাথে সাধারণ পরিচয়মূলক সম্পর্ক। মেয়েটির বাবা কানে কৎসা পৌছেছিল যে মেয়েটিকে উক্ত সৈনিকের সাথে প্রকাশ্যে কথা বলতে দেখা গেছে। ঘটনার দুই সপ্তাহ পর পত্রিকার কাছে পিতা 'আব্দেল কাদের আলী' দেওয়া ভাষ্য হচ্ছে,‘মৃত্যুই ছিল তার ( মেয়েটির) একমাত্র প্রাপ্য। আমি এ কারণে কোন অনুতাপ বোধ করি না। আমার প্রতি আমার সকল বন্ধু, যারা মেয়ের পিতা , তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে এবং যে সকল মুসলিমের নিজ ধর্মে প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে তাদের সকলের নিকট সে (মেয়েটি) যা করেছে তা ঘৃণ্য ও অপ্রত্যাশিত।”
উপরের ঐ ব্যক্তির উক্ত নিঃসন্দেহে গোড়া পন্থীদের বক্তব্য। কিন্তু , প্রকৃত সত্য হচ্ছে যে হিন্দু-মুসলমান-খ্রীস্টান কিংবা ইহুদি সকল প্রচলিত ধর্মে ঈশ্বর নামে যাকে সামনে আনা হয় তিনি নারী কে ঘৃণা করেন। আমেরিকার Southern Baptist Convention এর ‘বিশ্বাস ও লক্ষ্য’ (faith and mission) ঘোষনা পত্রে উদ্বৃত আছে “ স্ত্রী স্বামীর প্রভুত্বের নিকট বিনয়ের সাথে নিজেকে তার দাসত্বের জন্য সমর্পন করবে।” ("("A wife is to submit herself graciously to the servant leadership of her husband.") স্বামী নামক ব্যক্তিটি যখন সকল দিক থেকে নারী চেয়ে বলশালী, তখন এটাকেই মনে হয শ্রেয় , তাই নয় কি?
ক্যাথলিক চার্চ কি বলে আসুন শুনি। পোপ ২০০৮ সালের এক বক্তৃতার নারী-পুরুষ বৈষম্য কে প্রশ্রয় দিয়ে পরিশালীত ভাষায় যে বক্তব্য উপস্থাপন করেন তার সারকথা হচ্ছে ‘ মানব প্রকৃতিতে লৈঙ্গিক পার্থক্য বিষয়ে গড়ে উঠা আজকালকার সাংস্কৃতিক ও রাজনেতিক চেতনার প্রভাবে যারা বিভেদ টাকে তুলে দিতে চাইছেন বা বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করছেন , তাদের সাংস্কৃতিগত বাধাগুলো বিবেচনা করতে বলব এবং একই সাথে স্মরণ প্রয়োজন যে মানব জাতিকে নারী-পুরষ দুই ভাগে ভাগ করে ঈশ্বরের সৃষ্টি পরিকল্পনার মাঝে এক দিকে যেমন ঐক্যের দিক রয়েছে, বিপরীতে রয়েছে চিরন্তন পার্থক্য।’
("Faced with cultural and political trends that seek to eliminate, or at least cloud and confuse, the sexual differences inscribed in human nature, considering them a cultural construct, it is necessary to recall God's design that created the human being masculine and feminine, with a unity and at the same time an original difference.") নারী-পুরুষে প্রকৃতগত পার্থক্যকে জোড় দেওয়া প্রথম ফলাফল হচ্ছে অসমতা ও অধঃস্তনতার ধারনাকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং যুগ যুগ ধরে কিছু দিন পর পর পোপে এই প্রক্রিয়াই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এবার আসি ইহুদি ধর্মে কথায়। জেরুজালেমের পার্শ্ববর্তী স্থানে রাস্তôার পার্শ্বে এক ধর্মীয় পাঠচক্র গ্রুপ হলুদ অরে সতর্ক বাণী লিখে রেখেছে “ তুমি যদি নারী হও এবং তুমি যদি যথাযথ পোশাক পরিহিত না হও , তবে পাশ্ববর্তী এলাকায় প্রবেশ করবে না।”("If you're a woman and you're not properly dressed - don't pass through our neighbourhood.")
অবাক করার বিষয় এই যে, তারপরও প্রাযই নারীদের গীর্জরা বেঞ্চগুলো দখল করে বসে থাকতে দেখা যায় ? নাকি , তারা দীর্ঘকাল ‘খাঁচা বন্দী পাখি’ তে পরিণত হয়েছে? ধর্ম মানুষকে সমাজের দণ্ডমুন্ডু কর্তাদের প্রতি অনুগত ও অনুরক্ত হয়ে থাকার প্রশিণ দেয়। আর বিশেষ করে নারীকে গড়ে তুলে বংশবত ও অধঃস্তôন দাসীসুলভ মনোবৃত্তি করে। ধর্মগুলো কঠোর নীতি নৈতিকতার আগলে বাধা এবং পরিত্যাগ করাও কঠিন। এটা নিঃসন্দেহে নারীর ক্ষেত্রেরও সত্য। আর যার ফলে নারী মানসে অন্ধ অনুরক্ততা এবং দাসী সুলভ আত্মনিবেদন প্রধান কর্তব্যরূপে চিত্রিত হয়।
নারীরা পুরুষের থেকে আলাদা এ বদধমূল বিশ্বাস এবং তার উপর আরোপিত সংকীর্ণ একগেয়ে জীবন , নারী কে ধর্মে প্রতি আরও ধৈর্যøশীল ও অনুরক্ত হতে প্ররোচিত করে। নারীর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মই হয়ে উঠে এই হৃদয়হীন পৃথিবীতে হৃদস্পন্ধন। এর বিপরীতে তাদের বিসর্জন দিতে হয় নিজস্ব জীবন দৃস্টি ভঙ্গি , ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং যত ক্ষন এ নিয়ম তারা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে ততক্ষন সব কিছু নির্ঞ্ঝাট ভাবে অগ্রসর হয়।
বিশ্বে প্রচলিত প্রধান প্রধান ধর্ম মত এমনি এক সময় বিশ্বে আবির্ভাব ঘটেছিল যখন পুরুষের শ্রেষ্টত্ব প্রশ্নাতীত ভাবেই স্বীকৃত ছিল। সেই কাল বহু বছর আগে ইতিহাসের পাতায় ঠায় পেয়েছে। কিন্তু, আজও পুরুষোত্তম ঈশ্বর তার আসনে আসীন এবং নারীকে অবজ্ঞার পাত্রী হিসাবে ঈশ্বরের পায়ের নিচেই ঠায় দিয়ে রেখেছে। অপর দিকে নারীর প্রতি অন্যায় বিধিবিধান গুলো ঈশ্ব্বরের নামে লাইসেন্স পেয়ে টিকে আছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে একদিন ঈশ্বর সংক্রান্ত ধারণা আবির্ভাব হয়েছিল, কিন্তু চির কাল ঈশ্বর সে আসনে আসীন থাকবে এটা ভাবা অমূলক। নারী মুক্তির চিন্তাটা ঈশ্বর চিন্তার সাথে যুক্ত। তাই পুরুষোত্তম ঈশ্বর কে তার আসেন বসিয়ে রেখে নারী মুক্তি অর্জন সম্ভব না।
['দি অবজারভার ' ৩১ মে ২০০৯ তে প্রকাশিত Ophelia Benson কর্তৃক লিখিত God is merciful, but only if you're a man অবলম্বনে ভাবানুবাদ কৃত]
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


