somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দৈনিক প্রথম আলোর দিন বদলের পালা গান ও একালের যুধিষ্ঠিদের ধূসর বাণী।

০৭ ই জুন, ২০০৯ সকাল ১১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মহাভারতের কথা অমৃত সমান

কুরুক্ষেত্র দেবকুলের আর্শীবাদপুষ্ট পঞ্চপান্ডবের বাহিনী রাজশক্তি কৌরববাহিনীর সাথে ঘোরত্ব যুদ্ধে লিপ্ত । পঞ্চপান্ডবের বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন যুধিষ্ঠি , যার ন্যায়নিষ্টা ও সত্যবাদিতা শত্রুমিত্র নির্বিমেষে সর্বমহলে স্বীকৃত। যুধিষ্ঠির পঞ্চপান্ডব বাহিনীর বিরুদ্ধে শর ধারণ করেছেন তাঁদেরই গুরু দ্রোণ আচার্য। দ্রোণ আচার্যে মত যোদ্ধ যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন , তাদের পরাজয় অবসম্ভাবিব। তাই ,পান্ডব বাহিনী বিচলিত হয়ে পরে। কি করে দ্রোণ আচার্য কে নিবৃত করা যায় ? অনেক ভেবে একটি কৌশল খুজে পাওয়া গেল। যদি রটনা করা যায় যে দ্রোণ আচার্যের পুত্র ‘অশ্বথাম’ যুদ্ধে নিহত হয়েছে, তবে পুত্র শোকাগ্রস্ত পিতা দ্রোণ আচার্য় অস্ত্র ত্যাগ করবেন এবং এ সুযোগে তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু , একমাত্র যুধিষ্ঠির মুখের বাক্যই দ্রোণ আচার্য বিশ্বাস করতে পারেন। ন্যায়ধর্ম রক্ষার স্বার্থে ‘চির সত্যবাদী ’ যুধিষ্ঠি দ্রোণ আচার্য কে নিবৃত করতে ছলনা আশ্রয় নিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলেন ,“ নিহত হয়েছে অশ্বথামা” তারপর সামন্য বিরতী দিয়ে নিচু কন্ঠে উচ্চারণ করলেন , “ নামের একটি হাতি।” যুধিষ্ঠি বাক্য প্রথমাংশ উচ্চারনের সাথে বেজে উঠলো আনন্দ বাদ্য। ফলে “নিহত হয়েছে অশ্বথামা, নামের একটি হাতি।” এ পূর্ণ বাক্যের পরিবর্তে দ্রোণ আচার্যে কানে বাক্যের প্রথমাংশ “নিহত হয়েছে অশ্বথামা” পৌছল । সত্যবান যুধিষ্টির বাক্য বিশ্বাস করে পুত্র শোকে কাতর হয়ে পরলেন দ্রোণ আচার্য, ফেলে দিলেন হাতের অস্ত্র আর পান্ডব শিবির থেকে আসা একটি তীরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পরলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির পান্ডব বাহিনীর জয় হল। যুধিষ্টি একমাত্র মানুষ যে সশরীরে মর্তধাম ত্যাগ করে , স্বর্গ লোকে প্রবেশের সুযোগ পান। কিন্তু, যুদ্ধে ক্সেত্রে দ্রোন আচার্য কে পরাস্থ করতে ছলনা করার অপরাধে স্বর্গে প্রবেশের পূর্বে নরকের আগুনে তাঁর মর্তের দেহ কে শুদ্ধ করতে হয়।

আলোকিত মানুষের ধুসর বাণী

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার “ বদলে যাও বদলে দাও ” কর্মসূচির সাথে যুক্ত হয়েছে এ দেশের অনেক আলোকিত মানুষ। গত ৪ জুন ২০০৯ সকালে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা মেলতেই, এমনি একজন আলোকিত মানুষের হাস্যোজ্জ্বল মুখের আলোক ছটা ঠিকরে পরলো চোখে। তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ্‌ আবু সায়ীদ । যিনি নিজে শুধু আলোকিত মানুষ নন, একই সাথে আলোকিত মানুষ সৃষ্টির স্বপ্নদ্রষ্টা। ৪ জুন’০৯ প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত সায়ীদ স্যারের বাণী টি পাঠকের জন্য তুলে দিলাম।

“ আড়াই হাজার বছর আগে এথেন্স পেরিটলেসের আমলে প্রত্যেক যুবককে আঠারো বছর বয়সে পদার্পণ উপলক্ষে শপথ বাক্য উচ্চারণ করানো হতো ‘ জন্মের সময যে এথেন্সকে আমি পেয়েছিলাম, মৃত্যুর সময় যেন তার চাইতে উন্নততর এথেন্সকে পৃথিবীর বুকে আমি রেখে যেতে পারি।’ আমাদের তরুণ প্রজন্মের শপথ হোক এমনি আত্ম-প্রত্যয়ী।”


সমাজ বিকাশের ইতহাসের পুনঃপাঠ

শ্রদ্ধেয় সায়ীদ স্যার তাঁর বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মকে যে সময়কালের যে সমাজ ব্যবস্থার উদহারণ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন, সে সময় কালকে জানবার জন্য আসুন সমাজ বিকাশের ইতহাসের আড়াই হাজার বছর পূর্বের পাতায় চোখ রাখি।

আড়াই হাজার বৎসর আগে তৎকালীন গ্রীসের এথেন্সকে কেন্দ্রে করে যে নগর কেন্দ্রিক উৎকর্ষমূলক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল , সমাজ বিকাশের ইতহাসে তা চিত্রীত হয়েছে “ দাস সমাজ ব্যবস্থা” হিসাবে। কেননা অগুনিত দাসদের কায়িক শ্রম-রক্ত আর মর্মদন্তদ কান্নার বিনিময় এই সব নগর কেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । এ সকল সভ্যতা সামগ্রিক উৎকর্ষতার এমন পর্যায়ে পৌছেলি যে , আধুনিক মানুষের কাছেও তাদের অনেক সৃষ্টি আজও বিস্ময় হয়ে আছে।

এই সকল সভ্যতার ঊন্মেষের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে মানব সমাজে ধাতুর ব্যবহারের সাথে। প্রারম্ভিক পর্যায়ে অস্ত্র ও বর্ম প্রস্তুতে পাথরের পরিবর্তে ধাতুর ব্যবহার শিক্ষা এ সকল সভ্যতার সামনে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের দার উন্মুক্ত করে দেয় । ধাতব অস্ত্রে শক্তিতে পরাস্ত করতে থাকে পাথরের হাতিয়ার ব্যবহারকারী অপরাপর জাতি গোষ্ঠি কে। অপর দিকে, যুদ্ধ জয়ের পর শুধু পরাস্ত যোদ্দাদের নয় , বরং পরাজিত জাতি বা গোষ্ঠি সমূহের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা কে দাস হিসাবে বন্দী করে নিয়ে আসা হয় । আর এই সকল দাসদের শ্রমঘামে , রক্তে দৌত পথ বেয়ে বিকশিত হয়েছিল এথেন্সের মত সভ্যতাগুলো।
বিজ্ঞান-দর্শণে বিশেষ অবদান রেখে যাওয়া তৎকালিন অনেক মনিষীরাও দাসদের সাথে পাশবিক আচরণ কে ন্যায় সঙ্গতই মনে করতেন। কেননা, যে কোন সমাজ ব্যবস্থা এমন এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে তার মানুষদের প্রতিপালিত করে , যার মধ্যে সিংহ ভাগ মানুষের চিন্তা ধারণা উক্ত সমাজ কাঠামোর সাথে সঙ্গতি পূর্ণ হিসাবে বিকশিত হয় এবং স্থিতি অবস্থায় অধিকাংশ মানুষের মাঝে সমাজ কাঠামোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নৈতিকতার ধারণাই কাজ করে।

তৎকালিন তরুণদের মাঝে উন্নততর এথেন্স গড়ার যে প্রত্যায় ব্যক্ত হত তা শোষনমূলক সমাজ কাঠামো কে সংঘত রেখেই ঘোষিত হতো। যে সমাজ ব্যবস্থার উৎকর্ষতার মূল প্রত্থিত রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠির রক্ত শোষন প্রক্রিয়ার মধ্যে , শোষনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আত্মনিবেদন ব্যতিত শুধু সমাজকে আরও উৎকষতর স্তরে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গিকারের অর্থ হচ্ছে আরও নিবির শোষনমূলক ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে উৎকর্ষতার পথে অগ্রসর হওয়ার প্রত্যয় ঘোষনা করা।

আড়াই হাজার বৎসর আগের এথেন্স নগর কেন্দ্রিক সভ্যতার সাথে বর্তমান বিশ্ব্ব্যবস্থার গুনগত অনেক তফাৎ রয়েছে। দাস সমাজ ব্যবস্থার অবসান হয়ে নানা সমাজ বিবর্তনের পথ বেয়ে বর্তমানে আমরা পুজিবাদী - সাম্রজ্যবাদী বিশ্বের বাসিন্দা। কিন্তু একটি সাধারণ মিলের দিকও বিদ্যমান । তাহলো, দুটো সমাজ ব্যবস্থার ভীত্তি মূলে রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠির শ্রম শোষন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, উভয় সমাজ ব্যবস্থার উৎকর্ষতা নির্ভর করে কত বেশি নিবিরভাবে কত বেশি দক্ষতার সাথে শোষন প্রক্রিয়াকে সংহত করতে পারে তার উপর।

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি পুজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো বিদ্যমান। শ্রদ্ধেয় সায়ীদ স্যার তাঁর বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মকে যে আত্মপ্রত্যয়ী আহ্বান জানানো হয়েছে তা যদি এথেন্সের তরুন প্রজন্মের জন্য শুধু মাত্র দেশকে বর্তমান থেকে আরও উৎকর্ষতর স্তরে নেওয়ার প্রত্যয় হয় ; তাদের যদি শোষন - বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মূল উৎপাটনের অঙ্গিকার না থাকে ,তবে তা কখন সামিগ্রক মানব সমাজের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারবে না ।

বাজে কথার শেষ কথা

শুরু করেছিলাম মহাভারতের কাহিনী থেকে। ইদানিং লক্ষ্য করছি শ্রদ্ধেয় সায়ীদ স্যারের মত অনেক আলোকিত ব্যক্তিত্ব তরুন সমাজ কে সমাজ গঠনে উদ্দীপ্ত করবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু, তাঁদের উদ্দীপনার মধ্যে অন্যায় -শোষন- বৈষমের বিরুদ্ধে তারুণ্যের সংঘবদ্ধ শক্তিকে জাগ্রত করার প্রয়াশ অনুপস্থিত। এর অর্থ এই নয় যে এই সকল আলোকিত মানুষ সামাজিক শোষন- বৈষমের সম্পর্কে কিংবা সমাজ বিকাশের ইতিহাস জ্ঞাত নন। তাদের চরিত্র কে সত্যবাদী যুধিষ্ঠীর মত মনে হয়।
তাই তাঁদের বানী বিপরীতে আমি................
মনুষত্ব ও নৈতিকতার ধ্বজা ঊধ্বে তুলে ধরে তরুন প্রজন্ম কে আত্মপ্রত্যয়ী হওয়া আহ্বান জানিয়ে যাই । অন্যায় বিরুদ্ধে যুদ্ধ ন্যায়সঙ্গত।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০০৯ বিকাল ৪:২২
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×