চাকুরী জীবনের অভিজ্ঞতাঃ
৫ বছর আগে (৪ অক্টোবর ২০০৪) একজন প্রকৌশলী হিসাবে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে যোগদান করি।আত্মবিশ্বাস ছিল নিজ সীমিত মেধা কে আপোষহীন ভাবে জাতীয় কল্যাণে নিবেদন করবো। চাকুরির পাঁচ বছরের মাথায় এসে আত্মমূল্যায়ণ করতে গিযে দেখরাম প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পের সেই স্বদেশী-বিপ্লবী শিক্ষকের মত আমি কখন বিদ্যমান ব্যবস্থার সাথে একাকার হযে গেছি।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের দুনীতিগ্রস্থ কাঠামোর কথা নতুন করে বলবার কিছু নেই। কিন্তু এর একান্ত ভিতরের প্রবেশ না করলে মূল সংকট টা চোখে পরে না এবং এর ভিতরে অবস্থানকারীরাই মূল সংকটের স্বরূপ টা বুঝতে পারে। তা হচ্ছে এর উপনিবেশিক আমলের নিরেট আমলাতান্ত্রিক কাঠামো।যুগ যুগ ধরে এই কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে। এই কাঠামো কে যুগোপযোগি করা কথা বলে 'সুশাসন',রিফর্মমেশণ,গুড গভর্নেস, এডমিনেস্ট্রেটিব ট্রান্সফরমেশণ নানা গালভরা নামে বিশ্বব্যাংক , এডিবির সহ দাতাদের টাকায় ও তত্ত্বাধায়ণে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে কর্মযজ্ঞ মহড়া হয়েছে এবং এখনও চলছে । কিন্তু এত কিছুর পরেও সেই নিরেট কাঠামো নিরেট থেকে গেছে। একটি ঐতিহ্যবাহি নৌকা বাইচ দলের কাহিনী তে বিষয় টি তুলে ধরবার চেষ্টা করবো।
একটি ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ দলের কাহিনীঃ

একদা বাংলাদেশে একটি ঐতিহ্যবহী নৌকাবাইচ দল ছিল।

এক বছর জাপানী নৌকা বাইচ দলের সাথে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়েজন করা হল।


নানামুখি সমালোচনার ঝড় উঠলো। কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়ে উঠলো ।

এবং শোচনীয় পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত হল তদন্ত কমিটি।

তদন্তে দেখা গেল জাপান নৌকাবাইচ দলে ছিল একজন গায়েন আর সব মাল্রা।

অপরদিকে বাংলাদেশ দলে ছিল একজন মাল্লা আর সব গায়েন।

বাংলাদেশ নৌকাবাইচ দলের উৎকর্ষতার জন্য নেওয়া হল প্রকল্প ; আনা হল বিদেশি উপদেষ্টামন্ডলি।

পরের বছর আবার জাপানের সাথে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হল। এবারও দুই মাইল ব্যবধানে বাংলাদেশ দল পরাস্থ হল।

পুনরায় তদন্ত টিম গঠন কার হল। তদন্ত কমিটি সুপারিশ সহ রিপোর্ট পেশ করলেন।

রিপোর্টে বলা হল.........'নৌকাবাইচ দলের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি' প্রকল্পের বিদেশী উপদেষ্টাদের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ কাজ হয়েছে।

সকল গাযেনরা যথাযথ ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাদের পুরস্কৃত করার সুপারিশ করা হল।

বাংলাদেশের নৌকা বাইচ দলের এক মাত্র 'মাল্লা' টির Performance সন্তোষজনক না হওয়াই সকল ব্যর্থতার কারণ। অবিলম্বে তাকে বিহষ্কারপূর্বক নতুন' মাল্লা' নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রকাশিত হল।
এবং পেট্রোবাংলা উপ্যাখান।
সে দিনে টিভি টকশো তে দেখলাম একজন বক্তা মালোয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়াত্ত তেল/গ্যাস কোম্পানী 'পেট্রোনাস' এর উদহারণ টেনে প্রশ্ন তুলেছেন......... একই সময় ( '৭০দশকের প্রথমার্ধে) একই রকম পরিবেশে/ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা ও মালোয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান' পেট্রোনাস' গঠিত হলেও; আমরা কেন পেট্রোনাস এবং পেট্রোনাসের হাত ধরে উঠে আসা মালোয়েশিয়ার কাছাকাছি অবস্থানে পৌছাতে পারি নি?
এর উত্তর পাওয়া যাবে যদি স্বাধিনতা উত্তর কালে বাংলাদেশের তেল/গ্যাস-খনিজ সম্পদ সেক্টরের ঘটনা বলি একটু ফিরে দেখি।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ২৭-এর মাধ্যমে ’৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ খনিজ, তেল ও গ্যাস কর্পোরেশন (Bangladesh Mineral, Oil and Gas Corporation - BMOGC) প্রথম গঠিত হয় । একই বছর ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ১২০-এর মাধ্যমে খনিজ সম্পদকে তেল-গ্যাস থেকে আলাদা করা হয় এবং Bangladesh Mineral Exploration and Development Corporation - BMEDC নামে পৃথক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এ্যাক্ট ’৭৪ অনুমোদিত হয়। তারপর ১৯৭৪ সালের ২২ আগস্ট অর্ডিন্যান্স ১৫-এর মাধ্যমে গঠিত Bangladesh Oil and Gas Corporation - BOGC-এর সংক্ষিপ্ত নাম হয় পেট্রোবাংলা। ১৯৭৬ সালের ১৩ নভেম্বর সামরিক ফরমান ৮৮-এর বলে অপরিশোধিত তেল আমদানী, বিশুদ্ধকরণ, বাজারজাতকরণ ও পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্যাদি উৎপাদন ইত্যাদি নবগঠিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (Bangladesh Petrolium Corporation - BPC)-এর হাতে ন্যস্ত হয়। ১৯৮৫ সালের ১১ এপ্রিল অপর এক সামরিক ফরমান ২১-এর বলে বাংলাদেশ তেল ও গ্যাস কর্পোরেশন (Bangladesh Oil and Gas Corporation - BOGC) এবং বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও সমৃদ্ধকরণ কর্পোরেশন (Bangladesh Mineral Exploration and Development Corporation - BMEDC)-কে একীভূত করে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ কর্পোরেশন (Bangladesh Oil, Gas and Mineral Corporation - BOGMC) করা হয়। তারপর ১৯৮৯ সালের ফেব্রম্নয়ারি মাসে পূর্বেকার অধ্যাদেশ কিছুটা সংশোধন করে আবার নামকরণ করা হয় পেট্রোবাংলা। ১৯৮৫ সালের আর এক অধ্যাদেশের বলে পেট্রোবাংলা Public sector statutory body বা স্বায়ত্তশাসিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৮৭ সালে আবারও পেট্রোবাংলাকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পেট্রোবাংলার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পরিদপ্তর বিলুপ্ত করে ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই পেট্রোবাংলার প্রেষণ নিযুক্ত জনবল এবং পুরাতন অনুসন্ধান সরঞ্জাম নিয়ে প্রথমে শুধু তেল/গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য Bangladesh Petrolium Exploration Company Ltd হিসাবে বাপেক্স গঠনকরা হয়। ১৯৯৮ সালে বাপেক্ষ অত্যন্ত সীমিত আকারে উৎপাদন কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করে Bangladesh Petrolium Exploration and Production Company বা বাপেক্স বর্তমান রূপ ধারণ করে। নতুন কোম্পানী গঠিত হলেও প্রথম থেকে একদিকে বাপেক্স কাঁধে পূর্বসুরী পেট্রোবাংলার পুরনো দায়-দেনার একটা বোঝা চাপানো হয়েছে , অপরদিকে অনুসন্ধান কার্যক্রমকে বেগবানও আধুনিকায়নের কথা রলে গঠিত হলেও প্রতিষ্ঠানটির অনুসন্ধান কার্যক্রমের জন্য নির্ভরযোগ্য কোন আর্থিক উৎস সংস্থান করা হয় নি।
বাপেক্স গঠনের ২০ বছর কালে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার জন্য একমাত্র সরকারী সহায়তা ১৩.০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ত্রিমাত্রিক সার্ভে জন্য এক সেট যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং উক্ত বিষযে ১২ জন কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ। এই ২০ বছর বাপেক্সের প্রযুক্তিগত বিকাশের তেমন কোন নজির না থাকলেও প্রতিষ্ঠান টির জনবল কাঠামো বা অরগানোগ্রাম পরিবর্তন হযেছে বারংবার। জনবল বাড়ানো হযেছে, ক'বছর পরে আবার কমানো হযেছে।তাও ঠিক থাকে নি বেশি দিন। অনেক আভ্যন্তরীণ টেকনিকাল ডিভিশন বিলুপ্ত করা হযেছে আবার পুনঃসংয়োগ হযেছে।সাজানো হযেছে নতুন নতুন বিন্যাসে। আর এই পরিবর্তনের সাথে সম্বনিত হতে গিযে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বহুবার উচ্চ আদালতের দারস্ত হযেছে।
এই সব কিছু নৌকাবাইচ দলের দুর্দশাকেই স্মরণ করিযে দেয়।যে পেট্রোবাংলা-বাপেক্সের আজ পেট্রোনাসের সাথে প্রতিদন্দীতা করার কথা ছিল ,অথচ তা পরে রযেছে যোজন যোজন দূরে।
তবুও আশা হত নইঃ আলোকিত দিনের অপেক্ষায়
এর মাঝে ও আশাবাদী হই কিভাবে? কিসের ভরসা স্বপ্ন দেখি আলোকিত দিনের ?
একদশক আগে লাটিন আমেরিকার ' Donkey Sitting on Gold Mine ' বলে উপহাসে পাত্র বলিভিয়া আজ যে ভাবে নিজ শিরদাড় সোজা করে দাড়িযেছে ; তাই আমাকে আশাবাদি করে। আমি অপেক্ষায় আছি বলিভিয়ান বিপ্লবের মত কোন এক বিপ্লবী জনতার অপ্রতিরোধ্য স্রোত অদূর ভবিষ্যতে আমাদের বিদ্যমান কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আলোকিত দিনের সূচনা করবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০০৯ দুপুর ১:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



