[গত ৩০ নভেম্বর ছিল স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মদিন। উপলক্ষে গত ৩০ নভেম্বর ২০০৯ ''ছাত্রসমাজের প্রতি'' শীর্ষক জগদীশচন্দ্র বসুর অভিভাষণ ১ম কিস্তি সকলের জন্য উপস্থাপন করেছিলাম।
একজন সামাজিক দায়বদ্ধ মানুষ হিসাবে জগদীশচন্দ্র বসুর নিজ জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে এই অভিভাষণে ছাত্রদের কাছে তাদের মৌলিক দায় বোধের স্থানটিকে পরিস্কার করতে চেয়ছেন। জগদীশচন্দ্র বসুর সেই দিক নির্দেশনা এত যুগ পরেও পরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় এতটুকু ম্লান হয়নি।
শিক্ষার মৌলিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্ককে স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর একটা উক্তি এই যুগের শিক্ষার্থীদের জন্য উল্লেখ্য করতে চাই।'' র্পৃথিবীর বহুদেশ ভ্রমণ করিয়া আমি ইহা উপলব্ধি করিয়াছি যে- আমাদের সমুদয় দীক্ষা কেবল মনুষ্যত্ব লাভের উদ্দ্যেশ মাত্র। ''
প্রাসঙ্গিক ভাবে আরেক টি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন ।আমরা Somewhere in Blog এ প্রায়ই স্টিকি পোস্ট হিসাবে বিভিন্ন অসুস্থ ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য আবেদনমূলক পোস্ট দেখি।কোমল মনের অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়ান এবং সহানুভুতি প্রকাশ করেন। আমি যখন এই লেখা কম্পোজ করছি তখন সে ধরণের একটি আবেদন ব্লগের শীর্ষে স্থান পেয়েছে। এই সকল হৃদয়বানদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অসাহয় সাহায্য প্রত্যাশিদের প্রতি সহানুভুতি নিয়ে স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর অভিভাষন থেকে কয়েক টি লাইন উল্লেখ করতে চাই।
দেশব্যাপী রোগের সেবা ও পরিচর্যা ? পীড়ারও অন্ত নাই, শৃশ্রূষারও অন্ত নাই, এই রূপ কতকাল চলিবে? ইহার কি কোন প্রতিবিধান নাই? ....................... দূর্বল ভালোমানুষের দ্বারা এই সব হইবে না, এইসবের জন্য বিক্রমশীল পুরুষের আবশ্যক, তাহাদের পূর্ণশক্তির আঘাতে সব বাধাবিঘ্ন শুন্যে মিশিয়া যাইবে।
দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে অভিভাষণ টির শেষ কিস্তিতে বিলম্বের জন্য লজ্জিত।]

''ছাত্রসমাজের প্রতি''-১ম কিস্তি
পৃথিবীব্যাপী পরিভ্রমণ উপলক্ষে আমি দ্বিবিধ জাতীয় চরিত্র লক্ষ করিয়াছি।ােক জাতীয় চরিত্র এই যে, তাঁহারা গতকালের স্মৃতি লইয়া বৃথাগর্বে ভুলিয়া আছেন।পৃথিবী-যে স্থাকর নয়, ইহা-যে চিরপরিবর্তণশিল এ কথা তাহাদের বোধ্যগম্য হয় না। এইসব ধর্মাক্রান্ত জাতির চিহ্ন পৃথিবী হইতে মুছিয়া যাইতেছে। ইজিপ্ট আসিরিয়া এবং বাবিলন- ইহাদের গত স্মৃতি ছাড়া আর কী আছে?
চীনদেশে ভ্রমণকালে সে স্থানের বিখ্যাত কয়েকজন পন্ডিতের সহিত আমার পরিচয় হয়। তখন জাপান মাঞ্চুরিয়া গ্রাস ব্যাপারে প্রবৃত্ত ছিল। আমি আমার চীনা বন্ধুদিগকে জিজ্ঞাস করিলাম, আপনারা কী করিয়া চীনের স্বাধীনতা রক্ষা করিবেন? তখন তাঁহারা বলিলেন, '' চীনদেশের মতো যে দেশের বহু প্রাচীন কাল হইতে সভ্যতার শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া রহিয়াছে, সে দেশকে কি সেদিনের জাপান পরাভুত করিতে পারে! বরঞ্চ আমাদের সভ্যতাই জাপানকে পরাস্ত করিবে।'' এইসব কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম যে শীঘ্রই চীনের সৌভাগ্যেসূর্য অস্তমিত হইবে।
অন্যদিকে তাঁহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান পুরাতন কথা বলিয়া সময় অপচয় করিতে চাহেন না।বর্তমান ও ভবিষ্যৎ লইয়া তাঁহারা যথেষ্ঠ ব্যস্ত। তাঁহাদের নিকট শুনিলাম যে মানবসমাজের নিয়ম আর Law of Hydrostatic Pressure- একই। যে স্থানে Pressure বেশি সে স্থান হইতে জলস্রোত অল্প Pressure এর দিকে ধাবিত হয়। জীবনস্রোতাও সজীব হইতে নির্জীবের দিকে।পৃথিবীতে সজীব নির্জীবের স্থান অধিকার করিবে।
অথচ এই জাপানে অনুস্ধান কিরয়া জানিতে পারিরাম যে বিদ্যা ও বুদ্ধিতে ভারতীয় ছাত্র সেখানেকার বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানিদেরও উপরে উচ্চস্থান অধিকার করিয়াছে।বিদ্যাবুদ্ধির ক্রুটি নাই, তবে এইরূপ দশা কেন।
আমি আজ ত্রিশ বৎসর যাকৎ শিক্ষকতার কাজ করিতেছি। ইহার মধ্যে নূন্যকল্পে দশ হাজার ছাত্রের সহিত আমার পরিচয় হইয়াছে। তাহাদের চরিত্রে কী কী গুন তাহা জানি আর কী কী দূর্বলতা তাহাও উপলব্ধি করিতে পারিয়াছি।প্রধানত, তাহাদের স্বভাব অতি কোমল, সাধারণত তাহারা নম্রপ্রকৃতি, অতি সহজেই তাহাদের হৃদয় অধিকার করা যায়; এক কথায় তাহারা বড় ভালোমানুষ, এবার পথ দেখাইয়া দিলে অনেকেই সেই পথ অনুসরণ করিতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ জলপ্লাবন, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি দুর্ঘটনার সময় ছাত্রদের মধ্যে অদ্ভুত কার্যপরায়ণতা দেখা গিয়াছে। এতগুলি ছেলে কী সুন্দররূপে নিজকে Organize করিয়াছে। এইরূপ শুশ্রষা করিবার ক্ষমতা, এরূপ ধৈর্য, এরূপ কষ্টসহিষ্ঞুতা, এরূপ অসন্তুষ্টির অভাব প্রায় দেখা যায় না, সচারচর নারীজাতিই এসব মহৎ গুণের অধিকারিণী।
ইহার বিপরীত কেন্দ্রে কোনো কোনো পুরুষ দেখিতে পাওয়া যায় যাহাদের চরিত্র সম্পূর্ণ বিভিন্ন প্রকার। তাঁহাদের ধৈর্য্য ও সহিষ্ঞুতা একেবারেই নাই, তাঁহারা কিছুই মানিয়া লইতে চাহে না , তাঁহারা সর্বদাই অসন্তুষ্ট, তাঁহাদের র্হদয় দৃর্জয় ক্রোধে পূর্ণ। এইরূপ লোকের জাতীয় জীবনে স্থান কোথায়?
আমি এইরূপ প্রকৃতির একজনকে জানিতাম তিনি চিরস্মরণীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সমাজের নির্মম বিধানে তাঁহার ক্রোধ সর্বদা উদ্দীপ্ত থাকিত।আশ্চর্য এই যে ক্রোধ ও মমতা অনেক সময় একাধারেই দেখিতে পাওয়া যায় । বিদ্যাসাগরের ন্যায় কোমল হৃদয় আর কোথায় দেখিতে পাওয়া যায়? তিনি কোন বিধান মানিয়া লইতে না; অসীম শক্তিবলে তিনি একাই সমাজের কঠিন শৃংখল ভগ্ন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
দেশব্যাপী রোগের সেবা ও পরিচর্যা ? পীড়ারও অন্ত নাই, শৃশ্রূষারও অন্ত নাই, এই রূপ কতকাল চলিবে? ইহার কি কোন প্রতিবিধান নাই? কী করিয়া ম্যালেরিয়া দেশ হইতে দূর করা যায়? এইরূপ জঙ্গল ও ডোবার মধ্যে মানুষ কী করিয়া বাঁচিতে পারে? ইহার প্রতিকার নিশ্চয়ই আছে।
তাছাড়া আরও শত শত কার্য আছে- সাধারণের মধ্যে শিক্ষা প্রচার, জ্ঞান প্রচার, শিল্প ও বিজ্ঞানের উন্নতি, দেশে বিদেশে ভারতের মহিমা বৃদ্ধি করা। দূর্বল ভালোমানুষের দ্বারা এই সব হইবে না, এইসবের জন্য বিক্রমশীল পুরুষের আবশ্যক, তাহাদের পূর্ণশক্তির আঘাতে সব বাধাবিঘ্ন শুন্যে মিশিয়া যাইবে।
আর যে শান্তি ক্রোড়ে আমরা এতদিন নিশ্চেষ্ট ও সুপ্তভাবে জীবন যাপন করিয়াছি, জগৎ হইতে সেই শান্তি অপসৃত হইতেছে। শান্তি কোনো জাতির পৈতৃক অথবা চিরসম্পত্তি নহে; বল দ্বারা, শক্তি দ্বারা, জীবন দ্বারা শান্তি আহরণ করিতে এবং রক্ষা করিতে হয়। বলযুক্ত হও, শক্তিমান্ হও এবং তোমাদের শক্তি দেশের সেবায় এবং দুর্বলের সেবায় নিয়োজিত হউক।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



