১.
বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছেন, খুবই জরুরি দরকার। সে এল পাক্কা দেড় ঘন্টা পর। এতটা সময় একা বসে বসে নিজের আঙুল কামড়েছেন আর বন্ধুপ্রবর আসতেই রেগে ফেটে পড়লেন । যা নয় তাই বলে গালাগালির পালা শেষ করলেন; অথবা টেবিলের পেপারওয়েটটাই ছুড়ে দিলেন তার দিকে। আবার হয়তো প্রিয়জনের সাথে এমন রাগ করলেন যে নিজের দাঁতে দাঁত পিশে কেবল অগ্নিদৃষ্টি দিয়েই তাকে পারলে ভষ্ম করে দিতে চাইলেন। কেন এমনটা হয়? এমনধারা রাগ করার অভিজ্ঞতা কমবেশি আমাদের সকলেরই রয়েছে অথবা কখনোবা শিকার হতে হয়েছে অন্যের রাগের।
২.
এই রাগ অস্বাভাবিক কোনো মানসিক বৈকল্য কিংবা স্নায়ুতন্ত্রের কোনো রোগ নয় বরং প্রকৃত সুস্থ মানুষের সম্পূর্ন স্বাভাবিক একটি আবেগ বা ইমোশন। সুস্থ মনের অত্যন্ত স্বাভাবিক উপাদান এই রাগ। কোনো প্রণোদনার কারনে সামান্য বিরক্তি থেকে শুরু করে প্রবল উত্তেজনা, ক্রোধোন্মত্ত্বতা পর্যন্ত এই আবেগের বিস্তৃতি হতে পারে। মানুষের ষড়রিপুর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে এই আবেগটিকে রাখা হলেও মনোবিজ্ঞানের ব্যাখায় এবং শারীরবৃত্তিয় কার্যকলাপে এটি মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার অন্যতম উপাদান। কিন্তু যদি এই আবেগটিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, যদি এই আবেগটি অতি উচ্ছ্বসিত আকারে প্রকাশ পায় তখন দেখা দেয় নানা সমস্যা। সমস্যা হতে পারে মনো দৈহিক, সমস্যা হতে পারে পারিপার্শ্বিক সম্পর্কগুলোর (পরিবার, বন্ধু, কর্মক্ষেত্রে) মধ্যে, হতে পারে সামাজিক সমস্যা এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনি জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩.
মানুষের অন্যান্য আবেগের মতো রাগের ফলে বেশ কিছু শারীরবৃত্তিয় পরিবর্তন দেখা যায়, হৃদপিন্ডের গতি, রক্তচাপ বেড়ে যায়, এড্রিনালিন ও নরএড্রিনালিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, এর সাথে সমন্বিত হয় মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রনের কিছু কেন্দ্র( লিম্বিক সিস্টেম, অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম)। দেহের বাইরের কোনো প্রণোদনা যেমন- কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর প্রতিনিয়ত ফাঁকি দেয়া, রাস্তায় ট্র্যফিক জ্যাম বা পরিবারের কোনো সদস্যের অনাকাংক্ষিত আচরণ; এবং দেহের ভেতরের কোনো প্রণোদনা যেমন- ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা বা অতীতের কোনো অপ্রাপ্তির বেদনা থেকেও রাগের প্রকাশ হতে পারে। রাগ ( নিয়ন্ত্রিত) যেহেতু সুস্থ মানষের স্বাভাবিক আবেগ তাই এর কিছু ভালো দিকও ব্যাখা করেছেন মনোবিজ্ঞানিগণ; বলা হয় যে কোনো ধরনের হুমকির (শারীরিক, মানসিক) সাথে অভিযোজিত হবার জন্য, আমাদের দেহের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এই রাগ। কখনো যে কোনো প্রতিকুল পরিবেশে রাগের মাধ্যমে শুরু হওয়া আমাদের আচরণগত পরিবর্তন, প্রতিকুলতাকে অতিক্রম করতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রতি রাগ আমাদের জন্য জরুরি।
৪.
সকলেই কিন্তু সমানভাবে রাগেন না, কেউ রাগ করে কাপ পিরিচ ভাঙেন, কেউ উচ্চস্বরে চিৎকার করেন, কোনো কারনে কেউ ধুম করে রেগে উঠেন, যাদের আমরা বলি মাথাগরম, আবার কেউবা তার চাইতে বেশি রাগের কারনেও খুব বেশি রাগ করেন না, কেউ হয়তো এতটাই রাগ করলেন যে তার রাগের কোনো বহিঃপ্রকাশ হলোনা বটে তবে পারিপার্শ্বিকতা থেকে নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে নিলেন। এই যে একেক জনের রাগের প্রকাশ যে এক রকম তার মূলে রয়েছে জেনেটিক, পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব। জটিলতা পূর্ণ পরিবার ও বাবামার অশান্তিময় দাম্পত্য সম্পর্ক সন্তানকে অন্যান্য আচরণ বৈকল্যের পাশাপাশি রাগের প্রকাশভঙ্গিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। যুদ্ধোত্তর সংঘাতময় রাষ্ট্র, রাজিৈতক অস্থিরতা, বর্ণ বৈষম্য ইত্যাদি সামাজিক কারনেও ব্যক্তির রাগের প্রকাশ ভিন্নতর হতে পারে।
৫.
রাগের মতো জরুরি আবেগটি যাতে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে প্রকাশ না পায় সেজন্য মার্কিন মনোচিকিৎসক ডঃ চার্লস স্পিয়েলবারগার রাগের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ ভঙ্গির কথা উল্লেখ করেছেন- তার গবেষনায় তিনি বলেছেন রাগকে পুরোপুরি চেপে রাখা যাবেনা, একবারে দমন করা যাবেনা ; কারন অবদমিত রাগ থেকে হতে পারে নানাবিধ মানসিক ও শারীরিক সমস্যা- হতে পারে বিষন্নতা, উচ্চরক্তচাপ, খিটখিটে মেজাজ, বিশ্বনিন্দুক (cynical and hostile) চরিত্রের মালিক। এছাড়া অবদমিত রাগের কারনে আক্রান্ত হতে পারে passive-aggressive behavior নামক জটিল আচরণগত মানসিক বৈকল্যের; যেখানে সামনাসামনি মোকাবেলা না করে অযাচিত ভাবে অন্যের পেছনে লাগার অভ্যাস গড়ে উঠে । তবে কেমন হবে রাগের প্রকাশভঙ্গি ? রাগের প্রকাশ হতে হবে গঠনমূলক (constructive), দৃঢ় `(assertative) কিন্তু আক্রমণাত্মক (aggrassive) নয়। যা কিছু চাওয়ার তা চাইতে হবে অন্যকে আঘাত না করে আর যা কিছু না চাওয়ার তা বর্জন করতে হবে অন্যের প্রতি সম্মান রেখে। যে বিষয়টি নিয়ে রাগ হচ্ছে সেটিকে কেবল নিজের দিক থেকে না দেখে প্রায় ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে আনতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি, আর তাতেই বিষয়টি উপস্থাপিত হতে পারে ভিন্নমাত্রায়, বদলে যেতেপারে আপনার রাগের প্রকাশভঙ্গি, বদলে যেতে পারে আপনার জীবন। সেই সাথে নিজের ভেতরে নিয়ে আসতে হবে স্থিরতা, যুক্তিগ্রাহ্যতা যা কেবল মানসিক প্রশান্তিই আনবে না বরং উৎকন্ঠা, উচ্চরক্তচাপ বা বিষন্নতার মত জটির রোগ থেকে রক্ষা করবে।
৬.
কিছু পদ্ধতির মাধ্যমে রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে যার চর্চা করলে আমরা রাগকে আয়ত্ত্বে আনতে পারবো-
--বলা হয় Logic defeats angerতাই রাগের লাগাম হিসেবে যুক্তির বিকল্প নেই, কারো উপর বা কোনো ঘটনার উপর রাগ করলে ভেবে দেখুন ঘটনাটি কেন ঘটেছে,আপনার রাগ করার যথার্থ কারন থাকলেও নানামুখি যুক্তির প্রয়োগে আপনি সেই কারনটিকে একপাশে সরিয়ে রাখতে পারেন।
-- রাগের কারন ঘটলে নিজেকে যতটা সম্ভব Relax করে ফেলুন- বড় করে শ্বাস নিন, কোনো গঠনমূলক ছোট বাক্য( যেমন "ঠিক আছে" "শান্ত হও" "take it easy" ) বারবার উচ্চারণ করতে পারেন। ভালো কোনো সুন্দর দৃশ্য, আপনার প্রিয়জনের মুখচ্ছবি মনে করতে পারেন। এছাড়া নিয়মিত হালকা যোগ ব্যায়াম করতে পারেন।
--আলাপচারিতার সময় "কখনোই না" "সবসময়ই"এজাতীয় শব্দচয়ণ পরিহার করতে পারেন। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী বা অধস্থনদের সাথে কথোপকথনে আদেশমূলক শব্দের পরিবর্তে অনুরোধমূলক শব্দ চয়ন করুন, যেমন- "এই ফাইল টা ঠিক করে আনুন" না বলে বলা যায় "দেখুনতো এই ফাইলটায় আরো কিছু ঠিকঠাক করা যায় কিনা"। এভাবে ইতিবাচক ভঙ্গিতে কথা বলা অভ্যেস করলে কেবল নিজের রাগকে যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাই নয় বরং আশেপাশের মানুষজনেরাও রাগ করার কারণ খুজে পায় না।
--প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে কিছু না কিছু সময় নিজেকে দিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের National Mental Health এর একটি গবেষণাপত্রে এ সম্পর্কে একটি উদাহারণ দেয়া হয়েছে যে কর্মজীবি মা চাকুরি থেকে ঘরে ফিরা মাত্রই তার কোলে ক্রন্দররত শিশুটিকে যেন তুরে দেয়া না হয়, মাকে অন্ততঃ ১৫ মিনিট সময় দিন, নিজের জন্য তাকে কিছু সময় ভাবতে দিন এরপর শিশুটিকে তার কাছে দিন , দেখা যায় মাকে এই সময়টুকু দিলে মা এর যেকোনো বিষয়ে রাগ করার প্রবণতা অনেক কমে এসেছে।
--প্রয়োজনে রাগনিয়ন্ত্রণ কৌশল আয়ত্ত্ব করবার জন্যে মনোবিজ্ঞানী/মনোচিকিৎসক/কাউন্সিলরের সাহায্য নিতে পারেন।
৭.
মোদ্দা কথা হচ্ছে রাগকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা যাবেনা, আর তা সুস্থ মন ও শরীরের জন্য উপযোগীও নয়; বরং রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে , American Psychological Association এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে Controlling Anger Before It Controls You তাই মনে রাখতে হবে হতাশা, প্রাপ্তি বঞ্চনা, আর অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ভরা এই ছোট্ট গ্রহটিতে সব কিছু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না বরং তার চাইতে সেই হতাশা, বঞ্চনা, আর অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারনে আমাদের যে প্রতিক্রিয়া হয়, তার ধরন পরিবর্তনের চেষ্টাটুকু করতে আমরা যেন পিছিয়ে না যাই।
লেখাটি ২০০৬ সালে যায়যায়দিন এর ফিটনেস পাতায় ছাপা হয়েছিল

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

