সেদিন কি বার ছিলো মনে নেই। সকালে সারোয়ার চলে গেলো। আমি রওনা হলাম ধানমণ্ডি। উদ্দেশ্য খানিক আড্ডাবাজি করবো রবীন্দ্র সরোবরে, হ্যাপি আর্কেড থেকে টেলিটকের হারানো গোল্ডেন(!) সিমটা তুলবো এবং সবচে জরুরী যেটা, কেনার এক সপ্তাহের মাথায় জ্বলে যাওয়া হার্ডডিস্কটার কোন উপায় করার জন্যে এলিফ্যান্টরোডে দৌড়ঝাপ। লেকে পৌছে প্রায় ঘন্টা দুই ঝিমুলাম, আরাফের(আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন) খবর নেই। বেচারার পা মচকেছে গতকাল, কিন্তু কোথায় যে আছে কে জানে! ১৫ মিনিটের কথা বলে ঘণ্টা পার করে দিলো। একসময় বিরক্ত হয়ে হাঁটা দিলাম সিটি কলেজের দিকে সর্টকাট পথে।এর মধ্যেই ওর ফোন। আবার ফিরে আসলাম। দুজন প্রথমে গেলাম টেলিটকের কাষ্টমার কেয়ারে। সিম তুললাম। বেরিয়ে আসলাম। তারপর গেলাম এলিফ্যান্টরোডে। নাহ, হার্ডডিস্কের ওয়ারেন্টি পাবোনা, সারাতে হবে। হঠাৎ টের পেলাম, ফোন ফেলে এসেছি। সব মিলিয়ে আধা ঘন্টা হবে না, বাবার ফোন আসলো কোকোর মোবাইলে। আমি ধরলাম। আমার "হ্যালো" শুনে বাবা যেন একটা ধাক্কা খেলো। একটু থেমে জিজ্ঞেস করলো,
-আরাফ?
-না বাবা, আমি।
-অনীক?
-হুমম, ক্যান? কি হইছে?
-তুমি ঠিক আছো?
-হ্যাঁ, ক্যানো?
-তোমার কোন সমস্যা হয়নিতো?
-হুম, ক্যানো, আমার কি হবে?
-নাও, তোমার মা'র সাথে কথা বলো।
আমার তখনো কোন ধারণা নেই, গত ত্রিশটা মিনিটে কি হয়ে গেছে।
মা ফোন নেবার পর আমি হ্যালো বলার সুযোগ পাই নি। হয়তো ছেলের মৃত্যতেই কেবল মা'রা এমন কাঁদেন।
মা চিৎকার করে কাঁদছে, কথা বলতে পারছে না। এপাশে আমি সম্পুর্ণ হতভম্ব, কেন-কি-কিভাবে কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমার কানে মা'র কান্না ভাসতেছে, পৃথিবীর আর কিছুর কথা আমি জানিনা। একবার মনে হলো, আমি বেঁচে আছিতো? নইলে এমন কাঁদে ক্যানো মা?
বাবার সাথে কথা বললাম। ঘটনার সারমর্ম দাড়ালো, টেলিটকের কেয়ারে আমি ফোন ফেলে এসেছিলাম, ওরা আমার ফোনবুক থেকে কাকার নম্বরে ফোন করে সেটটা নিয়ে যেতে বলছে। কিন্তু, আমার গ্রামে থাকা অতি সরল কাকা বুঝছেন- ওরা ওখান থেকে '"আমাকে"ই নিয়ে যেতে বলেছে, আমার একটা কিছু হয়েছে। বাসায় ফোন করে এ কথা জানাতেই ভয়ঙ্কর একটা ভুলবোঝাবুঝি তৈরি হলো। আমার সথে কথা বলার পরও আরো প্রায় দেড়ঘন্টা কেঁদেছিলো মা, স্বাভাবিক হতে পারেনি পরের দিনেও। পরে শুনেছিলাম, কাঁদতে কাঁদতে মা'র কথা বন্ধ হয়ে গেছিলো। প্রচণ্ড হেঁচকি তুলছিলো, প্রায় দমবন্ধ অবস্থা। পরে ডাক্তার নিয়ে আসা হয়। ডাক্তার ওষুধ দিয়ে ঘুমপাড়িয়ে যান।
প্রচণ্ড নাড়া খেলাম। আম্মার কান্না এখনো কানে বাজছে- আমার অনীককে আমার কাছে এনে দাও___
আম্মার এইভাবে ভেঙ্গে পড়া মনে করিয়ে দিল, প্রতিটা দিনই দেশের কোনো না কোনো মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যুসংবাদ যাচ্ছে। রোজই কিছু মা এইভাবে বিলাপে বুক ভাসাচ্ছেন সন্তান শোকে। প্রত্যেকটা মা, যাদের সন্তান ঘরে নেই, প্রতিটা মুহুর্ত তটস্থ থাকেন কি ভয়ানক শংকা আর অনিশ্চয়তায়।
আর যাই করো খোদা, আমার মৃত্যু যেনো আমার মা'কে না দেখতে হয়। মা সহ্য করতে পারবে না খোদা একদম সহ্য করতে পারবে না।
আমার জীবন যাপন অনেক অগোছালো আর বেপরোয়া। প্রায়ই রাতভর ঘুরে বেড়াই সম্পুর্ণ একা। কদিন আগেই গোপনে চট্টগ্রাম আর কক্সবাজার ঘুরে এলাম, তাও একা। একটা গোটা রাত পুরো একা সাগরপাড়ে ছিলাম। অথচ,পুকুর ছাড়া নদীতেও সাঁতরাইনি কখনো। জীবনে প্রথমবারের মতই চট্টগ্রাম যাওয়া সেবার। আমি এমনই সবসময়। কিন্তু এই ঘটনাটার পর থেকে অনেকটাই ভীরু হয়ে গেছি। খুব ভয় কাজ করে- আমার কিছু হলে, মা'কে আবারো অমন কাঁদবে। আমি তখন দেখবো কি না, টের পাবো কিনা জানিনা। কিন্তু একদম সহ্য করতে পারবোনা আমি।
খোদা, আমার মা'কে যেন আমার মৃত্যু দেখতে না হয়।
প্রসঙ্গতঃ ভার্সিটি পড়ুয়া হলবাসী ছাত্র আমি। সেই এসএসসি থেকেই ঘরছাড়া উদ্বাস্তু

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



