somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেঘের রাজ্যে এক সপ্তাহ

১২ ই আগস্ট, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সিলেটের জাফলং বেড়াতে যাবার সময় ইনডিয়ার উঁচু পাহাড়গুলো দেখে ভেবেছিলাম, পাহাড়গুলোর ওপাশটা না জানি কেমন, সেখানে কেমন মানুষ থাকে, তাদের জীবনধারাই বা কেমন? যাওয়া কি হবে সেই পাহাড়ের ওপাশের দেশে?
অবশেষে একদিন সেই সুযোগ মিললো। তামাবিলে ইনডিয়ার ডাউকি চেকপোস্টে পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা শেষ করে গাড়ি ভাড়া করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, বিদেশে এসে পড়েছি। গাড়ির ড্রাইভার একজন পাগড়ি পড়া তরুণ। সে ইংরেজি বলতে পারে কিন্তু এক বর্ণও বাংলা বুঝে না। হ্যাঁ তাইতো; আমরা এখন দেশের বাইরে।
জাফলং থেকে দেখা ঝুলন্ত ব্রিজটার উপর দিয়েই শিলং যাবার রাস্তা। ব্রিজটা পার হতেই পথটা মোড় নিয়ে একটা খাড়া পাহাড়ের উপরে উঠে গেল। চারদিকে শুধু জঙ্গল, কোনো মানুষ নেই। কিছুক্ষণ পর ছোট একটা লোকালয় পার হতেই পথটা ক্রমাণ্বয়ে আরো উচু থেকে উচুতে উঠতে লাগলো। মাঝে মাঝে পথ রোধ করে দাড়াচ্ছে সাদা মেঘ। মেঘ পার হলেই আবার পরিষ্কার। রাস্তার পাশে হাজার ফিট খাদ দেখে শক্ত হয়ে বসলাম। উচ্চতা ভীতি আমার কখনোই ছিলনা। কিন্তু তবে জিপের ড্রাইভার যদি একটু অন্যমনস্ক হয় অথবা একটা টায়ার...নাঃ ভয় পেলে চলবে না।
খাড়া পাহাড়ের নিচে কুয়াশার কারণে ঠিকমতো দেখা যচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবহাওয়া এতো ঠান্ডা হয়ে গেল যে, আমরা শীতে কাপা শুরু করলাম। জিপ থামিয়ে আমরা ব্যাগ থেকে গরম পোশাক বের করে পড়ে নিলাম। এ সময় শুরু হলো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। কিন্তু একি, কানে তো কিছুই শুনছি না। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, সবারই নাকি আমার মতো অবস্থা।
হঠাৎ করে অনেক উচ্চতায় উঠার কারণে কান চিচি করছে, একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। পাহাড়ি উচু নিচু রাস্তায় আমাদের জিপটি আবার দূর্দান্ত বেগে চলা শুরু করলো। রাত হবার আগেই শিলং পৌছতে হবে।
আমরা যাচ্ছি ভারতের পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সিটি নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে পাহাড়ি পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগ বিষয়ে একটা কনফারেন্সে যাচ্ছি আমরা। কয়েক ঘন্টা চলার পর রাস্তার ধারে কিছু বাড়িঘর চোখে পড়তে লাগলো। মেঘালয়ের বাড়িগুলো খুবই সুন্দর। প্রায় সব বাড়ির সামনেই সারি সারি ফুলের টব আছে। তাতে রংবেরংয়ের ফুল ফুটে থাকে।
পরিচ্ছন্ন পাহাড়ি শহর শিলং-এর একপাশে পাহাড়ি উচু নিচু জঙ্গলের মাঝে ইউনিভার্সিটির নতুন ক্যাম্পাস। ইনডিয়ার ইউনিভার্সিটিগুলোকে স্টার দিয়ে র‌্যাংকিং করা হয়। ফাইভ স্টার ইউনিভার্সিটি হচ্ছে সবচেয়ে ভাল ইউনিভার্সিটি। এই ইউনিভার্সিটির তিনটি বিশাল ক্যাম্পাস আর প্রায় ১৩০টি বিভাগ আছে। শুধু পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পড়ানো হয়। প্রায়ই বিভিন্ন কনফারেন্স, সেমিনার এসবের আয়োজন করা হয়। দেশী-বিদেশী অতিথিদের থাকার জন্য খুব চমৎকার গেস্ট হাউজ আছে। ইউনিভার্সিটির পরিবেশ অনেকটা পার্কের মতো। মানুষ এত কম যে, হাঁটার সময় মনেই হবেনা কোনো লোকালয়ে হাঁটছি। চারদিকে ঘন গাছপালা, উঁচু-নিচু পাহাড় আর মাঝখানে চমতকার রাস্তা।
কনফারেন্সের অতিথি হিসেবে থাকার ব্যবস্থা হলো, পাইন গাছ ঘেরা একটা অপূর্ব সুন্দর কটেজ, সবরমতি হল-এ। কটেজটির উপরে টালির ছাদ, দেয়াল পাথরের আর মেঝে কাঠের তৈরি। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা ছিল চমৎকার। সেলফ সার্ভিস হওয়ায় অনেকেই অনেকগুলো মুরগির রান দিয়ে ভোজ সারলো। অবশ্য ভেজিটেরিয়ানদের জন্যও ছিল সুব্যবস্থা।
কনফারেন্স শেষে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে স্থানীয় বিভিন্ন আদিবাসীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠান ছিল, ছিল নেপাল থেকে আসা অতিথিদের বিচিত্র উপস্থাপনা আর ছিল বাংলা অনুষ্ঠান।
পরিচয় হলো বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানা ধরনের মানুষের সাথে। মনে হলো এ ধরনের সেমিনারে সাধারণত একটু ভিন্ন ধরনের মানুষেরাই অংশ নেয়। কারণ দুই হাজার মাইল ট্রেন ভ্রমণ করে এসেছে মি. বালাক। অল্প কথা বলেই বুঝতে পারলাম এ তরুণ একজন জ্ঞানী-গুণি লোক। শ্রী লংকা থেকে এসেছেন একজন চমতকার মহিলা (নামটা খেয়াল নাই)। ভুটান থেকে আগত লোকটা একটু বয়স্ক। কিন্তু খুবই বন্ধু বৎসল। আর একজন ছিলেন আগের দিনের পরিচয়েই আমাদের পাচ জনের নাম মুখস্ত করে ফেললেন। পরদিন দেখা হতেই নাম ধরে ডেকে চমকে দিলেন। এরা সবাই মূলত নিজস্ব পেপার বা গবেষণা রিপোর্ট উপস্থাপন করার জন্য এসেছিলেন। আমরা বোকার মতো শুধু অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলাম।
পরদিন ইউনিভার্সিটির নিজস্ব বাসে বেড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। আমরাও একটা বাসে উঠে পড়লাম। পাহাড়ি পথে বাস চলা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আমরা নামলাম বিশাল এক পাহাড়ের উপরে। পাশে অনেক নিচু আর বিশাল সমতল ভূমি দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। জিজ্ঞাসা করে জানলাম আমরা বাংলাদেশের একাংশ দেখছি। সাপের মতো আকাবাকা দাগ দেখে বুঝলাম ওটা নদী। তার কিছু দূরে সুনামগঞ্জের ধূসর হাওড় অঞ্চল। কয়েকটা পার্ক আর জলপ্রপাত দেখে আমরা যখন চেরাপুঞ্জিতে পৌছলাম তখন সেখানে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।
পরদিন আমরা গেলাম আসামের রাজধানী গোহাটিতে। ব্রহ্মপুত্র নদী এখানে বেশী প্রশস্ত নয়। তারই কাছাকাছি পাহারে চূড়ায় কামাখ্যা মন্দির। এটি কামরূপ কামাখ্যা নামেই পরিচিত। বাংলাদেশের অনেক ওঝা, সর্পবিদ, জাদুকর এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলে দাবী করে। যদিও খোঁজ করেও এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের দেখা পেলাম না।
আসামে রয়েছে প্রচুর বাঙ্গালী। আসামী ভাষাও অনেকটা বাংলা ভাষার মতো। সেখানে একটা বড় বস্ত্রমেলা চলছিল। সেখান থেকে আমরা কেনাকাটা করলাম। এবার দেশে ফেরার পালা। পাহাড়ি পথে আবার পথ রোধ করে দাঁড়ায় মেঘ। অবশ্য আমরা চলেই আসি।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:২৯
৭টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×