অবশেষে একদিন সেই সুযোগ মিললো। তামাবিলে ইনডিয়ার ডাউকি চেকপোস্টে পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা শেষ করে গাড়ি ভাড়া করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, বিদেশে এসে পড়েছি। গাড়ির ড্রাইভার একজন পাগড়ি পড়া তরুণ। সে ইংরেজি বলতে পারে কিন্তু এক বর্ণও বাংলা বুঝে না। হ্যাঁ তাইতো; আমরা এখন দেশের বাইরে।
জাফলং থেকে দেখা ঝুলন্ত ব্রিজটার উপর দিয়েই শিলং যাবার রাস্তা। ব্রিজটা পার হতেই পথটা মোড় নিয়ে একটা খাড়া পাহাড়ের উপরে উঠে গেল। চারদিকে শুধু জঙ্গল, কোনো মানুষ নেই। কিছুক্ষণ পর ছোট একটা লোকালয় পার হতেই পথটা ক্রমাণ্বয়ে আরো উচু থেকে উচুতে উঠতে লাগলো। মাঝে মাঝে পথ রোধ করে দাড়াচ্ছে সাদা মেঘ। মেঘ পার হলেই আবার পরিষ্কার। রাস্তার পাশে হাজার ফিট খাদ দেখে শক্ত হয়ে বসলাম। উচ্চতা ভীতি আমার কখনোই ছিলনা। কিন্তু তবে জিপের ড্রাইভার যদি একটু অন্যমনস্ক হয় অথবা একটা টায়ার...নাঃ ভয় পেলে চলবে না।
খাড়া পাহাড়ের নিচে কুয়াশার কারণে ঠিকমতো দেখা যচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবহাওয়া এতো ঠান্ডা হয়ে গেল যে, আমরা শীতে কাপা শুরু করলাম। জিপ থামিয়ে আমরা ব্যাগ থেকে গরম পোশাক বের করে পড়ে নিলাম। এ সময় শুরু হলো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। কিন্তু একি, কানে তো কিছুই শুনছি না। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, সবারই নাকি আমার মতো অবস্থা।
হঠাৎ করে অনেক উচ্চতায় উঠার কারণে কান চিচি করছে, একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। পাহাড়ি উচু নিচু রাস্তায় আমাদের জিপটি আবার দূর্দান্ত বেগে চলা শুরু করলো। রাত হবার আগেই শিলং পৌছতে হবে।
আমরা যাচ্ছি ভারতের পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সিটি নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে পাহাড়ি পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগ বিষয়ে একটা কনফারেন্সে যাচ্ছি আমরা। কয়েক ঘন্টা চলার পর রাস্তার ধারে কিছু বাড়িঘর চোখে পড়তে লাগলো। মেঘালয়ের বাড়িগুলো খুবই সুন্দর। প্রায় সব বাড়ির সামনেই সারি সারি ফুলের টব আছে। তাতে রংবেরংয়ের ফুল ফুটে থাকে।
পরিচ্ছন্ন পাহাড়ি শহর শিলং-এর একপাশে পাহাড়ি উচু নিচু জঙ্গলের মাঝে ইউনিভার্সিটির নতুন ক্যাম্পাস। ইনডিয়ার ইউনিভার্সিটিগুলোকে স্টার দিয়ে র্যাংকিং করা হয়। ফাইভ স্টার ইউনিভার্সিটি হচ্ছে সবচেয়ে ভাল ইউনিভার্সিটি। এই ইউনিভার্সিটির তিনটি বিশাল ক্যাম্পাস আর প্রায় ১৩০টি বিভাগ আছে। শুধু পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পড়ানো হয়। প্রায়ই বিভিন্ন কনফারেন্স, সেমিনার এসবের আয়োজন করা হয়। দেশী-বিদেশী অতিথিদের থাকার জন্য খুব চমৎকার গেস্ট হাউজ আছে। ইউনিভার্সিটির পরিবেশ অনেকটা পার্কের মতো। মানুষ এত কম যে, হাঁটার সময় মনেই হবেনা কোনো লোকালয়ে হাঁটছি। চারদিকে ঘন গাছপালা, উঁচু-নিচু পাহাড় আর মাঝখানে চমতকার রাস্তা।
কনফারেন্সের অতিথি হিসেবে থাকার ব্যবস্থা হলো, পাইন গাছ ঘেরা একটা অপূর্ব সুন্দর কটেজ, সবরমতি হল-এ। কটেজটির উপরে টালির ছাদ, দেয়াল পাথরের আর মেঝে কাঠের তৈরি। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা ছিল চমৎকার। সেলফ সার্ভিস হওয়ায় অনেকেই অনেকগুলো মুরগির রান দিয়ে ভোজ সারলো। অবশ্য ভেজিটেরিয়ানদের জন্যও ছিল সুব্যবস্থা।
কনফারেন্স শেষে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে স্থানীয় বিভিন্ন আদিবাসীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠান ছিল, ছিল নেপাল থেকে আসা অতিথিদের বিচিত্র উপস্থাপনা আর ছিল বাংলা অনুষ্ঠান।
পরিচয় হলো বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানা ধরনের মানুষের সাথে। মনে হলো এ ধরনের সেমিনারে সাধারণত একটু ভিন্ন ধরনের মানুষেরাই অংশ নেয়। কারণ দুই হাজার মাইল ট্রেন ভ্রমণ করে এসেছে মি. বালাক। অল্প কথা বলেই বুঝতে পারলাম এ তরুণ একজন জ্ঞানী-গুণি লোক। শ্রী লংকা থেকে এসেছেন একজন চমতকার মহিলা (নামটা খেয়াল নাই)। ভুটান থেকে আগত লোকটা একটু বয়স্ক। কিন্তু খুবই বন্ধু বৎসল। আর একজন ছিলেন আগের দিনের পরিচয়েই আমাদের পাচ জনের নাম মুখস্ত করে ফেললেন। পরদিন দেখা হতেই নাম ধরে ডেকে চমকে দিলেন। এরা সবাই মূলত নিজস্ব পেপার বা গবেষণা রিপোর্ট উপস্থাপন করার জন্য এসেছিলেন। আমরা বোকার মতো শুধু অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলাম।
পরদিন ইউনিভার্সিটির নিজস্ব বাসে বেড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। আমরাও একটা বাসে উঠে পড়লাম। পাহাড়ি পথে বাস চলা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর আমরা নামলাম বিশাল এক পাহাড়ের উপরে। পাশে অনেক নিচু আর বিশাল সমতল ভূমি দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। জিজ্ঞাসা করে জানলাম আমরা বাংলাদেশের একাংশ দেখছি। সাপের মতো আকাবাকা দাগ দেখে বুঝলাম ওটা নদী। তার কিছু দূরে সুনামগঞ্জের ধূসর হাওড় অঞ্চল। কয়েকটা পার্ক আর জলপ্রপাত দেখে আমরা যখন চেরাপুঞ্জিতে পৌছলাম তখন সেখানে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।
পরদিন আমরা গেলাম আসামের রাজধানী গোহাটিতে। ব্রহ্মপুত্র নদী এখানে বেশী প্রশস্ত নয়। তারই কাছাকাছি পাহারে চূড়ায় কামাখ্যা মন্দির। এটি কামরূপ কামাখ্যা নামেই পরিচিত। বাংলাদেশের অনেক ওঝা, সর্পবিদ, জাদুকর এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলে দাবী করে। যদিও খোঁজ করেও এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের দেখা পেলাম না।
আসামে রয়েছে প্রচুর বাঙ্গালী। আসামী ভাষাও অনেকটা বাংলা ভাষার মতো। সেখানে একটা বড় বস্ত্রমেলা চলছিল। সেখান থেকে আমরা কেনাকাটা করলাম। এবার দেশে ফেরার পালা। পাহাড়ি পথে আবার পথ রোধ করে দাঁড়ায় মেঘ। অবশ্য আমরা চলেই আসি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

