সন্দ্বীপে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো পুরনো শহরের একটা পাকা হোটেলে (নামটা মনে নাই)। ভাড়া মাথাপিছু ২৫ টাকা। আমরা ভাড়াটাকে ২০ টাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। মুলামুলির জবাবে হোটেলঅলা জানিয়ে দিলেন, আমরা যদি তিনজন আলাদা রুমে থাকি তাহলে ২৫ টাকা করে, তিনজন এক রুমে থাকলেও অবশ্য ২৫ টাকা করেই দিতে হবে। এক টাকাও কম হবে না। তিনি আরও জানিয়ে দিলেন, রাত দশটা পর্যন্ত বাতি জ্বলবে (জেনারেটরের লাইন)। তারপর হারিকেন জ্বলবে। আমরা রাজি হয়ে ব্যাগট্যাগ রেখে পাশের হোটেল থেকে টাটকা গুড়া মাছের ভাজি দিয়ে পেট ভরে ভাত খেলাম। টের পেলাম সন্দ্বীপে খাবার-দাবারের দাম কম নয়। আমাদের খাবারের বিল আসলো জনপ্রতি ৪০ টাকা করে। অবশ্য অপরিচিত লোকের জন্য খাবার বিল ডবল, এমন কোনো নিয়মও থাকতে পারে!
সমু্দ্রের ধারে বসে এরপর জোয়ার ভাটার খেলা দেখতে লাগলাম। এক বন্ধু বললো জোয়ার আসছে। পানি বাড়ছে আস্তে আস্তে। এখানে ঠিক সি বিচ নাই, সমুদ্রের দিকটাও অনেকটা নদীর কূলের মতো দেখতে। আমরা এ ধরনের এক জায়গায় বসে পা ঝুলিয়ে রাখলাম। উদ্দেশ্য জোয়ার এসে কতো তাড়াতাড়ি আমাদের পা পানিতে ডুবিয়ে দিতে পারে। জোয়ারের পানিতে কার পা আগে ভেজে এ ধরনের একটা প্রতিযোগিতাও হয়ে গেল।
সন্ধ্যা হয়ে এলো। এ সময় দূরে অসংখ্য মাছ ধরা নৌকার বাতি দেখা যাচ্ছিলো। পাশ দিয়ে সিগারেট ফুকতে ফুকতে এক স্থানীয় লোক যাচ্ছিলো। অন্ধকারে আমাদের বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে খোজখবর নেওয়া শুরু করলো। আমরা যখন জানালাম, এখানে এমনি ঘুরতে এসেছি তখন তিনি সিরিয়াস হয়ে একটা বেশ মজার কথা বললেন। কথাটা ছিল, ঘুরতে এসেছেন তো ঘুরেন, এখানে বসে আছেন কেন?
কিভাবে বুঝাই যে, আমরা আসলে চরকির মতো ঘুরতে আসিনি, অন্যভাবে ঘুরতে এসেছি। অনেক রাত পর্যন্ত সাগরের ধারে বসে থেকে আমরা হোটেলে ফিরে একটা ঘুম দিলাম।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের ভাড়া শোধ করে টাকা পয়সার নিয়ে আবার হিসাব করতে বসলাম। এবার ফিরার উপায় বের করা দরকার। খোজ খবর নিয়ে জানতে পেরেছিলাম দুপুরে এখান থেকে চট্টগ্রামের সদরঘাট পর্যন্ত একটা জাহাজ যায়। ঠিক করলাম জাহাজেই চট্টগ্রাম যাব। সেটার টিকিট কাটা হলো। সন্দ্বীপের বাজার ঘুরে দেখলাম। মাছের কোনো অভাব নেই, তাই এখানে লোকজন মাছের ব্যাপারে খুব খুতখুতে। আমাকে কয়েকজন জানালো যে, তারা মরা মাছ খায়না। মানে খুব টাটকা মাছ ছাড়া খায়না। বাজারেও একেবারে টাটকা মাছ বিক্রি হয়। পুরনো মাছ বিক্রি হয়না। বাসি হওয়ার আগেই ফেলে দেয়।
পকেটে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় এ দুপুরটা আমরা ভাত না খেয়েই কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। বিকল্প হিসাবে শসা আর ঝালমুরিকেই অমৃত মনে হলো। জাহাজে উঠার আগে দেখি আরেক ফ্যাকড়া। জাহাজ সরাসরি ঘাটে আসে না। একটু দূরে দাড়ায়। সেখানে নৌকায় করে যেতে হয়। নৌকা অলাকেও আবার কিছু টাকা দিতে হয়। টিকিট কেটে জাহাজে উঠে, নৌকা অলাকে টাকা দেয়ার পর আবার দুই টাকার ঝালমুরি খাওয়া হলো। কিন্তু এর পরও যখন ক্ষিদায় পেটটা চো চো করতে লাগলো তখন আমাদের তিনজনেরই মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেল। আর দুইশ টাকা সঙ্গে আনলে কতো মজা হতো! দুপুরে না খেলে থাকতে হতো না।
যাই হোক বঙ্গোপসাগরের ধুসর-সবুজ বুকের উপর দিয়ে বিশাল জাহাজটা যখন চলতে শুরু করলো তখন সাগরের কুলকুলে নোনা বাতাসে আবার আমাদের মেজাজ ভাল হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যটা অস্ত গেল। জাহাজের একেবারে সামনের অংশে দাড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে সূর্যাস্ত দেখলাম। ক্যামেরার ফিল্ম শেষ হয়ে গেছিলো। তাই ছবি আর তুলতে পারলাম না। এখানেও স্থানীয় কয়েকজন লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল। এরা অবশ্য আগের লোকদের মতো না। এরা রাজনৈতিক আলাপ করতেই বেশী আগ্রহী মনে হলো। তবে আমরা এমনি ঘুরতে এসেছি শুনে বেশ অবাকই হলো। আমি কয়েকজনকে সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্রটার কথা জিজ্ঞাসা করছিলাম। আমার হিসাব মতো এটা সাগরের বুকে এ এলাকাতেই কোথাও থাকার কথা। কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারলো না। সেরকম কিছু চোখেও পড়লো না।
সাগর বেশ শান্ত ছিল। দূরে নৌ বাহিনীর ঝকঝকে জাহাজগুলো দেখছিলাম। সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের বিশাল সব জাহাজও কিছু কিছু দেখা যাচ্ছিলো। কয়েকটা জাহাজ ছিল প্রায় বিশ তলার সমান উচু।
কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের জাহাজটা কর্ণফুলীর মোহনায় চলে আসলো। নদীর বাম পাশে টিএসপি সার কারখানা আর ডান পাশে কাফকো (কর্ণফুলী ইউরিয়া সার কারখানা) দেখে চিনতে পারলাম। এভাবে আরও পথ পাড়ি দিয়ে রাত নয়টার দিকে আমরা চট্টগ্রাম সদর ঘাটে নামলাম।
টাকায় টান থাকায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ট্রেনে করে ঢাকায় যাবো। আমাদের তিনজনেরই পেটে ছিল রাজ্যের ক্ষুধা। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আগে একটা হোটেলে ঢুকে পেট ভরে ভাত খাবো। তার পর যা হওয়ার হবে।
সেই মতে আমরা একটা হোটেলে ঢুকে মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। এর মধ্যে নতুন এক কাহিনী হয়ে গেল। হোটেল অলা মুরগির মাংসের দাম জানিয়েছিল ২৫ টাকা করে। কিন্তু আমরা খাওয়ার পরে জানাল ৫০ টাকা করে। কিভাবে হলো? আমাদের জানানো হলো, মাংসের প্রতিটা পিস ২৫ টাকা করে। কিন্তু প্লেটে আমাদের জন্য তিনটা করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা তিনটা করে খেয়েছি। হোটেলের বিল চুকিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি স্টেশনে চলে গেলাম। দেখি একটা ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে করছে। ট্রেনটার স্টুয়ার্টদের দেখে বেশ ভদ্রই মনে হলো। সাদা পোশাক পড়া, মাথায় ক্যাপ। কেমন যেন বিমান বিমান ভাব।
আমার বন্ধু পরামর্শ দিল এক স্টুয়ার্টের সাথে ভাব জমাতে। ট্রেনের কাছে গিয়ে আমরা তিনজনই এক স্টুয়ার্টকে মামা মামা বলে ডাকতে লাগলাম।
তিনি বললেন, কোথায় যাবেন? আমরা বললাম, ঢাকা। তাকে আরো জানালাম, টাকা পয়সা শেষ। স্টুয়ার্ট মনে হয় এ ধরনের পরিস্থিতি আগেও মোকাবেলা করেছে। তাই তার বিশেষ ভাবান্তর হলো না।
তিনি আমাদের ট্রেনের ভিতরে নিয়ে গেলেন। বললেন, ১০০ টাকা করে দেন। আমরা আমাদের কাছের যতো ১, ২, ৫, ১০ সব নোট বের করে হিসাব করতে লাগলাম। সব হিসাব করে জনপ্রতি ৭২ টাকা করে তার হাতে ধরিয়ে দিলাম। বললাম আর কিছু নাই। তিনি এতো ভাংতি টাকার বাহার দেখে আর কিছু না বলেই রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি আমাদের ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস এসি কক্ষে নিয়ে বসিয়ে দিলেন।
যথারীতি ১ ঘণ্টা পর টিকেট চেকার এসে হাজির। টিকেট টিকেট...। আমরাও কম চালাক না। বললাম, টিকেট তো ওই কামরার মামার কাছে। একথা বলে ওনাকে দেখিয়ে দিলাম। টিকেট চেকার চলে গেল। ঢাকায় পৌঁছার কিছুক্ষণ আগে স্টুয়ার্ট মামা এসে আমাদের জানিয়ে দিলেন, তেজগাও স্টেশনে ট্রেন যদি স্লো করে তাহলে সেখানেই নেমে যেতে। নাহলে যেন কমলাপুরের আগে যে কোনো জায়গায় নেমে যাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় ট্রেন কমলাপুরের আগে কোনো জায়গাতেই থামলো না। এ কারণে আমাদের কমলাপুরেই নামতে হলো। কমলাপুরে নেমে আমরা চিন্তা করলাম বড় গেটটা দিয়ে না বের হয়ে পাশের ছোট গেটটা দিয়ে বের হলেই হবে।
কিন্তু সেখানেও দেখি পুলিশ দাড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে বলে টিকেট টিকেট...। আমরা আবার খুবই সপ্রতিভভাবে মামার জ্বয়গান গেলাম। তবু কাজ হলো না। ওরা বললো, কোন মামা? এখানে নিয়ে আসেন। অগত্যা দুইজন গেটে দাড়িয়ে থাকলাম, একজন গিয়ে ঠিকই মামাকে খুজে নিয়ে আসলাম। তিনি আসতেই সব সমস্যা মিটে গেল।
কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে বের হয়ে তিনজন অভিজ্ঞতাটা মেলাতে লাগলাম। সীতাকুণ্ডে গেলাম, বঙ্গোপসাগরে ঘুরলাম, সন্দ্বীপে ঘুরলাম, টিকেট ছাড়া কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে চড়লাম, তাও আবার ফার্স্ট ক্লাস এসি। সবই মামার জোর। এটাই ছিল আমার জীবনে প্রথম (এবং শেষ) বিনা টিকেটে ট্রেন ভ্রমণ।
(ভ্রমণের ছবিগুলো নাই, থাকলে খুব ভালো হতো)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

