সংসদ ভবনের উত্তরের ক্রিসেন্ট লেকের ধারের উদ্যানটা আমার কাছে বরাবরই বেশ রহস্যময় বলে মনে হয়। এজন্য মন খারাপ হলেই আমি এখানে সময় কাটাতে আসি। কয়দিন ধরে মনটা খুব খারাপ ছিল। তাই পড়ন্ত এক বিকালে এর কিনারে বসে আমি এখানে আসা মানুষগুলোকে লক্ষ্য করছিলাম
সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। বেশ কয়েক জোড়া জুটি তখনও ভালই সময় কাটাচ্ছে। ডায়বেটিস কবলিতদের হাটাহাটি আস্তে আস্তে কমে আসছে। ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরাঘুরি করতে আসারা ধীরে ধীরে বাইরে চলে যাচ্ছে।
যতোই অন্ধকার হচ্ছে, বাগানের পশ্চিম দিকের মাটির ঢিবিটার ধারের নির্জনে রঙচংয়ে পোশাক পড়া কয়েকজন প্রফেশনাল মেয়ে স্নো পাউডার মেখে নিজেদের চেহারাটা ঘসামাজা করে নিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতিদিনের মতো বাগানের মাঝখানের লাইটগুলো অজ্ঞাত কারণে নিভে গেল।
বাগানের লাইটগুলো নিভে যাবার পরও কিছু নিরীহ দর্শনার্থী লেকের ধারেই বসে রইলো। আর কিছু দর্শনার্থী এ সময় রওনা দিলো বাগানের ভেতরের দিকে। প্রফেশনাল যে মেয়েগুলোর চেহারা ঘসামাজা করা শেষ তারা রওনা দিয়েছে বাগানের অন্ধকার কোনের দিকে। বোরখা পড়া কয়েকজন এসময় তাদের সাথে যোগ দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোরখা ঢুকে পড়ে ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতরে। কয়েকজন দর্শনার্থী এসময় তাদের পিছু নেয়
এ পর্যন্ত দৃশ্যটা স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। শান্ত নিস্তব্ধ পরিবেশ। কিন্তু হঠাৎ বাগানের পূর্ব দিকে আর্মড পুলিশের একটি ট্রাক এসে থামে। বুটের মচমচে শব্দ আর দৌড়াদৌড়িতে বুঝতে পারি এলাকাটা আর নিরাপদ নাই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়।
আজকে পুলিশের টার্গেট প্রফেশনাল মেয়েরাই। তাদের দিয়ে জৈবিক তাড়না মেটানোর জন্যই তাদের আগমন। ভাবছিলাম অন্ধকারে ছবি তুলতে পারে এমন একটা ক্যামেরা থাকলে পুলিশের কাণ্ডগুলো তুলে রাখা যেতো। এদের একটা কঠিন শ্বাস্তি হওয়া দরকার। আর্মড পুলিশের দলটির তাড়া ছিল মনে হয়। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই বাগানের অন্ধকারে বিনা পয়সায় নিজেদের জৈবিক তাড়না মিটিয়ে পুলিশেরা উধাও হয়ে যায়।
এরপর আবার ধীরে ধীরে রাতের বাগানের স্বাভাবিক প্রাণ ফিরে আসতে থাকে। এদিক ওদিক পালানো লোকজন আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসতে থাকে। এ বাগানটার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে শুধু প্রফেশনালদের খদ্দেরই আসে না। প্রচুর দর্শকও আসে।
বাগানের অন্ধকার কোনায় শুরু হয় অর্থের বিনিময়ে জৈবিক তাড়না নিবারণ। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তার পাশ দিয়েই অনেকে হেটেঁ যায়। দূরের ল্যাম্প পোস্টের আলোয় ভালোমতো দেখা যায় না কিছুই। তবু কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করে। পেইড জৈবিক তাড়না মেটানোর ব্যাপার স্যাপার। প্রফেশনালরা অবশ্য ব্যাপারটাকে ভাল চোখে দেখে না। মাঝে মাঝেই তাই গর্জন শোনা যায়,.... না করলে এখান থেকে ফুট। যা.. যা...
তবু দর্শক কমে না। তাড়া খেয়ে কিছু দূরে যায় মাত্র। কয়েকজন সিগারেট অলা এখানেও সিগারেট বিক্রি করে। অন্ধকারেই একটা কুপি জ্বালিয়ে বাদামঅলা চাপা স্বরে ডাকাডাকি করে, বাদেম বাদেম....
জুটিগুলি অবশ্য অন্ধকারে বাগানের এতোটা ভেতরে থাকে না। জানের একটা মায়া আছে না! তারা একটু বাইরের দিকে ঝলমলে ল্যাম্পপোস্টের আশেপাশে পরস্পর শরীরের উষ্ণতা উপভোগ করে।
বাগানের একেবারে অন্ধকার দিকটাতে মানুষের জটলাগুলো থেকে খানিকটা দূর দিয়ে আমি হেটে যাচ্ছিলাম। এসময় হলুদ শাড়ি পড়া এক মেয়ে এগিয়ে আসে। পথ রোধ করে বলে, করবেন না?
আমার পক্ষ থেকে কোনো আগ্রহ বা সাড়া না পেয়ে বলে উঠে, হিজরা খুঁজেন নাকি? পাইবেন না। আমি ভয়ে একটু জোরে পা চালাই
বিজয় স্মরণির দিকটাতে বাগানের অন্ধকারে প্রতি সন্ধ্যায় অন্যদের তুলনায় বয়স্ক এক মেয়েকে জমকালো একটা শাড়ি পড়ে দাড়াতে দেখি। প্রতিদিনই মাথার চুলগুলো উচু করে ঝুঁটি বাঁধে সে। এতে তাকে স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা মনে হয়। মেয়েটাকে আমি সবসময় একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একা দাড়িয়ে থাকতে দেখি। আচ্ছা এ মেয়েটা কি কোনো কাস্টমার পায়না? আচ্ছা এ কি আমাকে চিনতে পেরেছে? কালকেও তো এভাবেই হেঁটে গেলাম! আচ্ছা এর নাম জিজ্ঞাসা করলে কি সঠিক নামটা বলবে? নাকি টাকা পয়সা ছাড়া কোনো কথা বলবে না? এর জীবণটাও কি আমাদের মতো জটিলতায় পরিপূর্ণ?
আমি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, বরাবরের মতো সে জিজ্ঞাসা করলো, চলে?
আমিও কিছু না বলে বরাবরের মতো পাশ কাটিয়ে চলে যাই। বলা হয়না কিছুই। সেও বরাবরের মতো একটু হতাশ হয়। হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। মুখে অবশ্য আর কিছু বলে না।
মনে মনে ভাবি, এখানে এসে আমার কি লাভ হয়? সান্ত্বনা খুঁজি? কেউ দাম দেয় না? পৃথিবীর আর কোথাও নিজেকে দামী মনে হয় না, যতোটা এখানে মনে হয়?
এভাবেই প্রাণপণে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যায় কেউ কেউ। আর হতাশ জীবন নিয়ে মন খারাপ করা অন্ধকারে সান্ত্বনা খুজে ফেরে ব্যর্থ এক যুবক....
(ছবি: গুগল)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ৭:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



