হোম সিকনেস কাটেনি তখনও। দুই যুগ ধরে ঘুম থেকে উঠেই মা এর মুখ দেখতাম। এ অভ্যেস কি রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব? এক ছেলে, মা সব সময়ই আগলে রাখত। বুঝতে পারতাম না কখনও। মনে হত মা রা ত এমনই হয়। হবেই। বাবার সাথে ঈগো ঘটিত অনেক সমস্যাই ছিল। সবার ই থাকে। পড়াশুনা, বন্ধু বান্ধব, জীবন নিয়ে চি্ন্তা ভাবনা বসে বসে খাওয়া ঈত্যাদি বাবার প্রিয় বিষয় গুলো নিয়ে বাবার সাথে দুরত্ব রেখে ঠুক ঠাক মা-ই সামাল দিতেন।
দুই যুগ পর বাসা থেকে বেরিয়ে চাকরি নিয়ে ঢাকায়। মাল্টিনেষনেলএর রোস্টার ডিউটি তে মানিয়ে নিলেও সপ্তাহান্তে কি এক আকর্ষনে বাসায় না এলে হয় না। সপ্তাহ শেষে যখন বাসায় আসি মাত্র দুই দিনের জন্য, মা বড় বিরক্ত করেন। এমন একটা ভাব বন্ধু বান্ধব সব ছেড়ে দিয়ে দুই দিন ই ঘরে বসে থাকি। প্রীয় রেস্তোরায় ত দুরের কথা, বন্ধু বান্ধবের বাসায় খাওয়া সম্পুর্ণ নিষেধ। মা খাওয়াবেন। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে অবশ্য আমি সব সময়ই একটু খারাপ। মাছ খেতাম না, শাক শবজি খেতাম না। তাই আলাদা আমার জন্য মাংশ বা ডিমের ব্যাবস্থা আমার মা করে রাখতেন।
গত সপ্তাহে মা কে দেখতে যাই নি। সিদ্ধান্ত নিলাম এ সপ্তাহেও যাব না। এক ছেলের আব্দার তাদের রাখতে হবেই। বন্ধুর বাসায় এক রাত কাটিয়ে পর দিন সকালে বোনের বাসায় ফিরে এলাম। শুনলাম মা পড়ে গিয়ে হাত ভেন্গে ফেলেছেন। আমার সাথে কথা বলতে চান। ফোনে কথা হল মাএর সাথে। বাচ্চা দের মত কাঁদছেন আমার মা, "তুই আমাকে দেখতে আসবি না"?... বল্লাম আসব। তুমি অষুধ ঠিক মত খেও।...
পরের মংগল বার সকাল। ঘুম থেকে ডেকে তুলল আমার বোন। কেঁদে কেটে কথা বলতে পারছেনা। অনেক কষ্টে ঘোর লাগা গলায় পাগলের মত আপু বলল, মা নাকি হসপিটালে। শরির খুব খারাপ, আমাদের যেতে হবে।...অশুভ সংকেত? না। কিভাবে? অচেনা সেই বিশ্বাস অবিশ্বাসের ঘোর যেন মগযটাকে ঘিরে ফেলছে। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে চোখে মুখে কিছু পানি ছিটিয়ে ছুটে চল্লাম সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারের দিকে। বাড়ি যেতে যেতে রাস্থায় মোটামুটি অনুভুত হল। আল্লাহ আমাকে আমার জীবনের সব চেয়ে বড় শাস্তি দিয়ে ফেলেছেন। তার পরও এক টুকরো মিরাকল এর আশায় গাড়িতে বসে ছোট বেলায় শেখা সুরা, দোয়া পড়তে থাকি। বাসায় পৌঁছুতে আর বেশি বাকি নেই। শত অনিচ্ছা সত্যেও যখন আমার নাকে আতরের গন্ধ এসে লাগল, যখন দেখলাম ঘরের সামনে টুপি পরা জনবাহুল্ল। বুঝতে অসুবিধা হল না....
তার পর.....আজ প্রায় ৩ বছর হল মা কে হারিয়েছি। কবরে নেমে যত্ন করে মাথা টা শুইয়ে দিয়েছিলাম। আসতে ইচ্ছে করেনি সেদিন। জীবনে আর কখনও মা ডাকতে না পারার কষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মা এর হাতে কখনও বেতনের টাকা টা তুলে দেয়ার সুযোগ হয়নি, মুখ ফুটে বলা হয় নি মা তোমাকে কত ভালবাসি। ভাবতাম বলতে হবে কেন? অথবা ভাবতাম বলব কোনও এক সময়। আর বলা হয় নি, বলা হবেও না। এমন কিছু পুরোন না হওয়া ইচ্ছা মনের ভেতর খোচাতে থাকে। হয়ত খোচাবে সারাটা জীবন। জানি আমি তোমার এক অযোগ্য সন্তান ছিলাম। তবু মা গো তোমায় ভালবাসি অনেক ভালবাসি।
আমার মা এর মৃত্যু বার্ষিকী আগামি ১৩ মার্চ। ইংলিশ এ খুব সুন্দর একটা কথা আছে। "টেকেন ফর গ্রান্টেড"। আমরা সবাই মোটামুটি এমন ই একটা চিন্তা ভাবনা নিয়ে থাকি, মা ত সবারই আছে, থাকে। না, মা সবার নেই, সবার থাকে না।.....
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


