somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুপ্রিয় তথ্য আপা

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সম্প্রতি ইউএসএআইডি প্রকাশিত 'সার্পোটিং জেন্ডার এন্ড আইসিটি: ওপারচুনিটি ফর দ্য উইম্যান অব বাংলাদেশ" শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয় আইসিটি বা টেলিযোগাযোগ খাতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নারীর ক্ষমতায়ন ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া এ খাতে অংশগ্রহণে নারীর অভিজ্ঞতা, বিশেষত তথ্য প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রসার ঘটে, যা অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে৷ এমনকি আইএলও রিপোর্ট-২০০১ এ অর্থনীতির উর্ধমুখী লেখচিত্রের সঙ্গে আইসিটিকে সামঞ্জস্য করে যে নিবন্ধটি উপস্থাপন করা হয়, সেখানেও নারীর অংশগ্রহণকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ বিশ্ব গবেষণার এ তথ্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কতোটা সামঞ্জস্য- এটা অন্য আলোচনা; তবে মানব উন্নয়নের সঙ্গে প্রযুক্তির উঠাবসা সংক্রান্ত গবেষণার এ দখিনা হাওয়া আমাদের একেবারেই ছুঁয়ে যায়নি- এ বক্তব্য কিছুতেই মেনে নেবার নয়৷ পাঠক, চোখ এখনই কপালে তুলবেন না, চলুন পড়ে নেয়া যাক আমাদের গাইবান্ধা সংবাদদাতা মশিয়ার রহমান খান ও গোলাম রসূল মারুফের এবারের মহিলা অঙ্গনের মূল ফিচারটি৷



সময়টা পাঁচশত বছর আগে, যখন রূপকথার গল্পের যুগ৷ রাজকন্যার ঘুম ভাঙাতে পঙ্খীরাজে উড়ে আসে রাজপুত্র, সোনার কাঠি-রূপার কাঠির ছোঁয়ায় জেগে উঠে রাজকন্যা৷ আর এখন সময়টা একবিংশ শতাব্দী, যুগটা তথ্য প্রযুক্তির৷ রাজকন্যারা এখন জেগে উঠেছে৷ পঙ্খীরাজে নয়, সাইকেলে চড়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন তারা, সঙ্গে তথ্য প্রযুক্তির জাদুর কাঠি। সে-ই রাজকন্যারা গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মানুষগুলোর কাছে হয়ে উঠেছেন 'তথ্য আপা'৷

সেদিন সকালে 'তথ্য আপা'র সনে

বসন্তের সকাল, বেশ পরিস্কার৷ সাঘাটা উপজেলার খামার ধনারুহা গ্রামের একটি বাড়ির আঙিনায় 'তথ্য আপা'র জন্য অপেক্ষা করছিলেন কয়জন নারী। এদের সবাই বিভিন্ন রোগ, গর্ভবতী মায়ের সমস্যা ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে কথা বলবেন 'তথ্য আপা'র সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যেই 'তথ্য আপা' রীতা আখতার সাইকেলে করে এসে পৌছলেন সেখানে৷ মাটিতে মাদুর বিছিয়ে বসে পড়লেন সবাই, মাঝখানে 'তথ্য আপা'৷ হাতে ল্যাপটপ৷ এক এক করে সবার সমস্যা শুনলেন তিনি৷ ল্যাপটপ ঘেঁটে সে সমস্যার সমাধান বের করে তাদের দিলেন৷ কাউকে দিলেন মুখে বলে আর কাউকে কাগজে লিখে৷ আর যে সমস্যার সমাধান ল্যাপটপ ঘেঁটে পেলেন না, দ্রুত হাতে তা টাইপ করে নিলেন ল্যাপটপে৷ কার্যালয়ে ফিরে বিশেষজ্ঞের মতামত সংগ্রহ করবেন ঐ বিষয়ে ৷ আর দু-একদিন পর সে সমস্যার সমাধান পৌঁছে দিবেন কাংক্ষিত প্রশ্নকর্তার কাছে৷

যে পথে যেভাবে যাত্রা শুরু

গ্রামের পশ্চাত্পতদ জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নের স্রোতে এক করার লক্ষ নিয়ে সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ও সাঘাটা ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে 'উদয়ন পল্লী তথ্য কেন্দ্র' কাজ শুরু করে৷ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বেসরকারি উন্নয়নমূলক সংস্থা 'উদয়ন'কে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয় ডি-নেট৷ আর আর্থিক সহযোগিতা করে 'মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন' ৷ বস্তুত এ সম্মিলনেই এগিয়ে যাচ্ছে মূল কার্যক্রম ৷ 'পল্লীতথ্য কেন্দ্র' স্থাপনের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, আইন, মানবাধিকার, দুর্যোগ ও সরকারি সেবাসহ মোট দশটি বিষয়ে জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়া ৷ এ জন্য ল্যাপটপে রয়েছে একটি তথ্য ভান্ডার ৷ এ প্রকল্প বাস্থবায়নের মূল ভূমিকায় যারা রয়েছেন তাদের দাপ্তরিক পদবী ইনফো-লেডি ৷ তবে দু ইউনিয়নের সব মানুষের কাছে তারা 'তথ্য আপা' বলে পরিচিত৷ প্রকল্পের আওতায় দুজন 'তথ্য আপা' বিশটি গ্রামে তথ্য সরবরাহের কাজ করে থাকেন৷ আর সমগ্র প্রকল্পটির তদারকের দায়িত্বে রয়েছেন একজন কেন্দ্র কর্মকর্তা ৷

'তথ্য আপা'দের দিনলিপি

বেসরকারি উন্নয়নমূলক সংস্থা 'উদয়ন' অফিসে স্থাপিত পল্ল তথ্য কেন্দ্র থেকে ল্যাপটপ নিয়ে সকাল নয়টার মধ্যে গ্রামে বেড়িয়ে পড়েন 'তথ্য আপা'রা ৷ তারপর হাজির হন কোনো এক গ্রামে ৷ কিছুক্ষণের মধ্যে জড়ো হতে থাকেন ঐ গ্রামের নারীরা ৷ নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন তারা ৷ তথ্য আপা ল্যাপটপে রক্ষিত তথ্য ভান্ডারে খোঁজেন সে সমস্যার উত্তর৷ সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গেলে স্বস্তি ৷ মুখে জানিয়ে দেন কিংবা লিখে দেন সমস্যার সমাধান ৷ আর ল্যাপটপের তথ্য ভান্ডারে যে সমস্যার সমাধান থাকে না তা ল্যাপটপে লিখে আনেন 'তথ্য আপা' ৷ ই-মেইল করে পাঠান ডি-নেট ঢাকাস্থ কার্যালয়ে ৷ ডি-নেট তাদের নির্ধারিত বিশেষজ্ঞের সমাধানসহ দু-এক দিনের মধ্যেই তা ই-মেইলেই জানিয়ে দেন প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত তথ্য কেন্দ্রে এবং সে সমস্যার উত্তর যথারীতি 'তথ্য আপা'র মাধ্যমে পৌঁছে যায় সে-ই প্রশ্নকর্তা নারীর কাছে৷ বাড়িতে বসেই এ প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা পেয়ে যান সব সমস্যার সমাধান৷ কোথাও ছোটাছুটি করতে হয় না তাদের৷

সব তথ্য, সবার জন্য

শুধু নারীরাই নয়, পুরুষরাও যে কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারেন 'তথ্য আপা'র সঙ্গে ৷ কৃষি সমস্যার সমাধানও দিয়ে থাকেন তারা ৷ এমনিভাবে গত তিনবছরে মুক্তিনগর ও সাঘাটা ইউনিয়নের বিশ গ্রামের লোকজন, বিশেষ করে নারীদের কাছে 'তথ্য আপা' একজন প্রয়োজনীয় ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন৷ তাই যে কোনোদিন যে কোনো সময় 'তথ্য আপা'র দেখা পেলেই আনন্দিত হয়ে উঠেন বিশ গ্রামের মানুষ৷ কারণ আর চিন্তা নেই, সমস্যা যেখানে, সমাধান নিয়ে সেখানেই হাজির 'তথ্য আপা'৷

'তথ্য আপা'দের কল্যাণে এখন মানুষ নানা রকম সমস্যার সহযোগিতা খুঁজে পাচ্ছেন, খুঁজে পাচ্ছেন নানামুখী তথ্য ৷ ফলে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে তথ্য প্রযুক্তি হয়ে উঠছে এক পথ নির্দেশিকা ৷ এ বিষয়টি বর্তমানে কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকাতে সীমাবদ্ধ আছে, তবে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেবার জন্যে প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা ৷ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বিত প্রয়াসে এ প্রযুক্তি নির্ভর সেবা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করা আবশ্যক৷ এতে একদিকে যেমন সমস্যা সমাধানে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্য প্রবাহ থাকবে, তেমনি নারীর কর্মসংস্থানের যোগে, নারীর ক্ষমতায়নের তৈরি হবে নব মাত্রা ৷ সেদিনের প্রত্যাশায় চোখ রেখে সামনে তাকালে কতো সুন্দরই না মনে হয় ভবিষ্যতকে৷

(ফিচারটি আমাদের কার্যক্রমের উপর লেখা, যা গতকাল ০৩-০৪-২০১০ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে। ফিচারটির লিংক )
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×