রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ নানামুখী তদবিরে প্রশাসন অস্থির হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী প্রবেশ করে। যাদের অধিকাংশ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। আছে পেশাদার তদবিরবাজদের উৎপাত। এছাড়া সাংসদরা তো আছেনই। এসব নানামুখী তদবিরের চাপ সামাল দিতে সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা হিমশিম খাচ্ছেন। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রণালয়ে রুটিনওয়ার্কও ব্যাহত হচ্ছে। সচিবরা অফিসে বসে কাজ শেষ করতে না পেরে বাসায় ফাইল নিয়ে যাচ্ছেন। দিনের কাজ শেষ করতে কাউকে রাত অবধি অফিসও করতে হচ্ছে। এমনাবস্থায় তারা প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা কামনা করছেন।
জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের কার্যবণ্টন নির্দেশিকা মেনে বেশিরভাগ কর্মকর্তা নথি নিষ্পত্তি করেন না। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ বিষয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনেকেই জানেন না। নিজে ফাইল নিষ্পত্তি না করে দায়দায়িত্ব এড়াতে সচিব ও মন্ত্রী পর্যন্ত পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ফলে সচিব-মন্ত্রীদের কাছে বেশি মাত্রায় ফাইলের চাপ পড়ে। এ অবস্থায় নানামুখী তদবির এবং ফাইলের চাপে সচিবদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের একদিনের ফাইল নিষ্পত্তির রেকর্ড দেখলেই পরিস্থিতি অনুমান করা সহজ হবে। আর এভাবে বিপুলসংখ্যক ফাইল রিলিজ করতে গিয়ে সচিবদের অতিরিক্ত সময় অফিসে থাকতে হচ্ছে। রাত অবধি অফিস করে পরের দিন সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে আসতে গিয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একজন সচিবকে গড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০টি ফাইল দেখতে হয়। এসব ফাইল ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ছাড়তে গেলে দিন পার হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নীতিনির্ধারণী বিষয় ছাড়া আর কোন ফাইল মন্ত্রী-সচিব পর্যন্ত আসার কথা নয়। এরপর রয়েছে তদবিরের চাপ।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি তদবিরের চাপ সামাল দিতে হচ্ছে শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, সংস্থাপন, স্বাস্থ্য, এলজিআরডি, আইন, যোগাযোগ ও পূর্ত মন্ত্রণালয়কে। এসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের দফতরে সকাল ১০টা থেকেই তদবিরের চাপ শুরু হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের তদবিরের চেয়ে দলীয় পরিচয়ের তদবিরই বেশি। কেউ মন্ত্রীর লোক, এমপি, কিংবা দলীয় নেতা, এমপির আত্মীয়স্বজন প্রভৃতি পরিচয়ের। স্বাভাবিক তদবিরের বাইরে প্রভাবশালী মহলের তদবির চাপেও আমলারা বিপাকে রয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহ অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশ রদবদলের তদবির সবচেয়ে বেশি। জেলার এসপি এবং থানার ওসি পরিবর্তন নিয়ে এমপিদের পছন্দ-অপছন্দকে প্রাধান্য দেয়ার প্রচুর তদবির আসছে। অনেক ক্ষেত্রে নাম উলে¬খ করে রদবদলের প্রস্তাবও দেয়া হচ্ছে। এছাড়া দ্রুত অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া, ইমিগ্রেশন শাখা থেকে ফাইল ছাড়ানো, পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, বিএনপি জোট ও জরুরি অবস্থার সরকারের আমলে দায়ের করা মামলায় আসামি না ধরার জন্য পুলিশকে বলে দেয়ার তদবিরও আসে মন্ত্রণালয়ে।
দর্শনার্থী আর তদবিরের চাপে সবচেয়ে নাকাল অবস্থায় রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্তি, পাঠদান অনুমতি, বর্ধিত শ্রেণী-শাখার অনুমতিসহ বিস্তর তদবিরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজই করতে পারছেন না। শুধু এমপিওভুক্তির জন্য এ পর্যন্ত এমপিদের কাছ থেকে শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে বলে সংশি¬ষ্ট সূত্রে জানাগেছে। এছাড়া শিক্ষক বদলির তদবির তো হরহামেশাই হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা শিক্ষক বদলি কমিটির সুপারিশ মানতেও নারাজ।
সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে তদবিরের চাপ সরকারের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে। পছন্দ অনুযায়ী কর্মকর্তা পোস্টিং দেয়ার নানামুখী তদবিরে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় হিমশিম খাচ্ছে। ডিসি, ইউএনও এবং প্রেষণ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ দফতরে পোস্টিং নিয়ে তদবিরের চাপ বেশি। বিশেষ করে লোভনীয় পদে পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের অনেকে যে যার লাইনে জোর তদবির চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে অনেকে তদবিরের জোরে লোভনীয় বহু পোস্টিং নিয়েছেন। এ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও এমপিরা ডিও লেটার পাঠিয়ে কাজ আদায় করা ছাড়াও বেশিরভাগ তদবির করেন টেলিফোনে। প্রতিদিন অনেক এমপি সংস্থাপন সচিবের সঙ্গে দেখা করেও কর্মকর্তা রদবদলের তদবির করছেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ে অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত, জলমহাল ও বালুমহাল বরাদ্দের তদবিরও কম নয়। সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এসিল্যান্ড পোস্টিংয়ের জোর তদবির। এসিল্যান্ড তদবির নিয়ে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভূমি সচিব চান, অধিকতর যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টিং দিতে। এ কারণে এসিল্যান্ড পোস্টিং বিলম্বিত হচ্ছে।
বর্তমানে সচিবালয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। দর্শনার্থীর চাপে দুপুরের মধ্যে পুরো সচিবালয় রীতিমতো হাটবাজারের অবস্থায় পরিণত হয়ে যায়। বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে মন্ত্রী-সচিবরা দুপুরে সময়মতো খেতেও পারেন না। এজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ এবং সচিবালয়ের নিরাপত্তা রক্ষার কথা বিবেচনা করে দর্শনার্থীর চাপ কমাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা শাখা চিঠি ইস্যু করে। প্রতিদিন মন্ত্রীর দফতর থেকে ১০টির বেশি পাস ইস্যু না করতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পিএসদের কাছে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু এ নির্দেশনাও প্রতিপালিত হচ্ছে না। সচিবালয়ের দর্শনার্থী পাস কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোন কোন মন্ত্রীর দফতর থেকে একদিনে ৬০টির বেশি পাস দেয়া হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য দফতরের পাস যোগ করে তা একশ’ ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে সচিবালয়ে যেখানে আগে সর্বোচ্চ দেড় হাজার দর্শনার্থী প্রবেশ করত, এখন তা দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


